করোনা ভাইরাস: আমাদের জানা-অজানা এবং করণীয়

Send
আহসান হাবিব তন্ময়
প্রকাশিত : ১৬:২৭, মার্চ ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫২, মার্চ ১৯, ২০২০

করোনা আতঙ্কে কাঁপছে বিশ্ব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবকে মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশেও এ পর্যন্ত ১৭ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে অপরকে সচেতন করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু ভিত্তিহীন খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন কিছু খবর আমারও নজরে এসেছে। আমি চেষ্টা করব সেগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা দিতে এবং এসময় আমাদের কী করা উচিৎ সে ব্যাপারে আলোচনা করতে।
শুরু করা যাক সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরগুলো দিয়ে। একটি পোস্ট বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সেটি হলো ‘করোনা ভাইরাস চারদিন পর্যন্ত গলায় আটকে থাকে, গরম পানি খেলে ভাইরাস চলে যাবে।’ প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক মানুষের শরীর কীভাবে করোনা ভাইরাস (কোভিড -১৯) আক্রান্ত হয়। খুব সহজ ভাষায় কোভিড -১৯ এর গঠনের কথা বললে, এই ভাইরাসের বাইরে থাকে তৈলাক্ত লিপিড অণুর আবরণ (সাবানের সংস্পর্শে যা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে)। ভাইরাস নাক, মুখ বা চোখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে, তারপরে শ্বাসনালীর কোষগুলোতে সংযুক্ত হয়। ভাইরাসটি কোষের মেমব্রেনের সাথে তার তৈলাক্ত মেমব্রেনটি ফিউজ করে কোষকে সংক্রমিত করে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ২-১৪ দিন সময় লাগলেও, সংক্রমণের শুরু ভাইরাস শরীরে প্রবেশের সাথে সাথে হয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে, কোষে ভাইরাসটির আরও অনুলিপি তৈরি হয়। ভেঙে যাওয়ার এবং মরে যাওয়ার আগে, প্রতিটি সংক্রমিত কোষ ভাইরাসটির কয়েক মিলিয়ন কপি তৈরি করে। ভেঙে যাওয়া সংক্রমিত কোষ থেকে বের হওয়া ভাইরাসগুলো কাছের কোষগুলোকে সংক্রমিত করতে পারে বা হাঁচি কাশির ফোঁটার মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে আসতে পারে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসটি পরিষ্কার করার জন্য লড়াই করার কারণে করোনা ভাইরাস ( কোভিড -১৯ ) সংক্রমণে জ্বর হয়। মারাত্মক ক্ষেত্রে, প্রতিরোধ ব্যবস্থা ফুসফুসের কোষগুলোকে আক্রমণ করে। ফুসফুসে জমা তরল এবং মরে যাওয়া কোষগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যার ফলে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। তীব্র সংক্রমণের ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
উপরের করোনা ভাইরাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণের মাধ্যমে বোঝা যায় ভাইরাস চার দিন পর্যন্ত গলায় কিছু না করে বসে থাকবে না। আর এধরনের ভাইরাস সাধারণত ৩৮-৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে মারা যাওয়া শুরু করে। আর মনে রাখবেন ৪৮ ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশি গরম পানি খাওয়া মানুষের জন্য বিপদজনক। সেটি যদি আপনি করেনও, শতভাগ ভাইরাস আপনি মারতে পারবেন না। আরও একটি পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ‘রসুন সেদ্ধ পানি খেলে করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচা যাবে। সকালে খেলে রাতের মধ্যে কাজ হবে’- এ ধরনের তথ্যের কোনও প্রমাণ নেই। আর একটি বিষয় মনে রাখবেন, এটি যদি প্রমাণিত হয়, তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নয়, নেচার/ সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হবে, নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার মতো কাজ হবে। কিছু গবেষণা মতে, রসুনের অ্যান্টিবায়োটিক বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। কিন্তু কোনও প্রমাণ নেই যে এটি কোভিড -১৯ এর হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে। আর মনে রাখবেন, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে কিন্তু ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। মানুষের জন্য স্বস্তির খবর হলো ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের সিয়াটলে একটি গবেষণা কেন্দ্রে মনুষের শরীরে কোভিড -১৯ এর ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই খবরের সাথে আরও একটি খবর ছড়িয়ে পড়েছে যা পুরোপুরি সত্য নয়। মানুষ মনে করছে, আগমীকাল বা আগামী সপ্তাহ থেকে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। ব্যাপারটি এত সহজ নয়, বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ধাপ পার হতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এই ভ্যাকসিনটি কাজ করবে কিনা তা জানতে এখনও অনেক মাস সময় লাগবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ ধরনের অনেক ভুল ও ভিত্তিহীন খবর বিশ্বাস না করে আমদের যেটা করা উচিৎ সেটা হলো নিজে সচেতন হওয়া এবং অপরকে সচেতন করা। যেহেতু আমদের দেশে এরইমধ্যে ১৭ জন ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তাই সরকারের উচিৎ এটি ছড়িয়ে পড়া কীভাবে আটকানো যায় সেটা নিয়ে চিন্তা করা। অন্যকিছু দেশের মতো, কমপক্ষে ১৪ দিন ইমার্জেন্সি কিছু ছাড়া বাকি সব কিছু বন্ধ করা যেতে পারে। আজ থেকে আমাকেও আগামী ২১ দিন আমার বাসায় (ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যামেরিকা) বসে থাকতে হবে।
