বিশ্লেষণআন্তর্জাতিক সংহতিই করোনা মোকাবিলার পথ

Send
ইউভাল নোয়াহ হারারি
প্রকাশিত : ১৩:৩৩, মার্চ ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৩, মার্চ ১৮, ২০২০

করোনা ভাইরাসের মহামারির জন্য অনেকেই বিশ্বায়নকে দায়ী করছেন। বলছেন এই মহামারির আরও প্রাদুর্ভাব রোধ করার একমাত্র উপায় হলো পৃথিবীর বিশ্বায়ন রোধ করা। দেয়াল তোলো, ভ্রমণ সীমিত করো, ব্যবসা-বাণিজ্য কমাও। যাই হোক, মহামারি ঠেকাতে স্বল্পমেয়াদের সঙ্গনিরোধ (কোয়ারেন্টাইন) আবশ্যক। দীর্ঘমেয়াদি আইসোলেশন (বিচ্ছিন্নতা) সংক্রামক রোগগুলোর বিরুদ্ধে আসলে যথাযথ কোনও সুরক্ষা তো দেয়ই না, বরং অর্থনীতিতে ধস নামায়। করণীয় ঠিক এর বিপরীত। মহামারিটির আসল প্রতিষেধক পৃথকীকরণ (আইসোলেশন) নয়, বরং এর জন্য দরকার পারস্পরিক সহযোগিতা।

পৃথিবী বিশ্বায়িত হওয়ার বহু আগেও লাখ লাখ মানুষ মহামারিতে মারা গেছে। ১৪ শতকে যখন কোনও বিমান কিংবা প্রমোদতরী কিছুই ছিল না, তখনো ব্ল্যাক ডেথ নামক মহামারিটি এক যুগের কিছুটা বেশি সময়ের মধ্যেই প্রাচ্য এশিয়া থেকে পাশ্চাত্য ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি ইউরো-এশিয়া অঞ্চলটির ২০০ মিলিয়নের মধ্যে ৭৫ মিলিয়ন মানুষকে মেরে ফেলছিল, যা ইউরো-এশিয়ার মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। ইংল্যান্ডে প্রতি দশজনে চারজন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ফ্লোরেন্স শহরে এক লাখ নাগরিকের মধ্যে ৫০ হাজার নাগরিক প্রাণ হারায়।

সময়টা ১৫২০ সালের মার্চ মাস। গুটিবসন্তের (স্মল পক্স) একজনমাত্র বাহক ফ্রান্সিকো ডি অ্যাগুইয়া মেক্সিকোতে পা রাখেন। সে সময় মধ্য আমেরিকায় কোনও ট্রেন ছিল না, ছিল না কোনও বাস; এমনকি [চলাচলের জন্য] গাধা পর্যন্ত ছিল না। তা সত্ত্বেও ডিসেম্বরের মধ্যে গুটি বসন্ত মহামারি আকারে পুরো মধ্য আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং কারও কারও মতে এটি মধ্য আমেরিকার মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

১৯১৮ সালে একটি বিশেষ ধরনের ফ্লু ভাইরাস কয়েকমাসের মধ্যেই পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়। এটি প্রায় পঞ্চাশ কোটি মানুষকে আক্রান্ত করে, যা তখনকার মানব প্রজাতির এক চতুর্থাংশেরও বেশি। ধারণা করা হয়, এই ভাইরাসে ভারতবর্ষের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশের মৃত্যু হয়। তাহিতি দ্বীপে ১৪ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারায়। সামোয়াতে প্রাণ হারায় ২০ শতাংশ মানুষ। সবমিলে, মহামারিটিতে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। সম্ভবত এক বছরেরও কম সময়ে ১০ কোটির মতো মানুষ প্রাণ হারায়। চার বছর ধরে চলা নৃশংস প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যার চেয়েও এটি বেশি ছিল।

১৯১৮ সালের পরে একটি শতাব্দী পার করেছে মনুষ্যপ্রজাতি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মানবতা আরও বেশি করে মহামারির ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মধ্যযুগের ফ্লোরেন্সের চেয়ে এখন টোকিও কিংবা মেক্সিকোর মতো আধুনিক শহরগুলো এই জীবাণুগুলোকে আরও বেশি হন্তারক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এখন বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ১৯১৮ সালের চেয়েও অনেক দ্রুততর। একটা ভাইরাস ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে প্যারিস থেকে টোকিও এবং মেক্সিকো সিটিতে ভ্রমণ করে ফেলতে পারে।

