মৃত প্রিয়জনের কণ্ঠে কথা বলবে এআই, শোকের সঙ্গী নাকি ব্যবসার হাতিয়ার?

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক  
০১ আগস্ট ২০২৬, ২১:২৮আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ২১:২৮

ধরুন, বহু বছর আগে মারা যাওয়া আপনার মায়ের কণ্ঠে হঠাৎ ফোনে একটি বার্তা এলো। তিনি আপনার খোঁজ নিচ্ছেন, কোনও সিদ্ধান্তে পরামর্শ দিচ্ছেন, এমনকি আগের মতোই আপনার সঙ্গে কথাও বলছেন।

শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো লাগলেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উন্নতির ফলে এমন প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বাস্তবে এসেছে। মৃত ব্যক্তির ছবি, কণ্ঠ, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা পুরোনো বার্তা ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে এমন চ্যাটবট, যা সেই ব্যক্তির মতো করেই কথোপকথন চালাতে পারে।

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বলছে, এতে শোকাহত মানুষ প্রিয়জনকে আরও কাছাকাছি অনুভব করতে পারবেন। তবে মনোবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি-নৈতিকতা বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন—এটি কি সত্যিই শোক কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে, নাকি মানুষকে আরও গভীরভাবে অতীতের সঙ্গে আটকে রাখবে?

শোক মানেই ভুলে যাওয়া নয়

মনোবিজ্ঞানে ‘কন্টিনিউয়িং বন্ডস’ নামে একটি সুপরিচিত ধারণা রয়েছে। এর মূল কথা হলো—প্রিয়জন মারা গেলেও তার সঙ্গে মানুষের মানসিক সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না।

কেউ মায়ের শেখানো রান্না করতে গিয়ে তার কথা মনে করেন, কেউ কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাবার পরামর্শ কল্পনা করেন, আবার কোনো পরিচিত গন্ধ বা গান হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই নীরব সম্পর্কই শোক কাটিয়ে ওঠার একটি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর অংশ।

অর্থাৎ, প্রিয়জনকে মনে রাখা মানে তাকে আঁকড়ে ধরে থাকা নয়; বরং নিজের জীবন ও স্মৃতির ভেতর তাকে নতুনভাবে জায়গা করে দেওয়া।

যখন স্মৃতিও হয়ে ওঠে ব্যবসা

বিতর্কের শুরু এখানেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইভিত্তিক ‘গ্রিফ বট’ বা ‘ডিজিটাল ভূত’ শুধু প্রযুক্তি নয়, এটি একটি ব্যবসায়িক মডেলও। ব্যবহারকারীরা যত দিন সেই ডিজিটাল চরিত্রের সঙ্গে কথা বলবেন, তত দিন কোম্পানির আয়ও চলতে থাকবে।

কিন্তু একজন মানুষ যখন ধীরে ধীরে শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন, তখন এই সেবার প্রয়োজনও কমে যাওয়ার কথা। অন্যদিকে ব্যবসার স্বার্থ হলো ব্যবহারকারীকে যত দিন সম্ভব যুক্ত রাখা।

এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—শোক থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া এবং এই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবসায়িক স্বার্থ সব সময় এক পথে চলে না।

যদি একদিন সেই সেবাই বন্ধ হয়ে যায়?

ধরুন, যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আপনি মৃত প্রিয়জনের সঙ্গে ‘কথা’ বলছেন, সেটি হঠাৎ ব্যবসা গুটিয়ে ফেলল। অথবা সেবার মূল্য বেড়ে গেল, কিংবা প্রযুক্তিটিই আর চালু থাকল না।

তখন কী হবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে মানুষ দ্বিতীয় দফায় মানসিক আঘাত পেতে পারেন। কারণ এত দিন যে ডিজিটাল উপস্থিতির ওপর নির্ভর করছিলেন, সেটিও হঠাৎ হারিয়ে যাবে।

স্মৃতি কি অন্যের কাছে জমা রাখা যায়?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রিয়জনকে মনে রাখা একটি সক্রিয় মানসিক প্রক্রিয়া। তার গল্প বলা, প্রিয় খাবার রান্না করা, ব্যবহৃত কোনো বাক্য মনে করা কিংবা তার প্রিয় জায়গায় যাওয়া—এসবের মধ্য দিয়েই মানুষ স্মৃতিকে জীবন্ত রাখে।

কিন্তু যদি সেই দায়িত্বের বড় অংশই একটি অ্যাপের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে স্মৃতি ধরে রাখার চর্চা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

জিপিএসের মতোই কি স্মৃতিও দুর্বল হতে পারে?

