প্রায় ৭৫ কোটি বই বিক্রি করার পরও বর্তমানের কোনও বইয়ের দোকানে বারবারা কার্টল্যান্ডের এক কপি বই খুঁজে পাওয়া যেন অসম্ভব ব্যাপার। উইলিয়াম শেক্সপিয়র এবং আগাথা ক্রিস্টির পরেই ইতিহাসের তৃতীয় সর্বাধিক বিক্রীত লেখক হওয়া সত্ত্বেও কেন যেন ব্রিটিশ রোমান্টিক কথাসাহিত্যের এই মহারথী আজ মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছেন।
তার সাহিত্যিক খ্যাতির চেয়ে মানুষ হয়তো তার গোলাপি রঙের প্রতি অদ্ভুত ঝোঁক, টুথব্রাশ দিয়ে জুতার পলিশ লাগিয়ে তৈরি করা ঘন ও কালো চোখের পাতা, বগলে সবসময় গুঁজে রাখা ছোট কুকুর ছানাটি কিংবা প্রতিদিন ৯০টি ভিটামিন বড়ি খাওয়ার অভ্যাসের কথা বেশি মনে রাখেছে। এছাড়া তিনি ছিলেন প্রিন্সেস ডায়ানার সৎ-দাদি, ডায়ানা কার্টল্যান্ডের বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসতেন।
ব্রিটিশ সুপারমার্কেটের যখন কার্টল্যান্ডের বই সচরাচর দেখা যেত, সেই সময়কার পাঠকরাও হয়তো এখন তার বইয়ের নামগুলো সহজে মনে করতে পারবেন না। নিজের জীবদ্দশায় অবাক করার মতো ৭২৩টি বই লিখেছেন কার্টল্যান্ড, যার বেশিরভাগই ছিল ঐতিহাসিক রোমান্স ঘরানার। এসব উপন্যাসে সরল ও নিষ্পাপ তরুণীদের কোনও ধনী ও প্রভাবশালী ডিউক, লর্ড বা ক্যাপ্টেনের মন জয় করার গল্প ফুটিয়ে তোলা হতো।
তবে মৃত্যুর আড়াই দশক পরেও তার লেখার চেয়ে সেই মানুষটিই মানুষের মনে বেশি দাগ কেটে আছেন। এর পেছনে বড় অবদান স্বয়ং কার্টল্যান্ডেরই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগ আসার অনেক আগেই তিনি নিজের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ে এক অনন্য মাস্টার হয়ে উঠেছিলেন। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তিনি নিজের এই ইমেজ তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করতেন। কোয়ারেন্টাইনের বিধিনিষেধের কারণে যখন তিনি আমেরিকার প্রচারণামূলক সফরে কুকুরগুলো সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেননি, তখন ইলিউশন বা ভ্রম নষ্ট না করতে তিনি বগলে একটি পুতুল কুকুর নিয়ে হাজির হয়েছিলেন।
চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত কার্টল্যান্ডের একটি নতুন জীবনী সম্ভবত স্বয়ং কার্টল্যান্ডকেই দারুণভাবে ক্ষুব্ধ করত। নিখুঁতভাবে পরিপাটি রাখা তার সেই রূপের আড়ালে গিয়ে বইটিতে তার অসাধারণ পেশাগত জীবন ও বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিগত জীবনকে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বইটির লেখক ম্যাথিউ সুইট বইটির নাম দিয়েছেন, দ্য গ্রেট ডিক্টেটর: আ লাইফ অব বারবারা কার্টল্যান্ড। নামটি এই কারণে কার্টল্যান্ড নিজে টাইপ করতেন না বরং আরামকেদারে শুয়ে কোনও সেক্রেটারির কাছে গল্প বলতেন আর তিনি তা লিখে নিতেন।
কার্টল্যান্ডের নাতনি তারা ম্যাককরকোডেল লেখক ম্যাথিউ সুইটকে ক্যামফিল্ড প্লেসে থাকা কার্টল্যান্ডের সংরক্ষণাগারে সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার দিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক পারিবারিক বাড়িতেই ১৯৫০-এর দশক থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বসবাস করতেন এই লেখিকা।
প্রায় পুরো বিশ শতক জুড়েই ছিল কার্টল্যান্ডের জীবনকাল। ১৯০১ সালে জন্ম নেওয়া এই লেখিকা দেখেছেন দুটি বিশ্বযুদ্ধ, ষাটের দশকের যৌন বিপ্লব, নারীমুক্তি আন্দোলন, যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং ইন্টারনেটের জন্ম। এমনকি ২০০ সালে মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে তিনি নিজের ওয়েবসাইটও চালু করেছিলেন।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়টি ঘটেছিল যখন তার বয়স মাত্র দুই বছর। সেসময় দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর তার পিতামহ আত্মহত্যা করেন। এই মৃত্যুর ফলে তাদের পারিবারিক সৌভাগ্য চিরতরে বদলে যায়। তার বাবা-মা বিশাল বাড়ি ছেড়ে তুলনামূলক সাধারণ ও সীমিত জীবনের দিকে পা বাড়ান। তার বাবা মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়লেও মা পলি সমাজের উঁচুতলায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেন। পরবর্তী সময়ে অল্প বয়সে বারবারাও পর্যাপ্ত অর্থবিত্ত না থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন অভিজাত সমাজে নিজের জায়গা করে নেন।