একের পর এক মরণঘাতী মহামারির আবির্ভাবের কারণে আমাদের বরং একটি সংক্রমণের নরকে বসবাস করার কথা ছিল। তবে, মহামারির ঘটনা আর এর প্রভাব দুই-ই নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। এইডস ও ইবোলার ভয়াবহ প্রকোপের পরেও, প্রস্তর যুগের পরে আগের সময়ের তুলনায় মহামারিগুলো একুশ শতকে মানবপ্রজাতির খুব অল্প অংশেরই মৃত্যু ঘটাতে পেরেছে। তথ্য বলছে, এর কারণ বিচ্ছিন্নতা (আইসোলেশন) নয়; রোগজীবাণু থেকে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিতের অনন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মহামারির বিরুদ্ধে মানবতার এই চলমান বিজয়ের কারণ হলো চিকিৎসক আর জীবাণুর এই সশস্ত্র যুদ্ধে জীবাণুদের নির্ভরশীলতা এলোপাতাড়ি রূপান্তরের ওপর (ব্লাইন্ড মিউটেশন)। আর চিকিৎসকেরা নির্ভর করেন বিভিন্ন তথ্যের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ওপরে।

১৪ শতকে যখন  ব্ল্যাক ডেথ মহামারি আঘাত হানে তখন লোকজনের কোনও ধারণাই ছিল না এটি কী কারণে হয় এবং একে ঠেকাতে কী করা দরকার। আধুনিক যুগের আগ পর্যন্ত মানুষজন অসুখবিসুখের দায় সাধারণত ক্রুদ্ধ  দেবদেবী, হিংসুটে দানব অথবা বদ বায়ুর ওপরে চাপাত এবং ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের অস্তিত্ব সম্পর্কে তাদের মনে কখনও কোনও সন্দেহও জাগ্রত হয়নি । মানুষ দেবদেবতা ও পরিদের বিশ্বাস করতো, কিন্তু তারা কল্পনাও করতে পারত না যে এক ফোঁটা পানিতে প্রাণঘাতী জীবাণুদের একটি বহর থাকতে পারে। তাই, যখন ব্ল্যাক ডেথ অথবা গুটিবসন্ত আসত, তখন কোন কর্তৃপক্ষ যে কাজটি সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারার কথা চিন্তা করত সেটি হলো, বিভিন্ন দেবদেবী ও সাধুর উদ্দেশ্যে গণপ্রার্থনার আয়োজন করা। এটি কোনও কাজে আসেনি। প্রকৃতপক্ষে, মানুষ যখন গণপ্রার্থনার জন্য সমবেত হতো তখন এটি আরও ব্যাপক সংক্রমণ ঘটাতো।

গত শতাব্দীতে, সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং নার্সেরা তথ্য বিনিময় করেছিলেন এবং একসঙ্গে মহামারি ছড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ও একে ঠেকানোর উপায় দুই-ই বুঝতে পেরেছিলেন। বিবর্তন তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছিল যে কেন এবং কীভাবে নতুন রোগ ছড়ায় এবং কীভাবে পুরনো রোগগুলো আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে। বংশগতিবিদ্যা বিজ্ঞানীদেরকে জীবাণুগুলোর নিজস্ব নির্দেশিকা গ্রন্থের ওপরে গোয়েন্দাগিরির সুযোগ করে দেয়। মধ্যযুগের মানুষ যেখানে বুঝতেই পারেনি যে কী কারণে ব্ল্যাক ডেথ হয়, সেখানে নভেল করোনা ভাইরাসকে শনাক্ত, এর জীবনরহস্য উন্মোচন (জিনোম সিকোয়েন্স) করতে এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য একটি নির্ভরযযোগ্য পরীক্ষা পদ্ধতির উন্নয়ন ঘটাতে বিজ্ঞানীদের মাত্র দুই সপ্তাহ সময় লেগেছে।

