ব্রিটেনের ‘হারানো দশক’: পপুলিজমে বন্দি পশ্চিমা রাজনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৩ জুন ২০২৬, ২৩:০১আপডেট : ২৩ জুন ২০২৬, ২৩:১১

২০১৬ সালের ২৩ জুন। ব্রেক্সিট গণভোটের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যে এমন এক জনতুষ্টিবাদের (পপুলিজম) জোয়ার তৈরি হয়েছিল, যা পশ্চিমা রাজনীতির চেনা নিয়মকানুনগুলোকেই বদলে দেয়। আজ সেই ঐতিহাসিক ঘটনার ঠিক ১০ বছর পর, এক ক্ষয়িষ্ণু ও খণ্ডিত যুক্তরাজ্য তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ এক দশক আগের সেই প্রতিশ্রুত ভবিষ্যতের ভূত এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে দেশটিকে।

কনজারভেটিভ পার্টির দীর্ঘ ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক সুশৃঙ্খল ও বিচক্ষণ বিকল্প হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার। কনজারভেটিভদের ওই পুরো সময়টা মূলত ব্যয় হয়েছিল কৃচ্ছ্রসাধন, আদর্শিক লড়াই আর ব্রেক্সিটের চরম বিশৃঙ্খলার পেছনে। কিন্তু লেবার পার্টির সেই ঐতিহাসিক ভূমিধস জয়ের দুই বছর পার হতে না হতেই গত সোমবার (২২ জুন) স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার এই বিদায় প্রমাণ করে যে, ব্রিটেনের এই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন আর কেবল দলীয় ব্যাখ্যা দিয়ে মেলানো সম্ভব নয়।

অনেক পশ্চিমা নেতার কাছেই যুক্তরাজ্য এখন এক চরম সতর্কবার্তা। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও ধনী গণতন্ত্রের ভেতরে আধুনিক জনতুষ্টিবাদের এক জীবন্ত পরীক্ষা যেন উন্মোচিত হচ্ছে এখানে। ব্রেক্সিটের শুরুতে এক ‘উন্মুক্ত বৈশ্বিক ব্রিটেন’-এর অবাস্তব স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, যা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাবে এবং নিজেদের সীমান্ত ও বাজেটের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনবে।

বাস্তবে দেখা গেলো উল্টো চিত্র। একের পর এক কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী দেশকে আরও গভীর অকার্যকারিতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। থেরেসা মে ব্রেক্সিট আলোচনার জটিলতায় ভেঙে পড়েছিলেন, বরিস জনসন বিদায় নেন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে, লিজ ট্রাস ক্ষমতা হারান বাজারের তীব্র আতঙ্কে আর ঋষি সুনাককে পড়তে হয় নজিরবিহীন নির্বাচনি ভরাডুবির মুখে। আজ ব্রিটেন এক নিম্ন-প্রবৃদ্ধির বৃত্তে আটকা পড়ে আছে; যেখানে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্য সংঘাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভেঙে পড়া জনসেবামূলক খাত এবং এমন এক অতি-সংবেদনশীল ভোটার গোষ্ঠী, যারা রাজনৈতিক নেতাদের সামান্য ব্যর্থতাও এখন আর সহ্য করতে রাজি নয়।

কিয়ার স্টারমারের শাসনকাল মূলত অভিবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের পেছনেই ব্যয় হয়েছে। আর এই পরিস্থিতি নাইজেল ফারাজের ডানপন্থি দল রিফর্ম ইউকে-র জন্য দারুণ এক সুযোগ তৈরি করে দেয়। তারা লেবার পার্টির ঐতিহ্যবাহী শ্রমজীবী মানুষের সমর্থন নিজেদের দিকে টেনে নিতে শুরু করে।

এই প্রেক্ষাপটে দৃশ্যপটে আগমন অ্যান্ডি বার্নহামের। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক এই মেয়র এবং ক্যারিশম্যাটিক ‘কিং অব দ্য নর্থ’ এখন লেবার পার্টির একমাত্র হেভিওয়েট নেতা, যার মধ্যে ফারাজের এই উত্থান রুখে দেওয়ার মতো আসল জনতুষ্টিবাদী আবেদন রয়েছে। পার্লামেন্টে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা একটি উপ-নির্বাচনে বার্নহাম রিফর্ম ইউকে-কে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। আর এর মাধ্যমেই লেবার পার্টির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ সম্ভবত তার জন্য পরিষ্কার হয়ে গেছে।

