ট্রাম্প কি ভুল করছেন, নাকি এটাই ছিল বড় পরিকল্পনা?

সুদীপ্ত কবীর
২৭ জুলাই ২০২৬, ১৯:৪৮আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ২০:০৭

নিজে লেখা ‘দ্য আর্ট অব দ্য ডিল’ বইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘চুক্তি করতে কখনও মরিয়া হওয়া যাবে না।’ অথচ ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আদেশ দেওয়ার পর তিনি যেন নিজের সেই মৌলিক উপদেশই বেমালুম ভুলে গেলেন। যুদ্ধ থামাতে ও চুক্তির জন্য তেহরানের প্রতি একের পর এক মরিয়া আহ্বান জানিয়ে প্রথম দিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচকদের কাছে হাসির পাত্রে পরিণত হন ট্রাম্প। এর পরপরই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক সই হলে সেই হাসির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। এতে দেখা যায়, ইরান যেসব শর্ত দাবি করেছিল, তার প্রায় সবই মেনে নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মেয়াদে ২০১৬ সালে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তির (জেসিপিওএ) চেয়ে বাড়তি কোনও সুবিধা তিনি আদায় করতেই পারেননি। অথচ প্রথম মেয়াদে এই ওবামা চুক্তিকে সবসময় তাচ্ছিল্য করতেন ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তা থেকে বের করে এনেছিলেন।

সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, ওবামার চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে এবং বৈশ্বিক যুদ্ধ বাধিয়ে প্রায় একই মানের একটা চুক্তি করার যৌক্তিকতা কোথায়? উল্টো ওবামা যেটা কূটনীতির টেবিলে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন, ট্রাম্প তা করতে গিয়ে পেন্টাগনের শত শত কোটি ডলার খরচা করালেন এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে এক ভয়াবহ ঝুঁকিতে ফেললেন। এরই মধ্যে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ নতুন করে চড়ায় সম্প্রতি সেই সমঝোতা চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে ইরান, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সংঘাতের সর্বশেষ পর্ব শুরুর পর ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ, তবে আলোচনার পথ খোলা। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনও সময় আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে সিএনএনের প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়, যেখানে ট্রাম্প স্পষ্ট জানান যে আলোচনার জন্য ইরান এখনও তৈরি নয়। তাই তাদের ওপর সামরিক হামলা আরও কয়েক দিন চলবে। অবশ্য ১৩ দিন পর সেই হামলাও বন্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুদ্ধের শুরু থেকেই মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে এই দ্বিধাগ্রস্ত প্রবণতা স্পষ্ট। একদিকে তীব্র সামরিক হামলা, অন্যদিকে সমঝোতার প্রস্তাব। সমালোচকেরা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে চরম বেকায়দায় পড়েছে ওয়াশিংটন। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ চাপ সামলাতেও ট্রাম্প প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য, ইতিহাস ও কূটনীতি যদি কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বের আলোকে যাচাই করা হয়, তবে ভিন্ন ভাবনার খোরাক মেলে।

লন্ডনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউজ ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা নীতিপত্র বিশ্লেষণ করে এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মধ্যপ্রাচ্যে কোনও শত্রুভাবাপন্ন শক্তিকে প্রভাব বিস্তার করতে না দেওয়া, তেল ও গ্যাসের বৈশ্বিক সরবরাহ ধরে রাখা এবং কৌশলগত প্রণালিতে কারও আধিপত্য মেনে না নেওয়া। তা ছাড়া লাতিন আমেরিকার জন্য সার্বভৌম ও মুক্ত অর্থনীতির মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। তাহলে ট্রাম্প কি আসলেই হঠকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার কাঠামো নিজেদের সুবিধামতো বদলে দিতে সুনির্দিষ্ট কৌশলগত ছক ধরে এগোচ্ছে ওয়াশিংটন?

‘হিসেবি উন্মাদনা’ ও বলপ্রয়োগের কূটনীতি

বলপ্রয়োগের কূটনীতি সম্পর্কে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলেক্সান্ডার জর্জ বলেছেন, সর্বাত্মক যুদ্ধের বদলে সীমিত সামরিক চাপ, বিশ্বাসযোগ্য হুমকি এবং আলোচনার সুযোগ রাখা, এই তিনটির সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। মার্কিন অর্থনীতিবিদ থমাস শেলিং বলেছেন, আঘাত করতে পারার সক্ষমতাই আসলে দর-কষাকষির মূল ক্ষমতা। আবার প্রুশিয়ার সাবেক রাজা ফ্রেডরিক দ্য গ্রেট বলেছিলেন, সামরিক শক্তি ছাড়া কূটনীতি ও বাজনা ছাড়া গানের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।

