X
মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
১২ আশ্বিন ১৪২৯

রাজাকার নাকি মুক্তিযোদ্ধা, কী তার পরিচয়?

সাহেবুল ইসলাম পিপুল, (ভাঙ্গুরা), পাবনা
২৭ এপ্রিল ২০২১, ২১:৩৩আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২১, ১৬:৫৭

মুক্তিযুদ্ধের ক্যানভাসটা বিশাল। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধারও আছে আলাদা আলাদা নিজস্ব গল্প। সবার প্রয়োজন, ইচ্ছা কিংবা লড়াইটা এক রকম ছিল না। কেউ যুদ্ধে গেছেন জেদে, কেউ সব হারিয়ে, কেউবা তারুণ্যের শক্তি ও সাহসকে পুঁজি করে। তবে যুদ্ধের শুরুতেই অস্ত্র সংগ্রহের কৌশলে জেনে বুঝে শুরুতে নিকৃষ্ট রাজাকার আর অস্ত্র পেয়েই মুক্তিযোদ্ধার কাতারে নাম লেখানো মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কম। এদের দুই জায়গাতেই নিজেকে বিশ্বাস করাতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। তেমনই একজন যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করছেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে। তার নাম মোবারক হোসেন মবা।

তার গল্পের শুরুটা এভাবেই,‘আমি মোবারক হোসেন মবা। বর্তমানে আমার বয়স সাতাত্তর বছর। এক সময় শক্তিশালী যুবক ছিলাম। খেটে খাওয়া মানুষ আমি। দেশ মাতৃকার টানে ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তত করে ফিরে আসি দেশে। সবাই আমাকে সাহসী বলতো। নিজেই নিজেকে নিয়ে বাজি ধরলাম। গ্রামের প্রবীণ কয়েজনের সঙ্গে আলোচনা করে কৌশলে রাজাকার হিসেবে যোগ দিলাম পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে। খুব সাবধানে দুই সপ্তাহ ধরে সুযোগ খুঁজতে থাকি। এর মধ্যেই নিজের সঙ্গে জুটিয়ে নিলাম আরও দুই জনকে। ১৫ দিনের মাথায় পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে ৩টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও ২০ বাক্স গুলি পেয়েছিলাম। সেগুলোসহ পালিয়ে গেলাম। যোগ দিলাম সিরাজগঞ্জের ‘পলাশডাঙ্গা যুব শিবির’-এ। সেখান থেকেই মোট তিনটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম।’

এবার তার যুদ্ধে অংশ নেওয়ার গল্প। ‘একদিন সিরাজগঞ্জের নওগাঁ এলাকায় মুখোমুখি যুদ্ধে গিয়ে দেখি সব হিসেব গোলমাল। পাকিস্তানি বাহিনী ৪৫টি নৌকায় প্রায় ৩শ’ সৈনিক নিয়ে নওগাঁ এলাকা আক্রমন করেছে। আমরাও সর্বশক্তি দিয়ে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আমাদের প্রচণ্ড আক্রমণ ও রাস্তা-ঘাট না চেনায় পিছু হটে ফিরে যায় পাক বাহিনী। পরের দিন আরও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নওগাঁয় আবারও আক্রমণ চালাতে আসে।

‘আমরা পাল্টা জবাব দিতে থাকি। তবে ওদের প্রস্তুতি ছিল বেশি, অস্ত্র গোলা-বারুদও ছিল বেশি। জবাব দিতে দিতে এক সময় আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে আসে। বাধ্য হয়ে আমরাই পিছু হটি। ঐ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বুলেট এসে লাগে আমার গায়ে। গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যাই আমিসহ বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা। সেখান থেকে পালিয়ে আমরা প্রায় ২০ কি.মি  দূরে খান মরিচ ইউনিয়নের পরমানন্দপুর গ্রামে গিয়ে পৌঁছাই। টানা দুই দিনের যুদ্ধ আর না খাওয়া থাকায় ক্লান্ত-বিধ্বস্ত ছিলাম আমরা। আমাদের আশ্রয় দেন হদু হাজী নামে এক ব্যক্তি। পরে জানতে পারি আমরা যুদ্ধস্থল থেকে চলে আসার পরে পুরো নওগাঁ গ্রাম আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী।’

সেখান থেকে পলাশ ডাঙ্গা যুব শিবিরে ফিরে গেলে আমার সাহসিকতার কারণে প্রখ্যাত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও পরে সংসদ সদস্য (প্রয়াত) আব্দুল লতিফ মির্জা আমাকে বুকে টেনে নেন। যুদ্ধ শেষে আমাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি সনদও দিয়েছিলেন তিনি।

স্বাধীন দেশে শুরু হয় আমার জীবন যুদ্ধ। দেশের যুদ্ধে জিতলেও হেরে গেছি জীবনের যুদ্ধে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ভাঙাচোরা একটা ঘর-বাড়িই ছিল আমার সম্বল। সেখানে বসবাসের মধ্যে অযত্ন অবহেলায় হারিয়ে ফেলেছি যুদ্ধ শেষে পাওয়া আমার স্বীকৃতি সনদ। যদিও কখনো ভাবিনি জীবন চালাতে খুব বেশি প্রয়োজনও হবে এই সনদের। তা না হলে দেশকে টেকাতে পেরেছি, আমি আমার সনদটিও রাখতে পারতাম। শক্ত সমর্থ থাকায় আমি দিনমজুরির কাজ করে এগিয়ে নিচ্ছিলাম স্ত্রী কন্যার সংসার।

তিনি বলেন, ‘আশির দশকে হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় এলোমেলো হয়ে যায় আমার জীবন। পঙ্গুত্ব বরণ করে আমি হয়ে যাই অসহায়। নিজের কোনও সম্পদ না থাকায় একদিনে পথে বসতে হয় আমাকে। জীবন বাঁচাতে শুরু করি ভিক্ষা। এখনও ভিক্ষা করেই চলি। আমার রক্তে কেনা মাটিতে ভিক্ষা করতে খুব কষ্ট হয়। ভিক্ষা করেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। এখন কানে শুনি না, চোখে দেখি না, হাঁটতেও পারি না ঠিক মতো। স্ত্রীকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি। একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড আছে আমার।’

এই বৃদ্ধ বলেন, অনেককে শুনিয়েছি আমার এই জীবনের গল্প। কিন্তু কেন আপনারা মাঝে মাঝে আমার গল্প শুনতে আসেন জানি না। তবে যুদ্ধের ঘটনা বলতে আমার ভালোই লাগে। শরীরে শক্তি পাই। যদিও অনেককে এই গল্প বলার পরেও আমার মুক্তিযোদ্ধার সনদ আর তৈরির ব্যবস্থা করতে পারি নাই। আমি রাজাকার দলে যোগ দিয়েছিলাম অস্ত্র সংগ্রহ করার জন্য। সেই অস্ত্র নিয়েই মুক্তিযোদ্ধারে দলে যোগ দিয়ে করেছি তিনটা যুদ্ধ। আমার সঙ্গে যারা যুদ্ধ করেছেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যারা এই এলাকা থেকে ক্ষমতায় গেছেন তারা সবাই জানেন আমার যুদ্ধের বীরত্বের কথা। কিন্তু, তবুও স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে আমাকে শুনতে হয় আমি রাজাকার ছিলাম। দেশটা এত বিভক্ত হয়ে গেলো? তখনকার যারা ছিলেন, যারা মুক্তিযোদ্ধা, তাদের কাছে শুনছেন না কেন ওরা?

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পাথরঘাটা গ্রামের এই বৃদ্ধকে সম্প্রতি দেখা যায় এত শারীরিক অসুস্থতা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে মাত্র তিনটি ছোট আকারের লাউ বিক্রি করতে বাড়ি থেকে আড়াই কিলোমিটার পথ বাঁশের লাঠিতে ভর দিয়ে পায়ে হেঁটে আসতে হয়েছে বাজারে। তার দাবি, এখনও বেঁচে আছি। প্রমাণ তো করুক কেউ আমি মুক্তিযোদ্ধা না রাজাকার? পাথরঘাটা গ্রামের মৃত সোহরাব সর্দারের ছেলে তিনি।

স্বাধীনতার ৫০ বছর চলছে এখন। স্থানীয় সরকারে যারা আছেন তাদের অনেকের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের পরে বা তখন শিশু ছিলেন তারা। তাদের কাছে মোবারক হোসেন মবা এখনও জীবন্ত রহস্য, তিনি কি সত্যিই মুক্তিযোদ্ধা? নাকি রাজাকার?

