মিম, রিলস ও পোস্টারে প্রতিবাদ: যন্তর মন্তরে তরুণদের অস্ত্রের নাম হাস্যরস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৩ জুলাই ২০২৬, ১৩:০০আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১৩:০০

ডান পাশে স্পিকারে উচ্চশব্দে বাজছে ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’ গানটি, সমবেত কণ্ঠে সুর মেলাচ্ছেন একদল আন্দোলনকারী। বাঁ পাশে একটি অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্পে জরুরি সেবা দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। কিন্তু এসবের মাঝেও একদম নির্বিকার পি হোসেন খান। একটি সাদা চার্ট পেপারের ওপর ঝুঁকে নীল আর সবুজ স্কেচ পেন দিয়ে এঁকে চলেছেন তিনি। শিল্পীর দক্ষতায় লেখাটি ফুটিয়ে তোলার পর ইংরেজি ‘i’ অক্ষরের ওপর ফোটার বদলে এঁকে দিলেন একটি ছোট্ট ‘হৃদয়’।

 

লেখাটি পুরোপুরি তৈরি হতেই দেখা গেলো তাতে লেখা, ‘আমার সাবেক প্রেমিকা এবং এই সরকার দুজনেই হৃদয়হীন’।

দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান নেওয়া হাজার হাজার আন্দোলনকারীর একজন হলেন ২৭ বছর বয়সী খান। নিট-ইউজি-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সেখানে অবস্থান করছেন তারা। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে পরিচালিত ও শান্তিপূর্ণ আখ্যা পাওয়া এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি জেন-জি। আর শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার চেয়ে তাদের লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে হাস্যরস, ব্যঙ্গ ও পরিহাস।

নিজের পরিচয়ে নিজেকে ‘মিমার হিসেবে দাবি করা খান বলেন, যেহেতু সরকার শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে মনে হচ্ছে না, তাই হয়তো একটি হালকা বা হালকা চালের পদ্ধতি ব্যবহার করলে তাদের মনোযোগ পাওয়া যাবে। এছাড়া হাসির মাধ্যমে শক্তি মোকাবিলা করার যে সূক্ষ্ম কৌশল, অন্ধভক্তরা তা বুঝতে অক্ষম, এটি দেখতেও বেশ বিনোদনদায়ক। টানা ২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবাদস্থলে থাকা খান এক সপ্তাহের অনশনেও ছিলেন।

মিম, রিলস ও পোস্টারে প্রতিবাদ: যন্তর মন্তরে তরুণদের অস্ত্রের নাম হাস্যরস

প্রতিবাদস্থলে মিমের এমন প্রদর্শনী চলছে, যার উদাহরণ প্রচুর এবং বৈচিত্র্যময়। এর মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের হাস্যরসের তুলনা টেনেছেন অনেকে। যেমন খান করেছেন তার সাবেক প্রেমিকা ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের মধ্যে। আন্দোলনকারীরা বিরোধী দল বা বিদেশি শক্তির কাছ থেকে অর্থ সুবিধা নিয়ে অভিনয় করছেন, এমন অভিযোগের জবাবে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা দেখা যায়: কেউ আমাকে টাকা দেয় না, আমি বিনামূল্যে এই সরকারকে ঘৃণা করি। কেউ কেউ বর্তমান পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। যেমন, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে সুবিধাভোগী এমনকি অন্তর্মুখী মানুষগুলোও এখানে চলে এসেছে। আবার কিছু মন্তব্য ছিল বেশ বেপরোয়া; যেমন, আইকিয়ার মন্ত্রিসভা এর চেয়ে ভালো।

মিম, রিলস ও পোস্টারে প্রতিবাদ: যন্তর মন্তরে তরুণদের অস্ত্রের নাম হাস্যরস

পপ কালচার এবং বলিউড সিনেমা সংক্রান্ত রেফারেন্স নিয়ে তৈরি পোস্টারগুলোর জন্য ছিল আলাদা বিভাগ। রণবীর কাপুর ও শ্রদ্ধা কাপুর অভিনীত ‘তু ঝুঠি ম্যায় মক্কার’ (২০২৩) সিনেমার পোস্টারটি পুনর্নির্মাণ করে সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ছবি বসানো হয়েছে, যা সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে।

আবার কিছু অপ্রত্যাশীদের সঙ্গে তুলনাও দেখা গেছে। যেমন নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে ঋতুস্রাবের তুলনা করে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা হয়েছে: জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার চেয়ে আমার সেনিটারি প্যাড বেশি লিকপ্রুফ।

