মাইকের শব্দ বন্ধ করে শকুনের সংখ্যা বাড়ালো গ্রামটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:১৮আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:২৮

ডিজে আর লাউডস্পিকার বাজানো নিষিদ্ধ করেছিল গ্রামের মানুষ। কোনও উৎসব বা বিয়ের জাঁকজমক বন্ধ করতে নয়, সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল এমন একটি পাখির প্রাণ বাঁচাতে, যাকে বেশিরভাগ মানুষই উপেক্ষা করে। আর সেটি হলো শকুন। মহারাষ্ট্রের চিড়গাঁও গ্রামের বাসিন্দাদের ২০ বছরের এই নিরবচ্ছিন্ন ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা আজ ফল দিয়েছে। গ্রামটিতে শকুনের সংখ্যা ২২টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪৭টিতে, যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়েছে।

সংরক্ষণের এই যাত্রার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে মহাদভিত্তিক এনজিও সিসক-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেমসাগর মিস্ত্রির। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিলুপ্তপ্রায় শকুন ও অন্যান্য শিকারি পাখি রক্ষায় কাজ করছেন তিনি। তিনি জানান, ১৯৯১ সালে একটি সংস্থার মাধ্যমে ধনেশ ও গাংচিল জরিপ দিয়ে তার কাজ শুরু হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে রায়গড় জেলায় পাখিদের ওপর তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি কোকন পাখি মিত্র সম্মেলনের আয়োজন করেন।

তবে আসল সতর্কঘণ্টা বাজে ১৯৯৯ সালে। মিস্ত্রি বলেন, আমি একটি গবেষণা থেকে জানতে পারি যে শকুনের সংখ্যা ৯৯.৮ শতাংশ কমে গেছে। সেই সময় ভারতীয় উপমহাদেশে লম্বা ঠোঁট ও সাদা পিঠের শকুনকে অতিসংকটপন্ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে চিড়গাঁওয়ের বাসিন্দারা দৈনন্দিন অভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনেন। গ্রামের সাবেক সরপঞ্চ কিশোর গুলগুলে জানান, ২০০০ সালের দিক থেকে তারা শকুনের বাসস্থান রক্ষায় গাছ কাটা এবং বনজ সম্পদ সংগ্রহ বন্ধ করে দেন। অর্জুন, বহেরা, বাভালের মতো বড় মাথার দেশীয় গাছের চারা দিয়ে একটি নার্সারি তৈরি করা হয়, যাতে শকুন বাসা বাঁধতে পারে। বনের আগুন রোধে শুকনো পাতা নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় এবং বাতাসে গাছ উপড়ে পড়লেও জ্বালানির জন্য তা নেওয়া হয় না।

গ্রামের ৯৫ বছর বয়সী বাসিন্দা গোবিন্দ বারে জানান, আগে অনেক শকুন ছিল এবং তারা পাথর ছুড়ে সেগুলোকে তাড়িয়ে দিতেন। কিন্তু প্রকৃতিতে শকুনের গুরুত্ব জানার পর তারা শকুনকে নিজেদের পরিবারের অংশ মনে করেন।

৪৩ হেক্টরের চিড়গাঁও-বাগেচিওয়াড়ি দেবরাই এলাকায় বহিরাগতদের প্রবেশ সীমিত করা হয় এবং ২০০২ সালে ডিজে ও লাউডস্পিকার নিষিদ্ধের প্রস্তাব পাস হয়। গোবিন্দ বারে বলেন, গ্রামের ৬০ জন অধিবাসীর অধিকাংশই মুম্বাইয়ে থাকার কারণে মানুষের আনাগোনা কম, যা শকুনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

২০০০ সালের ২৩ অক্টোবর এক সমীক্ষায় গিয়ে ১৩টি শকুনকে তাড়া করতে করতে চিড়গাঁওয়ে পৌঁছান প্রেমসাগর মিস্ত্রি। সেখানে এনজিও ও সরকারি জরিপে মাত্র ২২টি সাদা পিঠের ও ৬টি লম্বা ঠোঁটের শকুন পাওয়া যায়। তিনি সেখানে প্রায় সাড়ে তিন বছর থাকেন এবং দেখতে পান খাদ্যসংকটে শকুনগুলোর পাকস্থলী সংকুচিত হয়ে গেছে।