সংবাদপত্রের সমালোচক কলামিস্ট হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা কার্টল্যান্ড ১৯২৫ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘জিগস’ প্রকাশ করেন। এটি ছিল এক ফরাসি কনভেন্ট স্কুলের তরুণীর প্রেমের খোঁজে লন্ডনে আসার গল্প। পরবর্তীতে ১৯২৬ সালের তার একটি নাটক অতিরিক্ত রিরংসাত্মক হওয়ার অভিযোগে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এছাড়া ১৯৩৫ সালের ‘ফার্স্ট ক্লাস লেডি’ উপন্যাসে অবৈধ গর্ভপাতের বিষয়টি তুলে ধরায় তা আয়ারল্যান্ডে সেন্সরশিপের শিকার হয়। আর ১৯৩৬ সালের ‘ডেঞ্জারাস এক্সপেরিমেন্ট’ উপন্যাসে প্রথমবারের মতো নাৎসি ইহুদিবিদ্বেষের বিষয়টি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছিল।
১৯৬০, ৭০ ও ৮০-এর দশকের সস্তা মার্কেট পেপারব্যাকের স্বর্ণযুগে কার্টল্যান্ডের রমরমা অবস্থা শুরু হয়। প্রকাশকরা নতুন লেখার জন্য মুখিয়ে থাকতেন আর বারবারাও প্রতি ১৫ দিন পের একটি করে বই লিখতেন।
তার এই উপন্যাসের প্রধান পাঠক ছিলেন মূলত কর্মজীবী ও গৃহিণী নারীরা। তিনি একবার বলেছিলেন, যারা বাস্তব জীবনে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এবং চেতনানাশক ওষুধ খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, আমি তাদের কাছেই লাখ লাখ পেপারব্যাক বই বিক্রি করি। তারা রান্নাঘরে আলুর খোসা ছাড়ানোর দৃশ্য আর দেখতে চান না, তারা চান মুক্তি। আমি তাদের দিই গ্ল্যামার, সুন্দর পোশাক এবং কাঙ্ক্ষিত আকর্ষণীয় পুরুষদের সান্নিধ্য।
তবে সব পাঠক সাধারণ গৃহিণী ছিলেন না। একটি বিখ্যাত ছবিতে দেখা যায়, কিশোরী ডায়ানা স্পেন্সারও কার্টল্যান্ডের বই পড়ছেন। প্রিন্সেস ডায়ানা শুধু ভক্তই ছিলেন না, বারবারার মেয়ে রাইন ১৯৭৬ সালে ডায়ানার বাবা আর্ল স্পেন্সারকে বিয়ে করার সুবাদে এই লেখিকা তার সৎ-দাদিতে পরিণত হন।
কার্টল্যান্ডের সাফল্যের শিখর ছুঁয়ে যাওয়ার সময়টি ছিল দ্বিতীয় ঢেউয়ের নারীবাদের উত্থানকাল, যা কার্টল্যান্ড একেবারেই পছন্দ করতেন না। বিখ্যাত নারীবাদী জার্মেইন গ্রিয়ার তার দ্য ফেমেইল ইউনুচ বইয়ে কার্টল্যান্ডের কাজকে ‘বন্ধ্যত্বপূর্ণ আত্মপ্রবঞ্চনা’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
১৯৬০ সালে কার্টল্যান্ড রোমান্টিক নভেলিস্টস অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও সক্রিয় রয়েছে। বর্তমানে রোমান্স বা প্রেমের উপন্যাসের জনরাটি তরুণ পাঠকদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও বারবারার ৭৫ কোটি বই বিক্রি হওয়া সত্ত্বেও আজ কোনও বুকশপে তার বই খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন।
সমালোচকদের মতে, তার লেখালিখি ছিল মূলত সেই নির্দিষ্ট সময়ের চাহিদার ফসল, যা বর্তমান যুগের পাঠকদের রুচির সঙ্গে মেলে না। তবুও রোমান্টিক কথাসাহিত্যের দুনিয়ায় এবং ব্লকবাস্টার উপন্যাসের বাণিজ্যিক ধারা তৈরিতে বারবারা কার্টল্যান্ড সবসময় এক অমর ও অত্যন্ত প্রভাবশালী নাম হয়ে থাকবেন।
সূত্র: এনডিটিভি

ভারত মণ্ডপমের ভেতরে কী আছে?
শুধু বরফই নয়, ঠান্ডায় পানি জমে যেভাবে কাচও হতে পারে
নয়াদিল্লিতে আজ বসছে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন






