লিথুয়ানিয়ার বাল্টিকে এক টুকরো প্রশান্তি, যেখানে সাগর ছুঁয়ে যায় বনকে

ফিচার ডেস্ক
০৬ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৫২আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৫২

ইউরোপের অনেক দেশে যখন গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত, তখন তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক আবহাওয়া নিয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করছে লিথুয়ানিয়ার বাল্টিক উপকূল। সাদা বালুর সৈকত, স্বচ্ছ নীলাভ জল, পাইনবন আর ইতিহাসঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দেশটির পালাঙ্গা ও কুরোনিয়ান স্পিট এখন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে নতুন জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠছে।

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত গরম ও বেড়ে যাওয়া ভ্রমণ খরচের কারণে অনেক পর্যটক এখন ইউরোপের তুলনামূলক শান্ত ও কম পরিচিত উপকূলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। সেই তালিকায় অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে লিথুয়ানিয়ার বাল্টিক উপকূল।

পর্যটকদের মুগ্ধ করে এর শান্ত পরিবেশ ও স্বচ্ছ পানি (সংগৃহীত ছবি)।

পালাঙ্গা: সমুদ্র, বালি আর ঐতিহ্যের শহর

লিথুয়ানিয়ার জনপ্রিয় সমুদ্রতীরবর্তী শহর পালাঙ্গার সাদা বালুর সৈকত পর্যটকদের মুগ্ধ করে এর শান্ত পরিবেশ ও স্বচ্ছ পানির জন্য। বাল্টিক সাগরের পানি এখানে হালকা সবুজাভ আভা ধারণ করে। অগভীর ও ধীরে ধীরে গভীর হওয়া এই সৈকত পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য বিশেষ উপযোগী।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ধনী তিশকেভিচাই পরিবার পালাঙ্গাকে একটি সমুদ্রতীরবর্তী অবকাশকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে। এরপর থেকেই এটি লিথুয়ানিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় ছুটির গন্তব্য।

পালাঙ্গার অন্যতম আকর্ষণ উনিশ শতকে নির্মিত ‘এল’ আকৃতির জেটি। সূর্যাস্ত দেখার জন্য এটি পর্যটকদের প্রিয় স্থান। শহরের ১০০ হেক্টর আয়তনের উদ্ভিদ উদ্যানে রয়েছে ঐতিহাসিক তিশকেভিচাই প্রাসাদ ও অ্যাম্বার জাদুঘর, যেখানে সংরক্ষিত আছে হাজারো প্রাচীন অ্যাম্বারের নিদর্শন।

স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, পার্কের বাইরে থাকা ফেলিকাসাস তিশকেভিচিয়াসের ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যের পায়ে স্পর্শ করে গালে চুমু দিলে নাকি সৌভাগ্য আসে।

পর্যটকদের জন্য রয়েছে নানা ধরনের থাকার ব্যবস্থা (সংগৃহীত ছবি)।

প্রকৃতির কোলে নিরিবিলি অবকাশ

পালাঙ্গায় পর্যটকদের জন্য রয়েছে নানা ধরনের থাকার ব্যবস্থা। পাইনবনে ঘেরা হোটেলগুলো থেকে সহজেই পৌঁছানো যায় নিরিবিলি সৈকতে। সেখানে ব্যক্তিগত কাবানা, সমুদ্রের পাশে বিশ্রাম ও স্থানীয় খাবারের অভিজ্ঞতা পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।

শহরের আশপাশে রয়েছে জলক্রীড়ার সুযোগও। ওয়েকবোর্ডিং, মিনারেল পুল ও বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র পর্যটকদের জন্য বাড়তি আনন্দের ব্যবস্থা করে।

কুরোনিয়ান স্পিট: বন, বালি ও কিংবদন্তির ভূখণ্ড

বাল্টিক সাগর ও কুরোনিয়ান লেগুনের মাঝখানে অবস্থিত কুরোনিয়ান স্পিট প্রায় ৬১ মাইল দীর্ঘ একটি সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকা। ঘন বন, বালিয়াড়ি ও ব্লু ফ্ল্যাগ সৈকতের জন্য পরিচিত এই অঞ্চল লিথুয়ানিয়ার অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ।

কুরোনিয়ান স্পিটের দক্ষিণ অংশ বর্তমানে রাশিয়ার অধীনে থাকলেও সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে দেখা যায় একই ধরনের বিস্তৃত বনভূমি।

এখানে উপভোগ করা যায় শান্ত ও নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশ (সংগৃহীত ছবি)।

লোককথায় ঘেরা বালুর দেশ

কুরোনিয়ান স্পিটকে ঘিরে রয়েছে নানা প্রাচীন কাহিনি। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, দৈত্যাকৃতি নারী নেরিঙ্গা তার এপ্রোনে করে বালি এনে এই ভূখণ্ড তৈরি করেছিলেন, যাতে উত্তাল বাল্টিক সাগর থেকে মানুষকে রক্ষা করা যায়।

এখানে পাওয়া অ্যাম্বারের টুকরো নিয়েও রয়েছে আকর্ষণীয় গল্প। বলা হয়, সমুদ্রের দেবী জুরাতে ও এক মরণশীল মানুষের প্রেমের ঘটনায় ক্রুদ্ধ বজ্রদেব পেরকুনাস পানির নিচের অ্যাম্বারের প্রাসাদ ধ্বংস করেছিলেন। সেই ধ্বংসাবশেষই নাকি আজও অ্যাম্বার হয়ে সৈকতে ভেসে আসে।

হারিয়ে যাওয়া গ্রামের ইতিহাস

তবে কুরোনিয়ান স্পিটের ইতিহাস শুধু কিংবদন্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। অষ্টাদশ শতকে ব্যাপক বন উজাড়ের কারণে বালুর স্তর এগিয়ে এসে এই অঞ্চলের ১৪টি গ্রাম ও দুটি কবরস্থান মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়।

পরবর্তীতে বালুর বাঁধ নির্মাণ ও ব্যাপক পুনঃবনায়নের মাধ্যমে এই অঞ্চলকে রক্ষা করা হয়। বর্তমানে কুরোনিয়ান স্পিট ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত।

বিস্তীর্ণ বনভূমি (নংগৃহীত ছবি)।

পাখি, মাছ ধরা ও স্থানীয় জীবন

কুরোনিয়ান স্পিট লাখো পরিযায়ী পাখির গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ। পেরেগ্রিন ফ্যালকন, লাল চিলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এখানে দেখা যায়। গ্রীষ্মকালে সীগাল ও কর্মোর‍্যান্টের উপস্থিতি বেশি থাকে।

এই অঞ্চলের জীবনযাত্রার সঙ্গে মাছ ধরার ঐতিহ্যও গভীরভাবে জড়িত। ছোট ছোট গ্রামে এখনও দেখা যায় ধোঁয়ায় শুকানো মাছের দোকান ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন।

প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনন্য সমন্বয়ে লিথুয়ানিয়ার বাল্টিক উপকূল এখন ইউরোপের অন্যতম আকর্ষণীয় গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। পালাঙ্গার সৈকত থেকে কুরোনিয়ান স্পিটের বুনো সৌন্দর্য প্রতিটি জায়গাই যেন ভিন্ন এক গল্প বলে।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
শিশু ধর্ষণের অভিযোগে যুক্তরাজ্যে গ্রেফতার হয়েছিলেন পাকিস্তানের সাবেক এক মন্ত্রী
চেকলিস্ট ভ্রমণ নাকি ধীরে ভ্রমণ—কোনটি বেশি আনন্দের?
বিশ্বের যেসব পর্যটনকেন্দ্র একসময় ছিল কারাগার
সর্বশেষ খবর
‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছাইড়া দে’ স্লোগানে মুখরিত সচিবালয় এলাকা 
‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছাইড়া দে’ স্লোগানে মুখরিত সচিবালয় এলাকা 
রাজধানীর চারপাশের নদীদূষণ রোধে কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর
রাজধানীর চারপাশের নদীদূষণ রোধে কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর
‘সাদ্দাম-ইনানকে ফোন করে হামলার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের’
‘সাদ্দাম-ইনানকে ফোন করে হামলার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের’
জুনিয়র সহকর্মীকে ধর্ষণ: দোষী সাব্যস্ত ভারতীয় সাংবাদিক তেজপাল
জুনিয়র সহকর্মীকে ধর্ষণ: দোষী সাব্যস্ত ভারতীয় সাংবাদিক তেজপাল
সর্বাধিক পঠিত
সমিতির ৩৯১ কোটি টাকা আত্মসাৎ, জামায়াতের সাবেক আমির গ্রেফতার
সমিতির ৩৯১ কোটি টাকা আত্মসাৎ, জামায়াতের সাবেক আমির গ্রেফতার
দক্ষিণ এশিয়ায় চমক দেখালো টাকা
দক্ষিণ এশিয়ায় চমক দেখালো টাকা
সূর্যের সবচেয়ে নিখুঁত ছবিতে নতুন বিস্ময়
সূর্যের সবচেয়ে নিখুঁত ছবিতে নতুন বিস্ময়
বিশ্বকাপে স্পেন-আর্জেন্টিনাকে আটকে দেওয়া সেই ভোজিনিয়ার অবশেষে স্বপ্নপূরণ
বিশ্বকাপে স্পেন-আর্জেন্টিনাকে আটকে দেওয়া সেই ভোজিনিয়ার অবশেষে স্বপ্নপূরণ
কোন ডালে প্রোটিনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি
কোন ডালে প্রোটিনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি