মানুষ না ‘কনটেন্ট’: আমরা কি অনুভূতিকে পোস্ট বানিয়ে ফেলেছি?

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
২১ মার্চ ২০২৬, ১৪:১৪আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৬, ১৪:১৪

রাতে কারও মন ভেঙে গেছে। কিছুক্ষণ পরই তার প্রোফাইলে ভেসে ওঠে একটা স্ট্যাটাস—দুই লাইনের কষ্ট, সঙ্গে একটা নিঃশব্দ ছবি। সকাল হলে সেখানে জমে যায় লাইক, কমেন্ট, ইমোজির ভিড়। সান্ত্বনার ভাষা আছে, সহমর্মিতার চিহ্ন আছে—কিন্তু কোথাও কি সত্যিই ছোঁয়া লাগে সেই মানুষের ভেতরের ভাঙনটায়?

ডিজিটাল এই সময়ে আমরা যেন ধীরে ধীরে নিজেদের জীবনকে গল্প নয়, “কনটেন্ট” হিসেবে দেখতে শিখে গেছি। আনন্দের মুহূর্ত মানেই ছবি; কষ্ট মানেই স্ট্যাটাস; অর্জন মানেই ঘোষণা। যেন অনুভূতিগুলো আগে আসে না—আগে আসে, “এটা পোস্ট করা যাবে তো?”

একসময় দুঃখ মানে ছিল নির্ভরতার মানুষ খোঁজা—বন্ধু, পরিবার, কাছের কেউ। এখন সেই জায়গাটা অনেকটাই নিয়েছে ভার্চুয়াল দেয়াল। আমরা লিখে ফেলি, শেয়ার করি, অপেক্ষা করি প্রতিক্রিয়ার। কারও “থাকো, সব ঠিক হয়ে যাবে”—এই এক লাইনের কমেন্টেই হয়তো সাময়িক স্বস্তি পাই। কিন্তু গভীরতর এক শূন্যতা থেকে যায়, যা কোনও ইমোজি দিয়ে পূরণ হয় না।

আবার আনন্দের ক্ষেত্রেও একই ছবি। কোথাও বেড়াতে গেলে, নতুন কিছু পেলে, বা কোনও ছোট সাফল্য এলেই প্রথম চিন্তা—“ছবি তুলেছি তো?” মুহূর্তটা উপভোগ করার আগেই সেটাকে ধরে রাখার, দেখানোর, প্রমাণ করার এক অদ্ভুত তাড়না কাজ করে। ফলে অনেক সময় অনুভূতির গভীরতা হারিয়ে যায় প্রদর্শনের ভিড়ে।

এই প্রবণতার পেছনে আছে স্বীকৃতির তৃষ্ণা। মানুষ চায়—তার অনুভূতিকে কেউ দেখুক, গুরুত্ব দিক। সোশ্যাল মিডিয়া সেই সুযোগটা দিয়েছে সহজভাবে। কিন্তু সেই সহজতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক ধরনের নির্ভরতা—যেখানে নিজের ভালো লাগা-খারাপ লাগার মান নির্ধারণ করে অন্যের প্রতিক্রিয়া।

তবে সবকিছুই নেতিবাচক নয়। অনেকের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে মনের কথা বলার জায়গা, সহমর্মিতা পাওয়ার পথ। কেউ হয়তো বাস্তবে বলতে পারে না, কিন্তু লিখে ফেলতে পারে। কেউ একা থাকলেও, অচেনা মানুষের কাছ থেকে পায় সাড়া। এই দিকটাও গুরুত্বপূর্ণ।

তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়—আমরা কি ধীরে ধীরে অনুভূতির ভেতর থেকে সরে এসে তার “প্রদর্শনে” বেশি অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি?

হয়তো দরকার ছোট একটা বিরতি। কোনও আনন্দের মুহূর্তে একটু কম ক্যামেরা, একটু বেশি উপস্থিত থাকা। কোনো কষ্টের সময়ে হয়তো একজন মানুষকে ফোন করা, যার কণ্ঠস্বর সত্যি ভরসা দেয়। সব অনুভূতি যে সবার জন্য নয়—কিছু অনুভূতি কেবল নিজের, কেবল কাছের মানুষের জন্য—এই বোধটুকু ফিরে পাওয়া জরুরি।

শেষ পর্যন্ত মানুষ কনটেন্ট নয়। মানুষের ভেতরে গল্প আছে, ব্যথা আছে, ভালোবাসা আছে—যা কোনও পোস্টের সীমায় পুরোটা ধরা পড়ে না।

হয়তো আমরা পোস্ট করবোই, শেয়ার করবই—কিন্তু তার মাঝেও যদি একটু সত্যিকারের অনুভূতিকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

/এম/  
সম্পর্কিত
অলসতা মনে হলেও যে অভ্যাসগুলো হতে পারে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ
ভিয়েতনামের ট্রেন স্ট্রিটে ‘ছাইয়া ছাইয়া’ নাচ, ভারতীয় পর্যটকদের ভিডিও ঘিরে নিন্দার ঝড়
রাজধানীজুড়ে ‘ভাইরাল সিদ্দিকের’ দানবাক্স
সর্বশেষ খবর
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী