জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে দাবি-সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডা, সেই সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ায় ঢাকা কলেজে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ— এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করেই রাজধানীর তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়ান। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সংঘটিত এসব ঘটনায় দুই পক্ষের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষও আহত হন।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দুই দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রথম দফা এবং পরে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে দ্বিতীয় দফায় এই সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
উভয় সংগঠনের দাবি, সংঘর্ষে তাদের প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলে ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষের পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শিবিরের কর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে দিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
পরে দুপুর ২টার দিকে আহতদের দেখতে ও খোঁজ নিতে ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে জড়ো হন। একই সময় হাসপাতালের মূল ফটকের বাইরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন।
একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আবারও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় শিবিরের নেতাকর্মীরা হাসপাতালের ভেতরে আশ্রয় নেন। দুই পক্ষের মধ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি কয়েকজনের হাতে দেশীয় অস্ত্রও দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
জবি শিবির-সমর্থিত ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, “ইউজিসির চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আমরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কয়েকজন শিক্ষক এবং ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এতে বাধা দেন। একপর্যায়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর হামলা চালায়, প্ল্যাকার্ড ছিনিয়ে নেয় এবং মারধর করে। এতে আমাদের প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন বলেন, “জকসুর ব্যর্থতা এবং সারা দেশে জামায়াত-শিবিরের অপকর্ম আড়াল করতেই তারা এসব করছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও তারা মব সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তারা ধারাবাহিকভাবে মব কালচারের চর্চা করছে।”
ঘটনার বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে জুলাই উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান চলছিল। এ সময় বাইরে একটি গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। আমরা ধারণা করছি, জুলাইবিরোধী কোনও শক্তি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। এতে ছাত্রলীগের কোনও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।”
সংঘর্ষের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জবি প্রশাসন বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম, শিক্ষার পরিবেশ এবং চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে। একইসঙ্গে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি-বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের সূত্র ধরে ঢাকা কলেজেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে কলেজ অডিটোরিয়ামের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এতে দুপক্ষেরই অন্তত ২০জন আহত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষে জড়িয়েছে-এমন খবর পেয়ে দুপক্ষ মারামারি শুরু করেন।
আহতদের মধ্যে ছাত্রদলের ১১ জন রয়েছেন বলে দাবি করে ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিলাদ হোসেন বলেন, “আমাদের আজকে ঢাকা কলেজের অডিটোরিয়ামে একটা কর্মী সভা ছিল। আমরা সেখানে যাওয়ার সময় আমাদেরকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বহিরাগত নিয়ে হামলা করে। পরে আমরা অধ্যক্ষের কাছে গেলে তারা ক্যাম্পাস দখলের চেষ্টা করে।”
মিলাদ হোসেন দাবি করেন, ঢাকা কলেজের সামনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন।
তবে ছাত্রদলকে হামলার ঘটনা অস্বীকার করে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, “আমাদের আজকে পূর্বঘোষিত শহীদদের জন্য দোয়া মাহফিল ছিল। সেখানে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদেরকে ছাত্রদল হামলা করে। এতে আমাদের অনেকে আহত হয়েছে।”
অপরদিকে পুরান ঢাকার বকশি বাজারে শিক্ষা বোর্ডের সামনে লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক নেছারুদ্দীন রাব্বির ওপর অতর্কিত হামলা হয়েছৈ। এ ঘটনায় সানাউল্লাহ নামে ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক গুরুতর আহত হয়ে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহত নেছারুদ্দীন রাব্বি বলেন, “আমরা ২-৩ জন বন্ধু শিক্ষা বোর্ডের সামনে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এসময় কয়েকজন এসে ‘নারায়ে তাকবীর’ ধ্বনি দিয়ে আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে আমি গুরুতর আহত হই, পরে বন্ধুরা আমাকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসে। ধারণা করছি ওরা সবাই শিবিরের কর্মী।”
তিনি জানান, তিনি একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (এনআইইটি) থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে বিএসিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এছাড়া ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় হল দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে ওই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুই গ্রুপের মাঝে পুলিশ অবস্থান করছে। সংঘর্ষে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হক (৫২) আহত ও ঢাকা দক্ষিণ ছাত্রদলের সভাপতি শামীম মাহমুদ (৩০) আহত হয়েছেন।
চকবাজার ওসি মো. মামুন জানান, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ক্যাম্পাসের বাইরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
ডিএমপির লালবাগ জোনের উপ-কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, “তাৎক্ষণিকভাবে সংঘর্ষের কারণ জানা যায়নি। আলিয়া মাদ্রাসার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অতিরিক্ত প্রলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।”
তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “তিনটি ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। ক্যাম্পাস এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।”

আলিয়া মাদ্রাসায় শিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষ, আহত অন্তত ১০ 







