মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে স্বামী হারানো এক রোহিঙ্গা নারী জানিয়েছেন, তিনি রাখাইনে সংঘটিত গণহত্যার কথা প্রকাশ্যে বলতে তৈরি আছেন। সরেজমিন রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে আসা ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মিররের বিশেষ প্রতিনিধি টম প্যারোরকে এ কথা জানিয়েছেন তিনি। মিররে প্রকাশিত প্যারোরের রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সচক্ষে নিজ স্বামীসহ একজন শিশু ও অল্প বয়সী ২০ নারীকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে দেখেছেন ফাতিমা।
২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় অন্তত সাত লাখ রোহিঙ্গা। ফাতিমা সেই পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদেরই একজন। ফাতিমা প্যারোরকে জানিয়েছেন, তার স্বামীকে গুলি করে হত্যার পর ধারালো ছুরিতে গলা কেটে মরদেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এক শিশুকে জবাই করে হত্যার পর পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। ফাতিমা ডেইলি মিররকে জানিয়েছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কবল থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করা সুশ্রী ও অবিবাহিত অন্তত ২০জন কম বয়সী নারীকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে দেখেছেন তিনি।
ওই নারীদের সম্পর্কে মিররের সাংবাদিক প্যারোরকে ফাতিমা জানান, ‘সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে মারা হয় তাদের’। বলেন, তিনি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এইসব ভয়াবহ নৃশংসতার কথা প্রকাশ্যে আনতে চান। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়ে এসব কথা বললে জাতিসংঘ কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো জেনারেলদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র, কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে। অপরায়িত রোহিঙ্গাদের পরিচয় নির্মিত হয়েছে ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ হিসেবে। ফাতিমা স্বপ্ন দেখেন, রাজনীতিকরাএকদিন নিজেদের জাতি-গোত্র-মত-পথের বাইরে থাকা অন্য মানুষদেরকে শত্রুজ্ঞান করার সংস্কৃতির অবসান ঘটাবেন।








