মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সড়ক-সেতু-ইউনিয়ন, জানেন না অনেকে

সালেহ টিটু, বরিশাল
২০ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:০০ আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ১৬:৩১

বরিশালে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সড়ক, সেতু এবং ইউনিয়নের নামকরণ করা হলেও অনেকে জানেন না। আগের নামেই ডাকছেন। অনেকে জানেন না নামকরণের ইতিহাস। পুরাতন নামেই সড়ক, সেতু ও ইউনিয়নের পরিচয় তুলে ধরছেন। অথচ এসব সড়ক ও সেতুর নামকরণের জন্য করতে হয়েছে আন্দোলন-সংগ্রাম। তবে ব্যতিক্রম হলো বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর পাড়ঘেঁষে গড়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধা পার্ক। এটি শুরু থেকেই মুক্তিযোদ্ধা পার্ক বলে ডাকেন সবাই। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের বাবুগঞ্জ উপজেলার সুগন্ধা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি ২০০৩ সালের ৮ এপ্রিল যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বাবুগঞ্জের আগরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নামে সেতুর নামকরণ করা হয়। এ জন্য সেতুর বাবুগঞ্জ প্রান্তে সড়কের পাশে বড় করে নির্মাণ করা হয় মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের স্মৃতিস্মারক। কিন্তু ওই স্মৃতিস্মারকও বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর সেতুর নামটি স্থানীয়দের মনে করিয়ে দিতে পারছে না। 

উদ্বোধনের ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও দোয়ারিকা সেতু বলে ডাকেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই এলাকার বাসিন্দা হাসমত আলী, জহির উদ্দিন ও আব্দুর রহিম জানান, বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর সেতু বললে কেউ চেনেন না। এ জন্য সবাই দোয়ারিকা সেতু বলেই ডাকেন। নতুন নামের ইতিহাসও অনেকে জানেন না। তবে কাগজে-কলমে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু নাম ব্যবহার করা হয়। 

মো. রফিক ও জাকির হোসেনসহ কয়েকজন পরিবহন চালক জানান, কেউ নতুন নাম ব্যবহার করেন না। আগের নামেই ডাকেন। যাত্রীরা দোয়ারিকা সেতু বললে আমরা সেখানে নিয়ে যাই।

ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু থেকে এক কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার সন্ধ্যা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটির নামকরণ করা হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের নবম সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর এমএ জলিলের নামে। ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে সেতু উদ্বোধন করে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। 

কিন্তু এমএ জলিল সেতু না বলে স্থানীয়রা আগের নামেই ডাকছেন। মেজর এমএ জলিলের নাম ব্যবহার না করে শিকারপুর সেতু বলেই ডাকেন সবাই। এই সেুতর নামকরণের সঙ্গে উজিরপুর প্রান্তে নির্মাণ করা হয় মেজর এমএ জলিলের স্মৃতিস্মারক। তাও মানুষের মাঝে প্রভাব ফেলতে পারেনি।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ​পাঠাগার ও জাদুঘর

শিকারপুরের বাসিন্দা জালিস মাহামুদসহ একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই দুই সেতু এলাকায় বছরের পর বছর ধরে ফেরি চলছিল। এ জন্য দোয়ারিকা ও শিকারপুর ফেরিঘাট বলে ডাকা হতো। সেতু দুটির নতুন নামকরণ হলেও এখনও সবাই দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতু বলেই ডাকেন এবং চেনেন। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কিংবা মেজর এমএ জলিল সেতু বললে কেউ চিনতে পারেন না। এ জন্য সবাই আগের নামেই ডাকেন।

উজিরউপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার অদুদ সরদার ও বাবুগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আনিসুর রহমান শিকদার জানিয়েছেন, সেতু নির্মাণের কাজ শুরুর পর থেকে আমাদের দাবি ছিল, মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও মেজর এমএ জলিলের নামে সেতু দুটির নামকরণ করা হোক। এ নিয়ে ওই সময় আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সেতু দুটির নামকরণ করা হয় দুই বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে। কিন্তু মানুষ আগের নামেই ডাকে। এটি মানুষের অসচেতনতা। জোর করে তো কারও মনে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আবেগ-ভালোবাসা ঢুকিয়ে দেওয়া যায় না। এটি ভেতর থেকে আসতে হয়।

এদিকে, বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুর ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করে শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নামে নামকরণ করা হয়। ইউনিয়নের নাম দেওয়া হয় জাহাঙ্গীরনগর। কিন্তু এখনও স্থানীয়রা আগরপুর ইউনিয়ন বলেই সম্বোধন করেন। তবে কাগজে-কলমে জাহাঙ্গীরনগর নাম ব্যবহার হয়।

জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের রহিমগঞ্জ গ্রামে শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বাড়ি। সেখানে তার নামে গড়ে তোলা হয়েছে একটি পাঠাগার ও জাদুঘর। যেখানে জাহাঙ্গীরের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশ স্বাধীনের ওপর বহু বই রয়েছে পাঠাগারে। সরকারি অর্থায়নে পাঠাগারটি নির্মিত হয়েছে। এটিকে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বাড়ি বলে ডাকেন স্থানীয়রা। 

বরিশাল নগরীর বটতলা মোড় থেকে চৌমাথা মোড় পর্যন্ত পুরাতন নবগ্রাম রোডকে ওয়ান-ইলেভেনের সময় এমএ জলিল নামে নামকরণ করা হয়। নামকরণ করে সেখানে একটি সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সড়ক প্রশস্তকরণের কারণে সাইনবোর্ড এখন নেই। এমনকি এমএ জলিল রোডের নামের কথা কেউ মনে করতে পারছেন না। সবার মুখে নবগ্রাম রোড।

নগরীর কীর্তনখোলা নদীর পাড়ের মুক্তিযোদ্ধা পার্ক

একইভাবে নগরীর সদর রোডসহ বেশ কয়েকটি সড়ক কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার নামে নামকরণ করা হলেও ওই নাম কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। সবাই পুরাতন নাম ব্যবহার করছেন। বিভিন্ন সময় এ নিয়ে সচেতনতামূলত সভা হলেও কোনও কাজে আসেনি।

নগরীর কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে নির্মিত হয় মুক্তিযোদ্ধা পার্ক। পার্কটি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুরু থেকে এটি মুক্তিযোদ্ধা পার্ক হিসেবে পরিচিত পাওয়ায় সবাই মুক্তিযোদ্ধা পার্ক হিসেবেই ডাকেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল জেলার সদস্য সচিব রফিকুল আলম এবং সবুজ আন্দোলনের সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, মানুষ অতীতকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়। পুরাতন নামগুলো মানুষের মুখে মুখে থাকে বছরের পর বছর। এ জন্য নতুনকে গ্রহণ করতে সময় লাগছে। এটি অসচেতনতা। তবে প্রচার-প্রচারণা এবং সভা-সেমিনারের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সচেতনতার মধ্য দিয়ে নতুন নামগুলোতে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। এই কাজে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারা।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার এনায়েত হোসেন চৌধুরী বলেন, বরিশালে গেজেটভুক্ত প্রায় সাড়ে সাত হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ মৃত্যুবরণ করেছেন। বাকিরা জীবিত।

মুক্তিযোদ্ধাদের নামের ব্যবহার না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এ জন্য জনসচেতনতামূলক-সভা ও লিফলেট বিতরণ করতে হবে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে এসব নামকরণ করা হয়েছে, তা সবাইকে বোঝাতে হবে। এসব নামে ডাকার আহ্বান জানাতে হবে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে এসেও আমরা যদি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের গুরুত্ব না বুঝি কিংবা অবহেলা করি তাহলে এটি আমাদের জন্য লজ্জার। এ নিয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

/এএম/
সম্পর্কিত
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল প্রকৃত জনযুদ্ধ: স্পিকার
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয়ে ভাঙচুর, চেয়ার-টেবিল-আসবাব-আলমারি লুট
৪৫ বছর পর স্বীকৃতি, বীরাঙ্গনা ফুলমতির শেষ বিদায় লাল-সবুজের পতাকায়
সর্বশেষ খবর
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
কারফিউয়ে শান্ত ফরাসি শহর, পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
কারফিউয়ে শান্ত ফরাসি শহর, পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির