X
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
১৩ ফাল্গুন ১৪৩০
বুসান ডায়েরি-৩

বিশ্বের সবচেয়ে কম জন্মহারের দেশ নিয়ে কৌতূহল

জনি হক, বুসান (দক্ষিণ কোরিয়া) থেকে
জনি হক, বুসান (দক্ষিণ কোরিয়া) থেকে
১১ অক্টোবর ২০২৩, ১০:৫২আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৩, ১৪:৩৮

দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বুসানে এসে তিনটি কৌতূহল তৈরি হলো। প্রথমত জাপান, কোরিয়ান ও চীনাদের আলাদাভাবে চেনার উপায় কী? বুসানের প্রথম ডায়েরিতেই লিখেছি– এই তিন দেশের মানুষকে দেখতে একই রকম লাগে! দেশ তিনটির অবস্থান কাছাকাছি হওয়াটাই কারণ কিনা জানি না। এরমধ্যে জাপানকে সূর্যোদয়ের দেশ হিসেবে জানে পৃথিবীবাসী। টোকিও থেকে বুসানের দূরত্ব ৯৫৯ কিলোমিটার। অথচ বুসানে আসার তিন দিন পরও সূয্যিমামার দেখা মিললো না। সকাল-সন্ধ্যা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। আবহাওয়া স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা। যদিও কাঁপুনি ধরিয়ে দেওয়ার মতো শীত নেই। খুব বেশি ভারি পোশাক না পরলেও সমস্যা হচ্ছে না। এককথায় সহনীয় আবহাওয়া।

আরেকটি কৌতূহল, দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে কম জন্মহারের দেশ কেন? দেশটিতে ২০২২ সালে শিশু জন্মের হার ছিল শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২১ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ। অথচ ২০২২ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রত্যেক নারী সন্তানের মা হলেই ২০ লাখ কোরিয়ান ওন (১ হাজার ৫১০ ডলার) নগদ পাচ্ছেন। এছাড়া অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য গণপরিবহনে আলাদা আসন ব্যবস্থা ও চিকিৎসার খরচ মেটানোসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার গত ১৬ বছরে ২১ কোটি ১০ ডলার (২৩ লাখ ২৭ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা) খরচ করেছে। তবুও দেশটিতে জন্মহার বাড়ছে না।

বুসান শহরের চিত্রটা আলাদা নয়। এখানে একাধিক সন্তানের মাকে আলাদাভাবে ৩৭৭ ডলার থেকে ৭ হাজার ৫৫২ ডলার পর্যন্ত বাড়তি সহায়তা দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার। কিন্তু বুসানে বসবাসরত অনেক নারী বিয়েতে নারাজ কিংবা বিয়ে করলেও সন্তান নিতে আগ্রহী নন।

বুসান বুসানে কোনও দম্পতির সঙ্গে বাচ্চা দেখলে চোখ আটকে থাকে। এমন একটি দম্পতির সঙ্গে আড্ডার সুযোগ হলো বুসান সিনেমা সেন্টারের সিনেমাউন্টেন অংশের সামনের চত্বরে। এখানে বিস্তৃত জায়গায় চেয়ার-টেবিল রাখা। দুই পাশে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান। আমরা তিন সংবাদকর্মী চিকেন পপকর্ন ও কোমল পানীয় নিয়ে ফাঁকা চেয়ার খুঁজছিলাম। শেষমেষ ওই দম্পতির সামনে তিনটি চেয়ার দেখে অনুমতি নিয়ে বসে পড়লাম। পাঁচ মাস বয়সী পুত্রসন্তান তো হো’কে নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল থেকে ৩২০ কিলোমিটার পেরিয়ে বুসানে এসেছেন তারা। অলিভার মিন ও তায় হি কিম দম্পতি চলচ্চিত্রপ্রেমী। অলিভারের হাত দেখেই কিছুটা আন্দাজ করলাম! তার বাঁ-হাতে প্লাস্টার। এমন অবস্থাতেই চলচ্চিত্রের টানে বুসান চলে এসেছেন তিনি। গত পাঁচ বছর ধরে বুসান চলচ্চিত্র উৎসব মিস করেননি। ১০ দিনের উৎসবে বিভিন্ন দেশের ছবি দেখে সময় কাটান। খেতে খেতে জানতে চাইলাম, হাতের অবস্থা এমন হলো কীভাবে? অলিভার মুখে হাসি রেখে জানালেন, সাইকেল চালাতে গিয়ে বাসার সামনে আচমকা পড়ে গিয়েছিলেন।

ছোট্ট তো হো’কে তখন ফিডার দিয়ে দুধ দিচ্ছিলেন মা। অলিভার-তায় হি কিম দম্পতির কাছে এবার কৌতূহল মেটাতে প্রশ্নটা করলাম– আপনাদের দেশের নাগরিকদের বিয়েতে এত অনীহা কেন? আর এখানকার নারীদের মা হতে না চাওয়ার মূল কারণ কী? দু’জনেই একগাল হেসে দিলেন। তাদের শহর সিউলেই জন্মহার সবচেয়ে কম। সিউলে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জন সন্তান নিতে অনীহা প্রকাশ করে। গুগল ঘেঁটে কোরিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল স্টাডিজের একটি জরিপের তথ্য তুলে ধরলাম, দক্ষিণ কোরিয়ায় মাত্র ৪ শতাংশ তরুণী মনে করে বেঁচে থাকার জন্য বিয়ে ও সন্তান প্রয়োজন আছে।

বুসান অলিভার মিন কৌতূহল মেটাতে বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়ায় বাড়ি ভাড়া ও শিক্ষার খরচ আকাশছোঁয়া। আমাদের দেশে প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে। বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। এসব কারণে সন্তান নেওয়ার আগ্রহ হারিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার নারী-পুরুষ। সন্তান লালন-পালনের বিপুল খরচের চিন্তাই সন্তান না নেওয়ার পেছনে মূল কারণ। এছাড়া চাকরির অনিশ্চয়তা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণ তো আছেই।’

সরকারি সহায়তা থাকার পরও চিত্রটা বদলাচ্ছে না কেন? এবার উত্তর দিলেন তায় হি কিম, ‘নগদ অর্থ সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে বলে মনে হয় না। সরকারি অর্থে একটি শিশুর প্রথম দুই বছরের খরচ মেটানো হয়। এর সঙ্গে তাকে লালন-পালনের সম্পর্ক কোথায়? দুই বছর পর থেকে শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে খরচ বাড়তে থাকে।’

বুসান বোঝা যাচ্ছে, নাতিদীর্ঘ আলোচনায় সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না! তাই ভাবলাম এবার তৃতীয় কৌতূহল মেটানো যাক। বুসানে এসে খেয়াল করেছি, হাঁটার সময় ছাড়া কোরিয়ানরা দিনের অধিকাংশ সময় মোবাইল ফোনে ডুবে থাকে। মেট্রোস্টেশনে ও ট্রেনের বগিতে সেই চিত্র চোখে পড়ে বেশি। অলিভার মিনের কাছে জানতে চাইলাম তার পর্যবেক্ষণ কী? তিনি উত্তরে বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়ায় সবারই কাজের প্রচণ্ড চাপ। ফলে তারা ই-কমার্স সাইট ব্যবহার করে প্রচুর। আর প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কম হয় বলে যতটুকু সময় মেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপ দেখে কোরিয়ানরা।’

জন্মহার ও প্রযুক্তি বিষয়ক ১০-১৫ মিনিটের গুরুগম্ভীর আলোচনায় মোটেও বিরক্তি দেখালেন না কোরিয়ান দম্পতি। বরং সারাক্ষণই তাদের মুখে হাসি। চলচ্চিত্রের উৎসবে এসে অন্য বিষয়ে কৌতূহলী হওয়ার কারণ চলচ্চিত্রই! মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’র ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারে কোরিয়ান এক তরুণের প্রশ্ন শুনে জন্মহারের বিষয়টি মনে পড়েছে। ছবিটির গল্পে বাংলাদেশের একজন অভিনেত্রী বিয়ের অনেক বছর পেরিয়ে যাওয়ায় সন্তান নিতে সামাজিক চাপে পড়ে। এ কারণে ওই তরুণের জানতে ইচ্ছে হলো, বাংলাদেশে জন্মহার কম নাকি বেশি? প্রশ্নটা শুনেই হেসে দিয়েছেন ফারুকী-তিশা দম্পতি।

বুসান সিনেমা সেন্টার অলিভার মিন-তায়ে হি কিমের সঙ্গে আড্ডায় মনে পড়ে গেলো সেই ঘটনা। কোরিয়ান এই দম্পতির কৌতূহল অন্য বিষয়ে। তারা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে জানতে চাইলেন। এবারের বুসান উৎসবের দুটি প্রতিযোগিতা বিভাগে বাংলাদেশের তিনটি ছবি থাকায় আমাদের অভিনন্দন জানালেন। ছবিগুলো দেখার ইচ্ছে আছে তাদের। বুসানে এবার বাংলাদেশ নিয়ে এমন অনেকের আগ্রহ লক্ষণীয়। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির আয়োজনে ‘বাংলাদেশ নাইট’ অনুষ্ঠানে বুসান ডেইলি নিউজের (বুসানিলবো) সাংবাদিক লি উ ইয়াং ক্ষণিকের আড্ডায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে নিজের জানার পরিধি তুলে ধরলেন। আমাদের কাছে কান উৎসবের অভিজ্ঞতা শুনলেন। যদিও কান উৎসবের মতো অত বৃহৎ নয় বুসান উৎসব, তবুও প্রাণবন্ত আমেজ সবখানে। বুসান মেট্রো রেল

/এমএম/
সম্পর্কিত
ইউরোপীয় হাওয়ায় শুরু হলো টোকিও উৎসব, ফোকাসে বেগম রোকেয়া
ইউরোপীয় হাওয়ায় শুরু হলো টোকিও উৎসব, ফোকাসে বেগম রোকেয়া
শেষবেলায় সাগরপাড়ে, সিউলে চাটগাঁইয়া খাবারের পসরা
বুসান ডায়েরি-৬শেষবেলায় সাগরপাড়ে, সিউলে চাটগাঁইয়া খাবারের পসরা
গিনেস রেকর্ডধারী ডিপার্টমেন্ট স্টোর এবং ‘এশিয়ার কান’
বুসান ডায়েরি-৫গিনেস রেকর্ডধারী ডিপার্টমেন্ট স্টোর এবং ‘এশিয়ার কান’
লালগালিচা থেকে পুরস্কার জয়, বুসানে বাংলাদেশের জয়ধ্বনি
লালগালিচা থেকে পুরস্কার জয়, বুসানে বাংলাদেশের জয়ধ্বনি
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন রুনা লায়লা
আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন রুনা লায়লা
কান-জয়ী সেই কৃষ্ণাঙ্গ নারী নির্মাতার হাতে সোনার ভালুক
কান-জয়ী সেই কৃষ্ণাঙ্গ নারী নির্মাতার হাতে সোনার ভালুক
অস্কার যেন অপেক্ষা করছে ‘ওপেনহাইমার’-এর জন্য!
স্ক্রিন অ্যাকটরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ডঅস্কার যেন অপেক্ষা করছে ‘ওপেনহাইমার’-এর জন্য!
অস্কারে মনোনয়ন পাওয়া ছবিতে যুক্ত হলেন প্রিয়াঙ্কা
অস্কারে মনোনয়ন পাওয়া ছবিতে যুক্ত হলেন প্রিয়াঙ্কা
ফাগুন সন্ধ্যায় তিন ভুল ভাঙালেন অপূর্ব
ফাগুন সন্ধ্যায় তিন ভুল ভাঙালেন অপূর্ব