প্রেমসাগর মিস্ত্রির

তখন গ্রাম স্বচ্ছতা অভিযান-এর অধীনে মরা গবাদিপশু পুঁতে ফেলার নিয়ম ছিল, যা শকুনের খাবারের পথ বন্ধ করে দেয়। মিস্ত্রি ও গ্রামবাসী প্রশাসনের কাছে বিশেষ অনুমতি চান। রায়গড়ের কালেক্টর, বন বিভাগ ও ট্রাফিক পুলিশ মরা গবাদিপশু শকুনকে খাওয়ানোর অনুমতি দেয়। ডেইরি ফার্ম থেকে কোনও ওষুধ বা ইনজেকশন না দেওয়া মৃত পশু সংগ্রহ করা হতো। এছাড়া কসাইখানা থেকে অবশিষ্টাংশ এবং প্রজনন মৌসুমে মাংস কিনে খাওয়ানো হতো। ষষ্ঠ শ্রেণির শিশু সুশান্ত গুলগুলে এই খাদ্য প্রদান ও বাসা পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব নেয়।

খাবারের ধারাবাহিক সরবরাহে কয়েক বছরের মধ্যে শকুনের বাসা ১১টি ছাড়িয়ে যায়। ২০০০ সালে ২২টি থাকা শকুন বেড়ে বর্তমানে ৩৪৭টিতে পৌঁছেছে। তবে ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় নিসর্গ-এ প্রায় ৩০ শতাংশ শকুন মারা যায়।

মিস্ত্রি জানান, নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শকুনের প্রজনন ও ছানা লালন-পালনের সময়ে পর্যটন ও পাখির ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। এই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ৩৯টি পড়ে যাওয়া ছানাকে বড় করে বনে মুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে লক্ষ্য ৩ হাজারের বেশি শকুনের সংখ্যা নিশ্চিত করা।

প্রকৃতির এই ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ সম্পর্কে মিস্ত্রি বলেন, শকুন পশুর মৃতদেহ খেয়ে শক্তিশালী এসিড দিয়ে বিপজ্জনক জীবাণু ধ্বংস করে। এটি ভবিষ্যতে কোভিডের মতো অতিমারি রোধেও সাহায্য করতে পারে।

খাবার পরিবহন ও তহবিলের অভাব এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রেমসাগর মিস্ত্রি বন বিভাগের সহযোগিতা এবং মেষপালকদের কাছ থেকে নিয়মিত ভেড়া কেনার ব্যবস্থার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি মুম্বাই ৩.০ প্রকল্প, খনি খনন এবং খামারবাড়ি তৈরির মতো শহরের বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করার তাগিদ দিয়েছেন, যাতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পরিবেশ বিঘ্নিত না হয়।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

/এএ/
সম্পর্কিত
মদের জন্য মাঝআকাশে যাত্রীর তাণ্ডব, ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টকে কামড় ও লাথি
মদিনায় ১১০ মিলিয়ন টন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ আকরিকের সন্ধান
গলছে হিমালয়ের বরফ, ঝুঁকিতে ভারতের অর্থনীতি
সর্বশেষ খবর
কোরিয়া বক্স অফিস: টানা ষষ্ঠ সপ্তাহেও শীর্ষে ‘দ্য ওডিসি’, দ্বিতীয় ‘অবসেশন’
কোরিয়া বক্স অফিস: টানা ষষ্ঠ সপ্তাহেও শীর্ষে ‘দ্য ওডিসি’, দ্বিতীয় ‘অবসেশন’
জুরাইন যেন রাজধানীর এক অবহেলিত ‘যন্ত্রণার দ্বীপ’
জুরাইন যেন রাজধানীর এক অবহেলিত ‘যন্ত্রণার দ্বীপ’
বনের গল্প, মানুষের স্মৃতি ‘সুন্দরবন সংগ্রহশালা’
বনের গল্প, মানুষের স্মৃতি ‘সুন্দরবন সংগ্রহশালা’
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল হাসপাতালে আগুন, নামতে গিয়ে আহত অনেকে
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল হাসপাতালে আগুন, নামতে গিয়ে আহত অনেকে
সর্বাধিক পঠিত
উত্তরার অফিস থেকে আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেফতার
উত্তরার অফিস থেকে আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেফতার
চার্জার খালি পড়ে থাকলেও কি বিদ্যুৎ খরচ হয়
চার্জার খালি পড়ে থাকলেও কি বিদ্যুৎ খরচ হয়
এনআইডি ও মোবাইলের কল ডিটেইল রেকর্ড বিক্রয়কারী গ্রেফতার
এনআইডি ও মোবাইলের কল ডিটেইল রেকর্ড বিক্রয়কারী গ্রেফতার
ব্যাংক খাতে অদক্ষ এমডি বাছাই শুরু, চাকরি হারাচ্ছেন কারা
ব্যাংক খাতে অদক্ষ এমডি বাছাই শুরু, চাকরি হারাচ্ছেন কারা
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে গুলি করা ব্যক্তির নাম জানালেন মোজাফফর
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে গুলি করা ব্যক্তির নাম জানালেন মোজাফফর