X
রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২
১৯ আষাঢ় ১৪২৯

বুনো মাশরুম খেয়ে মারা যাচ্ছেন আসামের চা শ্রমিকরা

আপডেট : ২০ মে ২০২২, ১২:১৮

অঞ্জলি খারিয়া গত ৮ এপ্রিল যখন নিজের মেয়ের সঙ্গে রাতের খাবার খেতে বসেন, তখন তিনি ভাবতেই পারেননি এটাই এক সঙ্গে তাদের শেষ খাবার। ভারতের আসাম রাজ্যের চাপাতলি গ্রামের এক চা বাগানে সারাদিন কাজের পর বাড়ি ফেরেন তিনি। পাহাড়ি বাঁক পেরিয়ে বাড়ি ফিরে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।

ভোর তিনটায় ছয় বছরের মেয়ে সুস্মিতাকে মারাত্মক বমি করতে দেখে ঘুম ভেঙে যায় অঞ্জলি খারিয়ার। তারপর মেয়ের শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব শুরু হয়। পরে কাঁপুনি আসতে থাকে মেয়ের।

পুরো রাত মেয়ের এমন অবস্থা চলতে থাকলে ভয় পেয়ে যান অঞ্জলি খারিয়া। কয়েক ঘণ্টা পর তার ছেলে এবং শ্বশুরও যখন বমি শুরু করেন তখন রীতিমতো ঘাবড়ে যান তিনি।

৩৭ বছরের খারিয়া বলেন, ‘তারা সবাই একসঙ্গে বমি করছিল। তারপরে তাদের ভয়ানক এবং লাগামহীন ডায়রিয়া হয়।’ ‘শিগগিরই তিনি বুঝতে পারেন রাতে কয়েক জন প্রতিবেশিরও একই লক্ষণ দেখা দিয়েছে। ‘এটা দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। সবাই বমি করছিল কিন্তু কেউ জানত না কেন,’ বলেন তিনি।

দিবরুগড় জেলার গ্রামটিতে সূর্য ওঠার পরই অঞ্জলি খারিয়া মেয়েকে নিয়ে কাছের ফার্মেসিতে দৌড়ে যান। সেখানে তাকে সামান্য স্যালাইনের পানি ও ওষুধ দেওয়া হয়।

অন্যদের হাসপাতালে নিতে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়। তাদের সঙ্গে ছেলে এবং শ্বশুরকে পাঠাতে নিজের জমানো শেষ অর্থটুকুও ব্যবহার করেন অঞ্জলি খারিয়া। তিনি বলেন, ‘ওষুধ খাওয়ার পর মেয়ের কিছুটা ভালো লাগতে থাকায় তাকে তাদের সঙ্গে পাঠাইনি। ভেবেছিলাম শিগগিরই সে ভালো হয়ে যাবে।’

২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে অঞ্জলির মেয়ে আবার বমি শুরু করে। এবার তাকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো অর্থ তার কাছে ছিল না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের কোলের মধ্যে মারা যায় সুস্মিতা।

পরে জানা যায় যারা অসুস্থতা বোধ করেছিল তারা সবাই বুনো মাশরুশ খেয়েছিল। এই মাশরুম অঞ্জলি খারিয়ার শ্বশুর কাছের জঙ্গল থেকে তুলে আনেন এবং সেগুলো প্রতিবেশিদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন। এই মাশরুমের বিষক্রিয়ায় সুস্মিতা ছাড়াও আরও দুই জনের মৃত্যু হয় বলে জানান কর্মকর্তারা। মোট ১১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এক মাস পেরিয়ে গেলেও গ্রামটি এখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৩৬ বছরের নেহা লামার স্বজনেরাও। তিনি বলেন, ‘ওই রাতের কথা কোনও দিন ভুলবো না, ভেবেছিলাম কেউ বাঁচবে না’। তিনি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন আর ছেলেকে নিয়ে সারা দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। নেহা লামা বলেন, ‘আমরা বহু বছর ধরেই মাশরুম তুলে খেয়ে আসছি। আমরা কিভাবে জানবো তাতে বিষ থাকতে পারে?’

বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে মারা যান অঞ্জলি খারিয়ার মেয়ে

আসামে প্রায়ই মাশরুশ বিষক্রিয়ার খবর শিরোনাম হয়। এছাড়া প্রতিবেশী উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে স্থানীয়রা গজিয়ে ওঠা মাশরুম, ফার্ন ও বুনো ফল খায় এবং বিভিন্ন খাবারে সেগুলো ব্যবহার করে। কিছু এলাকায় বুনো মাশরুমকে সুস্বাদু বলে বিবেচনা করা হয় এবং স্যুপ ও সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়।

আসামে এই ধরনের মৃত্যু সাধারণ ঘটনা, বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে। এই সময়ে রাজ্যটির বিখ্যাত চা বাগানের সবুজ জমিতে শত শত মাশরুম গজায়। আর এই মাশরুমে আক্রান্তদের প্রায় সবাই দরিদ্র শ্রমিক। তারা চা বাগানগুলোতে কাজ করে।

এসব মৃত্যুর হিসেব সরকারি হিসেবে থাকে না। কিন্তু আসাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের (এএমসিএইচ)সুপারিন্ডেন্ট প্রশান্ত ডিহিঙ্গিয়া বলেন এপ্রিলে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের বেশিরভাগই চা শ্রমিকদের পরিবারের সদস্য।

২০০৮ সালে বিষাক্ত মাশরুম খাওয়ার পর ২০ জনের মৃত্যু হয়, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এই ঘটনার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে রাজ্য সরকার একটি প্যানেল গঠন করে। তারপরেও বেশিরভাগ আক্রান্ত চা বাগানের শ্রমিক বলে জানান দিলিপ কুমার শর্মা। তিনি আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী এবং ওই সরকারি প্যানেলের সদস্য।

গ্রামের বাসিন্দারা জঙ্গল থেকে মাশরুম সংগ্রহ করেন

ড. দিলিপ কুমার শর্মা বলেন, ‘এর একটি বড় কারণ চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব,  মাশরুমের ধরনের প্রশ্ন যখন আসে - তারা জানে না কোন ধরনটি বিরল, কোনটি সুস্বাদু বা কোনটি বিষাক্ত।’ তিনি মনে করেন বাগান মালিকদের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়া। তিনি বলেন, ‘সরকার অতীতে এই ধরনের মাশরুম খাওয়ার বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে, কিন্তু সেই বার্তা এসব পরিবারের কাছে পৌঁছায় না কারণ তাদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত।’

তবে ওই জনগোষ্ঠীর সদস্যরা বলছেন বিষয়টি এতটা সাধারণ নয়। আসামের উর্বর পাহাড়ে বিশ্বের সবচেয়ে দামী কিছু চা উৎপাদিত হয়। বিস্তীর্ণ এস্টেটগুলো- কয়েকটি বড় ভারতীয় এবং বহুজাতিক কর্পোরেশনের মালিকানাধীন- এছাড়াও বিলাসবহুল বাসস্থান রয়েছে যা পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

কিন্তু শ্রমিকদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি এই শান্ত-মনোরম অবস্থা থেকে অনেক দূরে। চাপাতলি গ্রামের অনেক চা শ্রমিক জানিয়েছেন তারা বাঁশের তৈরি ঘরে বাস করে। এগুলোর চাল দিয়ে পানি পড়ে আর পয়নিষ্কাশনের সুবিধাও নেই। তারা এতো কম মজুরি পায় যে তাদের পরিবারকে প্রায়ই অভুক্ত থাকতে হয়। আর সম্প্রতি সবজি এবং অন্য নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছে।

অঞ্জলি খারিয়া দিনে ১৩০ রুপি মজুরি পান। আর তার ওপর নির্ভর করে পরিবারের ছয় সদস্য। তিনি বলেন, ‘এসব কারণেও আমরা যা পাই তাই খুঁজে তুলি আর সেগুলো খাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার মেয়ের মৃত্যুর পর সরকারি কর্মকর্তারা আমাদের দেখে গেছেন তারা বিষাক্ত মাশরুম না খাওয়ার জন্য বলেছেন। কিন্তু আমরা খুব গরিব এবং সবকিছুর দাম অনেক বেশি। যা পাই তাই খেয়ে আমাদের বাঁচতে হয়।’

চাপাতলি গ্রামের বেশির মানুষই ভাঙা ঘরে বাস করেন

জেলা প্রশাসন বলছে তারা সমাজকল্যাণ প্রকল্পের মাধ্যমে মূল্য বৃদ্ধির সমস্যা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দিবরুগড়ের ডেপুটি কমিশনার বিশ্বজিত পেগু বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করছি সরকারি বিতরণ ব্যবস্থার আওতায় তারা বিনামূল্যে রেশন পাচ্ছে।’