যাই হোক, কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন সে ব্যাপারে আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং আমাদের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এর ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া বেশ কিছু জনসচেতনতামূলক তথ্য আপানাদের সামনে তুলে ধরছি। প্রথমত, এটি কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা জানুন। অসুস্থতা প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হল এই ভাইরাসের সংস্পর্শ এড়ানো। ধারণা করা হয়, এই ভাইরাসটি মূলত মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। কাছাকাছি থাকা মানুষের মধ্যে (প্রায় ৬ ফুটের মধ্যে) ছড়িয়ে পড়তে পারে। যখন সংক্রামিত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দেই, তখন বের হওয়া শ্বাস প্রশ্বাসের ফোঁটাগুলির মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ছড়ানো ফোঁটাগুলো কাছাকাছি থাকা মানুষের নিঃশ্বাসের মাধ্যমে তাদের ফুসফুসে যেতে পারে। করোনা ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ নিন। আপনার হাত নিয়মিত পরিষ্কার করুন। কমপক্ষে ২০ সেকেন্ডের জন্য আপনার হাত নিয়মিত সাবান এবং পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। বিশেষত আপনি ঘরের বাইরে থাকার পরে এবং কাশি বা হাঁচি দেওয়ার পরে। যদি সাবান এবং পানি সহজে না পাওয়া যায় তবে কমপক্ষে ৬০% অ্যালকোহল আছে এমন হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন। আপনার সমস্ত হাতে এটি লাগিয়ে শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত দুই হাত একসাথে ঘষতে থাকুন। হাত না ধুয়ে আপনার চোখ, নাক এবং মুখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। জনসমগম হতে পারে এমন সবকিছু এড়িয়ে চলুন। অসুস্থ মানুষের কাছাকাছি যাবেন না, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রচুর পানি এবং পানি জাতীয় খাবার খান রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ঠিক রাখার জন্য। অন্যকে রক্ষা করার পদক্ষেপ নিন। আপনি অসুস্থ হলে বাড়িতেই থাকুন, চিকিৎসা নেওয়া ছাড়া। প্রয়োজন মনে হলে আইইডিসিআর এর হেল্প লাইনে ফোন করুন। আপনি যখন কাশি বা হাঁচি দেন, তখন আপনার মুখ এবং নাক আপনার কনুইয়ের অভ্যন্তরভাগ ব্যবহার করে অথবা টিস্যু দিয়ে ঢেকে রাখুন।ব্যবহৃত টিস্যু দ্রুত ডাস্টবিন ফেলে দিন। দ্রুত আপনার হাত সাবান এবং পানি দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ডের জন্য ধুয়ে ফেলুন। যদি সাবান এবং পানি সহজেই পাওয়া না যায় তবে কমপক্ষে ৬০% অ্যালকোহলযুক্ত একটি স্যানিটাইজার দিয়ে আপনার দুই হাত পরিষ্কার করুন। আপনি অসুস্থ হলে অবশ্যই ফেসমাস্ক পরুন। প্রতিদিন প্রায়শই স্পর্শ করা জিনিষগুলোকে পরিষ্কার করুন এবং জীবাণুনামুক্ত করুন। এর মধ্যে রয়েছে টেবিল, দরজার হ্যান্ডেল, ইলেকট্রিক সুইচ , কাউন্টারটপস, ফোন, কিবোর্ড, পানির কল ইত্যাদি। ৭০% অ্যালকোহল অথবা ব্লিচ ব্যবহার করতে পারেন। এগুলো কীভাবে পরিষ্কার রাখা যায় সে ব্যাপারে ইউটিউবে অনেক ভিডিও রয়েছে, বিশেষত ইলেকট্রিনিক সরঞ্জমাদির ব্যপারে। ভুল তথ্য নয়, সঠিক তথ্য জানার মাধ্যমে আমরা নিজেরা সচেতন হই এবং অপরকে সচেতন করি । আমাদের সচেতনতা পারে এই ভাইরাসের প্রকোপ থেকে আমাদের বহুলাংশে রক্ষা করতে।
শীঘ্রই আসতে পারে করোনা ভাইরাসের ঔষধ
বিখ্যাত নেচার সেল ডিসকভারি  জার্নালে আজকেই প্রকাশ পাওয়া একটি পেপার দাবি করছে, হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন ঔষধ, ক্লোরোকুইনের একটি কম বিষাক্ত ডেরাইভেটিভ, কোভিড-১৯ এর সংক্রমণকে বাধা দিতে কার্যকর। সম্ভবত চীনের হাসপাতালগুলো এই ঔষধটি ব্যবহার করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। প্রাথমিক ক্লিনিকাল তথ্যের আলোকে ন্যাশনাল হেলথ কমিশন অব দ্য পিপলস রিপাবলিক অব চায়না কোভিড-১৯ এর সংক্রামণ চিকিৎসায় পরীক্ষামূলক ওষুধের তালিকাতে ক্লোরোকুইনকে এরইমধ্যে যুক্ত করা করেছে। হাইড্রোক্সিলোরোকুইন এবং ক্লোরোকুইন, সাধারণত বাতজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ঔষধগুলির উপাদান পেরুভিয়ান সিনচোচা গাছের ছাল থেকে প্রাপ্ত। ক্লোরোকুইন দীর্ঘদিন ধরে ম্যালেরিয়া এবং অ্যামিবিয়াসিসের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পিএইচডি গবেষক: ইউসিএসসি (বায়োসেন্সরস’ অপটিক্যাল ন্যানোপ্রোব), ন্যানো ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া স্যান্টা ক্রুজ, ইউএসএ

/এনএ/

লাইভ

টপ