কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত পাওয়া গেছে এবং তারা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ার পাশাপাশি রামিসা হত্যা মামলার মতো অপ্রতীম হত্যার বিচারও দ্রুত শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডকে ‘মর্মান্তিক ঘটনা’ উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর সন্দেহভাজনদের গ্রেফতারে অভিযান চালায় পুলিশ। প্রথমে তিনজন এবং পরে আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বয়স যাচাই করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে কারও বয়স ১৮ বছরের নিচে হতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্রসহ সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা হচ্ছে।
গ্রেফতার ব্যক্তিদের সঙ্গে অপ্রতীমের আগে থেকেই পরিচয় ছিল জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা অনেকটা কিশোর অপরাধচক্রের মতো চলাফেরা করতো। অপ্রতীমের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও ওঠাবসা ছিল, একসঙ্গে আড্ডাও দিত। তাদের কেউ কেউ অপ্রতীমের চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ বছরের বড় বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসা মোবাইল ফোনটি প্রধান সন্দেহভাজন তুহিনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যান্য আলামতও জব্দ করেছে পুলিশ। পুলিশ এখন ফরেনসিক বিশ্লেষণসহ পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে। আসামিদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে।
অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি তুহিনের বাড়ি থেকে উদ্ধারের বিষয়টি পুলিশও নিশ্চিত করেছে।
পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা পুলিশের প্রশংসা করতে পারি। তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে এবং আলামতসহ অন্যান্য বিষয় জব্দ করতে পেরেছে।
তিনি বলেন, নিহত শিশুর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। আইনানুগ সব প্রক্রিয়া শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। বিচার করবে আদালত, আমরা সহযোগিতা করবো। আশা করি, রামিসা হত্যার বিচারের মতো এই হত্যাকাণ্ডের বিচারও সংক্ষিপ্ত সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকরা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য তুলে ধরে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করেন। আসকের গণমাধ্যমভিত্তিক হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আসকের তথ্য-উপাত্ত সরকার পরীক্ষা করে দেখতে পারে। কোন ঘটনা কীভাবে ঘটেছে এবং সেসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীকে গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করা একটি ধাপ। কিন্তু কেন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, সেই কারণগুলোও খুঁজে দেখতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিভিন্ন অপরাধ বিশ্লেষণে মাদক, জুয়া এবং অনলাইন বা সাইবার স্পেসের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। এসব সমস্যা শুধু আইন প্রয়োগ করে সমাধান সম্ভব নয়। সামাজিক পর্যায়েও কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তরুণরা অপরাধমূলক বা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের দিকে না যায়।
সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে শুরু হয়েছে। এর লক্ষণ আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে সমাজের সব সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে।
ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন
গত কয়েক দিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, রাজধানীর কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার সঙ্গে দলটির কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেয়েছে। যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করার কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও। পুলিশের দাবি, গ্রেফতার ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য।
মন্ত্রী বলেন, হাইকোর্টের ফটকের সামনে এবং যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও রাতে চালক-সহকারীহীন অবস্থায় পার্ক করে রাখা বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
যেসব ঘটনায় এখনো কাউকে শনাক্ত করা যায়নি, সেসব স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন নয় বলেও মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় তিনি দলটির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের অনুসন্ধানে ওই সময় বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হওয়ার অনুমান করা হয়েছিল এবং তৎকালীন সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর ও পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উঠে আসে।
বিরোধী দলের লংমার্চ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাদের সমালোচনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করলে সেটিকে তারা মনোযোগের সঙ্গে নেন। তিনি বলেন, বিরোধী দলের দাবি থাকতে পারে এবং তারা গণতান্ত্রিকভাবে কর্মসূচি পালন করতে পারে। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে সহযোগিতা করা।
চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলে বিরোধী দলের লংমার্চের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেসব কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বড় ধরনের সংঘাত হয়নি। তিনি বলেন, তাদের দাবির পক্ষে জনগণ থাকলে জনগণ কথা বলবে। নির্বাচন যখন হবে, তখন জনমত কাদের পক্ষে যায় সেটি দেখা যাবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর সরকারের ও পুলিশের পদক্ষেপও বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিচারিক কার্যক্রম বিচার বিভাগের বিষয়। সরকারের কাজ হচ্ছে তদন্ত, আইনগত প্রক্রিয়া এবং বিচার কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরানোর সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত সর্বশেষ তথ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিতে পারবে। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারও ভারত সরকারের কাছে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় পলাতক ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের ফেরত চেয়ে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে এবং বিষয়টি অনুসরণ করা হচ্ছে। এর আগেও সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনাসহ বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন পলাতক আসামিকে দেশে ফেরাতে সরকার কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজধানীর তেজগাঁও কলেজ মসজিদ থেকে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ২৩ জনকে আটকের বিষয়েও বিস্তারিত জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শুক্রবার জুমার নামাজের পর কয়েকজন ব্যক্তি মসজিদে অবস্থান করে আলোচনা করছিলেন। সম্ভাব্য উগ্রবাদী তৎপরতার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে গিয়ে তাদের আটক করে।
তাদের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ১১ জনের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে তাদের অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, আটক ২৩ জনের মধ্যে ১১ জনকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং বাকি ১২ জনকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাকি ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদে ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উগ্রবাদী তৎপরতায় সংগঠিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের উগ্রবাদী তৎপরতার বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স রয়েছে।
তিনি জানান, এ ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং আরও জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।









