অনেকেই মনে করেন ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিটি খাবারের ক্যালোরি গুনতে হবে কিংবা পেট ভরে খাওয়া যাবে না। এ ধারনা একবারেই ভুল। বরং সুষম খাবার, পরিমাণ বুঝে খাওয়া, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মতো কয়েকটি অভ্যাস ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
ওজন কমানোর পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই। কেউ উপবাস করেন, কেউ শুধু প্রোটিন খান, কেউ প্রবল কায়িক শ্রম করে দুর্বল হয়ে পড়েন, আবার কেউ বা খাবার ত্যাগ করার ভয়ে শুরুই করেন না। কখনও প্রবল নিয়মে হিতে বিপরীত হয়, কখনও অনিয়মে মেদ জমতেই থাকে। আর তারপর হতাশা ছাড়া কিছুই থাকে না।
অথচ ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পছন্দের খাবার বাদ দেওয়া কিংবা পেট ভরে না খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কী খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং খাওয়ার পর কতটা সক্রিয় থাকছেন, সে দিকে নজর দেওয়া জরুরি। সম্প্রতি পুষ্টিবিদ কৃতি ঠাকরে ওজন কমানোর সহজ পাঁচটি স্বাস্থ্যকর নিয়মের কথা জানিয়েছেন। এই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো মেনে চললে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সহজ মনে হবে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার ৫ পন্থা
পুষ্টিবিদ কৃতি ঠাকরে ওজন কমানোর এই অভ্যাস আপনারও কাজে লাগতে পারে-
১. অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলুন: চা-কফিতে বাড়তি চিনি, মিষ্টি, আইসক্রিম কিংবা চিনিযুক্ত নরম পানীয় এসবের মাধ্যমে অজান্তেই শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি প্রবেশ করে। শুধু সরাসরি চিনি নয়, প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে বাড়তি চিনি। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে মিষ্টি খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয়ের কমিয়ে ফেলুন।
২. চিনিযুক্ত ঠান্ডা পানীয় পরিহার করুন: তৃষ্ণা মেটাতে অনেকেই ঠান্ডা পানীয়, প্যাকেটজাত জুস কিংবা চিনির সিরাপ মেশানো শরবত খান। কিন্তু এ ধরনের পানীয় থেকে প্রচুর ক্যালোরি শরীরে ঢুকে পড়ে। অন্যদিকে, সাধারণ পানি শরীরকে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে এবং এতে ক্যালোরি নেই। তাই নিয়মিত চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে সাধারণ পান করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৩. থালা সাজান ৩-২-১ নিয়মে: প্রতিদিনের খাবারে কতটা ভাত বা রুটি, নবজি এবং কতটা প্রোটিন রাখবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েন অনেকেই। এ ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে ৩-২-১ পদ্ধতি। থালার ছ’ভাগের মধ্যে তিন ভাগে রাখুন সবজি, দু’ভাগে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং বাকি এক ভাগে ভাত, রুটি বা অন্য কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার। ডাল, ডিম, মাছ, মাংস কিংবা পনির হতে পারে প্রোটিনের উৎস। এই পদ্ধতিতে খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয়।
৪. পেট ভরে যাওয়ার আগেই খাওয়া থামান: খাবার সামনে থাকলে অনেকেই পেট ভরে যাওয়ার পরেও খেতে থাকেন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়া হয়ে যায়। তাই খাওয়ার সময়ে শরীরের সংকেত বোঝার চেষ্টা করুন। পেট পুরোপুরি ঠাসা হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা না করে যখন বুঝবেন আরামদায়কভাবে খিদে মিটেছে, তখনই খাওয়া থামান। ধীরে ধীরে খাওয়া এবং খাবারের দিকে মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস এ ক্ষেত্রে সাহায্য করবে। জাপানে প্রচলিত ‘হারা হাচি বু’ নীতিতেও প্রায় ৮০ শতাংশ পেট ভরলেই খাওয়া থামানোর কথা বলা হয়।
৫. খাওয়ার পরে হাঁটুন: খাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ বসে না থেকে হালকা হাঁটাহাঁটি করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পুষ্টিবিদের পরামর্শ, খাবারের পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ১৫-২০ মিনিট হাঁটতে পারেন। ধীরে ধীরে হাঁটার সময় ও দূরত্ব বাড়ান। পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী কাফ রেইজ ও চেয়ার সিট-টু-স্ট্যান্ডের মতো সহজ ব্যায়ামও করতে পারেন।
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পায়ের গোড়ালি মাটির ওপর তোলা এবং পায়ের পাতার সামনের অংশে ভর দিয়ে পুরো শরীরকে ওপরের দিকে তুলে ধরাকেই ‘কাফ রেইজিং’ ব্যায়াম বলা হয়। আর ‘চেয়ার সিট’ হলো শক্ত চেয়ার রেখে হাতে কোনও ভর না দিয়ে তাতে বসা এবং উঠে দাঁড়ানো।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোনও একটি নিয়মের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং ধারাবাহিক স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের উপর গুরুত্ব দিন। পেট ভরে খাওয়ার অর্থ অতিরিক্ত খাওয়া নয়, বরং শরীরের প্রয়োজন বুঝে পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়াই সুস্থ থাকার অন্যতম চাবিকাঠি।