করোনা ভাইরাস মানবদেহে কী প্রভাব ফেলে

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১০:৫০, মার্চ ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫১, মার্চ ১৩, ২০২০

সার্স-কভ-২ ভাইরাস গলার পিছন থেকে ফুসফুসে এবং পরে রক্তে মিশে যায়। বুধবার চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল ল্যানসেট-এ প্রকাশিত চীনের উহানের ১৯১ জন রোগীর রোগ অগ্রগতি বিশ্লেষণে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানা গেছে।

নভেল করোনা ভাইরাস রোগ (কোভিড-১৯) বিশ্বের শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। গত দুই সপ্তাহে ভাইরাসটি চীনের বাইরে ১৩ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে ১১ মার্চ বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। উৎপত্তিস্থল চীনে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হলেও সেখানে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব কমে গেছে। তবে চীনের বাইরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ইতালিতে। দেশটিতে ১২ হাজার ৪৬২ মানুষ আক্রান্ত হওয়ার বিপরীতে মারা গেছেন ৮২৭ জন। আর আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটারের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এ ভাইরাস ১২৪টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ২৬ হাজার ৩৮০ জন মানুষ। এরমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে চার হাজার ৬৩৫ জন। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৬৮ হাজার ৩১৩ জন।

ল্যানসেট’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশ কিছুদিন আগেই বিজ্ঞানীরা জেনে গেছেন যে, যখন কোনও আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা নাক ঝাড়েন তখন ভাইরাসটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যরা এই তা নিশ্বাস গ্রহণ বা চোখ, নাক ও মুখের স্পর্শের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারেন। বারবার ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে হাত ধুয়ে স্পর্শের মাধ্যমে এই সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যেতে পারে।

কিন্তু একবার যদি ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করে ফেলে তখন তা স্পাইকের মতো একটি প্রোটিন ব্যবহার করে শ্বসনযন্ত্রের কোষে থাকা অ্যাঙ্গিওটেনসিন-কনভারটিং এনজাইম ২ (এসিই-২)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়, সেটিতে প্রবেশ করে এবং এরমধ্যেই বংশ বিস্তার করে সংক্রমণ ছড়ায়।

কোভিড-১৯ রোগের কালপঞ্জি

এই রোগের প্রথম লক্ষণ হলো জ্বর। রোগ-জীবাণুর উন্মেষকালের গড়ে পাঁচদিন পর জ্বর শুরু হয়। আক্রান্ত হওয়া ও লক্ষণ প্রকাশের ক্ষেত্রে সময় লাগে প্রায় ১৪ দিন। অনেক ক্ষেত্রে ২৭ দিনও লেগেছে বলে ল্যানসেটের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

লক্ষণ শুরু হওয়ার প্রথম তিন দিনে ভাইরাস গলার পিছন দিকে আক্রমণ করে। ফলে গলা ব্যথা ও শুকনো কাশি শুরু হয়। পরে তা শ্বাসনালীর নিচের দিকে চলে যায়। লক্ষণ দেখা দেওয়ার চার থেকে ৯ দিনে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

ভাইরাসটি বংশ বিস্তার করতে করতে ফুসফুসে পৌঁছায়। এতে ফুসফুসের থলিতে ছিদ্র হয়ে তা তরল দ্বারা পূর্ণ হয় এবং নিউমোনিয়ার সৃষ্টি হয়। ফুসফুসের প্রদাহের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। লক্ষণ শুরুর আট থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হওয়ার পর ডায়রিয়ার মতো আন্ত্রিক জটিলতাও দেখা গেছে। ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে।

যেভাবে মৃত্যু হয়

গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের জিনুইনথান ও উহান পালমনারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৯১ জন প্রাপ্ত বয়স্ক রোগীদের ৪৮ শতাংশের ক্ষেত্রে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি অন্য স্বাস্থ্যজনিত জটিলতা ছিল, ৩০ শতাংশের ছিল উচ্চ রক্তচাপ, ১৯ শতাংশের ডায়াবেটিস ও ৮ শতাংশের ছিল হৃদরোগ।
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক প্রধান ড. শোভা ব্রুর বলেন, কোভিড-১৯ খুব প্রাণঘাতী না কিন্তু অনেক বেশি সংক্রমিত হয়। যেহেতু এটি অনেক মানুষকে আক্রান্ত করে ফলে বেশ কিছু মানুষের মৃত্যু হয়। সংক্রমণের ক্ষেত্রে এটি চিকেন ফক্সের কাছাকাছি। সত্যিকার অর্থে এই বিস্তারের কারণ এখন আমরা জানি না। তবে আমরা জানি যে, এটি শ্বাসনালী থেকে অন্ত্রের নালীতে যায়, তারপর রক্তে মিশে গিয়ে বহু অঙ্গকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। এতেই মৃত্যু হয় আক্রান্ত ব্যক্তির।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর মৃত্যু না হওয়া রোগীদের বয়স ছিল মৃত্যু হওয়া রোগীদের চেয়ে গড়ে ১৭ বছর বেশি।

ল্যানসেট’র প্রতিবেদনের তথ্যের সূত্র ধরে ভারতের পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের সংক্রমণ রোগের সিনিয়র উপদেষ্টা ড. ললিত কান্ত বলেন, আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না কেন প্রবীণরা এই রোগে মারা যাচ্ছেন। কিন্তু আমরা জানি যে, বয়স হলে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধের জন্য টি-সেল ও বি-সেলের কর্মক্ষমতা মন্থর, কমে যায় অথবা বেড়ে যায়। এই সেলগুলোর অকার্যকারিতা শরীরে ভাইরাসের বংশ বিস্তার ঠেকানো কঠিন করে তোলে।

ড. শোভা ব্রুর বলেন, ২০০৩ সালে ছড়িয়ে পড়া সার্স ভাইরাসের সঙ্গে করোনা ভাইরাসের প্রায় ৭০ শতাংশ মিল রয়েছে কিন্তু পুরোপুরি মিল নেই। ব্যাট করোনা ভাইরাসের কাছাকাছি এই ভাইরাস। কিন্তু আমরা সার্স ভাইরাসের মতো সাইটোকিন স্টর্মে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হতে পারে বলে ধারণা করতে পারি।

সাইটোকাইন স্টর্ম হলো সংক্রমণ ঠেকাতে প্রতিরোধক কোষের মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে শরীরের কোষ ও অঙ্গের ক্ষতি হওয়া।

/এএ/এমওএফ/এমওএফ/

লাইভ

টপ