নিসে বৃহস্পতিবার থেকেই ছিল উৎসব আর আনন্দ। পর্যটন শহর বলে সন্ধ্যার পর ছিল বিভিন্ন আয়োজন। প্রতিবারের মতো এই বৃহস্পতিবারও নিসের মানুষ উন্মুখ ছিল চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আলোর আতসবাজির ঝলকানি দেখতে। কিন্তু কেউই ভাবেননি বাস্তিল দিবস এমন রক্তাক্ত হয়ে যাবে। আনন্দময় ও উৎসবমুখর রাতটি পরিণত হবে বিভীষিকাময় এক রাতে।
বৃহস্পতিবার ছিল (১৪ জুলাই) বাস্তিল দিবস। ফরাসি জাতির মুক্তির দিন। ১৮৭৯ সালের ১৪ জুলাই বাস্তিল কারাগার ভেঙে ফেলার মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়। ওই দুর্গের পতনের মাধ্যমেই ফ্রান্সে রাজপরিবারের একাধিপত্যের অবসান ঘটে। এরপর থেকে আধুনিক ফ্রান্সে দিবসটি জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
ফরাসি বিপ্লবের স্লোগান ছিল ‘সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা’। এ স্লোগানে ফ্রান্সের মানুষ শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে অধিকার প্রতিষ্ঠার বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফরাসি বিপ্লব শুধু ফ্রান্সে নয়, মুক্তির পথ দেখায় পুরো ইউরোপে। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও নিষ্পেষণ থেকে মুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। আর সেই বাস্তিল দিবসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় পুরো ফরাসি জাতি একদিকে শোকাহত, অন্যদিকে এমন হামলায় শিশু-নারীসহ ৮৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ। তবে এমন ভয়াবহ হামলার পরও ফ্রান্সের মানুষ আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংহতি জানিয়ে গড়ে তোলছেন ঐক্য। সেই সংহতির সুর বেজে উঠছে বিশ্বনেতাদের কণ্ঠেও।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১৪ জুলাই) বাস্তিল দিবস উদযাপনের জন্য ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাইসের প্রমেনাদে দেজ অ্যাংলেইসে আতশবাজি প্রদর্শনী দেখতে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। সেখানে একটি ট্রাক ওই জমায়েতের দিকে ছুটে আসে। ফলাফল হিসেবে এ পর্যন্ত ৮৪ জন নিহত এবং বেশ ক'জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১৮ জনের অবস্থা ছিল বেশ আশঙ্কাজনক। সর্বশেষ দেশটির প্রেসিডেন্টে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, আহত ৫০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তারা জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন।

৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও জরুরি অবস্থায় মেয়াদ বৃদ্ধি
নিস শহরে ট্রাক হামলার ঘটনায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শনিবার থেকে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভালস। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ এমন একটি হুমকি যার জন্য ফ্রান্সকে ব্যাপক ভুগতে হচ্ছে। সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য হলো ভয় আর আতঙ্ক ছড়ানো। কিন্তু ফ্রান্স সুদৃঢ় গণতন্ত্রের দেশ। এটি নিজেকে অস্থিতিশীল হতে দেবে না।’
এর আগে ট্রাক হামলার ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে চলমান রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা আরও তিন মাস বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ। শুক্রবার সকালে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে এ ঘোষণা দেন তিনি। গত বছর নভেম্বরে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই ফ্রান্সে জরুরি অবস্থা জারি আছে। সে জরুরি অবস্থা তিন দফা বাড়িয়ে তা ২৬ জুলাই পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু সে জরুরি অবস্থার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাস্তিল দিবসে হামলার প্রেক্ষাপটে আবারও তিন মাসের জন্য তা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হলো। আগামী ২৬ জুলাই থেকে বর্ধিত জরুরি অবস্থা কার্যকর হবে।
