দেশে করোনার ঢেউ এসেছে বেশ কয়েকবার। আর তা নিয়ন্ত্রণে বিস্তর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্ত এসেছে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পর এবং তা বাস্তবায়নে লেগেছে আরও সময়। যার ফলাফল ব্যাপক আকারে সংক্রমণ বেড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন–সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল সময়োপযোগী, তবে বাস্তবায়নে লেগেছে কিছুটা সময়। অল্প রোগী থাকতেই দ্রুত রেসপন্স করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা।
বিশ্বের এমন কয়েকটি দেশ আছে যারা একজন করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আকারে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেয়। নিউজিল্যান্ড তার মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীতে যখন করোনার নতুন কোন ভ্যারিয়েন্টের উত্থান ঘটে তখন সব দেশই প্রযুক্তির কল্যাণে তা জানতে পারে। তবে ভ্যারিয়েন্ট দেশে প্রবেশ ঠেকানোর জন্য অনেক দেশ ফ্লাইট বন্ধ করে দিলেও বাংলাদেশ এমন কোনও সিদ্ধান্ত কখনও নেয়নি। শুধু ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের তাণ্ডবের সময় ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
গত বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণের হার কমতে শুরু করলেও আবার মার্চ থেকে বাড়তে শুরু করে শনাক্তের হার। সরকার সংক্রমণ ঠেকাতে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করে ২৯ মার্চ। সেদিন করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয় ৫ হাজার ১৮১ জন। এপ্রিলে সংক্রমণ সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়। ৭ এপ্রিল একদিনে সর্বাধিক ৭ হাজার ৬২৬ জন শনাক্ত হয় যা তার আগে কখনও পাওয়া যায়নি। এপ্রিল মাসে একদিনে সর্বোচ্চ ১১২ জন মৃত্যুবরণ করে যা তখন রেকর্ড ছিল। এরমধ্যে ৭ এপ্রিল রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) দেশে সাউথ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের কথা জানায়। শনাক্ত ও মৃত্যু বাড়তে থাকায় পাঁচ এপ্রিল থেকে মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এ বিধিনিষেধের ফলাফলে সংক্রমণ পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঈদুল ফিতরে বিধিনিষেধ শিথিল করে দেওয়া হয়। তখন ভারতে করোনার নতুন স্ট্রেইন ‘ডেল্টা’ পাওয়া যায়।
ডেল্টা’র এই ভ্যারিয়েন্ট দেশে ধরা পড়ে ৮ মে। তার আগেই দেশে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করে ঈদের জন্য শপিং মল খুলে দেওয়া হয়। তবে গণপরিবহন এবং দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ থাকার পরও মানুষ ভিড় করে গ্রামে গেছে। ফিরেছে ওই একইভাবে বিধিনিষেধের মধ্যেই। ঈদযাত্রার কারণে দেশের সাত সীমান্তবর্তী জেলায় বেড়ে যায় সংক্রমণ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে শুরু করে পরে ঢাকাসহ সারাদেশে শুরু হয় ডেল্টার তাণ্ডব। শনাক্ত ছাড়িয়ে যায় ১৬ হাজার আর মৃত্যু আড়াই শ ছাড়িয়ে যায় একদিনে।
করোনা নিয়ন্ত্রণে গোঁজামিল অবস্থার প্রেক্ষিতে জাতীয় পরামর্শক কমিটি তখন দেশে মহামারিকালে প্রথম শাটডাউন দেওয়ার সুপারিশ করে।
