‘নীরব মহামারি’ মানসিক স্বাস্থ্যের প্রকৃত চিত্র কেউ জানে না

সাদ্দিফ অভি
১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০০ আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০০

দেশে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, কিন্তু সামগ্রিক চিত্র এখনও অজানাই থেকে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে। দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রথম জরিপ হয়েছিল ২০০৩-২০০৫ সালে। যেখানে বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের হার প্রায় ১৬ শতাংশ। এর ১৫ বছর পর দ্বিতীয় জরিপ হয়, সেখানে বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শিশুদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে নির্ণয়যোগ্য মানসিক রোগ আছে। এরপর করোনা মহামারি, যুদ্ধের কারণে মন্দা এবং ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পরও সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝতে আর কোনও সমীক্ষা করা হয়নি।  

২০১৮ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ কোনও না কোনও মানসিক রোগে ভুগছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও’র হিসাবে এই সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি মানুষ, যাদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রয়োজন। শিশু ও কিশোরদের মধ্যে আক্রান্তের হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। 

পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ চিকিৎসা না পাওয়ার ক্ষেত্রে। জরিপ বলছে, আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনও সেবাই নেন না। গত জুলাই মাসে সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. শাখাওয়াত হোসেন বকুল নিজেও স্বীকার করেছেন, ৯২ শতাংশের বেশি রোগী চিকিৎসার বাইরে থাকেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, জনবল সংকট। ডব্লিউএইচও মানসিক স্বাস্থ্য অ্যাটলাস ২০২৩ অনুযায়ী প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন মাত্র শূন্য দশমিক ০৭৩ জন এবং মনোবিজ্ঞানী আছেন শূন্য দশমিক ১২ জন। মোট মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী ১ দশমিক ১৭ জন প্রতি এক লাখে।

দ্বিতীয়ত, বাজেট। স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ বরাদ্দ থাকে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে।  

তৃতীয়ত, গত পাঁচ বছরে এ নিয়ে কোনও নতুন জাতীয় জরিপ বা গবেষণা হয়নি, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছে ডব্লিউএইচও।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র সহায়তায় ২০২৫ সালে ২০ হাজারের বেশি মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ সেবা দেওয়া হয়েছে এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণের কাজ চলছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ মানসিক রোগে ভুগলেও তাদের ৯২ শতাংশের বেশি কোনও চিকিৎসাসেবা পান না। এমনকি দেশের প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন মাত্র ১ দশমিক ১৭ জন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী অক্ষমতাজনিত রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মানসিক রোগ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যা বর্তমানে মানুষের অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। যদিও মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে হৃদরোগ ও ক্যানসার এখনও শীর্ষে অবস্থান করছে। তবে মানুষের দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মানসিক ব্যাধিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টের সদস্যসচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও চাহিদার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। আমাদের বড় সমস্যা হলো সচেতনতার অভাব। আমরা শরীরকে গুরুত্ব দিই, মনকে দিই না। অনেকেই মনে করেন মন বলে কিছু নেই, মানসিক অসুখ মানেই পাগল হয়ে যাওয়া। এই ভুল ধারণার কারণে মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে না।’ 

তিনি বলেন, ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ অনুযায়ী দেশে তিন কোটির বেশি মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের মধ্যে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ আক্রান্ত। অথচ বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসক আছেন মাত্র আড়াইশ থেকে চারশ জনের মতো। এর ফলে তৈরি হয়েছে বড় ট্রিটমেন্ট গ্যাপ। ১০০ জন অসুস্থ হলে মাত্র ৮ জন সেবা নিতে আসছেন, ৯২ জনই সেবার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। কেউ অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন, কেউ অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।’ 

তার মতে, এর কারণ চারটি। প্রথমত, জনসচেতনতার অভাব। দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনবলের সংকট, শুধু সাইকিয়াট্রিস্ট নয়, সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিক নার্স, সোশ্যাল ওয়ার্কার নিয়ে যে টিমওয়ার্ক দরকার, সেই টিম নেই। তৃতীয়ত, অবকাঠামোগত ত্রুটি, সেবা এখনও ঢাকা ও বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছায়নি। চতুর্থত, বাজেট স্বল্পতা, স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ।

তিনি বলেন, ‘সরকার এখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করছে এবং সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য কর্নার রাখার চিন্তা করছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। তবে সার্বিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সব মিলিয়ে এই সার্ভেটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং খুব জরুরি একটা বিষয় এবং যত তাড়াতাড়ি পারি আমরা সার্ভে কর্মকাণ্ড শুরু করবো। ১৭ বছর একটা সরকার ছিল। এই দু’বছর হলো মাত্র, ২০২৪ সালের আগস্টে যে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তন আসলো সেখান থেকে অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আমাদের এগুতে হচ্ছে।’ 

/এসও/এসটি/ 
সম্পর্কিত
বাড়ছে শিশুদের মানসিক ট্রমা, করণীয় কী?
চারপাশে অনেক মানুষ, তবু নিজেকে কেন একা লাগে
পেশাগত মানসিক চাপ: আড়ালে থেকে যায় যে লড়াই
সর্বশেষ খবর
এমপি মুজিবুর রহমানকে দেখতে হাসপাতালে জামায়াত সেক্রেটারি 
এমপি মুজিবুর রহমানকে দেখতে হাসপাতালে জামায়াত সেক্রেটারি 
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দিরে মন্দিরে চলছে দেবী বন্দনা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দিরে মন্দিরে চলছে দেবী বন্দনা
ফোরকান হত্যা মামলায় গ্রেফতার যুবলীগের সাবেক সভাপতি
ফোরকান হত্যা মামলায় গ্রেফতার যুবলীগের সাবেক সভাপতি
মেশিনের যুগেও টিকে আছে হাতের তৈরি শাড়ি, চাহিদা আছে বিদেশেও
মেশিনের যুগেও টিকে আছে হাতের তৈরি শাড়ি, চাহিদা আছে বিদেশেও
সর্বাধিক পঠিত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
এ যেন অন্য এক মিরপুর-১০, প্রশংসায় ভাসছে সরকার
এ যেন অন্য এক মিরপুর-১০, প্রশংসায় ভাসছে সরকার
শাবনূরের অনুরোধে সিডনির রাস্তায় গান গাইলেন রবি চৌধুরী
শাবনূরের অনুরোধে সিডনির রাস্তায় গান গাইলেন রবি চৌধুরী
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক  
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক