‘শিক্ষকের পেশাগত জায়গা আমার পিএইচডি সুপারভাইজার শিখিয়েছেন’

১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে ইউনেস্কোর উদ্যোগে এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত বিশেষ আন্তঃসরকার সম্মেলনে ‘রিকমেন্ডেশন কনসার্নিং দ্য স্ট্যাটাস অব টিচার্স’ গ্রহণ করা হয়। দিনটিকে স্মরণ করে ১৯৯৪ সাল থেকে ইউনেস্কো ও এডুকেশন ইন্টারন্যাশনালের (ইআই) উদ্যোগে প্রতিবছর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ উপলক্ষে নিজের প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন বিশিষ্টজনেরা।

অধ্যাপক ড. সামসাদ মর্তুজা
০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৫ আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৫

জীবনের প্রতিটি ধাপেই আমরা কোনও না কোনও শিক্ষকের সংস্পর্শে আসি। স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, এরপর বিভিন্ন জায়গায় গবেষণা, পিএইচডি, পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন; এই দীর্ঘ চলার পথে অনেক শিক্ষকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। প্রত্যেকের কাছ থেকেই কিছু না কিছু পেয়েছি। আজ আমি যে জায়গায় এসেছি, সেখানে প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো অবদান আছে। শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, আমি নিশ্চিত, এটি সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

তবে আজ আমি এমন একজন শিক্ষকের কথা বলতে চাই, যাঁর কাছ থেকে আমি শুধু গবেষণা শিখিনি, একজন শিক্ষকের পেশাগত জায়গাটাও শিখেছি। তিনি ছিলেন আমার পিএইচডি সুপারভাইজর, প্রফেসর উইলিয়াম রো। তিনি বার্কবেক কলেজ, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের একজন এমিরেটাস প্রফেসর।

তাঁর যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে ভালো লাগতো, তা হলো তাঁর পেশাদারত্ব। তিনি খুবই প্রফেশনাল একজন গবেষক ছিলেন। তাঁর সঙ্গে যখন প্রথম কাজ শুরু করি, প্রথম দিনই তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি ৮০ হাজার থেকে এক লাখ শব্দের একটা থিসিস লিখবে। কোথাও ক্রিয়েটিভিটি, ক্রিয়েটর; এই শব্দগুলো দেখতে চাই না।’

আমি একটু অবাক হয়েছিলাম। কারণ আমার পিএইচডি ছিল কবিতার ওপর। মনে হয়েছিল, ক্রিয়েটিভিটি ছাড়া আমার কবিতা কী করে হয়? কিন্তু পরের দুই বছর তিনি আমাকে দিয়ে শুধু ইন্ট্রোডাকশন লিখিয়েছেন। পেছনে তাকিয়ে এখন বুঝতে পারি, আমার বোঝার জায়গায় তখন অনেক ঘাটতি ছিল। তিনি যেভাবে বিষয়টিকে ফ্রেম করতে চাইছিলেন, আমি তখনো সেটি বুঝতে পারিনি। কিন্তু তিনি কখনো আমাকে বলেননি, ‘তুমি এটা করো।’ বরং আমাকে কিছু বই দিয়ে বলতেন, ‘এগুলো পড়ে আসো।’ বলতেন, ‘অমুক কনফারেন্সে যাও।’

তিনি আমাকে উত্তরটা দিয়ে দেননি। বরং নিজেকে আবিষ্কার করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। সেই সময় হয়তো বিষয়টি বুঝতে পারিনি। কিন্তু আজ আমি যে জায়গায় এসেছি, সেখানে তাঁর সেই ধৈর্য, নিষ্ঠা ও কমিটমেন্টের বড় অবদান আছে। তাঁর তৈরি সেই প্রশিক্ষণের জায়গাটাই আমাকে আজকের জায়গায় আসতে সাহায্য করেছে।

দুই বছর ধরে শুধু ইন্ট্রোডাকশন লেখার সেই সময়টাকে এখন আমার কাছে অন্যভাবে মনে হয়। ওই কাজের মধ্য দিয়েই সাহিত্যের একটি জগতকে আমি নতুন করে জানার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্তে নিয়ে যাননি। আমাকে পড়তে দিয়েছেন, ভাবতে দিয়েছেন, নিজের পথ নিজেকে খুঁজে নিতে দিয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত যখন আমার পিএইচডি সম্পন্ন হলো, তখন তাঁর পেশাদারত্বের আরেকটি ঘটনা আমার মনে গভীরভাবে থেকে গেলো। আমার ভাইভা বা ডিফেন্স হয়েছিল প্রায় আড়াই ঘণ্টা। ডিফেন্সের সময় তাঁর থাকার কথা ছিল না। কিন্তু তিনি থাকার জন্য জোর করেছিলেন। দেয়ালের দিকে মুখ করে তিনি কম্পিউটারে বসেছিলেন, শুধু আমার ডিফেন্সটি শোনার জন্য। ডিফেন্স শেষে এক্সটারনাল আমাকে অভিনন্দন জানালেন, ‘কনগ্রাচুলেশন, ডক্টর মর্তুজা।’

