ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদের কাছে শিবলিঙ্গ স্থাপন নিয়ে উত্তপ্ত মালদহ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৭ জুলাই ২০২৬, ১৭:০১আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১৭:০১

পশ্চিমবঙ্গের মালদহের চতুর্দশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদের কাছে বিশাল এক শিবলিঙ্গ স্থাপনে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য ও ভক্তদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্য দিয়ে অঞ্চলটিতে বহু পুরোনো মন্দির-মসজিদ বিতর্ক আবার নতুন করে সামনে এলো।

আদিনা মসজিদ চত্বর নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। কয়েকটি হিন্দু সংগঠনের দাবি, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (এএসআই) দ্বারা সংরক্ষিত এই স্থানটি মূলত একটি প্রাচীন আদিনাথ শিব মন্দির ছিল।

আয়োজকদের দাবি, কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনেই শিবলিঙ্গটি স্থাপন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে ওই স্থানে একটি আদিনাথ মন্দির নির্মাণের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন তারা।

পুলিশ জানিয়েছে, শ্রাবণ মাসে প্রতি বছরই এই স্থানে পূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং অনুষ্ঠানটি যাতে শান্তিপূর্ণ থাকে সে জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় এবং প্রচুর মানুষের সমাগমের আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুরো এলাকায় কড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে মালদহ পুলিশ।

মালদহের পুলিশ সুপার অনুপম সিং বলেন, এই মন্দিরটি ওই স্থান থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মিটার দূরে অবস্থিত। সেখানেই পূজার আয়োজন করা হচ্ছে। যতদূর জানি, প্রতি বছরই শ্রাবণ মাসে এখানে পূজার আয়োজন করা হয়। তবে এবার কিছুটা বড় পরিসরে আয়োজন করা হচ্ছে।

ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদিনাথ পুরাতন শিব মন্দির কমিটির সদস্যরা সম্প্রতি পাণ্ডুয়ায় সংরক্ষিত আদিনা মসজিদের কাছে পূজা শেষ করেছেন। তারা ঘোষণা করেন, হুগলি জেলার তারকেশ্বর থেকে আনা ৩.৬ ফুট উঁচু এবং ১.৫ টন ওজনের একটি শিবলিঙ্গ চলতি শ্রাবণ মাসে পাশের একটি মন্দিরে স্থাপন করা হবে।

সংগঠনটি তাদের পুরোনো দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, বর্তমানে যেখানে মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে, একসময় সেখানে মূল আদিনাথ মন্দিরটি ছিল। সংরক্ষিত এই স্মৃতিসৌধের ভেতরে শিবলিঙ্গটি স্থাপনের জন্য তারা পরবর্তীতে আইনি অনুমতিও চাইবে।

নতুন করে এই তৎপরতার জেরে স্থানটির চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেখানে ধর্মীয় কর্মসূচির খবর আসার পর মালদহ জেলা পুলিশ একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, প্রাচীন স্মৃতিসৌধ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান আইন-১৯৫৮ অনুযায়ী স্থাপনাটি সংরক্ষিত। এর মধ্যে অনুমতি ছাড়া কোনও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা বা কাঠামোগত পরিবর্তনের চেষ্টা করা হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়। এতে দাবি করা হয়, এএসআই ভুলভাবে একটি সংরক্ষিত স্থানকে আদিনা মসজিদ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে ভেতরে হিন্দু দেব-দেবী ও প্রতীক বিদ্যমান। তবে এএসআই সরকারিভাবে জায়গাটিকে আদিনা মসজিদ হিসেবেই চিহ্নিত করে আসছে।

এএসআই-এর তথ্য অনুযায়ী, ইলিয়াস শাহের পুত্র সুলতান সিকান্দার শাহ ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মাণ করেছিলেন এবং ১৯৫৮ সালের প্রাচীন স্মৃতিসৌধ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান আইনের অধীনে এটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিসৌধ হিসেবে সংরক্ষিত। মালদহ শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার উত্তরে পাণ্ডুয়ায় অবস্থিত এই ভবনটি চতুর্দশ শতাব্দীর ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

বিশাল এই চত্বরে ২৬০টি পাথরের স্তম্ভ ও ৩৮৭টি গম্বুজযুক্ত কক্ষ রয়েছে। একসময় এটিকে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ মসজিদ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যদিও ভূমিকম্পে এটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১৯ শতক থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে, তা সত্ত্বেও এটি পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যযুগীয় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর একটি।

স্থানটি ঘিরে বিরোধের মূল কারণ হলো ব্যাসাল্ট পাথরের দেয়াল ও দরজায় খোদাই করা হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক। কাঠামোর কিছু অংশে শিব ও গণেশের প্রতীক ছাড়াও হিন্দু ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের পদ্ম ও লতাপাতার নকশা দেখতে পাওয়া যায়।

স্থাপত্য ঐতিহাসিকদের মতে, এটি মূলত পুরোনো কোনও স্থাপনার উপাদান নতুন করে ব্যবহারের কারণে হয়েছে, যা মধ্যযুগীয় নির্মাণশৈলীতে প্রায়ই দেখা যেত। পণ্ডিতরাও এটিকে ইসলামিক ও দেশীয় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এএসআই সংরক্ষিত স্থানটিকে আদিনা মসজিদ হিসেবে বজায় রাখলেও, দেয়ালের নকশা ও ব্যবহৃত উপকুলের উৎস নিয়ে ঐতিহাসিক এবং স্থানীয় দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক এখনও অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

/এএ/
সম্পর্কিত
বানর ‘পাঞ্চ’-এর প্রথম জন্মদিনে কার্ড পাঠালেন হাজারো ভক্ত
দুবাই থেকে মুম্বাইগামী ইন্ডিগোর ফ্লাইটে ধোঁয়ার আতঙ্ক, জরুরি অবতরণ
‘শান্তির স্বার্থে’ ইরানে টানা তৃতীয় রাত হামলা স্থগিত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র
সর্বশেষ খবর
সাংবাদিকদের জন্য নীতিমালা প্রণয়নে সম্পাদকদের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী 
সাংবাদিকদের জন্য নীতিমালা প্রণয়নে সম্পাদকদের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী 
তিন শর্তে লাইসেন্স ফিরে পেলো আদদ্বীন হাসপাতাল
তিন শর্তে লাইসেন্স ফিরে পেলো আদদ্বীন হাসপাতাল
শিক্ষিকার ভাইরাল ভিডিও নিয়ে যা বললেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী
শিক্ষিকার ভাইরাল ভিডিও নিয়ে যা বললেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী
২৬ টুথপেস্টে ‘ক্ষতিকর’ মাইক্রোপ্লাস্টিক: তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট
২৬ টুথপেস্টে ‘ক্ষতিকর’ মাইক্রোপ্লাস্টিক: তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট
সর্বাধিক পঠিত
উদ্বোধনের ১২ দিনেই ধসে পড়লো ৪৭০০ কোটির এক্সপ্রেসওয়ে
উদ্বোধনের ১২ দিনেই ধসে পড়লো ৪৭০০ কোটির এক্সপ্রেসওয়ে
প্রধান শিক্ষিকার রিল ভিডিও ভাইরালের পর বিতর্ক, তদন্তে শিক্ষা বিভাগ
প্রধান শিক্ষিকার রিল ভিডিও ভাইরালের পর বিতর্ক, তদন্তে শিক্ষা বিভাগ
নিয়োগ পরীক্ষার হলে বিএনপির সাবেক এমপির ছেলে, পরীক্ষার্থীরা বললেন ‘আমরা হতবাক’
নিয়োগ পরীক্ষার হলে বিএনপির সাবেক এমপির ছেলে, পরীক্ষার্থীরা বললেন ‘আমরা হতবাক’
বাংলাদেশি দম্পতিকে পিটিয়ে গ্রেফতার ভারতীয় চিকিৎসক
বাংলাদেশি দম্পতিকে পিটিয়ে গ্রেফতার ভারতীয় চিকিৎসক
নির্বাচন অফিসে পরীক্ষা ছাড়াই ১৪৩ জনকে নিয়োগ, নির্বাচন কর্মকর্তা বরখাস্ত
নির্বাচন অফিসে পরীক্ষা ছাড়াই ১৪৩ জনকে নিয়োগ, নির্বাচন কর্মকর্তা বরখাস্ত