মৃতদের আত্মা কি কখনও পৃথিবীতে ফিরে আসে? প্রাচীন বিশ্বাসে এর উত্তর ‘হ্যাঁ’। এশিয়ার বেশ কিছু সংস্কৃতিতে এমনই এক বিশ্বাসকে ঘিরে পালিত হয় হাংরি ঘোস্ট ফেস্টিভ্যাল, বাংলায় যাকে বলা যায় ‘ক্ষুধার্ত আত্মাদের উৎসব’। প্রতি বছর এই আয়োজন ঘিরে মৃতদের আত্মাকে স্মরণ করা, তাদের শান্তি কামনা করা এবং তাদের উদ্দেশে খাবার ও নানা সামগ্রী উৎসর্গ করার রীতি রয়েছে।
তবে নামের মধ্যে ‘আত্মা’ বা ‘ভূত’ থাকলেও এই উৎসব কেবল ভয়ের গল্প নয়। বরং এটি মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা, পূর্বপুরুষদের স্মরণ এবং জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতার এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রকাশ। পরিবারগুলো খাবার রান্না করে, ধূপ জ্বালায় এবং বিভিন্ন সামগ্রী উৎসর্গ করে। বিশ্বাস করা হয়, এসব আয়োজনের মাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো আত্মারা স্বস্তি পায় এবং পরিবারের ওপর আশীর্বাদ আসে।
কেন পালিত হয় এই উৎসব?
হাংরি ঘোস্ট ফেস্টিভ্যাল পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো পূর্বপুরুষদের সম্মান জানানো এবং তাদের আত্মার শান্তি কামনা করা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরলোকের দরজা খুলে যায়। তখন মৃতদের আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে এসে খাবার ও স্বস্তির সন্ধান করে।
জীবিতরা তাই তাদের উদ্দেশে খাবার, পানীয় ও বিভিন্ন সামগ্রী উৎসর্গ করে। বিশ্বাস করা হয়, এতে আত্মারা সন্তুষ্ট থাকে, দুর্ভাগ্য দূরে থাকে এবং পরিবারের জীবনে আশীর্বাদ আসে।
এর মধ্য দিয়ে জীবিত ও মৃতদের মধ্যে এক প্রতীকী বন্ধনও তৈরি হয়। পরলোকগত প্রিয়জনদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি পরিবার ও পূর্বপুরুষদের সম্পর্কের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয় এই উৎসব।
হাংরি ঘোস্ট ফেস্টিভ্যালের ইতিহাস
এই উৎসবের শিকড় চীনা সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এর ইতিহাস দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এবং হান রাজবংশের সময়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
চীনা লোকবিশ্বাসে চন্দ্রপঞ্জিকার সপ্তম মাসকে এমন একটি সময় হিসেবে দেখা হয়, যখন পরলোকের দরজা খুলে যায়। এই সময় মৃতদের আত্মারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায় এবং খাবার ও স্বস্তির সন্ধান করে। প্রাচীন চীনা পরিবারগুলো এসব ‘ক্ষুধার্ত আত্মা’কে ভয় পাওয়ার পাশাপাশি তাদের সন্তুষ্ট রাখারও চেষ্টা করত।
এই উৎসবের রীতিনীতি গড়ে ওঠার পেছনে বৌদ্ধ ও তাওবাদী বিশ্বাসেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাসে আত্মাদের উদ্দেশে খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী উৎসর্গ করার মাধ্যমে তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের ধারণা রয়েছে।
অন্যদিকে, তাওবাদী বিশ্বাসে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো আত্মাদের শান্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে এই দুই ধর্মীয় ধারার বিশ্বাস ও চীনা লোকাচারের সমন্বয়ে হাংরি ঘোস্ট ফেস্টিভ্যালের বর্তমান রূপ গড়ে ওঠে।
হান রাজবংশের সম্রাট উ এই ধরনের আচার-অনুষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে ঐতিহ্যে উল্লেখ আছে। পূর্বপুরুষদের সম্মান জানানো এবং তাদের উদ্দেশে খাবার উৎসর্গ করার রীতিও এ সময় গুরুত্ব পায়।
কীভাবে পালিত হয়?
উৎসবের অন্যতম পরিচিত রীতি হলো আত্মাদের উদ্দেশে খাবার উৎসর্গ করা। পরিবারের সদস্যরা নানা ধরনের খাবার ও পানীয় প্রস্তুত করে তা বাড়ির বাইরে বা নির্দিষ্ট স্থানে সাজিয়ে রাখেন। উদ্দেশ্য একটাই, ঘুরে বেড়ানো আত্মাদের স্বাগত জানানো এবং তাদের পরিতৃপ্ত করা।
আরেকটি পরিচিত রীতি হলো কাগজের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী পুড়িয়ে উৎসর্গ করা। কাগজের টাকা, পোশাক কিংবা বাড়ির প্রতিকৃতি পর্যন্ত তৈরি করে আগুনে পোড়ানো হয়। বিশ্বাস করা হয়, এসব সামগ্রী পরলোকের আত্মাদের কাছে পৌঁছে তাদের স্বস্তিতে থাকতে সাহায্য করে।
চীন ছাড়িয়ে এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে
সময়ের সঙ্গে এই ঐতিহ্য চীনের গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সম্প্রদায় নিজেদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাস অনুযায়ী উৎসবটির আচার-অনুষ্ঠানে পরিবর্তন এনেছে। ফলে একই মূল বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হয়েছে আলাদা আলাদা রীতি।
আধুনিক সময়েও উৎসবটির মধ্যে প্রাচীন ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট। মানুষ এখনও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে, তাদের উদ্দেশে খাবার ও নানা সামগ্রী উৎসর্গ করে এবং পরিবারের মঙ্গল কামনা করে।
সব মিলিয়ে হাংরি ঘোস্ট ফেস্টিভ্যাল শুধু মৃতদের ঘিরে কোনও ভীতিকর আয়োজন নয়। বরং এটি জীবিত ও মৃতের মধ্যকার প্রতীকী সম্পর্ক, পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পারিবারিক বন্ধনের এক অনন্য প্রকাশ। হাজার বছরের পথ পেরিয়েও যে ঐতিহ্য আজও মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে, হাংরি ঘোস্ট ফেস্টিভ্যাল তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।