এই আশঙ্কা বোঝাতে বিশেষজ্ঞরা একটি পরিচিত উদাহরণ দেন।

আজকাল অনেকেই কোথাও যাওয়ার সময় পুরোপুরি জিপিএসের ওপর নির্ভর করেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন এমন নির্ভরশীলতা মানুষের নিজের পথ মনে রাখার ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, যদি কোনোদিন প্রিয়জনকে মনে রাখার কাজও পুরোপুরি এআইয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে কি আমাদের নিজের স্মৃতিচর্চাও ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে পারে?

এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো নেই। তবে উদ্বেগটিও উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

তাহলে কী করা উচিত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিকে স্মৃতি সংরক্ষণের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পুরোনো ছবি, ভিডিও, চিঠি কিংবা কণ্ঠ সংরক্ষণে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে নতুন করে ‘কথা বলার’ অভ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া মানসিকভাবে স্বাস্থ্যকর নাও হতে পারে।

তাদের পরামর্শ— প্রিয়জনের স্মৃতিকে ঘিরে ছোট ছোট পারিবারিক রীতি ধরে রাখুন; তার পছন্দের খাবার রান্না করুন বা শেখানো কোনও কাজ করুন; পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাকে নিয়ে গল্প করুন; শোকের মুহূর্তে সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির আশ্রয় না নিয়ে নিজের অনুভূতির সঙ্গে কিছুটা সময় কাটান।

শেষ কথা

প্রযুক্তি মানুষের অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু শোকের পথ এখনও মানুষেরই হাঁটতে হয়।

এআই হয়তো মৃত মানুষের কণ্ঠ অনুকরণ করতে পারে, তার ভাষার ধরন নকল করতে পারে, এমনকি তার মতো উত্তরও তৈরি করতে পারে। কিন্তু কোনো প্রযুক্তিই মানুষের ভেতরে গড়ে ওঠা সেই গভীর সম্পর্ক, স্মৃতি আর ভালোবাসার বিকল্প নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রিয়জনের প্রকৃত ঠিকানা কোনও সার্ভার নয়। তারা বেঁচে থাকেন আমাদের স্মৃতিতে, অভ্যাসে, সিদ্ধান্তে এবং প্রতিদিনের জীবনযাপনের ভেতর। প্রযুক্তি সেই স্মৃতিকে সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু তার জায়গা নিতে পারে না। তাই মৃত প্রিয়জনের কণ্ঠে এআই কথা বলতে পারলেও, সেই কণ্ঠের ওপর কতটা নির্ভর করবেন—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

/এম/
সম্পর্কিত
কেন কোঁকড়ানো হয় চুল? প্রোটিন, জিন নাকি ত্বকের গভীরে লুকিয়ে থাকা রহস্য
অফিসে এআই ব্যবহার করছেন? সহকর্মীরা জানলে লাভ নাকি ক্ষতি?
আপনার ‘হ্যাঁ’ আর সঙ্গীর ‘হ্যাঁ’ কি একই অর্থ বহন করে?
সর্বশেষ খবর
প্রাথমিকে ক্রীড়া শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে মার্শাল আর্ট 
প্রাথমিকে ক্রীড়া শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে মার্শাল আর্ট 
গেটে বকশিশ কম দেওয়ায় ভেঙে গেলো বিয়ে
গেটে বকশিশ কম দেওয়ায় ভেঙে গেলো বিয়ে
গ্যাস সংকটের ওপর বিলের খড়গ, সমাধান চান গ্রাহকরা
গ্যাস সংকটের ওপর বিলের খড়গ, সমাধান চান গ্রাহকরা
অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, এক্সপো হচ্ছে ঢাকায়
অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, এক্সপো হচ্ছে ঢাকায়
সর্বাধিক পঠিত
‘এনসিপির সালাউদ্দিনকে গ্রেফতার না করলে আইন হাতে তুলে নেওয়া হতে পারে’
‘এনসিপির সালাউদ্দিনকে গ্রেফতার না করলে আইন হাতে তুলে নেওয়া হতে পারে’
এবার নাসীরুদ্দীনের সঙ্গে কথোপকথনের প্রমাণ দিলেন রাশেদ খাঁন
এবার নাসীরুদ্দীনের সঙ্গে কথোপকথনের প্রমাণ দিলেন রাশেদ খাঁন
রাজধানীতে ঘরে ঢুকে নারী চিকিৎসককে হত্যা
রাজধানীতে ঘরে ঢুকে নারী চিকিৎসককে হত্যা
পেট্রোবাংলা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিলেন নাহিদ ইসলাম  
পেট্রোবাংলা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিলেন নাহিদ ইসলাম  
অ্যাথোস সালমের ভবিষ্যদ্বাণীতে এবার নতুন যুদ্ধের সতর্কবার্তা
অ্যাথোস সালমের ভবিষ্যদ্বাণীতে এবার নতুন যুদ্ধের সতর্কবার্তা