তারপর দেখলাম, প্রফেসর উইলিয়াম কিছু প্রিন্ট নিচ্ছেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে এক্সামিনারদের সঙ্গে আমার যে কথা হয়েছিল, সেখানকার ফিডব্যকগুলো আমি নিজে লিখে রাখতে পারতাম না। কিন্তু তিনি পুরো সময়টা ধরে সেগুলো টাইপ করেছেন। তারপর প্রিন্ট আউটটি আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘দিস ইজ মাই গিফট টু ইউ, ডক্টর মর্তুজা।’

মুহূর্তটি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল, একজন সুপারভাইজর হলে হয়তো এমনই হওয়া উচিত। তিনি আমাকে নিজেকে আবিষ্কার করতে দিয়েছেন। নতুন পথ দেখিয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি একজন শিক্ষকের পেশাগত জায়গাটাও শিখিয়েছেন। তাঁর কাছ থেকে আমি বুঝেছি, একজন শিক্ষকের শুধু মানবিক দিক থাকলেই চলে না। তাঁর একটি পেশাগত জায়গাও থাকতে হয়। সেই পেশাগত জায়গাটি কীভাবে তৈরি করতে হয়, কীভাবে দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করতে হয়, সেটি তিনি আমাকে শিখিয়েছেন।

আমার কাছে সেটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, একজন শিক্ষক কখনো কখনো সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়েও একজন শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারেন। কখনো তিনি শুধু একটি বই হাতে তুলে দেন, কখনো কোনো সম্মেলনে যেতে বলেন, কখনো নিজের ভুলটা নিজেকেই আবিষ্কার করতে দেন। আর কখনো আড়াই ঘণ্টা নীরবে পাশে বসে একজন শিক্ষার্থীর ডিফেন্স শোনেন এবং শেষে হাতে তুলে দেন তাঁর নিজের লেখা ফিডব্যাক।

প্রফেসর উইলিয়াম রো আমার জন্য এমনই একজন শিক্ষক। আমি সত্যিই তাঁর কাছে অনেক কৃতজ্ঞ।

—উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)

/এসও/ইউএস/
সম্পর্কিত
কেন বারবার শিক্ষকরা রাজপথে নামেন?
‘শিষ্টাচার শেখার ক্ষেত্রে আমার শিক্ষকদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য’
‘যাদের হাত ধরে মানুষ হওয়ার শিক্ষা’
সর্বশেষ খবর
মুচমুচে জালিতে মজাদার ডিমের কবিরাজি রেসিপি
মুচমুচে জালিতে মজাদার ডিমের কবিরাজি রেসিপি
কেন বারবার শিক্ষকরা রাজপথে নামেন?
কেন বারবার শিক্ষকরা রাজপথে নামেন?
অপরাজিত থাকার রেকর্ডে স্পেনের সামনে এখন কারা?
অপরাজিত থাকার রেকর্ডে স্পেনের সামনে এখন কারা?
আজ বৃষ্টির সম্ভাবনা কম, কেমন থাকবে তাপমাত্রা?
আজ বৃষ্টির সম্ভাবনা কম, কেমন থাকবে তাপমাত্রা?
সর্বাধিক পঠিত
২০২৭ সালে স্বর্ণের দাম নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট ও বাবা ভাঙ্গার পূর্বাভাসে কী আছে?
২০২৭ সালে স্বর্ণের দাম নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট ও বাবা ভাঙ্গার পূর্বাভাসে কী আছে?
অসুস্থতায় ৯ মাস শুটিংয়ে নেই, এবার ফিরতে চান তানিয়া বৃষ্টি
অসুস্থতায় ৯ মাস শুটিংয়ে নেই, এবার ফিরতে চান তানিয়া বৃষ্টি
গ্রেফতার এড়াতে লিঙ্গ পরিবর্তন, ৮ বছর পর ধরা পড়লেন পলাতক আসামি
গ্রেফতার এড়াতে লিঙ্গ পরিবর্তন, ৮ বছর পর ধরা পড়লেন পলাতক আসামি
বিচ্ছেদের ঘোষণা প্রীতম ও শেহতাজের
বিচ্ছেদের ঘোষণা প্রীতম ও শেহতাজের
পিচ্চি রাজা পালিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য, দুই পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেফতার
পিচ্চি রাজা পালিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য, দুই পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেফতার