সুপ্রিম কোর্টে মামলা নিষ্পত্তির গতি বেড়েছে, আইনজীবীদের ভিন্নমত

বাহাউদ্দিন ইমরান
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:২৫ আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:২৫

মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারাধীন মামলার চাপ কমাতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের দুই বিভাগেই ২০২৬ সালে মামলা নিষ্পত্তির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আপিল বিভাগে ১১ হাজার ১৩৬টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৮৭ হাজার ৫৯৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। একই সময়ে নতুন মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির সংখ্যা বেশি হওয়ায় উভয় বিভাগেই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমেছে বলে দাবি কোর্ট প্রশাসনের। তবে এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।

সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আপিল বিভাগে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে ৯ হাজার ১৩৯টি। এর বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার ১৩৬টি। অর্থাৎ, এ সময়ে দায়েরের চেয়ে ১ হাজার ৯৯৭টি মামলা বেশি নিষ্পত্তি হয়েছে।

অন্যদিকে, হাইকোর্ট বিভাগে বছরের প্রথম আট মাসে ৮৭ হাজার ৫৯৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। একই সময়ে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে ৭৪ হাজার ৬০৭টি। ফলে দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তি হয়েছে ১২ হাজার ৯৮৯টি মামলা বেশি।

আপিল বিভাগে আট মাসেই ছাড়িয়েছে আগের পাঁচ বছরের গড়

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আপিল বিভাগে যথাক্রমে ৬ হাজার ৮৫৯টি, ৫ হাজার ৪০৬টি, ৫ হাজার ৩৪৯টি, ৫ হাজার ৩১২টি এবং ৭ হাজার ৫৫৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। পাঁচ বছরে মোট নিষ্পত্তি হওয়া মামলার গড় ছিল বছরে প্রায় ৬ হাজার ৯৬টি।

এর বিপরীতে ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার ১৩৬টি মামলা। অর্থাৎ, বছরের বাকি চার মাস এখনও বাকি থাকতেই আগের পাঁচ বছরের যেকোনও একটি পূর্ণ বছরের তুলনায় বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

একই সময়ে মামলা দায়েরের সংখ্যাতেও ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আপিল বিভাগে নতুন মামলা দায়ের হয়েছিল যথাক্রমে ৭ হাজার ৮০৬টি, ২৯ হাজার ১৬২টি, ১১ হাজার ৯৩৮টি, ২৯ হাজার ৯১৫টি এবং ১৭ হাজার ৯৮৪টি। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে ৯ হাজার ১৩৯টি।

মাসপ্রতি মামলা নিষ্পত্তির চিত্র

২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির চিত্র পাওয়া যায়। জানুয়ারি মাসে ২০ কর্মদিবসে ২ হাজার ৭০৫টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৮ কর্মদিবসে ২ হাজার ৭২৪টি, মার্চে ১০ কর্মদিবসে ১ হাজার ১০৭টি এবং এপ্রিলে ১ হাজার ৩২১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

এ ছাড়া মে মাসে ১৫ কর্মদিবসে ৬৩৮টি, জুনে ১৮ কর্মদিবসে ১ হাজার ৩২১টি, জুলাইয়ে ২২ কর্মদিবসে ৬৮৭টি এবং আগস্টে ১৯ কর্মদিবসে ৬৩৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

সব মিলিয়ে আট মাসে ১৩২ কর্মদিবসে ১১ হাজার ১৩৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, কর্মদিবসপ্রতি গড়ে প্রায় ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

বছরের শুরুতে আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা ছিল ৪১ হাজার ৫৫১টি। দায়েরের তুলনায় বেশি মামলা নিষ্পত্তি হওয়ায় ৩১ আগস্ট শেষে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৫৫৪টিতে। অর্থাৎ, আট মাসে আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা কমেছে ১ হাজার ৯৯৭টি।

তবে মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. গোলাম রহমান ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আপিল বিভাগে পেন্ডিং কিছু কিছু মামলা দ্রুত শুনানির জন্য অধস্তন আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাই নিষ্পত্তির যে সংখ্যা তারা দেখাচ্ছেন, এটিকে সেই অর্থে পুরোপুরি নিষ্পত্তি বলা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া এখন আপিল বিভাগে তো তেমন কোনও মামলাই হচ্ছে না। মূলত নিষ্পত্তির হার যেগুলো তারা বলছে, সেগুলো পুরাতন মামলা। যার মধ্যে অনেক মামলার নির্দিষ্ট মেয়াদও ফুরিয়েছে।’

হাইকোর্টে আট মাসে ৮৭ হাজার ৫৯৬ মামলা নিষ্পত্তি

মামলা নিষ্পত্তিতে আরও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে হাইকোর্ট বিভাগে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মোট ৮৭ হাজার ৫৯৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৭ হাজার ৭৩৯টি এবং এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকে ২৭ হাজার ৫৬০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এরপর জুলাই মাসেই নিষ্পত্তি হয়েছে ৩২ হাজার ২১১টি এবং আগস্টে ২০ হাজার ৮৬টি মামলা। অর্থাৎ, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে হাইকোর্ট বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে জুলাই ও আগস্ট; এই দুই মাসেই নিষ্পত্তি হয়েছে ৫২ হাজার ২৯৭টি মামলা।

একই সময়ে জানুয়ারি-মার্চে ২২ হাজার ৯৯৯টি, এপ্রিল-জুনে ২৭ হাজার ৮০৩টি, জুলাইয়ে ১০ হাজার ২৩২টি এবং আগস্টে ১৩ হাজার ৫৭৩টি নতুন মামলা দায়ের হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রথম আট মাসে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে ৭৪ হাজার ৬০৭টি।

ফলে এ সময়ে নতুন মামলা দায়েরের তুলনায় ১২ হাজার ৯৮৯টি মামলা বেশি নিষ্পত্তি হয়েছে।

হাইকোর্টে আগের পাঁচ বছরের যেকোনও পূর্ণ বছরের চেয়ে বেশি নিষ্পত্তি

হাইকোর্ট বিভাগে ২০২১ সালে ২৩ হাজার ৬৫৪টি, ২০২২ সালে ৮৭ হাজার ৪৭৪টি, ২০২৩ সালে ৭৪ হাজার ২৭৮টি, ২০২৪ সালে ৩৮ হাজার ২৯৭টি এবং ২০২৫ সালে ৫৫ হাজার ৭৫৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল।

এর বিপরীতে ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৭ হাজার ৫৯৬টি মামলা। অর্থাৎ, জানুয়ারি-আগস্টের মধ্যে ২০২২ সালের পুরো বছরের নিষ্পত্তির সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। একইভাবে ২০২৫ সালের পুরো বছরে নিষ্পত্তি হওয়া ৫৫ হাজার ৭৫৬টি মামলার তুলনায় চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৩১ হাজার ৮৪০টি বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

আইনজীবী ড. গোলাম রহমান ভূঁইয়া মনে করেন, হাইকোর্ট বিভাগে যে মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে সেগুলোও সব পুরাতন। আগে ফাইল হয়ে পড়ে ছিল, কিন্তু শুনানি হয়নি, সেগুলো তারা নিষ্পত্তি হিসেবে দেখিয়েছে। এখানেও নিষ্পত্তি সেভাবে হয়নি, বলা চলে।

কমেছে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা

মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও কমেছে। ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলা ছিল ৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬টি। প্রথম আট মাসে নতুন মামলা দায়েরের তুলনায় ১২ হাজার ৯৮৯টি বেশি মামলা নিষ্পত্তি হওয়ায় ৩১ আগস্ট শেষে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৭৬টিতে। ফলে বছরের প্রথম আট মাসে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলা কমেছে ১২ হাজার ৯৮০টি।

ড. গোলাম রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হলে বিচারক নিয়োগ করতে হবে আপিল বিভাগে। নয়তো একটি বেঞ্চে এত মামলা নিষ্পত্তি হবে না। এই সরকার বিচারক নিয়োগের যে আইন বাতিল করেছে, তাতে এখন আর যোগ্যতাসম্পন্ন বিচারক আসবে না বলেও’ শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এ বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আশরাফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির যে হার দেখানো হয়েছে, তা মূলত জাতির সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। ‘স্টেপ নট টু বি টেকেন’, অর্থাৎ যে মামলাগুলো প্রয়োজনীয় স্টেপের অভাবে বছরের পর বছর ঝুলে আছে; এমন হাজার হাজার মামলায় একটি মাত্র কমন অর্ডারে নিষ্পত্তি করা যায়। সেখানে নিষ্পত্তির হার দেখিয়ে যা বলতে চাইছে আপিল বিভাগ, তা এক ধরনের প্রতারণা। তবে, হ্যাঁ, আপিল বিভাগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি হয়েছে, তাও রাজনৈতিক বিবেচনার মামলা। এছাড়া তেমন কোনও মামলাই শুনানি করা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপিল বিভাগ ছাড়াও হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ৪৯৮ ধারার মোশন মামলাগুলো ছাড়া তেমন কোনও মামলাই শোনা হচ্ছে না। যেগুলো নিষ্পত্তির কথা বলছে, সেগুলো বছরের পর বছর ঝুলে আছে এবং একটি মাত্র কমন অর্ডারে তা নিষ্পত্তি করতে সময় লাগে না। হাইকোর্টে রেডি মামলার শুনানি হয় না। ফিক্সড করতে হয়, টপে আসতে হয়। আবার দেখা যায়, মামলা টপে এলেও শুনানি করা সম্ভব হয় না।’

/আইএএম/ইউএস/
সম্পর্কিত
মিরপুরে মেট্রোরেল এলাকার পোস্টার-লিফলেট অপসারণ 
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার বিষয়ে যা বলছে পুলিশ
ঢাবি শিক্ষককে ভিসি হিসেবে মানতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা, সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ
সর্বশেষ খবর
জাসদ কার্যালয় থেকে আটক ২৫০ জন মুক্ত, ২৭ জনের ফোন যাবে ফরেনসিকে
জাসদ কার্যালয় থেকে আটক ২৫০ জন মুক্ত, ২৭ জনের ফোন যাবে ফরেনসিকে
ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপির প্রার্থী রাষ্ট্রপতির ভাই, জমা দিলেন মনোনয়নপত্র
ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপির প্রার্থী রাষ্ট্রপতির ভাই, জমা দিলেন মনোনয়নপত্র
স্ক্রিনের ওপারে কেমন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে শিশুদের?
স্ক্রিনের ওপারে কেমন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে শিশুদের?
হাসপাতালে দ্বিতীয় হামলায়ও বেঁচে যান মোজতবা খামেনি!
হাসপাতালে দ্বিতীয় হামলায়ও বেঁচে যান মোজতবা খামেনি!
সর্বাধিক পঠিত
কোটি মানুষের শিল্পনগরী, নেই কোনও বিনোদনকেন্দ্র
কোটি মানুষের শিল্পনগরী, নেই কোনও বিনোদনকেন্দ্র
চীন-ভারতকে টপকে যুক্তরাষ্ট্রই হবে বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস?
চীন-ভারতকে টপকে যুক্তরাষ্ট্রই হবে বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস?
ঢাকার কাছেই ৫ রিসোর্ট: কোথায় কী সুবিধা, খরচ কত 
ঢাকার কাছেই ৫ রিসোর্ট: কোথায় কী সুবিধা, খরচ কত 
সিলেট-ঢাকা ছয় লেন মহাসড়কের কাজ কবে শেষ হবে, জানালেন বাণিজ্যমন্ত্রী
সিলেট-ঢাকা ছয় লেন মহাসড়কের কাজ কবে শেষ হবে, জানালেন বাণিজ্যমন্ত্রী
এত সাহস, এক গালে চড় দিলে দুই গালে চড় দেবো: বিদ্যুৎমন্ত্রী
এত সাহস, এক গালে চড় দিলে দুই গালে চড় দেবো: বিদ্যুৎমন্ত্রী