মিম, রিলস ও পোস্টারে প্রতিবাদ: যন্তর মন্তরে তরুণদের অস্ত্রের নাম হাস্যরস

প্রত্যাশিতভাবেই প্রধানমন্ত্রী মোদি ও শিক্ষামন্ত্রী প্রধান অধিকাংশ সৃষ্টির মূল প্রেরণা। এক পোস্টারে দেখা যায়, শিক্ষামন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটি ফুল ছিঁড়ে পাপড়ি গুণছেন: ‘আমি কি পদত্যাগ করব? নাকি করব না?’ কেউ কেউ পৌরাণিক কাহিনীর সাহায্য নিয়েছেন। একটি পোস্টারে মহাভারতের কৃষ্ণ ও অর্জুনের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে অর্জুনের জায়গায় শিক্ষামন্ত্রী প্রধানকে বসিয়ে বলানো হয়েছে, ‘সবাই আমার বিরুদ্ধে, মাধব।’ জবাবে কৃষ্ণের নির্মম উত্তর: ‘আগে পদত্যাগ কর ভাই’।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির সুসম্পর্কের পর ইন্টারনেট দুনিয়ায় ‘মেলোডি’ টফি ভাইরাল হয়েছিল। সেই টফি নিয়েও মিম দেখা গেছে। সানা ও মুসকান নামের দুই বোনকে একটি কাগজে লিখতে দেখা যায়, মেলোডি খাও, দেশ খেয়ো না।

পাঁচ দিন পর পরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও এই আন্দোলনে এসেছেন দিল্লি কলেজ অব আর্টের ১৯ বছর বয়সী ছাত্রী সানা। তিনি বলেন, আমাদের আসতেই হতো। না এসে উপায় ছিল? এই আন্দোলন আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আজ তাৎক্ষণিক ইস্যুটি নিট পরীক্ষা সংক্রান্ত হলেও কাল হয়তো আমার পড়াশোনা সম্পর্কিত কিছু হবে। তাই আমাকে এখানে আসতেই হতো।

যন্তর মন্তরের এই হাস্যরস স্পষ্টভাবে জেন জি-দের মতো, যা দেখতে অদ্ভুত হলেও আঘাত হানে সরাসরি। তবে এই হাস্যরসকে অস্ত্র বানানোর পাঠ তারা পূর্বসূরিদের কাছ থেকেই পেয়েছে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, যখনই পরম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখনই হাস্যরস নিজের কণ্ঠ তুলে ধরেছে। প্রাচীন রাজ দরবারে রাজবিদূষকের ভূমিকা ছিল এমনই, আকবরের দরবারে বীরবল, রাজা কৃষ্ণদেবরায়ের দরবারে তেনালী রমন কিংবা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের দরবারে গোপাল ভাঁড়।

সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেখা যায়, হাবিব তানভীরের মতো শিল্পীরা জরুরি অবস্থার চ্যালেঞ্জ জানাতে ‘চরণদাস চোর’ নাটকের মতো হাসির নাটককে অস্ত্র করেছিলেন। একই সময়ে আবু আব্রাহামের ‘প্রেসিডেন্ট ইন দ্য বাথটব’ কার্টুন প্রকাশিত হয়, যা ইন্দিরা গান্ধী সরকারের অধ্যাদেশ জারি করে আইনসভাকে এড়ানোর চিত্র তুলে ধরেছিল। সেখানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমেদকে বাথটাবে বসে স্বাক্ষর করতে করতে বলতে দেখা যায়, ‘আরও অধ্যাদেশ থাকলে তাদের অপেক্ষা করতে বলো’।

দক্ষিণে চোল রামাস্বামীর ‘তুঘলক’ পত্রিকা ছিল। তিনি সম্পাদকীয় না লিখে শাসকদের অহংকার ও ভিন্নমত দমনের বিষয়ে মহাভারতের গল্প লিখতেন, যা স্ক্রিপচার উদ্ধৃত করার কারণে কর্তৃপক্ষের জন্য নিষিদ্ধ করা কঠিন ছিল।

রাশিয়ান দার্শনিক ও সাহিত্য সমালোচক মিখাইল বখতিন হাস্যরসের মাধ্যমে কর্তৃত্বকে উল্টে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে ‘কার্নিভালেস্ক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ক্ষমতার বিন্যাস বদলে দিয়ে এটি শাসকদের অপ্রস্তুত করে দেয়। কারণ ভয় দেখিয়ে ক্ষোভ দমন করা সহজ হলেও একদল হাসিখুশি জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ।

যন্তর মন্তরের জেন-জি আন্দোলনকারীরা ভারতের এই সৃজনশীল প্রতিবাদের ইতিহাস থেকে শিখে থাকতে পারেন, তবে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে তারা এটিকে সম্পূর্ণ নিজেদের মতো করে নিয়েছেন। যন্তর মন্তরে প্রতিবাদের অর্ধেক অংশ সশরীরে হলেও বাকি অর্ধেক চলছে অনলাইনে, যেখানে হাস্যরসই তাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