হামলাকারীর পরিচয় শনাক্ত
শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাক চালককে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তিনি তিউনিসিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক। ৩১ বছর বয়সী এ ব্যক্তি একাই হামলা চালিয়েছেন নাকি তার কোনও সহযোগী ছিল তা নিশ্চিত হতে ব্যাপক পুলিশি অভিযান চলছে। ফ্রান্সের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে ট্রাক চালকের নামও প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে তার নাম মোহাম্মদ লাহৌআইজ বৌহলেল। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে খবরটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। পুলিশ সূত্র ও ফরাসি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দু’দিন আগে নিস শহরের পার্শ্ববর্তী সেইন্ট-লঁরা-দু-ভার থেকে ট্রাকটি ভাড়া করেন চালক। ফরেনসিক কর্মকর্তারা গাড়িটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন।
টেলিগ্রাফের খবরে তদন্ত সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘সহিংসতা সৃষ্টিকারী হিসেবে পুলিশের কাছে তার পরিচিতি ছিল। সে অস্ত্রও ব্যবহার করত। তবে তার কোনও সন্ত্রাসবাদী সংযোগ ছিল না।’ দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ওই ট্রাকের চালক নিহত হয়েছেন।

রক্তের স্বল্পতা ও রক্তদাতাদের ঢল
বৃহস্পতিবারের হামলায় শুধু বাস্তিল দিবস রক্তাক্ত হয়নি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বের সব এলাকার পর্যটকদের কাছে সমাদৃত নিসের রাস্তাও রক্তে ভিজে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতদের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সরকার জনগণের কাছে রক্তদানের আহ্বান জানানো হয়। খোলা হয় যেকোনও ধরনের সাহায্যের জন্য জরুরি কন্ট্রোল রুম। সহমর্মিতা ও সংহতিতে বিশ্বাসী মানুষেরা বসে থাকেননি। ছুটে গেছেন হাসপাতালে। রীতিমতো মানুষের ঢল নেমেছে রক্ত দিতে। আছেন সব বয়সের, সব শ্রেণির ও সব ধর্মের মানুষ।
টিম বাকের নামের এক রক্ত দিতে আগ্রহী ব্যক্তি জানান, আমি দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। আমার মনে হয় আমাকে আরও অন্তত ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। আমার ছেলেও বন্ধুদের সাহায্যের জন্য সারারাত কাজ করেছে। তিনি আরও বলেন, নিসের রক্তদাতারা কেমন যদি কেউ জানতে চায় তাহলে শহরের সড়কগুলো খেয়াল করা উচিত। সব বয়সের, সব আয়ের ও বর্ণের মানুষকে দেখতে পাওয়া যাবে। ফ্রান্সকে যদি সন্ত্রাসবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদকে প্রতিরোধ করতে হয় তাহলে দেশটির নাগরিকদের বৈচিত্র্য ও সংহতির ওপরই দাঁড়াতে হবে।
টিম বাকের বলেন, যখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় আপাতত আর রক্তের প্রয়োজন নেই তখনও প্রায় ৪০০ মানুষ রক্ত দিতে আগ্রহী ছিলেন। প্রয়োজন না হলেও অনেকেই রক্ত দিতে চাচ্ছিলেন। পরে তাদের বলা হয়, আগামী সপ্তাহে এসে রক্ত দিতে।
আইএস-এর দায় স্বীকার
নিস শহরের হামলায় আইএস-এর দায় স্বীকারের খবর দিয়েছে এক ফরাসি মিডিয়া। আজারবাইজানভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ট্রেন্ড-এর এক খবরে এ কথা জানানো হয়েছে। তবে আইএস-এর ওই দায় স্বীকারের ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জঙ্গি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী বেসরকারি সংগঠন সাইট ইন্টেলিজেন্স সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় সবার আগে দায় স্বীকারের খবর প্রকাশ করে থাকে। সেই সাইট ইন্টেলিজেন্সও এখন পর্যন্ত আইএস-এর দায় স্বীকারের ব্যাপারে কিছু জানায়নি। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর সাবেক বিশ্লেষক নাদা বাকোসের মতে, হামলাটি আল-কায়েদা এবং আইএস ধাঁচের। তিনি বলেন, ‘তাদের একটি প্লেবুক আছে। সেখানে এ ধরনের হামলার উল্লেখ আছে। তারা তাদের অনুসারীদের এ ধরনের সহিংসতা চালানোর উস্কানি দিচ্ছে।’
বিশ্বনেতাদের সংহতি
ভয়াবহ এ হামলায় নিন্দা, শোক ও সংহতি জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি শোক ও সমবেদনার পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদী হামলা রোধে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তারা। ভয়াবহ এ হামলায় নজিরবিহীন প্রাণহানির ঘটনায় ফ্রান্সের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক।
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফ্রান্সের নিস শহরে ভয়াবহ হামলার ঘটনায় ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদের কাছে সহমর্মিতার বার্তা পাঠিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে যেকোনও ধরনের সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল ফ্রান্সের নিসে হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধে ফরাসি সরকারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
এছাড়া ভারত, চীন, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরাও এ ঘটনায় শোক ও নিন্দা জানিয়েছেন।

হামলায় নিহত প্রথম ব্যক্তি মুসলিম নারী
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, হামলায় প্রথম যার মৃত্যু হয়েছে তিনি একজন মুসলিম নারী। অনুষ্ঠান দেখতে সবাই যেখানে জড়ো হয়েছিলেন সেদিদকেই দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল ঘাতক ট্রাক। সে সময়ই লোভাল সৈকতের কাছে রাস্তার ধারের ফুটপাতে ওই নারীকে পিষে দেয় ট্রাকটি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার। মৃত নারীর দুই ছেলেসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা স্তম্ভিত হয়ে যায়। হাল্কা নীল একটি কম্বল দিয়ে ঢাকা ছিল মৃতদেহটি।
ইউরোপজুড়ে সতর্কতা জারি
নিসে হামলার পর ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন দেশে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বেশ কিছু দেশের সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা আরোপ করা হয়েছে। সীমান্ত থেকে মাত্র ২২ মাইল দূরে নিস শহরে ভয়াবহ হামলার পর ইতালিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলিনো আলফেনো। শুক্রবার টুইটারে তিনি ফ্রান্সের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যবহৃত তিনটি সড়ক ও ভেন্তিমিগলিয়া রেলপথে টহল বাড়ানোর কথা জানান। বেলজিয়াম জানিয়েছে, তাদের সতর্কতার মাত্রা বাড়ানো হবে না। আগে থেকেই দেশটিতে সন্ত্রাস ও হামলার বিষয়ে সতর্কতা জারি ছিল। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, রয়টার্স, নিউ ইয়র্ক টাইমস।
এ সম্পর্কিত আরও খবর-
- রক্তে ভেজা নিসে রক্তের জন্যই হাহাকার
- ‘একটা ট্রাক অস্ত্রে রূপান্তরিত হয়ে বহু মানুষ হত্যা করলো’
- ফ্রান্সের ‘ট্রাক হামলাকারী’কে আগে থেকেই চিনত পুলিশ!
- ২০১০ সালেই ট্রাককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিল আল কায়েদা!
- হামলার পর ফ্রান্সে থমথমে নীরবতা, তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক
- দুইদিন আগেই ট্রাকটি ভাড়া করেন হামলাকারী
- ভিডিওতে দেখুন ফ্রান্সে ট্রাক হামলার পর উৎকণ্ঠিত মানুষের ছোটাছুটি
- ট্রাককে ‘সন্ত্রাসবাদী’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার এবারই প্রথম নয়
- শিশুদের বাঁচাতে নিরাপদে ছুড়ে দিচ্ছিলেন অভিভাবকরা
- ফরাসি মিডিয়ায় ‘আইএস-এর দায় স্বীকারের খবর’, বাড়ছে জরুরি অবস্থার মেয়াদ
- ফ্রান্স-তিউনিসিয়ার দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল 'হামলাকারী' ট্রাক চালকের!
/এএ/এমএনএইচ/








