X
বুধবার, ১০ আগস্ট ২০২২
২৬ শ্রাবণ ১৪২৯

একদিনে কোটি টিকা: অব্যবস্থাপনায় লাখো মানুষের ভোগান্তি

জাকিয়া আহমেদ
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২১:১১আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২৩:২৫

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকা নিতে লাইনে দাঁড়ানো এক নারী। কোলে দেড় মাসের ঘুমন্ত সন্তান। এত ছোট শিশুকে নিয়ে এসেছেন কেন জানতে চাইলে বলেন, সাথে নিয়ে এসেছি কোলেরটাকে, বাড়িতে আরেকটাকে রেখে এসছি। আল্লাহই জানেন কখন টিকা নিয়ে বাড়ি যেতে পারবো।

ঢামেক হাসপাতালে টিকা নিতে দুপুর দুইটায় দীর্ঘ যে লাইন দেখা যায়, তার শুরু শহীদ মিনার থেকে। নারী-পুরুষের আলাদা দুই লাইন গিয়ে ঠেকেছে হাসপাতালের টিকাদান কেন্দ্রে।

ডেমরা থেকে আসা ৫৯ বছরের হালিমা খাতুনকে দেখা গেলো লাইনে দাঁড়িয়ে কলা খাচ্ছেন। জানালেন, সাড়ে ১১টার দিকে এসেছেন। এত মানুষ। কখন শেষ হবে ঠিক নেই।

সঙ্গে থাকা স্বামী মুজিবুর রহমান বললেন, আজ টিকার শেষ দিন। তাই স্ত্রীকে নিয়ে এলাম টিকা দিতে।

এতদিন টিকা নেননি কেন প্রশ্নে মুজিবুর বলেন, ‘মোবাইলে কী জানি করে (রেজিস্ট্রেশন) সেটা পারি নাই। আমিও এর আগে এমনি এক টিকা দেওয়ার দিনে (গণটিকা কার্যক্রম) দিয়েছিলাম। টিকার জন্য কাগজপত্র লাগবে না শুনে আর দেরি করি নাই।’

ঢামেক হাসপাতালের পাশেই শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউট। সেখানে দ্বিতীয় তলায় চলছে টিকাদান কার্যক্রম।

দ্বিতীয় তলায় প্রচণ্ড হট্টগোল। নিরাপত্তারক্ষীদের হুইসেল আর উপচেপড়া ভিড় চোখে পড়ে। সবাই চিৎকার-চেঁচামেচি করেই চলেছেন।

যশোর থেকে মোহাম্মদ সাগর এসেছেন তার চাচাকে নিয়ে। তার রেজিস্ট্রেশন কার্ডে ২২ জানুয়ারির তারিখ রয়েছে প্রথম ডোজ হিসেবে। কিন্তু এখনও এসএমএস পাননি। প্রথম ডোজ দেওয়া আর হবে না শুনে গতকাল রাতে ঢাকায় এসেছেন টিকা নিতে। কিন্তু এসএমএস ছাড়া তাকে টিকা দিতে যেতে রাজী নন নিরাপত্তারক্ষীরা।

পাশে তখন চলছে উঁচু গলায় বচসা। দুপুর ১টায় এই কেন্দ্রে টিকা শেষ হয়। যারা পরে এসেছেন, তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। যারা নিতে এসেছেন তাদের কথা হচ্ছে, আগে বলা হয়েছে টিকা কার্যক্রম চলবে। ১টা বা ২টার ভেতর কেন্দ্রে পৌঁছাতে হবে এমনটা বলা হয়নি।

একদিনে কোটি টিকা: অব্যবস্থাপনায় লাখো মানুষের ভোগান্তি

টিকার কার্ড নিয়ে সেখানে দাঁড়ানো অসংখ্য মানুষকে নিরাপত্তারক্ষীরা চলে যেতে বলার পরও তারা যেতে রাজী নন। অবশেষে কেন্দ্রের ফোকাল পারসন ডা. আশরাফুল হক এসে বুঝিয়ে বলেন। অপেক্ষমানদের আগামীকাল আসতে বলেন তিনি। কিন্তু সবার এক কথা, আজই টিকার শেষ দিন।

ডা. আশরাফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গতকাল শুক্রবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) টিকাদান কেন্দ্র খোলা রাখা হলো। কিন্তু প্রচারণা ছিল না। আগে থেকে বিষয়টি জানানো হলে মানুষেরও প্রস্তুতি থাকতো। বৃহস্পতিবার জরুরি ভিত্তিতে নোটিশ এসেছে। সে হিসেবে সবগুলো কেন্দ্রই খোলা রাখা হলো। অনেকে জানতেই পারেনি যে শুক্রবার টিকা নেওয়া যাবে। কিন্তু ২৬ ফেব্রুয়ারি এক কোটি টিকা দেওয়া হবে- এ মাইকিংই চলেছে। মানুষ এ কারণে ২৬ ফেব্রুয়ারির প্রস্তুতিই নিয়েছিল। শুক্রবার মাত্র সাড়ে তিনশ’ টিকা দেওয়া হয়েছিল। যেখানে প্রতিদিন আড়াই-তিন হাজার টিকা দেওয়া হয়।

