দাঁতের ফাঁকে ৭০০ জীবাণুর সংসার!

জীবনযাপন ডেস্ক
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৫আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৫

দাঁত পরিষ্কার রাখতে সকাল-সন্ধ্যা ব্রাশ, প্রয়োজনে ফ্লস কিংবা মাউথওয়াশ এসবের কথা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু মুখের ভেতর যে বিপুলসংখ্যক অণুজীবের বসবাস, তাদের কথা কয়জনই বা ভাবেন! দাঁত, মাড়ি, জিহ্বা ও মুখগহ্বরের বিভিন্ন অংশে থাকা এসব অণুজীবের কিছু আমাদের জন্য উপকারী, আবার কিছু নানা ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মুখে প্রায় ৭০০ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক থাকতে পারে। অন্ত্রের মতো মুখেও এই অণুজীবদের মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য থাকে। উপকারী জীবাণুগুলো ক্ষতিকর জীবাণুর বিস্তার ঠেকাতে সাহায্য করে। কিন্তু সেই ভারসাম্য নষ্ট হলে দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির প্রদাহ ও সংক্রমণের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তাই মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখার বিষয়টি শুধু নিয়মিত দাঁত মাজাতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিনের খাবারও মুখের অণুজীবের ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

মুখের সব অণুজীব যে ক্ষতিকর, এমনটা নয়। বরং কিছু ব্যাকটেরিয়া মুখের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভেইলোনেল্লা, অ্যাকটিনোমাইসিস, নিসেরিয়া ও স্ট্রেপ্টোকক্কাস স্যালিভারিয়াসের মতো কিছু অণুজীব ক্ষতিকর জীবাণুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে কিছু ব্যাকটেরিয়া দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির রোগের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে স্ট্রেপ্টোকক্কাস মিউট্যান্স দাঁতের ক্ষয়ের অন্যতম পরিচিত জীবাণু। মুখের পরিবেশে চিনি বেশি থাকলে এই ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বাড়বাড়ন্তের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে দাঁতের ওপর অ্যাসিডের প্রভাব বাড়ে এবং এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মাড়ির দীর্ঘস্থায়ী রোগের সঙ্গেও কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। যেমন পরফাইরোমোনাস জিঞ্জিভালিস নামের ব্যাকটেরিয়াকে মাড়ির গুরুতর রোগের সঙ্গে যুক্ত পাওয়া গেছে। মুখের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও কিছু শারীরিক রোগের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে। হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, স্নায়বিক রোগসহ বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে মুখের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞানীরা আগ্রহী হলেও এসব ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক সব সময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন নয়।

দাঁত ও মাড়ির যত্নে ব্রাশিংয়ের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অতিরিক্ত চিনি ও ঘন ঘন মিষ্টি খাবার খাওয়ার অভ্যাস মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

সবুজ শাকসবজি বিশেষ করে পালংশাক, কলমিশাকসহ বিভিন্ন সবুজ শাকে নাইট্রেট থাকে। মুখের কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া নাইট্রেটকে নাইট্রাইটে রূপান্তর করতে পারে। এই প্রক্রিয়া শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত, যা রক্তনালির কার্যক্রম ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

রসুনও খাবারের তালিকায় রাখতে পারেন। এতে থাকা অ্যালিসিন নামের যৌগের জীবাণুরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে রসুন খাওয়াকে দাঁতের রোগের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

চা, বিশেষ করে গ্রিন টি ও ব্ল্যাক টিতে থাকা পলিফেনল মুখের কিছু ক্ষতিকর জীবাণুর কার্যক্রম কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে চায়ে অতিরিক্ত চিনি মেশালে সেই সুবিধা অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। তাই চা খেলে চিনি কমানোই ভালো।

পনিরও দাঁতের জন্য উপকারী খাবারগুলোর একটি হতে পারে। পনির চিবানোর সময় মুখে লালা বাড়ে, যা খাবারের অবশিষ্টাংশ ও অ্যাসিড দূর করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এতে থাকা কিছু উপাদান দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।

মজানো বা ফারমেন্টেড খাবারে থাকা উপকারী অণুজীবও অন্ত্রের পাশাপাশি মুখের অণুজীবের ভারসাম্যে ভূমিকা রাখে। তবে সব ফারমেন্টেড খাবার সমান নয়, অতিরিক্ত চিনি বা লবণযুক্ত খাবার নিয়মিত বেশি খাওয়া ঠিক নয়।

