কল্পনা করুন এমন এক জায়গার কথা, যেখানে বিশালাকার পাথরের তৈরি যন্ত্রগুলো একসময় গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত এবং সূর্যের আলো দেখে সময় হিসাব করত। এবার সেই একই স্থানটিকে এমন এক চত্বর হিসেবে ভাবুন, যা বর্তমানে মানুষের একত্র হওয়া, মনের কথা বলা এবং দাবি আদায়ের সবচেয়ে পরিচিত জনপরিসরে পরিণত হয়েছে।
বিজ্ঞান, ইতিহাস এবং নাগরিক জীবনের এই অপূর্ব মিলনক্ষেত্রটিই হলো দিল্লির যন্তর মন্তর; যা ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের রূপ পরিবর্তন করেছে।
গণবিক্ষোভ বা প্রতিবাদের কেন্দ্রস্থল হওয়ার অনেক আগেই যন্তর মন্তর একটি মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণাগার হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। জয়পুরের মহারাজা সওয়াই জয় সিং (দ্বিতীয়)-এর উদ্যোগে ১৭২৪ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। উত্তর ভারতজুড়ে তিনি যে পাঁচটি পর্যবেক্ষণাগার নির্মাণ করেছিলেন (জয়পুর, উজ্জয়িনী, বারাণসী এবং মথুরা), এটি ছিল তার প্রথম।
মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগী জয় সিং আকাশের নির্ভুল পর্যবেক্ষণ চেয়েছিলেন। সাধারণ ছোট যন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে তিনি ইট-পাথরের বিশালাকার সব কাঠামো তৈরির নির্দেশ দেন, যা দিয়ে নক্ষত্র ও গ্রহের অবস্থান মাপা, সময় গণনা এবং ক্যালেণ্ডার ও নৌ-চলাচলের তথ্য সমৃদ্ধ করা যেত। দিল্লির পর্যবেক্ষণাগারটিই ছিল এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী বৈজ্ঞানিক নেটওয়ার্কের প্রথম ধাপ।
এমনকি আজও দিল্লির অন্যান্য ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধের চেয়ে যন্তর মন্তরের জ্যামিতিক নকশাগুলো একদম আলাদা। এটি কোনও দুর্গ বা রাজপ্রাসাদ নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক স্তম্ভ, যা ভারতের সমৃদ্ধ জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার অনন্য স্মারক।
ধারণা করা হয়, ‘যন্তর মন্তর’ নামটি সংস্কৃত শব্দ ‘যন্ত্র’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘উপকরণ’। এই চত্বরে বেশ কিছু বিশালাকার জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত যন্ত্র রয়েছে। এর প্রতিটি বিশেষ কাজের উদ্দেশ্যে তৈরি, যার মধ্যে সূর্যের গতিবিধি ট্র্যাক করা থেকে শুরু করে নিখুঁত সময় ও মহাজাগতিক স্থানাঙ্ক পর্যবেক্ষণ অন্যতম।
আধুনিক টেলিস্কোপের বহুল ব্যবহারের আগের যুগে কেবল পাথর ও গাঁথুনি দিয়ে নির্মিত এই বিশাল আকারের স্থাপত্যগুলো সবাইকে চমকে দেয়। এর অদ্ভুত ঢাল, বৃত্তাকার এবং খিলানযুক্ত গঠন দেখে দর্শনার্থীরা প্রায়ই ভাবনায় পড়েন, তারা কি কোনও ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ দেখছেন, নাকি কোনও ভাস্কর্য পার্ক বা বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার দেখছেন! জয়পুরের যন্তর মন্তরের মতো দিল্লিরটি ততটা বড় না হলেও এটি রাজধানীর অন্যতম স্বতন্ত্র ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে টিকে রয়েছে।
যন্তর মন্তরের সাধারণ মানুষের জমায়েতের স্থান হয়ে ওঠার ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত দিল্লির বড় বড় বিক্ষোভ ও আন্দোলনগুলো সাধারণত ইন্ডিয়া গেটের কাছে বোট ক্লাব-এর মাঠে অনুষ্ঠিত হতো। তবে ১৯৮০-এর দশকে সেখানে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের পর কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের যন্তর মন্তর রোডের দিকে নির্দেশিত করতে শুরু করে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে এই এলাকাটি কার্যত রাজধানীর নির্ধারিত বিক্ষোভের স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এর ভৌগোলিক অবস্থান এখানে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ভারতের সংসদ ভবন এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরগুলোর কাছাকাছি হওয়ায় এটি শহরের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত না করেও সহজেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি নাগরিক, বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং আন্দোলনগুলোর দাবি তুলে ধরার একটি প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
বিজ্ঞানের সঙ্গে নাগরিক জীবনের এমন বিরল মেলবন্ধন ভারতের আর খুব কম স্থানেই দেখা যায়। ইতিহাসের এক অধ্যায়ে যন্তর মন্তর জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আকাশ বুঝতে সাহায্য করেছিল, আর পরবর্তী অধ্যায়ে এটি সাধারণ মানুষের অধিকার ও কণ্ঠস্বর তুলে ধরার জায়গায় পরিণত হয়েছে।
এই দ্বৈত সত্তাই স্থানটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এটি যেমন ১৮ শতকের স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন, তেমনই আধুনিক ভারতের নগরজীবনের এক জ্যান্ত ইতিহাস। মহাজাগতিক গ্রহ-নক্ষত্র দেখার উদ্দেশ্যে নির্মিত হলেও তিন শতক পর আজও মানুষ নতুন এক ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় যন্তর মন্তরে এসে জড়ো হয়।
সূত্র: বেটার ইন্ডিয়া

চারবার আলোচনার প্রস্তাব সরকারের, প্রত্যাখ্যান সিজেপির
মিম, রিলস ও পোস্টারে প্রতিবাদ: যন্তর মন্তরে তরুণদের অস্ত্রের নাম হাস্যরস
অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, সাময়িক বিরতি নেওয়ার ঘোষণা
খাবার, ক্ষোভ আর সংহতিতে গতি পাচ্ছে যন্তর মন্তরের আন্দোলন