ভাঙ্গুড়া উপজেলা চেয়ারম্যান বাকী বিল্লাহ যুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম। তিনি জানান, মবা আমার নিকট প্রতিবেশী। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি তিনি রাজাকার হয়ে যোগ দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি খুবই অসহায়। আমি চেষ্টা করি সর্বদা তাকে সাহায্য সহযোগিতা করতে।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ইউনিটের সাবেক কমান্ডার মোকসেদ আলী বলেন, মবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা জানি না। তবে তিনি রাজাকার হিসেবে পাকিস্তানিদের সঙ্গে ছিলেন এটা জানি। রাজাকার হওয়ায় তার কাছেও অস্ত্র থাকতো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ’৭১ পাবনা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযুদ্ধা আ.স.ম আব্দুর রহিম পাকন বলেন,  আমি মূলত পাবনা নগড়বাড়ী এলাকায় যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে আমি এলাকায় ছিলাম না। তবে মবা  নামে ওই ব্যক্তির বাড়ি আমার গ্রামে হওয়ায় আমি শুনেছি তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে আমি নিশ্চিত নই।

মোবারক হোসেন মবাকে তাহলে এই রহস্যের শেষ হবে কবে? তার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন এমন একজনও কি এখন বেঁচে নেই যিনি বলতে পারবেন আসল সত্যটা। তার যুদ্ধের গল্পগুলো কি পুরোটাই বানানো নাকি সম্পূর্ণ সত্যি? নাকি তিনি আসলেই রাজাকারদের দল থেকে আর বের হননি? একবার রাজাকার দলে নাম লেখালে পরে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে সক্রিয় যুদ্ধ করলেও কি তাকে রাজাকারই বলা হবে? কি হবে তার পরিচয়? এই সমস্যাটা খোলাসা করবে কে? যদি মুক্তিযোদ্ধা হয়েই থাকেন তাহলে তাকে কেন পুরো সম্মান দেখানো হবে না? প্রশ্নগুলোর জবাব জানতে চায় পরের প্রজন্ম।

/টিএন/
সম্পর্কিত
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বঙ্গমাতা সেতুর পিলারে মালবাহী জাহাজের ধাক্কা
বঙ্গমাতা সেতুর পিলারে মালবাহী জাহাজের ধাক্কা
আদিতির হত্যাকারীর বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ
আদিতির হত্যাকারীর বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিবিআই’র চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিবিআই’র চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার
শিল্পকলায় নাট্যকেন্দ্রের ১৫তম প্রযোজনা
শিল্পকলায় নাট্যকেন্দ্রের ১৫তম প্রযোজনা
এ বিভাগের সর্বশেষ
‘মোরা একখানা ভালো ছবির জন্য যুদ্ধ করি’
‘মোরা একখানা ভালো ছবির জন্য যুদ্ধ করি’
এক উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের ৪৯৫ স্মৃতিবিজড়িত স্থান, পড়ে আছে অবহেলায়
এক উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের ৪৯৫ স্মৃতিবিজড়িত স্থান, পড়ে আছে অবহেলায়
মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সড়ক-সেতু-ইউনিয়ন, জানেন না অনেকে
মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সড়ক-সেতু-ইউনিয়ন, জানেন না অনেকে
১৬ বছরের কিশোরের অর্ধশতাধিক অপারেশন ও বিজয়ের গল্প
১৬ বছরের কিশোরের অর্ধশতাধিক অপারেশন ও বিজয়ের গল্প
‘দৈনিক বাংলার প্রেসে বোমা ফাটাইছি’
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি‘দৈনিক বাংলার প্রেসে বোমা ফাটাইছি’