ডা. আশরাফুল হক বলেন, কেন্দ্র খোলা থাকায় যারা এ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন তাদের জন্য যে বরাদ্দ ছিল সেটাও দিতে হয়েছে সরকারকে। এখানে অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতিও হলো।

প্রসঙ্গত, এক কোটি ডোজ করোনার টিকা দেওয়ার বিশেষ ক্যাম্পেইনে শনিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই প্রতিটি কেন্দ্রে দেখা গেছে উপচেপড়া ভিড়। নিবন্ধন বা জন্মসনদের বাধ্যবাধকতা না থাকায় মানুষ ভিড় করেছেন কেন্দ্রগুলোতে।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম ২৬ ফেব্রুয়ারি ‘বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন’ পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছিলেন।

এ দিন শুধু মোবাইল নম্বর দিয়েই টিকা নেওয়া যাবে এবং প্রথম ডোজ আর দেওয়া হবে না- স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমন প্রচারণায় ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি টিকাকেন্দ্রে নেমেছিল মানুষের ঢল।

সকালেই রাজধানীর শ্যামলীর ২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতালে টিকাপ্রত্যাশীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে বলে জানান হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আখতার।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, সকাল ৭টার আগেই মানুষ আসতে শুরু করেছে। সকাল সাড়ে ১০টার ভেতরেই এসেছে তিন হাজার মানুষ। ভিড় সামলাতে হাসপাতালের নিরাপত্তারক্ষীদের পাশাপাশি অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করতে হয়েছে।

ডা. আয়েশা আখতার বলেন, হাসপাতালের সক্ষমতা দুই হাজারের মতো হলেও আজ দেওয়া হয়েছে পাঁচ হাজার টিকা।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, গণটিকা কার্যক্রম আরও দুদিন বাড়ানো হয়েছে। অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘এখনও প্রচুর ভিড় বিভিন্ন কেন্দ্রে। সে কারণে আমরা ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টিকাদানের সময় বাড়িয়েছি। আমরা কখনও বলিনি, করোনাভাইরাসের প্রথম ডোজ দেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। আমরা বলেছি, ২৬ তারিখের মধ্যে সবাইকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা হবে। এরমধ্যে যৌক্তিক কারণে কেউ যদি প্রথম ডোজ নিতে না পারেন, তারা আমাদের স্থায়ী কেন্দ্রগুলো থেকে টিকা নিতে পারবেন।’

একদিনে কোটি টিকা দেওয়ার ভোগান্তি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরাও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, অহেতুক একটি প্রচেষ্টায় মানুষ হয়রানির শিকার হলো।

চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটিজ (এফডিএসআর)-এর মহাসচিব ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এক সপ্তাহের ঘোষণা দিতে পারতো। একদিনে দিতে যেয়ে এত হয়রানি। সায়েন্টিফিক ওয়েতে না ভেবে অবিবেচনাপ্রসূত কার্যক্রম। সক্ষমতা যাচাই না করে চটকদার কথা বলে মানুষদের কি হয়রানিই না করা হলো।’

/এফএ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রুশ পর্যটকদের নিষিদ্ধ করুন, পশ্চিমাদের জেলেনস্কি
রুশ পর্যটকদের নিষিদ্ধ করুন, পশ্চিমাদের জেলেনস্কি
কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরলেন যুবক
কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরলেন যুবক
নারী উদ্যোক্তাকে হত্যার অভিযোগে স্বামী ও শিক্ষিকা গ্রেফতার
নারী উদ্যোক্তাকে হত্যার অভিযোগে স্বামী ও শিক্ষিকা গ্রেফতার
নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আবু তাল্লাহর খোঁজে আসাম পুলিশ
নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আবু তাল্লাহর খোঁজে আসাম পুলিশ
এ বিভাগের সর্বশেষ
দ্রুত টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার অনুরোধ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
দ্রুত টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার অনুরোধ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
১১ আগস্ট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে শিশুদের করোনা টিকা
১১ আগস্ট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে শিশুদের করোনা টিকা
রাজধানী থেকে শুরু হবে শিশুদের টিকা কার্যক্রম
রাজধানী থেকে শুরু হবে শিশুদের টিকা কার্যক্রম
৫ থেকে ১১ বছরের শিক্ষার্থীদের করোনার টিকা দেওয়া হবে
৫ থেকে ১১ বছরের শিক্ষার্থীদের করোনার টিকা দেওয়া হবে
নভেম্বরে বন্ধ হতে পারে টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ
নভেম্বরে বন্ধ হতে পারে টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