বিজ্ঞানীরা একবার যদি বুঝতে পারেন মহামারিটির কারণ কী; তাহলে এর বিরুদ্ধে লড়াইটাও অনেক সহজ হয়ে যায়। ভ্যাক্সিনেশন, অ্যান্টিবায়োটিক, উন্নত স্বাস্থ্যবিধি এবং আরও ভালো চিকিৎসা অবকাঠামো মানুষকে তার অদৃশ্য শিকারিদের উপরে হস্তক্ষেপ করতে সক্ষম করেছে। ১৯৬৭ সালেও গুটিবসন্ত ১৫ মিলিয়ন মানুষকে আক্রান্ত করে এবং এর মধ্যে ২ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটায়। তবে পরের দশকে গুটিবসন্তের টিকা দেওয়ার একটি বৈশ্বিক কার্যক্রম এতটাই সফল হয়েছিল যে, ১৯৭৯ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করে যে মানবতা জয়ী হয়েছে এবং গুটিবসন্ত পুরোপুরিভাবে নির্মূল হয়েছে। ২০১৯ সালে একজন ব্যক্তিও গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়নি কিংবা মারা যায়নি।

সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাস মহামারির ক্ষেত্রে এই ইতিহাস আমাদের কী শিক্ষা দেয়?

প্রথমত, ইতিহাস আমাদের বলতে চায়, স্থায়ীভাবে নিজের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে আপনি নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না। বিশ্বায়নের যুগের অনেক আগে তথা মধ্যযুগে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মহামারিগুলোর কথা স্মরণ করে দেখুন। তো ১৩৪৮ সালের ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন ছিল, এখন এসে আপনি সেই স্তরে আপনার যোগাযোগকে সীমিত করে ফেললেও তা যথেষ্ট হবে না। সত্যিই বিচ্ছিন্নতার ভেতর দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে চাইলে, মধ্যযুগীয় হওয়াটাও কোনও কাজে দেবে না। এর জন্য আপনাকে পুরোপুরি প্রস্তর যুগে যেতে হবে। আপনি কি তা করতে পারবেন?

দ্বিতীয়ত, ইতিহাস বলে যে প্রকৃত সুরক্ষা আসে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য বিনিময় এবং বৈশ্বিক সংহতির মাধ্যমে। যখন কোনও দেশ মহামারি দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ভয় ছাড়াই সততার সঙ্গে সংক্রমণের তথ্য বিনিময় করার জন্য সদিচ্ছা থাকতে হবে, যাতে অন্য দেশগুলো সেই তথ্যের ওপরে আস্থা রাখতে পারে এবং আক্রান্ত দেশকে একঘরে করার বদলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। আজকে, চীন পুরো পৃথিবীকে করোনা ভাইরাস নিয়ে অনেক কিছু শেখাতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন খুবই উঁচু স্তরের আন্তর্জাতিক আস্থা ও সহযোগিতা।

কার্যকর সঙ্গরোধ (কোয়ারেন্টাইন) ব্যবস্থার জন্যও দরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পারস্পরিক সহযোগিতা। মহামারি ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সঙ্গরোধ ও অবরুদ্ধকরণ (লক-ডাউন) অপরিহার্য। তবে যখন এক দেশ আরেক দেশকে অবিশ্বাস করে এবং প্রত্যেক দেশ মনে করে এটি তাদের নিজেদের ব্যাপার, তখন সরকারগুলো তেমন কঠোর ব্যবস্থা নিতে ইতস্তত বোধ করে। যদি আপনার দেশে ১০০টি করোনা সংক্রমণের কথা জানতে পারেন, তাহলেই কি আপনি সঙ্গে সঙ্গে পুরো শহর ও অঞ্চলকে অবরুদ্ধ (লক-ডাউন) করে ফেলবেন? বৃহত্তর অর্থে এটি নির্ভর করে আপনি অন্য দেশগুলোর কাছে কী আশা করেন, তার ওপর। আপনার নিজের শহর অবরুদ্ধ করে ফেলাটা অর্থনৈতিক পতন ডেকে আনতে পারে। যদি আপনি মনে করেন, অন্যান্য দেশও আপনাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে, তখন আপনি এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিতে পারবেন। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন অন্য দেশগুলো আপনাকে পরিত্যাগ করবে, তাহলে আপনি হয়তো খুব দেরি হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ইতস্তত করতে থাকবেন।