যুক্তরাষ্ট্র যে ইরানে দফায় দফায় হামলা চালিয়ে আবার আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছে, তাকে এই তত্ত্বগুলোর দৃষ্টিকোণে যাচাই করলে বেহিসেবি চালের মধ্যেও একটি কাঠামোর আভাস পাওয়া যাবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করেছে, ইরানকে আঘাত করার সক্ষমতা ও ইচ্ছা তাদের রয়েছে, আবার একই সঙ্গে কূটনীতির টেবিল থেকেও তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়নি।

ট্রাম্প কি ভুল করছেন, নাকি এটাই ছিল বড় পরিকল্পনা?

তাহলে এটি যদি সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ হয়, তবে ওবামা ও ট্রাম্পের চুক্তির মূল তফাত কোথায়? যুদ্ধের শুরুর দিকে সিএনএনের এক নিবন্ধে বলা হয়, তেহরান বিশ্বাস করত যে হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কখনও বেপরোয়া পদক্ষেপ নেবে না। কারণ এর সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের স্থায়িত্ব জড়িত। তবে যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়ে দিয়েছে, নিজেদের স্বার্থের সামনে তাদের কোনও চূড়ান্ত সীমার বাধ্যবাধকতা নেই।

এখন যদি ইরানকে চাপ প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি কার্যকর করাতে পারে, তবে সাফল্য কেবল চুক্তির ভাষা দিয়ে নয়; বরং প্রতিপক্ষকে কোন অবস্থান থেকে আলোচনার টেবিলে আনা হয়েছে, সেটিও মূল্যায়নের অংশ হবে। শেলিংয়ের ভাষায় এটি হবে বাধ্যকরণ, যা প্রমাণ করবে মার্কিন আধিপত্য। কারণ ওবামার চুক্তি হয়েছিল শান্ত পরিবেশে, আর এখানে চাপ প্রয়োগ করে নতি স্বীকার করানোর চেষ্টা চলছে। এই পন্থার প্রভাব সুদূরপ্রসারী—যেমন ওবামার আমলে চুক্তি হলেও হিজবুল্লাহ কিংবা হামাসের মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়নি, কিন্তু ট্রাম্পের চাপে ইরান চুক্তি মানলে এই প্রক্সি গোষ্ঠী থেকে তাদের দূরত্ব তৈরি করতে হবে। বিপরীতে ইরান বাজেয়াপ্ত সম্পদ ফেরত পাবে ও বহুজাতিক বিনিয়োগের সুযোগ পাবে। এটি হলো একেবারে চিরায়ত ‘ক্যারট অ্যান্ড স্টিক ডিপ্লোম্যাসি’। অবশ্য সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত সামরিক চাপ প্রতিপক্ষকে আপসের বদলে আরও অনমনীয় করে তুলতে পারে।

অর্থনীতির টোপ ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ

চুক্তি নিয়ে ইরান যে সিদ্ধান্তই নিক, সেখান থেকে নিজস্ব সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্র তৈরির সুযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট কিহোন ও জোসেফ নাই তাদের কমপ্লেক্স ইন্টারডিপেন্ডেন্স তত্ত্বে বলেছেন, বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে জড়িয়ে যাওয়া দেশের কাছে সামরিক সুরক্ষার চেয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

ইরান যদি সরাসরি চুক্তি কার্যকরে রাজি হয়, তবে তাদের অবরুদ্ধ অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরে আসবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার প্রাথমিক খবরের পর দেখা গেছে, অনেক সাধারণ ইরানি সংঘাতের অবসান চান, যাতে ধসে পড়া অর্থনীতির চাকা অন্তত ঘোরে। ইতিহাসে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার পর অনেক উগ্র রাষ্ট্র সামরিক সংঘাতের চেয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় মনোযোগী হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিম জার্মানি ও জাপানের উত্থান এখানে প্রাসঙ্গিক। যুদ্ধের পর মার্শাল প্ল্যানসহ নানা উদ্যোগে একসময়ের প্রধান শত্রুদের ধীরে ধীরে বিশ্বস্ত মিত্রে পরিণত করে ওয়াশিংটন। জাপানের অগ্রাধিকার সামরিক শক্তি থেকে বদলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে মোড় নেয়। ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতা জার্মানি বা জাপানের মতো না হলেও, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের কৌশলগত আচরণ পাল্টে দেয়।

ট্রাম্প কি ভুল করছেন, নাকি এটাই ছিল বড় পরিকল্পনা?

আবার ইরান যদি চুক্তি না করে সংঘাতের পথেই চলতে থাকে, সেখান থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ হাসিল হওয়া সম্ভব। চলতি যুদ্ধে ওয়াশিংটনের অন্যতম অলিখিত লক্ষ্য হলো ইরানের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। ওয়াশিংটনের বৈরিতা ইরানের সঙ্গে চিরকালের নয়; ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের আগে শাহ প্রশাসনের আমলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। হোয়াইট হাউজের আপত্তি বর্তমান কট্টর মার্কিনবিরোধী শাসনকাঠামো নিয়ে। এই সরকার যদি চুক্তি না মানে, তবে দীর্ঘায়িত যুদ্ধে তাদের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বে ইরানের অর্থনীতি আজ কার্যত আইসিইউতে। গত ডিসেম্বরে মুদ্রার রেকর্ড দরপতন ও মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সেই বিক্ষোভ দমনে হাজারো মানুষকে হত্যা করা হয়। যুদ্ধের কারণে অর্থনীতি এখন আরও ক্ষতিগ্রস্ত। যদি সাধারণ ইরানিরা মনে করে যে অর্থনৈতিক স্বস্তির সুযোগ সরকার নিজেই নষ্ট করছে, তবে বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থান দেখা দিতে পারে। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টেড রবার্ট গার তার রিলেটিভ ডেপ্রিভেশন তত্ত্বে বলেছেন, মানুষ কেবল চরম দারিদ্র্যের কারণে বিদ্রোহ করে না; বরং প্রত্যাশা ও বাস্তবতার বিশাল ফারাকের কারণে জনঅসন্তোষ রাজনৈতিক বিস্ফোরণে রূপ নেয়।

এমন বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করলে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পর দায়িত্ব নেওয়া নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকার তা সামলাতে কতটা সক্ষম হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ বর্তমানে ইরানের শাসনব্যবস্থায় এক সীমিত অভ্যন্তরীণ পর্ষদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেইর মতো যারা আলোচনার মাধ্যমে সংকট মেটাতে চান, তাদের ওপর কট্টরপন্থিরা চরম নাখোশ এবং তাদের প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। বড় আকারের বিক্ষোভ মোকাবিলায় এই বিভক্ত নেতৃত্ব কতটা কার্যকর থাকবে, তা বড় প্রশ্ন। এভাবে যদি তেহরানের সরকারের পতন ঘটে, তবে মার্কিন যুদ্ধের মূল লক্ষ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পূরণ হবে। তবে বিদেশি শত্রুর আগ্রাসনের মুখে পুরো জাতি এক ছাতার নিচে চলে আসার যে মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘র‍্যালি অ্যারাউন্ড দ্য ফ্ল্যাগ’ বলা হয়, সেই সম্ভাবনাকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে এই যুদ্ধ ঘিরে ইরানের দুশ্চিন্তা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও অভ্যন্তরীণ চাপে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের অন্যতম ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হরমুজ প্রণালিও তার কৌশলগত গুরুত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ধীরে ধীরে ইরানের দাপট কমতে পারে। 

তুরুপের তাস হারাচ্ছে ইরান

সংঘাত শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত আটকে দিয়েছে ইরান। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হতো। তেহরানের অবরুদ্ধ করার পদক্ষেপে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে। ইরান চায় হরমুজে তাদের আধিপত্য মেনে নিয়ে টোল আদায়ের অধিকার দেওয়া হোক। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা হরমুজকে ‘পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ’ কৌশলগত সম্পদ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের শিক্ষক মুহান্নাদ সেলুমের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করার ক্ষমতা না থাকায় ইরান হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ সৃষ্টির প্রধান হাতিয়ার করেছে। কিন্তু কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহরান কামরাভা মনে করেন, এই কৌশল ইরানের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালুর ফলে শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির একক কৌশলগত গুরুত্বই কমে যেতে পারে, কারণ প্রতিবেশী দেশগুলো ইতোমধ্যে বিকল্প পরিবহন পথ তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে।

ট্রাম্প কি ভুল করছেন, নাকি এটাই ছিল বড় পরিকল্পনা?

যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি পণ্য হরমুজ দিয়ে পরিবহন হতো। ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব ও আমিরাতের প্রধান পথ ছিল এটি। এখন বিকল্প পথ তৈরির বিনিয়োগ ইরানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কমাবে। যেমন, মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ঐতিহাসিক বানিয়াস পাইপলাইন পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে ইরাক, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ এলাকায় হরমুজ প্রণালির বাইরে নতুন বন্দর ও কনটেইনার অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।

গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ এই বিকল্প পথগুলো হরমুজের তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ বহন করতে সক্ষম হবে। নব্বইয়ের দশকে কাস্পিয়ান সাগর থেকে রাশিয়াকে এড়িয়ে জ্বালানি পশ্চিমে নিতে বাকু-তিবলিসি-চেইহান (বিটিসি) পাইপলাইন ২০০৬ সালে চালু করে সাফল্য পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা। বিটিসির মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে কীভাবে অবকাঠামো ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যেও যদি হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমে যায়, তবে ইরানের ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা চিরতরে কমবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি লাভ হচ্ছে। এক, হরমুজে ইরানের ক্ষমতার মাত্রা যাচাই করা যাচ্ছে; এবং দুই, বিকল্প পথ তৈরির সুযোগে হরমুজের ভূরাজনৈতিক ফাঁদের কার্যকারিতা দীর্ঘমেয়াদে নিষ্ক্রিয় করা যাচ্ছে।

একই সঙ্গে, হরমুজের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার প্রধান দায়িত্ব আন্তর্জাতিকভাবে ইরানের ওপর বর্তালে ভবিষ্যতে সামুদ্রিক অস্থিতিশীলতা বা তেল সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটার সব রাজনৈতিক দায়ও তেহরানের ওপর চাপবে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলার দায়ী হিসেবে এশিয়া ও ইউরোপের আমদানিকারক দেশগুলোর তোপের মুখে পড়ে তেহরানের কূটনৈতিক অবস্থান চরম দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

সামরিক অভিযান, সমঝোতার টোপ ও হরমুজের বিকল্প সন্ধান- এগুলো আলাদাভাবে হয়তো বিচ্ছিন্ন কৌশল মনে হতে পারে। তবে এগুলো প্রতিটিই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দাপট কমানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার কাঠামো বদলাতে প্রভাব রাখতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিবাদ যতটা না আদর্শিক, তার চেয়ে অনেক বেশি কৌশলগত স্বার্থের। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা যুক্তরাষ্ট্র আজ অবধি সৌদি আরবের রাজতন্ত্র নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলেনি। ট্রাম্পের সর্বশেষ নীতিপত্রেও বলা হয়, কোনও দেশের সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হবে না। ১৯৭০-এর দশকে উপসাগরীয় দেশগুলো ডলারে তেল কেনাবেচা (পেট্রোডলার) করতে রাজি হওয়ার পর থেকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে মার্কিন প্রশাসন মাথা ঘামায় না। এমনকি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে ইরানের শাহ প্রশাসনের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা ছিল না। আবার সিরিয়ার নতুন নেতা আহমদ আল-শারা, যার মাথার দাম কোটি ডলার ঘোষণা করা হয়েছিল, আসাদের পতনের পর তাকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র মূল কৌশলগত প্রতিবন্ধক এখন শুধুই ইরান।

প্রখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিয়ার্শমিয়ারের অফশোর ব্যালেন্সিং তত্ত্ব অনুযায়ী, বৃহৎ পরাশক্তিগুলো সব জায়গায় সরাসরি সামরিক উপস্থিতি না রেখে আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অফশোর ব্যালেন্সিং কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হলো ইসরায়েল। এই কৌশল সফল করতে ইসরায়েলের জন্য একটি শত্রুহীন নিষ্কণ্টক মধ্যপ্রাচ্য প্রয়োজন। অতীতে যেসব আরব রাষ্ট্র প্রবল ইসরায়েল বিরোধী ছিল, তারা ধাপে ধাপে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে বা যুদ্ধহীন পরিবেশ মেনে নিয়েছে। যেমন ১৯৭৯ সালে মিসর, ১৯৯৪ সালে জর্ডান এবং ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কো।

ট্রাম্প কি ভুল করছেন, নাকি এটাই ছিল বড় পরিকল্পনা?

সৌদি আরবকে সম্প্রতি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির অনুমোদন দেওয়ার বিনিময়ে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির শর্ত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। শর্ত সরাসরি না মানলেও রিয়াদ বর্তমানে ইসরায়েলের জন্য মারাত্মক কোনও সামরিক হুমকি তৈরি করছে না। অন্যদিকে সিরিয়ার নতুন সরকারও নিশ্চিত করেছে যে ইসরায়েলের প্রতি তাদের কোনও আগ্রাসী মনোভাব নেই। তা ছাড়া লেবাননের হিজবুল্লাহ কিংবা গাজার হামাসের সামরিক সক্ষমতাও সাম্প্রতিক অভিযানের পর উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ ও তার কৌশলগত মিত্রকে হুমকির মুখে ফেলার মতো একমাত্র অবশিষ্ট রাষ্ট্র হলো ইরান। এই চার দশকের প্রতিদ্বন্দ্বীকে কাবু করতে পারলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সমীকরণ ওয়াশিংটনের অনুকূলে চলে আসবে।

শেষ হাসি কার?

সব দিক বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে এই যুদ্ধকে কেবল সাধারণ সামরিক সংঘাত হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। তেহরান নিজে থেকে চুক্তিতে রাজি হোক কিংবা অভ্যন্তরীণ জনরোষে সরকারের পতন ঘটুক, দিন শেষে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার কাঠামো নিজেদের সুবিধামতো বদলে দেওয়ার পথেই হাঁটছে ওয়াশিংটন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ওয়াশিংটন যা চাইছে তা নিখুঁতভাবে ঘটছে। ইতিহাস বলে, বড় শক্তির বহু হিসাবই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক যুদ্ধই তার বড় প্রমাণ। তবে আরেকটি ঐতিহাসিক সত্য হলো, ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক নেতৃত্ব হারায়নি, বরং কালক্রমে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছিল এবং ভিয়েতনাম নিজেও বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্যে যুক্ত হয়েছিল। তাই ভিয়েতনামে আপাত ধাক্কা মানেই দীর্ঘমেয়াদে মার্কিনদের কৌশলগত পরাজয় ছিল না।

বর্তমান যুদ্ধের সফলতা বা ব্যর্থতা যুদ্ধক্ষেত্রের সাময়িক স্থিতি দিয়ে মাপা যাবে না; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের বিলুপ্তি, হরমুজের কৌশলগত গুরুত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান কতটা বদলালো, তা দিয়েই চূড়ান্ত জয় মাপা হবে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ আসলেই এক গভীর ভূরাজনৈতিক চাল কি না, সেটির চূড়ান্ত উত্তর সময়ের পথ ধরেই স্পষ্ট হবে।

/এএ/
সম্পর্কিত
ভাঙা হাড়ের চিকিৎসায় হাসপাতালে ভর্তি, হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারে নারীর মৃত্যু
রাশিয়ায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ইউক্রেন, প্যারেড বাতিল করে টিভিতে পুতিনের দীর্ঘ ভাষণ
জেন-জিদের সংসার ভাঙছে এআই
সর্বশেষ খবর
প্রাইম মিনিস্টার্স কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হচ্ছে: আমিনুল হক
প্রাইম মিনিস্টার্স কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হচ্ছে: আমিনুল হক
হাম উপসর্গে আরও ৫ মৃত্যু
হাম উপসর্গে আরও ৫ মৃত্যু
মঙ্গলবার বঙ্গভবনে অফিস করবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি
মঙ্গলবার বঙ্গভবনে অফিস করবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি
নায়িকা স্নিগ্ধাকে মারধর: আত্মসমর্পণ করে আশিয়ান চেয়ারম্যান নজরুলের জামিন
নায়িকা স্নিগ্ধাকে মারধর: আত্মসমর্পণ করে আশিয়ান চেয়ারম্যান নজরুলের জামিন
সর্বাধিক পঠিত
প্রধান শিক্ষিকার রিল ভিডিও ভাইরালের পর বিতর্ক, তদন্তে শিক্ষা বিভাগ
প্রধান শিক্ষিকার রিল ভিডিও ভাইরালের পর বিতর্ক, তদন্তে শিক্ষা বিভাগ
নির্বাচন অফিসে পরীক্ষা ছাড়াই ১৪৩ জনকে নিয়োগ, নির্বাচন কর্মকর্তা বরখাস্ত
নির্বাচন অফিসে পরীক্ষা ছাড়াই ১৪৩ জনকে নিয়োগ, নির্বাচন কর্মকর্তা বরখাস্ত
একসঙ্গে ছাত্রদলের ৪ নেতার পদত্যাগ
একসঙ্গে ছাত্রদলের ৪ নেতার পদত্যাগ
এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের তারিখ ঘোষণা
এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের তারিখ ঘোষণা
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সম্মানি ভাতা বাড়লো
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সম্মানি ভাতা বাড়লো