মধুতে বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও পলিফেনল থাকলেও এটিও মূলত চিনি। তাই দাঁতের যত্নের জন্য মধুকে ইচ্ছেমতো খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া যায় না। মিষ্টি হিসেবে অল্প পরিমাণে খাওয়া এবং পরে মুখ পরিষ্কার রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

মুখের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় শত্রুদের একটি হলো অতিরিক্ত চিনি। মিষ্টি, চকলেট, ক্যান্ডি, প্যাকেটজাত মিষ্টি পানীয় কিংবা চিনিযুক্ত কোমল পানীয় ঘন ঘন খেলে দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কারণ মুখের কিছু ব্যাকটেরিয়া চিনি ব্যবহার করে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেল ক্ষয় করতে পারে।

সাদা পাউরুটি, বিস্কুট, ক্র্যাকার্স, কেক ও অন্যান্য পরিশোধিত শর্করাজাতীয় খাবারও অতিরিক্ত না খাওয়াই ভালো। বিশেষ করে আঠালো বা দাঁতের সঙ্গে লেগে থাকে এমন মিষ্টি খাবার মুখের ভেতরে দীর্ঘ সময় থাকলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

ঘন ঘন লাল মাংস খাওয়ার অভ্যাস নিয়েও কিছু গবেষণায় মুখের অণুজীবের পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে। তাই খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য রাখা এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও চর্বিযুক্ত খাবারের বদলে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য ও পরিমিত প্রোটিন রাখা বেশি স্বাস্থ্যকর।

চা-কফিও পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। বিশেষ করে এগুলোতে বেশি চিনি মেশানো হলে দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

মুখের অণুজীবের ভারসাম্য ঠিক রাখতে খাবারের পাশাপাশি দৈনন্দিন পরিচর্যাও গুরুত্বপূর্ণ। দিনে অন্তত দুইবার ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা, দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মাড়ি থেকে নিয়মিত রক্ত পড়া, মুখে দুর্গন্ধ, দাঁতে ব্যথা, দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া কিংবা দীর্ঘদিন কোনও ঘা না শুকালে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মুখের ভেতর থাকা অণুজীবদের সবাইকে ‘শত্রু’ ভাবারও কারণ নেই। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত তাদের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখা। আর সেই ভারসাম্যের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি কমিয়ে স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার বেছে নেওয়াই হতে পারে সবচেয়ে সহজ পথ।

সূত্র: এনডিটিভি

/এমএএল/
সম্পর্কিত
জিরে দিয়ে ওজন কমানোর দাবি কতটা সত্য, জানুন বিশেষজ্ঞ মত
জ্বর-ব্যথায় নিজের মতো ওষুধ খেয়ে অজান্তেই ডেকে আনছেন বিপদ
বালিশ কত পুরনো হলে বদলাবেন? 
সর্বশেষ খবর
স্কুলের খাবার খেয়ে আবারও অসুস্থ শিক্ষার্থীরা, তদন্তে কমিটি
স্কুলের খাবার খেয়ে আবারও অসুস্থ শিক্ষার্থীরা, তদন্তে কমিটি
দল বেঁধে ভ্রমণে যাওয়ার আগে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
দল বেঁধে ভ্রমণে যাওয়ার আগে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
রাউটার রিস্টার্ট করলে কি স্পিড বাড়ে?
রাউটার রিস্টার্ট করলে কি স্পিড বাড়ে?
ই-জোন এইচআরএম লিমিটেডে বড় নিয়োগ
ই-জোন এইচআরএম লিমিটেডে বড় নিয়োগ
সর্বাধিক পঠিত
যুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহে পর্নোগ্রাফিকে বৈধতার পথে ইউক্রেন
যুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহে পর্নোগ্রাফিকে বৈধতার পথে ইউক্রেন
ডিভোর্স হয়েছে সৃজিত-মিথিলার? ইঙ্গিত দিলেন নির্মাতা নিজেই
ডিভোর্স হয়েছে সৃজিত-মিথিলার? ইঙ্গিত দিলেন নির্মাতা নিজেই
কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কত
কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কত
ফোর্বসের সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীদের তালিকা থেকে বাদ আজিজ খান
ফোর্বসের সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীদের তালিকা থেকে বাদ আজিজ খান
থাইল্যান্ড ছাড়লো মার্কিন বিমানবাহী রণতরি আব্রাহাম লিংকন
থাইল্যান্ড ছাড়লো মার্কিন বিমানবাহী রণতরি আব্রাহাম লিংকন