আন্দোলনের সবচেয়ে জনপ্রিয় রিলসগুলোর মধ্যে রয়েছে পুলিশ তেড়ে আসার পর শিক্ষার্থীদের দৌড়ানোর ভিডিও। ভয়ের একটি মুহূর্তকে তারা ‘ইন রিয়াল লাইফ’ বা বাস্তব জীবনের ‘সাবওয়ে সারফার্স’ গেমের মতো করে তৈরি করেছে, যেখানে খেলোয়াড় পুলিশের হাত থেকে পালায়। যারা সশরীরে হাজির হতে পারেনি তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আফসোস করে লিখছে, যন্তর মন্তরে সাবওয়ে সারফার্স খেলতে না পারার ফিয়ার অব মিসিং আউট বা আফসোস তাদের তাড়া করছে।

অন্য একটি পোস্টে এক আন্দোলনকারীকে মহাত্মা গান্ধীর পোশাকে দেখা গেছে। যার ক্যাপশনে লেখা ছিল: ‘পরিবেশ এমন তৈরি হয়েছে যে সিজন ১-এর প্লেয়ারকে ডেকে আনতে হয়েছে’, যা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের রেফারেন্স।

আন্দোলনকারীদের ওপর টিয়ারগ্যাস প্রয়োগের পর তৈরি করা একটি রিলে যমুনা নদীর দূষণের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়, ‘পুলিশকে বলো আমি যমুনাপাড়ে থাকি... এর চেয়ে বেশি ঝাঁজালো গ্যাস আমাদের ড্রেনে থাকে।’

সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ‘ককরোচ’ মন্তব্যের পরেই অভিজিৎ দিপকে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) গঠন করেছিলেন। তিনি নিজেও মিমের বিষয় হয়েছেন। তার ছবির পেছনে নুসরত ফতেহ আলী খানের ‘মেরে রাশকে কমর’ গানের ‘আগ অ্যায়সি লাগাই, মজা আ গায়া’ অংশটি লুপে বাজিয়ে পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে।

তবে সব আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী প্রধান। অনলাইনে তাকে দেশের সব বিভেদ ভুলে সবাইকে এক ছাতার নিচে আনার জন্য ব্যঙ্গ করে ‘ধন্যবাদ’ জানানো হচ্ছে: ‘আমাদের বিরুদ্ধে সব ধর্ম, জাতি ও লিঙ্গকে এক করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ’ আপনি আমাদের যুগের ইংরেজ।

এদিকে যন্তর মন্তরে নিজের তৈরি পোস্টার নিয়ে দাঁড়িয়ে হাসছেন খান, আর অন্য আন্দোলনকারীরা অনলাইনে দেওয়ার জন্য তার ছবি তুলছেন। সরকার দাবি মানুক বা না মানুক, খান জানেন তার এই প্রতিবাদ ইন্টারনেটের দুনিয়ায় টিকে থাকবে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

/এএ/
সম্পর্কিত
খলিলুর রহমানের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সাক্ষাৎ 
অজন্তা-ইলোরা: দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
যন্তর মন্তরে লাঠিচার্জ করা পুলিশ কর্মকর্তাদের আদালতে তোলার হুঁশিয়ারি সিজেপি নেতার
সর্বশেষ খবর
জুলাই অভ্যুত্থান: বিসর্জিত প্রাণের নীরব আর্তনাদ
জুলাই অভ্যুত্থান: বিসর্জিত প্রাণের নীরব আর্তনাদ
শ্বশুরবাড়িতে গভীর রাতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে কুপিয়ে হত্যা 
শ্বশুরবাড়িতে গভীর রাতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে কুপিয়ে হত্যা 
সালমান শাহ হত্যা: ৩০ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ
সালমান শাহ হত্যা: ৩০ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ
ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিএমপির ২২৪০ মামলা
ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিএমপির ২২৪০ মামলা
সর্বাধিক পঠিত
হত্যাকাণ্ডের শিকার সেই শিক্ষিকার চার সন্তান নিয়ে দিশেহারা পরিবার
হত্যাকাণ্ডের শিকার সেই শিক্ষিকার চার সন্তান নিয়ে দিশেহারা পরিবার
ভুলে চার মাস কারাভোগ, ৩০ লাখ টাকা পেলেন ভুক্তভোগী
ভুলে চার মাস কারাভোগ, ৩০ লাখ টাকা পেলেন ভুক্তভোগী
দিল্লিতে আন্দোলন চলা যন্তর মন্তর আসলে কী
দিল্লিতে আন্দোলন চলা যন্তর মন্তর আসলে কী
আদালতে বিচার চলাকালে শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীর মাথা ফাটালেন বিচারক
আদালতে বিচার চলাকালে শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীর মাথা ফাটালেন বিচারক
‘সময় নষ্ট করবেন না’, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়ে আবেদন নাকচ সুপ্রিম কোর্টের
‘সময় নষ্ট করবেন না’, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়ে আবেদন নাকচ সুপ্রিম কোর্টের