ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ আর সারাক্ষণ মোবাইল-কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা সব মিলিয়ে শরীর ও মন দু’টিই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মানসিক ও শারীরিক স্বস্তি পেতে তাই অনেকেই স্পা-তে সময় কাটাতে পছন্দ করেন। কিন্তু এর জন্য সব সময় দামি স্পা-তে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাড়িতে বাথটাব থাকলে গরম পানিতে কিছুক্ষণ শরীর ডুবিয়ে রেখেও মিলতে পারে নানা উপকার। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে, গরম পানিতে গোসল রক্তচাপ, রক্ত সঞ্চালন এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রাচীন গ্রিক ও রোমানদের সময় থেকেই গরম পানিতে গোসলের প্রচলন রয়েছে। সে সময়ও মনে করা হত, এই অভ্যাস শরীরের নানা সমস্যায় উপকারী। আধুনিক বিজ্ঞানও এখন গরম পানিতে গোসলের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে গবেষণা করছে।
স্পার বিকল্প হতে পারে গরম পানিতে গোসল?
স্পা করতে গেলে নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে হয়, খরচও কম নয়। অন্য দিকে, বাড়িতে বাথটাব থাকলে গরম পানিতে গোসল করা অনেক সহজ। ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় গরম পানিতে শরীর ডুবিয়ে রাখার সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গবেষকদের মতে, রক্তচাপ কমানোর ক্ষেত্রে গরম পানিতে গোসলের প্রভাব স্পার চেয়েও বেশি হতে পারে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার উপরও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যায়ামের মতো উপকার মিলতে পারে?
কিছু গবেষণায় দীর্ঘ সময় গরম পানিতে গোসল করার সঙ্গে অ্যারোবিক ব্যায়ামের কিছু শারীরবৃত্তীয় প্রভাবের তুলনা করা হয়েছে। গরম পানিতে শরীরের তাপমাত্রা বাড়লে হৃদ্স্পন্দন ও রক্ত সঞ্চালনে পরিবর্তন আসে। কয়েকটি গবেষণায় গরম পানিতে গোসলের সঙ্গে রক্তে শর্করার মাত্রা কমার সম্ভাব্য সম্পর্কও উঠে এসেছে।
রক্ত সঞ্চালনের সমস্যাতেও কি উপকার?
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ বা পিএডি একটি পরিচিত রক্ত সঞ্চালনজনিত সমস্যা। সাধারণত পায়ের ধমনিতে রক্তপ্রবাহ কমে গেলে এই রোগ দেখা দেয়। ফলে হাঁটাচলার সময় পায়ে ব্যথা হতে পারে। এই সমস্যায় গরম পানিতে শরীর ডুবিয়ে রাখার প্রভাব কতটা, তা জানতে গবেষণা চালাচ্ছেন ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে হওয়া এই গবেষণায় নিয়মিত গরম পানিতে গোসল পিএডির উপসর্গ কমাতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গরম পানিতে হাঁটার ক্ষমতা বেড়েছে
ইংল্যান্ডের স্টকপোর্টের বাসিন্দা কেন হেউডের বয়স ৭৫ বছর। ৩৮ বছর বয়সে তার পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ ধরা পড়ে। সম্প্রতি রোগের উপসর্গ বেড়ে যাওয়ায় তিনি আট সপ্তাহের একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে অংশ নেন। সেখানে সপ্তাহে তিন দিন তাকে গরম পানিতে ভরা টাবে গোসল করানো হত। পানির তাপমাত্রা রাখা হয়েছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পুরো সময় তার শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখা হয়েছিল।
পরীক্ষা শেষে হেউড জানান, তার রক্তচাপের উন্নতি হয়েছে, পাশাপাশি হাঁটার ক্ষমতাও বেড়েছে। আগে প্রতিদিন কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে তাকে বারবার বেঞ্চে বসে বিশ্রাম নিতে হত। কিন্তু পরীক্ষার শেষে আর সেই প্রয়োজন হয়নি। এমনকি স্থানীয় পার্কের যে খাড়া ঢাল বেয়ে ওঠার কথা ভাবলেও আগে ভয় পেতেন, সেটিও উঠে গিয়েছেন তিনি। গবেষণা শেষ হওয়ার পরও সপ্তাহে তিন দিন বাড়িতে গরম পানিতে গোসল করছেন হেউড। পাশাপাশি ফিজিয়োথেরাপি ও শরীরচর্চাও চালিয়ে যাচ্ছেন। তাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করছেন তিনি।
গরম পানিতে গোসল করলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে কেন?
গরম পানিতে গোসল করলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ থেকে ত্বকের দিকে রক্তপ্রবাহ বাড়ে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী উইলিয়াম কেরির ব্যাখ্যা, পায়ের ধমনিতে রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে। সাধারণ মানুষের হৃদ্যন্ত্র ও রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।
প্রাচীন গ্রিক ও রোমানদের আমলেও ছিল প্রচলন
গরম পানিতে গোসলের স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে ধারণা নতুন নয়। প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা স্নান এবং স্পা-চর্চাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। সে সময় চিকিৎসার একটি প্রচলিত তত্ত্ব ছিল ‘হিউমরিজম’। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত প্রচলিত এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের শরীরে রক্ত, কফ, হলুদ পিত্ত ও কালো পিত্ত এই চার ধরনের তরলের ভারসাম্যের উপর স্বাস্থ্য নির্ভর করে।
তৎকালীন চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, শরীরের এই তরলগুলির কোনওটি অতিরিক্ত গরম, ঠান্ডা, শুষ্ক বা আর্দ্র হয়ে পড়লে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। শরীরে শুষ্কতার আধিক্য রয়েছে বলে মনে করা হলে গরম পানিতে গোসলকে ভারসাম্য ফেরানোর একটি উপায় হিসেবে দেখা হত। চিকিৎসার ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক রজার রোলসের মতে, সেই সময় ছানি থেকে বাতের ব্যথাসহ নানা ধরনের অসুস্থতার চিকিৎসায় গোসলের কথা বলা হত। তবে এই প্রাচীন চিকিৎসা-তত্ত্ব আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত নয়।
আধুনিক চিকিৎসাতেও রয়েছে পানি-চিকিৎসার ব্যবহার
সপ্তদশ শতকে অণুজীবের অস্তিত্ব আবিষ্কারের পর ‘হিউমরিজ়ম’ তত্ত্বের ভিত্তি ভেঙে পড়ে। তবে গোসলের উপকারিতা নিয়ে চিকিৎসকদের আগ্রহ একেবারে কমেনি। বিভিন্ন সময়ে দেখা গিয়েছে, কিছু ধরনের ব্যথা, শারীরিক অস্বস্তি এবং ত্বকের সমস্যায় পানি-চিকিৎসা উপকারী হতে পারে। চিকিৎসার ইতিহাসবিদ রজার রোলসের মতে, এর কিছুটা হয়তো মানসিক প্রত্যাশা বা প্লাসিবো প্রভাবের ফল। তবে পানির সাহায্যে চিকিৎসার কিছু কার্যকারিতাও রয়েছে। এখনও অনেক হাসপাতালে হাইড্রোথেরাপি বিভাগ রয়েছে। সেখানে পানিতে শরীর ডুবিয়ে রেখে স্নায়ু ও পেশির সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের পুনর্বাসনের চিকিৎসা করা হয়।
মানসিক চাপ কমায়
গরম পানিতে গোসল শুধু শরীরকে আরাম দেয় না, মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করতে পারে। ব্যস্ত জীবনে নিজের জন্য সময় বের করা অনেকের পক্ষেই কঠিন। কাজ, সংসার ও অন্যান্য দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে একান্তে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ মেলে না। সে ক্ষেত্রে গোসলের সময়টুকু হয়ে উঠতে পারে নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর অবকাশ।
সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন স্নান করেন সমাজমাধ্যমের পরিচিত মুখ গ্রেস বুথ। তার কথায়, ব্যস্ত কর্মজীবন ও মাতৃত্বের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের জন্য সময় পাওয়া কঠিন। সব সময় কিছু না কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন তিনি। তাই গোসলের সময়টুকু তার কাছে বাধ্যতামূলক বিশ্রামের মতো। তার মতে, গোসলের পর মন অনেক বেশি শান্ত ও সতেজ লাগে।
শরীরের পাশাপাশি মনকেও বিশ্রাম দিন
গবেষণায় অংশ নেওয়ার আগে কেন হেউডের নিয়মিত স্নানের অভ্যাস ছিল না। কিন্তু গরম পানিতে গোসল শুরু করার পর শরীরের পাশাপাশি মনেও স্বস্তি পাচ্ছেন তিনি। তার মতে, কিছুক্ষণ পানিতে শরীর ডুবিয়ে রেখে নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকলে শরীর ও মন দু’টিই শান্ত হয়। এখন নিয়মিত শরীরচর্চার পাশাপাশি গরম পানিতে গোসলও তার দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। এতে ব্যথা কমাতেও কিছুটা উপকার পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
স্নানের সময় সতর্কতা জরুরি
গরম পানিতে গোসল আরামদায়ক হলেও অতিরিক্ত গরম পানি শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে যাদের হৃদ্রোগ, নিম্ন রক্তচাপ কিংবা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত। গরম পানিতে শরীরের রক্তপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে কারও কারও মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগতে পারে। এমন হলে সঙ্গে সঙ্গে গোসল বন্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, গরম পানিতে গোসলের সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণা চললেও একে কোনও রোগের চিকিৎসা, ফিজিয়োথেরাপি বা নিয়মিত শরীরচর্চার বিকল্প হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।