পরামর্শক কমিটি বলেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণে সারাদেশেই উচ্চ সংক্রমণ এবং ৫০টিরও বেশি জেলায় অতি উচ্চ সংক্রমণ লক্ষ করা যায়। কিন্তু করোনাভাইরাস প্রতিরোধের জন্য খণ্ড খণ্ডভাবে নেওয়া কর্মসূচির উপযোগিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দেশে করোনাভাইরাসের বিশেষ করে ডেলটা প্রজাতির সামাজিক সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছে এবং ইতোমধ্যেই রোগের প্রকোপ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের জীবাণুর সংক্রমণ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা তখন বলেছেন, গত বছর করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে তা নিয়ন্ত্রণে কোনও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা এবং ভুল পদক্ষেপের কারণে দেশে মহামারি প্রকট আকার ধারণ করেছে। তারা বলছেন, একের পর এক যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেগুলোর অনেকটাই বিজ্ঞানভিত্তিক ছিল না। সেই সঙ্গে রয়েছে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে অনীহা।
‘করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রথম থেকেই ভুল পথে হেঁটেছে। তবে সেটা ভুল করে নয়। সিদ্ধান্ত নিয়েই ভুল পথে হেঁটেছে’ তখন এ মন্তব্য করেন জনস্বাস্থ্যবিদ চিন্ময় দাস।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে নজির আহমেদ তখন বলেন, ‘ভারত থেকে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট দেশে আসবে, এটা ধরেই নেওয়া দরকার ছিল। সেই সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জে যখন সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে তখন সেটা ছড়াতেও ১৪ দিন সময় নিয়েছে। এরপর সেটা বাড়তে শুরু করে। কিন্তু তখন যদি যাতায়াত সীমিত, রোগী শনাক্ত করে আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন, হাসপাতাল উন্নত করার ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে সেটা রাজশাহীতে আসতো না। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার ছিল, কিন্তু সেটা করা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘সংক্রমণ প্রতিরোধে যে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল, সেটা নিতে ব্যর্থতার কারণেই সীমান্তবর্তী এলাকাতে এটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে এবং এখন সেটা সীমান্তবর্তী জেলার সীমানা ছাড়িয়ে পুরো দেশেই ছড়িয়েছে। কেবল ব্যবস্থাপনার অভাবে পুরো দেশের ৪১ জেলায় সংক্রমণের হার এখন ১০ শতাংশের বেশি।’
তবে আইইডিসিআর’র প্রধান উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন মনে করেন, চীন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো যেখানে রোগী পাওয়া গেছে তার চারপাশে বেষ্টনী দিয়ে একটা শহর পুরো বন্ধ করে দেয়, সেরকম করার সক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদের মানুষকে আটকানো, তাদের খাওয়া, লেখাপড়া ঠিক রাখতে যদি আমরা পারতাম, তাহলে হয়তো আমাদের গোটা দেশ বন্ধ করতে হতো না। অধিকাংশ দেশকেই পুরোপুরি চলাফেরা বন্ধ করতে হয়েছে। এক-দুইজন রোগী পেলেও তো সব বন্ধ করে দেওয়া যায় না। ভ্যারিয়েন্ট যখন প্রথম শনাক্ত হয় অন্যদেশে তখন তো আমরা সঙ্গে সঙ্গে খবর পাই। কাজেই রেসপন্স সময়মত হয়েছে। সরকারি পদক্ষেপ প্রতিপালনে কোন কোন ক্ষেত্রে হয়তো আমাদের সমস্যা হয়েছে। যার কারণে পুরোপুরি লকডাউন দিতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সফলতার জন্য আমাদের যে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের জীবনযাত্রাকে সহায়তা করা, অর্থনীতি—এগুলো কিন্তু স্বাস্থ্যের পুরো বাইরে। সেগুলো ঠিক থাকলে হয়তো আমরা আরও সফল হতাম। এখন আমরা মাঝামাঝি অবস্থায় আছি বৈশ্বিক বিবেচনায়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য ড. আবু জামিল ফয়সাল মনে করেন, আমাদেরকে সবসময় অল্পতে সতর্ক হয়ে সবজায়গায় প্রতিরোধের ব্যবস্থাকে জোরদার করতে হবে। যখনই অল্প কিছু রোগী দেখা যাবে তখনই আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।








