X
শনিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২২, ১৫ মাঘ ১৪২৮
সেকশনস

কলকাতার নিজামসে ফিরলো ঐতিহাসিক বিফ রোল

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২১, ১৭:০০

যে বিফ নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে গত কয়েক বছর তোলপাড়, সেই পদ আবার মহাধূমধামে জায়গা করে নিলো কলকাতার আইকনিক রেস্তোরাঁ ‘নিজামস’-এ। শহরের খাদ্যরসিকরা স্বাগত জানাচ্ছেন এই পদক্ষেপকে। কেউ কেউ বলছেন এটাই হলো কলকাতাবাসীর ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা’র জয়।

মধ্য কলকাতার নিউ মার্কেট অঞ্চলের ‘নিজামস’ শহরের সবচেয়ে পরিচিত ও জনপ্রিয় রেস্তোরাঁগুলোর একটি। ষাট বা সত্তর দশকের উত্তাল দিনগুলো থেকেই নিজামস কলকাতার পরিচিতির অংশ হয়ে উঠেছে। একসময় শহরের তরুণ-তরুণীরা এই রেস্তোরাঁর টেবিল দখল করেই সাবাড় করতেন ৬০ পয়সার ‘বিফ রোল’ আর দেড় টাকায় বিফ ভুনা, সঙ্গে লাচ্ছা পরোটা।

কিন্তু বছরকয়েক আগে ব্যবসায়িক কারণে বন্ধ হয়ে যায় নিজামস। সম্প্রতি নতুন ম্যানেজমেন্টের অধীনে নিউ মার্কেটের সুবিখ্যাত দোকানটি আবার ঝাঁপ তুললেও নতুন মেনুতে ছিল না গরুর কোনও পদ। 

এটা নিয়ে কলকাতার নিজামস-ভক্তরা অনুযোগ জানাচ্ছিলেন। তাদের দাবি মেটাতেই গত শুক্রবার (২৯ অক্টোবর) থেকে রেস্তোরাঁটি ফিরিয়ে এনেছে গরুর মাংসের নানা আইটেম। কলকাতায় আসা হাজার হাজার বাংলাদেশি পর্যটকও নিউ মার্কেট ও তার আশেপাশের অঞ্চলেই মূলত থাকেন। তারাও এখন নিজামসের বিখ্যাত খাবারটির স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

কলকাতার নিজামস যাত্রা শুরু করে ১৯৩২ সালে

নিজামসের ম্যানেজার সমর নাগ জানাচ্ছেন, ‘আমাদের বহু ক্রেতাই বলছিলেন বিফ রোল বা বিফ কাবাব ছাড়া নিজামসকে ভাবাই যায় না। তাদের দাবি মেটাতেই  আইটেমগুলো ফিরিয়ে এনেছি। সঙ্গে যোগ করেছি তুরস্ক ও কাজাখস্তানের কিছু নতুন ডিশ।’

তবে নিজামস কর্তৃপক্ষ সেইসঙ্গে এও জানিয়েছেন, তাদের যে ক্রেতারা বিফ খান না, তাদের অনুভূতিকে সম্মান জানাতে তারা বিফের জন্য আলাদা কিচেনের ব্যবস্থা করেছেন। এমনকি যারা খাবেন, তাদের বসার ব্যবস্থাও আলাদা।

গরুর মাংস বেচাকেনা বা খাওয়া নিয়ে ভারতের সব রাজ্যে আইন এক রকম নয়। বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিফ নিষিদ্ধ হলেও গোয়া, কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ, মিজোরাম, মেঘালয়ের মতো অনেক জায়গায় গরুর মাংসে বাধা নেই। আবার আইনি বাধা না-থাকলেও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এড়াতে অনেকেই প্রকাশ্যে বিফ খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকছেন।

এই পটভূমিতে নিজামস যে সাহস দেখিয়ে ‘বিফ’কে তাদের মেনুতে ফিরিয়ে আনল, সেটাকেই সাধুবাদ জানাচ্ছেন কলকাতায় অনেকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শিবাজী রায়ের কথায়, ‘ছমাস আগে নির্বাচনে যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপিকে হারিয়েছে, সেই লড়াইয়ের কিন্তু একটা বড় দিক ছিল সাংস্কৃতিক। এই রাজ্যের বাঙালিরা যে বিজেপির ফতোয়ায় তাদের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস পাল্টাবে না, ওই ফলাফলে সেই বার্তা ছিল স্পষ্ট– আর নিজামসের এই সিদ্ধান্তেও সেটার প্রতিফলন আছে বলে মনে করি।’ 

তিন দশক আগে বিখ্যাত গায়ক কবীর সুমন তার ‘প্রথম সব কিছু’ গানটিতে বিশুদ্ধ নস্টালজিয়ার আবহে গেয়েছিলেন, ‘প্রথমবার নিজাম গিয়ে কাবাব ভরপেট!’

আজ প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে এসে সেই শিল্পীও ভীষণ খুশি যে নিজামস আবার তাদের মেনুতে বিফ ফিরিয়ে এনেছে। 

বাংলা ট্রিবিউনকে কবীর সুমন বলছিলেন, ‘নিজামস মানে আমার কাছে শুধু একটা রেস্তোরাঁ নয়, ওটা একটা জীবনযাপনের নাম। মুক্ত ও অবাধ চিন্তাভাবনা, ঘরোয়া পরিবেশ আর পকেটসই দামে জিভে-জল-আনা খাবারদাবার—এসব মিলিয়েই নিজামস। দেখি যাবো একদিন নিজামসে বিফ রোল খেতে!’

‘ফুডকা’ নামে যাকে অনেকেই চেনেন, সেই সুপরিচিত ফুড-ব্লগার ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ীরও বলতে দ্বিধা করেননি, ‘কলকাতার লোভনীয় খাবারের মানচিত্রে ইদানিংকালের সবচেয়ে বড় শিরোনাম হল নিজামসে বিফের প্রত্যাবর্তন।’

৯০ বছর আগে ১৯৩২ সালে কলকাতার শেখ হাসান রাজা নিউ মার্কেট এলাকায় ‘নিজামস’ শুরু করেছিলেন। ছেলে শেখ নিজামুদ্দিনের নামে তিনি রেস্তোরাঁর নাম রেখেছিলেন নিজামস। বিখ্যাত ‘কলকাতা কাঠি রোলে’র জন্মও এখানে।

ব্রিটিশ আমলে দেশি ও ফিরিঙ্গিদের মধ্যে যেমন, স্বাধীনতার পর কলকাতার শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও ভীষণ জনপ্রিয় ছিল নিজামস। রাজ কাপুর, অমিতাভ বচ্চন, নবাব পতৌদি-শর্মিলা ঠাকুরও সুযোগ পেলে ঢুঁ মারতেন এই রেস্তোরাঁয়।

 

 

/এফএ/
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© 2022 Bangla Tribune