সম্ভবত, এই মহামারিগুলো সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি মানুষজনের অনুধাবন করা দরকার, সেটি হলো যে কোনও দেশে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা পুরো মানব প্রজাতিকেই হুমকির মুখে ফেলে। এর কারণ হলো, ভাইরাসেরা বিবর্তিত হয়। করোনার মতো ভাইরাসেরা পশুপাখির মধ্যে জন্ম নেয়, যেমন বাদুড়। যখন তারা লাফ দিয়ে মানব প্রজাতিতে চলে আসে, তখন শুরুতে ভাইরাসগুলো তাদের মানব পোষকের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। মানবদেহে ভাইরাসগুলোর ডিএনএ থেকে একই ধরনের ডিএনএ তৈরির সময় ভাইরাসগুলো মাঝে-মধ্যে আকস্মিক জিনগত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। বেশিরভাগ পরিবর্তনই নিরীহ। তবে, প্রতিবার এবং পরে কোনও পরিবর্তন ভাইরাসটিকে আরও সংক্রামক বা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার তুলনায় প্রতিরোধী করে তোলে এবং ভাইরাসের এই পরিবর্তিত রূপটি তখন দ্রুততার সঙ্গে আরও বেশি জনসংখ্যার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে একজন মাত্র মানুষ ট্রিলিয়ন ভাইরাস অণুর পোষক হতে পারে, যা প্রতিনিয়ত ডিএনএ অনুলিপি তৈরির ভেতর দিয়ে যায়, প্রত্যেক আক্রান্ত ব্যক্তিই ভাইরাসটিকে মানুষের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার হাজার হাজার কোটি নতুন সুযোগ করে দেয়। প্রত্যেক মানব বাহকই একটি জুয়ার মেশিনের মতো, যা ভাইরাসটিকে সাফল্যে পৌঁছানোর জন্য ট্রিলিয়ন লটারি টিকিট দেয়। ভাইরাসটির শুধু একটি টিকিট জিতলেই হবে। 

এটা কোনও নিছক ভাবনা নয়। রিচার্ড পিটারসন তাঁর Crisis in The Red Zone বইয়ে  ২০১৪ সালের ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার ঠিক এমন একটি ঘটনাক্রমের(chain of events) বর্ণনা দিয়েছেন। প্রাদুর্ভাব শুরু হয় তখন, যখন কিছু ইবোলা ভাইরাস বাদুড় থেকে মানুষে চলে আসে। এই ভাইরাসগুলো মানুষজনকে খুব অসুস্থ করে ফেলে, কিন্তু তখন পর্যন্ত তারা মানুষের তুলনায় বাদুড়ের শরীরেই বাস করার জন্য বেশি খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। পশ্চিম আফ্রিকার মাকোনা অঞ্চলের কোথাও এই ভাইরাসটি একজন মানুষকে আক্রান্ত করে এবং ইবোলা ভাইরাসের একটিমাত্র জিনগত পরিবর্তন একে অপেক্ষাকৃত একটি বিরল রোগ থেকে একটি আগ্রাসী মহামারিতে পরিণত করে। এই জিনগত পরিবর্তনের ফলে মাকোনা স্ট্রেইন নামের মিউট্যান্ট ইবোলা স্ট্রেইনটি মানব কোষের কোলেস্টেরল পরিবাহকদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে পড়তে সক্ষম হয়। সে কারণে এখন কোলেস্টেরলের বদলে পরিবাহকগুলো কোষের ভেতরে ইবোলা ভাইরাসকে ঠেলে দিচ্ছে। এই নতুন মাকোনা স্ট্রেইনটি মানুষের ক্ষেত্রে চারগুণ বেশি সংক্রামক ছিল।  

যখন আপনি এই কথাগুলো পড়ছেন, তখন সম্ভবত তেহরান, মিলান কিংবা উহানে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত কোনও মানুষের শরীরে থাকা ভাইরাসটির কোনও একটি জিনে একই ধরনের পরিবর্তন (মিউটেশন) ঘটে যাচ্ছে। যদি সত্যিই এটি ঘটতে থাকে, তাহলে এটি শুধু ইরানি, ইতালিয়ান কিংবা চাইনিজ কারও জন্য নয়, আপনার জীবনের জন্যও সরাসরি হুমকি। সারা পৃথিবীর মানুষের জীবন-মরণের স্বার্থে; করোনা ভাইরাসকে এমন একটি সুযোগ তৈরি করে দেওয়া উচিত হবে না। এবং এর অর্থ হলো প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক মানুষের জন্যই আমাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। 

