বিয়ে হলো, কিন্তু নামটা বদলালো না! একসময় এমন ঘটনা শুনলে হয়তো ভুরু কুঁচকে যেত অনেকের। এখন বরং উল্টো প্রশ্ন উঠছে—বিয়ে করলেই স্বামীর পদবি নিতে হবে, এমন নিয়মটা আসলে কে বানিয়েছে?
একজন নারী বছরের পর বছর যে নামে পড়াশোনা করলেন, চাকরি করলেন, নিজের পরিচয় তৈরি করলেন, সাফল্য পেলেন—বিয়ের দিন সেই নামের শেষ অংশটুকু কেন হঠাৎ বদলে যাবে? ভালোবাসার সম্পর্ক বদলাল, জীবনসঙ্গী বদলাল, ঠিকানা বদলাল—কিন্তু নিজের নামটাও কি বদলাতেই হবে?
এই প্রশ্ন এখন আর নিছক তর্কের বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বিয়ের পর নিজের পদবি রেখে দেওয়া নারীর সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষ করে তরুণ ও উচ্চশিক্ষিত নারীদের মধ্যে। কারণ পদবি এখন অনেকের কাছে শুধু পারিবারিক পরিচয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যক্তিসত্তা, পেশাগত পরিচয়, অর্জন এবং নিজের তৈরি একটি জীবন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে এখনও স্বামীর পদবি নেওয়াই সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দ। ২০২৩ সালের পিউ গবেষণা অনুযায়ী, বিপরীত লিঙ্গের দাম্পত্যে থাকা প্রায় ৭৯ শতাংশ নারী বিয়ের পর স্বামীর পদবি নিয়েছেন। কিন্তু বয়স কমলে চিত্রটি বদলাতে শুরু করে। ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের প্রায় ২০ শতাংশ নিজের পদবি রেখেছেন, যেখানে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৯ শতাংশ।
অবিবাহিত নারীদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ পছন্দের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। তাদের মাত্র ৩৩ শতাংশ বলেছেন, বিয়ের পর স্বামীর পদবি নিতে চান। আরও ১৭ শতাংশ দুই পক্ষের পদবি মিলিয়ে নেওয়ার পক্ষে।
অর্থাৎ প্রশ্নটা এখন আর শুধু ‘স্বামীর পদবি নেবেন কি না’ নয়। বরং বিয়ের পর নিজের পরিচয়ের কতটা নিজের কাছে থাকবে—সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
পদবি বদলানোর রীতি কি সব দেশেই আছে?
একেবারেই নয়।
বিশ্বের কোটি কোটি নারী বিয়ের পরও নিজের জন্মসূত্রে পাওয়া পদবি ব্যবহার করেন। সন্তান হওয়ার পরও সেই নামই থাকে। স্পেন, চিলি ও মেক্সিকোয় নারীরা ঐতিহ্যগতভাবে নিজের বাবার ও মায়ের পদবি বহন করেন। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামেও বিয়ের পর নারীর পদবি বদলানো প্রচলিত নয়।
গ্রিসে তো আইনগতভাবেই একজন নারী বিয়ের পর স্বামীর পদবি নিতে পারেন না। ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশেও বিয়ের কারণে আইনগতভাবে নারীর জন্মের নাম বদলে যায় না।
তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে স্বামীর পদবি নেওয়ার রীতিটি এত শক্তিশালী হলো কীভাবে?
এর পেছনে ছিল ক্ষমতার গল্প
এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাসে। যুক্তরাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক সময়ে ইংরেজদের প্রচলিত ‘কোভারচার’ নামের একটি আইনগত ব্যবস্থা বিবাহিত নারীর অবস্থানকে স্বামীর অধীন করে রেখেছিল। নিজের উপার্জন, সম্পত্তি কিংবা সন্তানের ওপর অধিকার রাখার ক্ষেত্রেও নারীর স্বাধীনতা ছিল সীমিত।
এই সামাজিক ও আইনগত কাঠামোর সঙ্গে বিয়ের পর স্বামীর পদবি গ্রহণের রীতিও জড়িয়ে যায়। অর্থাৎ নাম বদলানো তখন কেবল ভালোবাসা বা পারিবারিক ঐক্যের প্রতীক ছিল না; এর মধ্যে ছিল একজন নারীর আইনগত পরিচয় বদলে যাওয়ার ইতিহাসও।
পরে অবশ্য পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতগুলো নারীদের স্বামীর পদবি নিতে বাধ্য করার বিভিন্ন নিয়ম বাতিল করতে থাকে। ফলে যে সিদ্ধান্ত একসময় সামাজিক ও আইনগত চাপের অংশ ছিল, সেটি ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত পছন্দে পরিণত হয়।
নিজের নামে তৈরি পরিচয় কি সহজে বদলানো যায়?
এই প্রশ্নটি আজ আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিয়ের বয়স বেড়েছে, নারীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবন বিস্তৃত হয়েছে।
১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের বিয়ের মধ্যম বয়স ছিল ২০ দশমিক ৬ বছর। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২৮ দশমিক ৪ বছর। অর্থাৎ অনেক নারী এখন বিয়ের আগেই জীবনের একটি বড় সময় নিজের শিক্ষা, চাকরি ও পেশাগত পরিচয় তৈরি করছেন।
একই সময়ে উচ্চশিক্ষায়ও নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। তারা পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি পিএইচডি অর্জন করছেন।
তাই একজন নারী যদি বিয়ের আগে নিজের নামে বহু বছর ধরে পড়াশোনা, গবেষণা, চাকরি বা ব্যবসার পরিচয় তৈরি করেন, বিয়ের পর হঠাৎ সেই নাম বদলে ফেলার প্রয়োজন তিনি নাও অনুভব করতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা কার?
অনেক নারী স্বামীর পদবি নেন। কেউ সন্তানদের সঙ্গে একই পারিবারিক পদবি ব্যবহার করতে চান, কেউ পারিবারিক ঐক্যের অনুভূতি থেকে সিদ্ধান্ত নেন, আবার কারও কাছে এটি নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ।
কেউ নিজের পদবি রাখেন, কেউ দুই পক্ষের পদবি মিলিয়ে নেন।
অর্থাৎ পরিবর্তনটা স্বামীর পদবি নেওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটি আরও বেশি ব্যক্তির হাতে চলে আসা।
২০২৫ সালের একটি ইউগভ জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি মানুষ বলেছেন, দাম্পত্যের অঙ্গীকার প্রকাশের জন্য স্বামী-স্ত্রীর একই পদবি থাকা জরুরি নয়।
শেষ পর্যন্ত বিয়ে একজন মানুষের সম্পর্ক বদলায়, জীবন বদলায়, ঠিকানা বদলায়। কিন্তু নিজের নাম বদলাবেন কিনা—সেই সিদ্ধান্তটি যে বিয়ের মতোই ব্যক্তিগত, সেই ধারণাটিই হয়তো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
/এম/
বিয়ের আয়োজনেই কি বোঝা যায় দাম্পত্য কেমন হবে?
বিয়ে পুরুষের জন্য ‘আশীর্বাদ’, নারীর জন্য কী?
কিছু মানুষ কেন বিয়ে করতে ভয় পায়?