অ্যান্ডি বার্নহাম যদি ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশও করেন, তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ক্ষমতায় থাকার দায়ভার বহন করা, যা কোভিড-পরবর্তী পুরো গণতান্ত্রিক বিশ্বের শাসকদের জন্যই একটি প্রমাণিত বোঝা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ফ্রান্সে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর জনপ্রিয়তার রেটিং কোনও কোনও সময় মাত্র ১১ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র‍্যালি জয়ের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থি এএফডি নজিরবিহীনভাবে তাদের অবস্থান শক্ত করেছে এবং চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের রক্ষণশীলদের চেয়ে ব্যবধান ক্রমাগত বাড়িয়েই চলেছে। এমনকি হাঙ্গেরিতেও গত এপ্রিলে ভোটাররা ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে।

এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি আগামী নভেম্বরে একটি কঠিন মধ্যবর্তী পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, তিনিও এই একই ক্ষমতাসীনবিরোধী শক্তির মুখে অরক্ষিত প্রমাণিত হচ্ছেন। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের ঐতিহাসিক বিজয় ব্রেক্সিটের ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কার সঙ্গেই জড়িত ছিল, যা ইঙ্গিত দিয়েছিল যে অভিবাসন, বিশ্বায়ন এবং অভিজাতদের ব্যর্থতার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে পশ্চিমা ভোটাররা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুড়িয়ে দিতেও প্রস্তুত।

কিন্তু এখন ট্রাম্প নিজেই সেই ব্যবস্থার অংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ইরান যুদ্ধের কারণে তার জনপ্রিয়তার রেটিং এখন মাত্র ৩০-এর কোঠার ওপরের দিকে ঘোরাফেরা করছে। বিশ্বের সবচেয়ে সফল অ্যান্টি-সিস্টেম রাজনীতিবিদ এখন আকস্মিকভাবে তার নিজের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই লড়াই করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।

নিজেদের ‘নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার’ পক্ষে ভোট দেওয়ার এক দশক পর, ব্রিটেন আজ এক রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে আটকা পড়েছে। দশ বছরের এই পদ্ধতিগত বিশৃঙ্খলা প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্রব্যবস্থা-বিরোধী ক্ষোভকে উসকে দেওয়া অত্যন্ত সহজ, কিন্তু সেই ক্ষোভকে ধারণ করে রাষ্ট্র শাসন করা কার্যত অসম্ভব।

সূত্র: অ্যাক্সিওস

/এএ/
সম্পর্কিত
হাউস অব লর্ডসের প্রতিবেদন: যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের নিয়মে পরিবর্তন আস‌বে?
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
‘ইরানের সরকারবিরোধীদের সহায়তায় স্টারলিংক পাচার করেছিল ইসরায়েল’
সর্বশেষ খবর
ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ পেজে বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনার ছবি
ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ পেজে বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনার ছবি
চৈত্রে ফোটা জবা ফুল
চৈত্রে ফোটা জবা ফুল
নিরাপত্তায় ঢাকা ও ফাঁকা গোপালগঞ্জ: এসপি বললেন, ‘এখানকার মানুষ শান্তিপ্রিয়’
নিরাপত্তায় ঢাকা ও ফাঁকা গোপালগঞ্জ: এসপি বললেন, ‘এখানকার মানুষ শান্তিপ্রিয়’
চীনের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ 
চীনের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ 
সর্বাধিক পঠিত
আলজেরিয়ার জয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, নকআউটে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ কারা?
আলজেরিয়ার জয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, নকআউটে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ কারা?
‘ভাই নয়’, ‘মহোদয়’ বলতে হবে, সাংবাদিককে সিভিল সার্জন
‘ভাই নয়’, ‘মহোদয়’ বলতে হবে, সাংবাদিককে সিভিল সার্জন
গ্যালারিতে বসেই মেসির ম্যাচে উত্তাপ ছড়ালেন শাকিরা
গ্যালারিতে বসেই মেসির ম্যাচে উত্তাপ ছড়ালেন শাকিরা
সিলেট ছাড়ার আগ মুহূর্তে যা বলে গেলেন ডিসি সারওয়ার আলম
সিলেট ছাড়ার আগ মুহূর্তে যা বলে গেলেন ডিসি সারওয়ার আলম
বিশ্বকাপকে বিক্রি করে দিয়েছেন ফিফা সভাপতি: ফিলিপ লাম 
বিশ্বকাপকে বিক্রি করে দিয়েছেন ফিফা সভাপতি: ফিলিপ লাম