১৯৭০ সালে মানুষ গুটিবসন্ত ভাইরাসকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল, কারণ সব দেশের সব মানুষকে গুটিবসন্তের প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হয়েছিল। যদি একটি মাত্র দেশের জনগণকে টিকা দিতে ব্যর্থ হতো, তাহলে এটি পুরো মানবতাকেই হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারত, কেননা যতক্ষণ পর্যন্ত গুটিবসন্ত ভাইরাস টিকে থাকত, এটি কোথাও না কোথাও বিবর্তিত হতো, আবার সবসময় সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারত। 

ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মানুষকে খুব নিবিড়ভাবে সীমান্ত পাহারা দিতে হবে। কিন্তু এই সীমান্ত দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত নয়। বরং এটি মানব বিশ্বের এবং ভাইরাস বিশ্বের মধ্যকার সীমান্ত। পৃথিবী নামের গ্রহটি অগণিত ভাইরাসের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে এবং জিনগত রূপান্তরের কারণে ক্রমাগত নতুন ভাইরাস তৈরি হচ্ছে। ভাইরাসের দুনিয়া থেকে মানব বিশ্বকে আলাদা করা এই সীমান্তরেখাটি প্রত্যেক মানুষের শরীরের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করেছে। যখন কোনও একটি বিপজ্জনক ভাইরাস পৃথিবীর যেকোনও জায়গার [মানুষের ভেতরকার] এই সীমানাকে ভেদ করতে সমর্থ হয়, তখন এটি পুরো মানব প্রজাতিকেই বিপদে ফেলে দেয়। 
গত শতাব্দীতে মানুষ এই সীমান্তকে যতটা মজবুত করেছে, তা অতীতে কখনও করেনি। সীমান্তটির একটি দেয়াল হিসেবে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নির্মিত হয়েছে এবং এর প্রহরী হলো নার্স, ডাক্তার ও বিজ্ঞানীরা, যারা এটি পাহারা দেয় এবং অনুপ্রবেশকারীদের প্রতিহত করে। যদিও এই সীমান্তের বড় অংশ ভয়ানকভাবে উন্মুক্ত। পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এমনকি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত। এটি আমাদের সবাইকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। আমরা স্বাস্থ্য বিষয়টিকে জাতীয় পর্যায়ে ভাবতে অভ্যস্ত, কিন্তু ইরানি ও চীনাদের জন্য ভালো স্বাস্থ্যসেবার প্রদান  করাটা ইসরায়েলি ও আমেরিকানদেরও মহামারি থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে। এই সহজ সত্যটি সবার কাছে স্পষ্ট হওয়া উচিত। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনকভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে  গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষও বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান।  

একটি নেতৃত্বহীন বিশ্ব

আজ মানবতা শুধু করোনা ভাইরাসের নয়, মানুষে মানুষে আস্থার অভাবের কারণেও এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। একটি মহামারিকে পরাজিত করতে বিজ্ঞানীদের ওপর জনগণের আস্থা থাকতে হবে, নাগরিকের আস্থা থাকতে হবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ওপর এবং দেশগুলোর একে অন্যকে বিশ্বাস করতে হবে। গত কয়েক বছরে, দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিকরা জেনেশুনে বিজ্ঞানের ওপর, কর্তৃপক্ষের ওপর এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর আস্থা রাখার ব্যাপারটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। এর ফলে আমরা এখন এমন বৈশ্বিক নেতৃত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছি, যা একটি সমন্বিত বৈশ্বিক প্রণোদনাকে অনুপ্রাণিত, সংগঠিত এবং অর্থায়ন করতে পারত।

২০১৪ সালে ইবোলা মহামারির সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এরকম বৈশ্বিক নেতার ভূমিকা পালন করেছিল। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময়েও আমেরিকা একই রকম ভূমিকা পালন করে, যখন অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় অনেক দেশ একে অনুসরণ করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকা বিশ্ব নেতা হিসেবে ভূমিকা থেকে পদত্যাগ করেছে। বর্তমান মার্কিন প্রশাসন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় করা তাদের সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে ফেলেছে এবং বিশ্বের কাছে এটি স্পষ্ট করেছে, আমেরিকার আর কোনও প্রকৃত বন্ধু নেই। তাদের রয়েছে কেবল স্বার্থগত সম্পর্ক। যখন করোনা ভাইরাস সংকট শুরু হলো, তখন আমেরিকা এক কোনায় সরে দাঁড়াল এবং এখন পর্যন্ত তারা নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা নেওয়া থেকে বিরত রয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের ওপরে আস্থা এতটাই হ্রাস পেয়েছে যে এমনকি এটি  শেষমেশ নেতৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা করলেও খুব অল্প দেশই একে অনুসরণ করতে রাজি হবে।

নিজেরটা আগে, এমন একজনকে কি আপনি নেতা হিসেবে মানতে চাইবেন?  

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেখে যাওয়া শূন্যস্থানটি অন্য কারও দ্বারা পূরণ হয়নি। বরং এর বিপরীতটা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক কাঠামোর বৈশিষ্ট্যই এখন জাতিবিদ্বেষ, বিচ্ছিন্নতাবাদ। তবে আস্থা ও বৈশ্বিক সংহতি ছাড়া আমরা করোনা ভাইরাসের মহামারিকে ঠেকাতে পারব না এবং ভবিষ্যতেও আমরা এরকম আরও মহামারির মুখোমুখি হবো। তবে প্রত্যেক সংকটই একটি সুযোগও। আশা করা যায়, বর্তমান মহামারিটি মানবজাতিকে বুঝতে প্ররোচিত করবে যে, সবচেয়ে বড় বিপদ আসে বৈশ্বিক বিভেদের কারণে।

একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত হিসেবে ইউরোপের প্রসঙ্গ তুলে আনা যায়। সাম্প্রতিক করোনা মহামারি তাদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে একটি অপার সুযোগ হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকতর ভাগ্যবান সদস্যরা যদি দ্রুতগতিতে ও উদারতার সঙ্গে তাদের বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্য দেশগুলোর জন্য অর্থ, সরঞ্জাম ও চিকিৎসাকর্মী পাঠায় তাহলে এটি যেকোনও গালভরা বুলির চেয়ে ইউরোপীয় মূল্যবোধকে আরও ভালোভাবে প্রমাণিত করবে। অন্যদিকে যদি প্রতিটা দেশেরই নিজেদেরকেই ভাইরাসটি ঠেকানোর ব্যবস্থা করতে হয়, তাহলে এই মহামারিটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৃত্যুঘণ্টার শব্দের মতো শোনাবে।

এই সংকটকালীন মুহূর্তে, চূড়ান্ত লড়াইটা জারি রয়েছে মানবতার নিজের ভেতরেই। যদি এই মহামারিটির ফল হয় বৃহত্তর বিভেদ ও মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস, তাহলে এটি হবে ভাইরাসটির সবচেয়ে বড় বিজয়। যখন মানুষ নিজেদের মধ্যে সংঘাতে ব্যস্ত হয়ে উঠবে, তখন ভাইরাসটিও দ্বিগুণ হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, এই মহামারির ফল যদি হয় আরও জোরদার বৈশ্বিক সংহতি; তাহলে এটি কেবল করোনার বিরুদ্ধেই নয় বরং  এটি হবে ভবিষ্যতের সব রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে একটি বিজয়।   

  • লেখক ও অনুবাদক পরিচিতি: নোয়াহ হারারি একজন ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক। তিনি জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। স্যাপিয়েন্স, হোমো ডিউস ও টুয়েন্টি ফার্স্ট লেসনস ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি নামের তিনটি বেস্টসেলার বইয়ের লেখক। ‘ইন দ্য ব্যাটল এগেইনস্ট করোনা ভাইরাস, হিউম্যানিটি ল্যাকস লিডারশিফ’ শিরোনামে মার্কিন সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হারারির সাম্প্রতিক এই নিবন্ধের ভাষান্তর করেছেন মোকাররম রানা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র বিভাগে অধ্যয়নরত।
/বিএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