বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের নমনীয়তা কমে, হাঁটাচলায় সমস্যা দেখা দেয়, অনেকের আবার বাতের ব্যথা কিংবা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার ভয়ও থাকে। এই সময়ে ভারী ব্যায়াম বা জিমে গিয়ে শরীরচর্চা করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ নিয়মিত শরীরচর্চা সুস্থ থাকতে সাহায্য করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জাপানি ব্যায়াম ‘তাই চি’ হতে পারে একটি বিকল্প। ধীর গতিতে হাত-পা সঞ্চালন, শরীরের হালকা মোচড় এবং নিয়ন্ত্রিত শ্বাসপ্রশ্বাসের সমন্বয়ে এই ব্যায়াম করা হয়। এতে শরীরের ভারসাম্য ও নমনীয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি মন শান্ত রাখতেও সাহায্য মিলতে পারে।
তাই চি বা তাইজিকুয়ানের উৎপত্তি চীনের মার্শাল আর্টের ধারায়। এক সময়ে আত্মরক্ষা ও শারীরিক প্রশিক্ষণের জন্য এই পদ্ধতি অনুশীলন করা হতো। পরে তা ধীরে ধীরে শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার ব্যায়াম হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর প্রতিটি ভঙ্গি ধীরে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে করতে হয়। তাই চি করার সময়ে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার ছন্দের দিকেও নজর রাখা জরুরি। ধীর গতির এই অনুশীলনকে অনেক সময়ে ‘মুভিং মেডিটেশন’ বা চলমান ধ্যানও বলা হয়।
তাই চি করার জন্য খুব বেশি জায়গা বা ভারী সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। শান্ত পরিবেশে আরামদায়ক পোশাক পরে দাঁড়াতে হবে। এরপর হাত-পা ধীরে সঞ্চালন করে এবং শরীরের ভার এক দিক থেকে অন্য দিকে সরিয়ে বিভিন্ন ভঙ্গি অভ্যাস করা যায়। সামনে কোনও দেওয়াল ঠেলার মতো করে হাত বাড়ানো, শরীরকে ধীরে ডান-বাঁ দিকে ঘোরানো কিংবা হাত দু’টি আলতো করে উপরে-নীচে তোলার মতো ভঙ্গি এর অংশ হতে পারে।
আর একটি সহজ অনুশীলনে এক পায়ে শরীরের ভার রেখে অন্য পা সামান্য ভাঁজ করতে হয়। বুকের সামনে হাত তুলে কয়েক মুহূর্ত ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। তারপর অন্য পা দিয়ে একইভাবে অভ্যাস করা যায়। তবে যাদের হাঁটাচলায় সমস্যা রয়েছে, তারা প্রয়োজনে চেয়ার বা মজবুত কোনও অবলম্বনের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশিক্ষকের পরামর্শে ব্যায়াম করবেন।
তাই চি-র কয়েকটি জনপ্রিয় ধরন রয়েছে। সেগুলো হলো-
ইয়াং স্টাইল: তাই চি-র বহুল প্রচলিত একটি ধরন। এতে হাত-পা ধীরে প্রসারিত করে বিভিন্ন ভঙ্গি করতে হয়। শরীরের ভারসাম্য ও নমনীয়তা বাড়ানোর অনুশীলনে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
সান স্টাইল: এই পদ্ধতিতে তুলনামূলকভাবে ছোট ছোট পদক্ষেপ এবং মসৃণ ভঙ্গির উপর জোর দেওয়া হয়। হাঁটুতে অস্বস্তি থাকলে কিছু ভঙ্গি সুবিধাজনক হতে পারে। তবে কোন অনুশীলন উপযুক্ত, তা ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে।
চেন স্টাইল: তাই চি-র প্রাচীন ধারাগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। এতে ধীর ভঙ্গির পাশাপাশি তুলনামূলক দ্রুত নড়াচড়া ও শক্তি প্রয়োগের অনুশীলনও থাকে। তাই নতুনদের প্রশিক্ষকের কাছ থেকে পদ্ধতি শিখে নেওয়া ভালো।
বয়সের সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য ও পেশির সমন্বয় বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই চি-র মতো নিয়ন্ত্রিত ব্যায়াম নিয়মিত অভ্যাস করলে ভারসাম্য ও চলাফেরার দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য মিলতে পারে। বিশেষ করে যাদের পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই ধরনের ব্যায়াম উপকারী হতে পারে।
স্ট্রোকের পর পুনর্বাসন কিংবা পারকিনসন্সের মতো স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞের পরামর্শে তাই চি-র কিছু অনুশীলন করা হতে পারে। তবে এটি কোনও রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। অ্যালঝাইমার্স বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি দূর করে, কিংবা বাতের ব্যথা সারিয়ে দেয় এমন নিশ্চয়তাও দেওয়া যায় না।
বয়স্কদের শরীরের অবস্থা এক রকম হয় না। হৃদ্রোগ, বাতের সমস্যা, মাথা ঘোরা কিংবা ভারসাম্য বজায় রাখতে অসুবিধা থাকলে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রথম দিকে সহজ ভঙ্গি দিয়ে শুরু করতে হবে এবং শরীরে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরার মতো সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হবে। নিয়মিত ও সঠিক পদ্ধতিতে অভ্যাস করাই শরীরচর্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।