ছোটবেলায় মাটিতে খেলতে গিয়ে জামাকাপড় নোংরা হলে বকা খেতে হয়নি এমন মানুষ খুব কমই আছেন। এখন অবশ্য শিশুদের খেলাধুলার বড় অংশই ঘরের ভেতর বা পরিচ্ছন্ন কংক্রিটের জায়গায় সীমাবদ্ধ। অথচ সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বলছে, মাটি, ঘাস, গাছপালা কিংবা শ্যাওলার মতো প্রাকৃতিক উপাদানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ শরীরের জন্য একেবারে খারাপ নয়। বরং ত্বক ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য এতে কিছু সম্ভাব্য উপকার থাকতে পারে।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে হাত ধোয়া বন্ধ করে দিতে হবে বা অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন থাকাই স্বাস্থ্যকর। বরং গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, নিরাপদ উপায়ে প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা শরীরের নিজস্ব জীবাণুসমাজ বা মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ফিনল্যান্ডের পরিবেশবিজ্ঞানী ও প্রকৃতি-স্বাস্থ্য গবেষক মিরা গ্রোনরোসের একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মাটি, পিট ও শ্যাওলার মতো প্রাকৃতিক উপাদানে প্রায় ২০ সেকেন্ড হাত ঘষতে বলা হয়েছিল। এরপর কলের পানিতে হাত ধুয়ে নেওয়ার পরও তাদের ত্বকে থাকা জীবাণুর সংখ্যা ও বৈচিত্র্যে পরিবর্তন দেখা যায়।
খালি চোখে অবশ্য সেই পরিবর্তন বোঝার উপায় ছিল না। হাত দেখতে পরিষ্কারই ছিল। কিন্তু ত্বকের মাইক্রোবায়োম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রকৃতির সংস্পর্শে আসার পর সেখানে বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর উপস্থিতি বেড়েছে।
২০১৯ সালে মাইক্রোবায়োলজি ওপেন-এ প্রকাশিত গবেষণাটিও প্রকৃতি ও মানুষের মাইক্রোবায়োমের সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহ বাড়িয়েছে।
‘জীবাণু’ শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে রোগের কথা আসে। কিন্তু ত্বকে থাকা সব জীবাণু ক্ষতিকর নয়। বরং সেখানে অসংখ্য অণুজীব একসঙ্গে বসবাস করে। এই জীবাণুগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য থাকলে তারা পরস্পরের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে এবং ক্ষতিকর জীবাণুর আধিপত্য বিস্তার ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ত্বকে নানা ধরনের জীবাণুর উপস্থিতি থাকলে রোগসৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য সহজে জায়গা করে নেওয়া কঠিন হতে পারে।
পরিবেশবিজ্ঞানী মারিয়া রসলুন্ড বিষয়টি বোঝাতে ত্বকের জীবাণুসমাজকে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর সহাবস্থান থাকলে কোনও একটি ক্ষতিকর জীবাণুর ‘আধিপত্য’ বিস্তারের সুযোগ কমে যায়।
ফিনল্যান্ডের ৪৩টি ডে-কেয়ার সেন্টার নিয়ে পরিচালিত ভাহভিস্তুর গবেষণা প্রকল্পে শিশুদের দৈনন্দিন খেলার পরিবেশে প্রকৃতির উপাদান যুক্ত করার প্রভাবও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০১৬-১৭ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় ডে-কেয়ারের পাকা উঠানের একটি অংশে বনভূমির মাটি, পিট ও গাছ লাগানোর বাক্স যোগ করা হয়েছিল। সেখানে শিশুরা নিয়মিত খেলার পর তাদের ত্বক, লালা ও অন্ত্রের জীবাণু বিশ্লেষণ করা হয়।
পাকা উঠানে খেলা শিশুদের তুলনায় বনভূমির মাটির সংস্পর্শে আসা শিশুদের ত্বকে এক বছর পরও জীবাণুর বৈচিত্র্য বেশি ছিল।
এ ধরনের গবেষণাই পরে ভাহভিস্তুর প্রকল্পের মতো উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করে। প্রকৃতির উপাদান যুক্ত করে শিশুদের খেলার জায়গাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলার চেষ্টা চলছে।
প্রকৃতির সংস্পর্শের সম্ভাব্য প্রভাব শুধু ত্বকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কি না, সেটিও গবেষকদের আগ্রহের বিষয়।
একটি পরীক্ষায় শিশুদের এমন বালুর বাক্সে খেলতে দেওয়া হয়, যেখানে জীবাণুবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ মাটি ছিল। অন্য একটি দলের বালুর বাক্স দেখতে একই রকম হলেও সেখানে জীবাণুর বৈচিত্র্য ছিল কম।
জীবাণুবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ মাটিতে খেলা শিশুদের ত্বকে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বাড়ার পাশাপাশি রক্তে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সাইটোকাইনের পরিবর্তনও দেখা যায়।
গবেষণায় গামাপ্রোটিওব্যাকটেরিয়া নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার বিশেষ ভূমিকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বাড়ার সঙ্গে রেগুলেটরি টি-সেল বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সহায়তাকারী শ্বেত রক্তকণিকার পরিবর্তনের সম্পর্কও দেখা গেছে।
তবে এর মানে এই নয় যে প্রকৃতির সংস্পর্শে এলেই একজিমা, হাঁপানি বা অ্যালার্জি হবে না। এসব রোগের সঙ্গে প্রকৃতির যোগাযোগের সম্পর্ক নিয়ে এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। আরও গবেষণা প্রয়োজন।
প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাব্য সুফল নিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের ওপরও গবেষণা হয়েছে। একটি গবেষণায় কিছু প্রাপ্তবয়স্ককে শীতকালে ঘরের ভেতর সবজি চাষ করতে দেওয়া হয়। একদল জীবাণুবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ মাটি ব্যবহার করেন, অন্যদল ব্যবহার করেন কম জীবাণুবৈচিত্র্যের মাটি। এক মাস ধরে তারা নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করেন এবং উৎপাদিত সবজি খান।
পরে দেখা যায়, জীবাণুবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ মাটি ব্যবহার করা ব্যক্তিদের ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বেড়েছে। রক্তে প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সাইটোকাইনেও পরিবর্তন দেখা যায়।
অর্থাৎ, বাগান করা, গাছের পরিচর্যা করা কিংবা মাটিতে হাত দেওয়ার মতো সাধারণ কাজও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়ানোর একটি উপায় হতে পারে।
প্রকৃতির সংস্পর্শের জন্য সব সময় মাঠে বা বনে যাওয়ার প্রয়োজন নেই এমন ইঙ্গিতও মিলেছে আরেক গবেষণায়।
ফিনল্যান্ডের কয়েকটি অফিসে জীবন্ত গাছপালা দিয়ে তৈরি ‘গ্রিন ওয়াল’ স্থাপন করা হয়েছিল। দুই সপ্তাহ পর কর্মীদের শরীরে পরিবর্তন পরীক্ষা করেন গবেষকেরা।
দেখা যায়, তাদের ত্বকে জীবাণুর বৈচিত্র্য বেড়েছে। একই সঙ্গে রক্তে প্রদাহ বাড়াতে ভূমিকা রাখা কিছু সাইটোকাইনের মাত্রা কমেছে। ত্বকে ল্যাক্টোব্যাসিলাস গোত্রের জীবাণুর উপস্থিতিও বেড়েছিল, যা ত্বকের সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষণাগুলো থেকে এখন পর্যন্ত যে বিষয়টি সামনে আসছে, তা হলো প্রকৃতির সঙ্গে নিরাপদ ও নিয়মিত যোগাযোগ শরীরের মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্য এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তাই শিশু মাটিতে খেললে বা বাইরে গিয়ে শুকনো পাতা, ছোট ডাল কিংবা গাছের ফল কুড়িয়ে আনলে সব সময় তা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ শিশুদের দেওয়া যেতে পারে, অবশ্যই পরিবেশটি নিরাপদ কি না তা নিশ্চিত করে।
গবেষক মিরা গ্রোনরোসও নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রে এমনটাই করেন। বাইরে গিয়ে তারা গাছের শঙ্কু বা ডালপালা কুড়িয়ে আনতে চাইলে তিনি বাধা দেন না। বরং সেগুলো বাড়িতে এনে খেলতেও দেন।
প্রকৃতি ঠিক কীভাবে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে, তার সব উত্তর এখনও বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। তবে এখন পর্যন্ত গবেষণাগুলো বলছে, প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাব্য উপকার রয়েছে এবং বড় ধরনের ক্ষতির স্পষ্ট প্রমাণ নেই।
তাই সুযোগ পেলেই মাটি, ঘাস বা গাছপালার কাছাকাছি যাওয়া যেতে পারে। শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে মাটিতে খেলতেও দেওয়া যায়।
তবে মনে রাখতে হবে, প্রকৃতির সংস্পর্শ আর অপরিচ্ছন্ন থাকা এক বিষয় নয়। খাবার খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর বা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে ভালোভাবে হাত ধোয়া জরুরি।
সূত্র: বিবিসি