তবে অঞ্জলি খারিয়া এবং অন্যরা তা অস্বীকার করে বলছেন তারা কখনও বিনামূল্যে খাদ্যশস্য পাননি। ‘কোনও কোনও দিন খাওয়ার কিছু থাকে না। কিন্তু কেউ সাহায্য করতে আসেনি।’

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন সবচেয়ে মারাত্মক অসুস্থতা তখন হয় যখন স্থানীয়রা ‘ডেথ ক্যাপ’ নামে পরিচিত এক ধরনের মাশরুম তুলে খান। হালকা সবুজ কিংবা সাদা রঙের এই বিষাক্ত মাশরুম সুস্বাদু বলে অনেকেই মনে করেন। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে শ্বাসকষ্ট, বিম, পেট ব্যাথা এবং মারাত্মক ডায়রিয়া।

বহু ক্ষেত্রেই অসুস্থতা বোধ করার পরই রোগীরা হাসপাতালে যায় না। এতে করে কিডনি কিংবা লিভার বিকল হয়ে পড়ার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানান ডা. প্রশান্ত ডিহিঙ্গিয়া। তিনি বলেন, ‘যে সময়ে তারা চিকিৎসা নিতে আসে তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।’

ডা. প্রশান্ত ডিহিঙ্গিয়া মনে করেন সমস্যা মোকাবিলার একমাত্র উপায় হচ্ছে কোন ধরনের মাশরুম বিষাক্ত হতে পারে তা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো। তিনি বলেন, ‘কোনও জনগোষ্ঠীকে তাদের প্রথাগত খাবার খাওয়া বন্ধ করানো সম্ভব নয়, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে।’

ডেপুটি কমিশনার বিশ্বজিত পেগু বলেন, গ্রামে গ্রামে যাওয়া এবং সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এগুলো বোঝানো সম্ভব নয়। তবে কর্তৃপক্ষ তৃণমূল পর্যায়ে প্রচার চালিয়ে বিষাক্ত এবং খাবার যোগ্য মাশরুম আলাদা করা শেখানোর চেষ্টা করছে।

তবে চাপাতলী গ্রামের বাসিন্দারা আশ্বস্ত নন। অঞ্জলি খারিয়া বলেন, ‘আমাদের জন্য আমরাই আছি। আমাদের কেউ মারা গেলেই কেবল তারা (কর্মকর্তারা) আসে।’

সূত্র: বিবিসি

/জেজে/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
যুদ্ধের প্রভাবে আবারও লোডশেডিংয়ের কবলে দেশ
যুদ্ধের প্রভাবে আবারও লোডশেডিংয়ের কবলে দেশ
বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ কে?
বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ কে?
মাদ্রাসাছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ
মাদ্রাসাছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ
শিক্ষা আইন প্রণয়ন কমিটিতে যুক্ত হতে চায় হেফাজত
শিক্ষা আইন প্রণয়ন কমিটিতে যুক্ত হতে চায় হেফাজত
এ বিভাগের সর্বশেষ
বেতন ৫ হাজার, থাকতে হবে বাইক: ৩০০ ‘বিস্তারক’ নিয়োগ করছে বিজেপি
বেতন ৫ হাজার, থাকতে হবে বাইক: ৩০০ ‘বিস্তারক’ নিয়োগ করছে বিজেপি
‘সন্দেহজনক উদ্দেশ্যে’ মমতার বাসভবনে ঢুকে পড়া ব্যক্তি গ্রেফতার
‘সন্দেহজনক উদ্দেশ্যে’ মমতার বাসভবনে ঢুকে পড়া ব্যক্তি গ্রেফতার
জম্মুতে গ্রেফতার লস্কর জঙ্গি ছিল বিজেপি’র আইটি সেল প্রধান
জম্মুতে গ্রেফতার লস্কর জঙ্গি ছিল বিজেপি’র আইটি সেল প্রধান
ভারতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে কীসের এত জলঘোলা?  
ভারতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে কীসের এত জলঘোলা?  
এবার নুপুর শর্মার বিরুদ্ধে ‘লুক আউট’ নোটিশ জারি
এবার নুপুর শর্মার বিরুদ্ধে ‘লুক আউট’ নোটিশ জারি