‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান, সত্য উদ্ঘাটন, বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আইন প্রণয়নের দাবিতে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন জাতীয় কমিটি’। এ সময় ১১ দলীয় ঐক্যজোটের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
রবিবার (৩০ আগস্ট) জমা দেওয়া এই স্মারকলিপিতে বলা হয়, গত প্রায় দেড় দশকে রাজনৈতিক বিরোধী নেতা-কর্মী, মতপ্রকাশকারী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে গোপন স্থানে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন একে প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কমিশনে জমা পড়া ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয় এবং ২৮৭টি ঘটনা ‘নিখোঁজ ও মৃত’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
‘আয়ানাঘর’-এর প্রসঙ্গ টেনে স্মারকলিপিতে বলা হয়, নাগরিকদের চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আইনের শাসন হতে পারে না।
২০২৪ সালের পরিবর্তনের পর গুম কমলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখনও অসম্পূর্ণ রয়েছে উল্লেখ করে স্মারকলিপিতে কোস্ট গার্ডের বিরুদ্ধে ওঠা মৎস্যজীবী মিরাজ শেখের গুমের সাম্প্রতিক অভিযোগ তুলে ধরা হয়। ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল তুলে নেওয়ার পর তার সন্ধান না মেলায় ১২ জুলাই হাইকোর্ট তাকে হাজির করার নির্দেশ দেন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) একে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম পরিচিত গুমের অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বর্তমানে সংসদে প্রক্রিয়াধীন ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় কমিটি জানায়, গুমের অভিযোগের তদন্তভার পুনরায় পুলিশের ওপর রাখা হলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হবে। কারণ যেসব বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারাই তদন্ত করলে বিচার নিরপেক্ষ হতে পারে না। পাশাপাশি কোনো গুম যদি ‘ওয়াইডস্প্রেড অর সিসটেমেটিক’ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, তবে কোন পর্যায়ে এবং কীভাবে তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হবে—তার সুস্পষ্ট আইনি প্রক্রিয়া নির্ধারণের জোর দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য অবিলম্বে একটি শক্তিশালী, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডসম্মত এবং ভুক্তভোগীবান্ধব আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশের যেসব বিধান ভুক্তভোগীদের অধিকতর সুরক্ষা, প্রতিকার ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করেছিল, সেগুলো নতুন আইনে অক্ষুণ্ণ রাখা এবং প্রয়োজনে আরও শক্তিশালী করার দাবি জানানো হয়।
গুমের অভিযোগের তদন্ত কোনো পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা বা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এককভাবে না দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে, বিশেষ করে যখন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে। এ জন্য গুমের অভিযোগ তদন্তে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত ও কার্যকর ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিশন বা স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা গঠনের দাবি জানানো হয়।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং দায়ীদের পদমর্যাদা বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভিত্তিতে কোনো দায়মুক্তি না দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
গত ১৫ বছরের সব গুমের ঘটনা পুনরায় যাচাই করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান নির্ধারণেরও দাবি জানানো হয়। জীবিতদের উদ্ধার এবং মৃতদের পরিবারের কাছে মরদেহের সন্ধান নিশ্চিত করে যথাযথ মর্যাদায় দাফনের ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে।
‘আয়ানাঘর’সহ সব গোপন আটককেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আলামত সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নির্দেশদাতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। গুম থেকে ফিরে আসা প্রত্যেক ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, সাক্ষ্যগ্রহণের সুরক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য সত্য জানার অধিকার, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তার নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
মিরাজ শেখের ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশ অবিলম্বে বাস্তবায়ন করে তার অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
গুম প্রতিরোধ আইনে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়ের বিষয়টি স্পষ্ট করার দাবি জানিয়ে বলা হয়েছে, এতে নির্দেশদাতারা দায় এড়াতে পারবেন না। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধ আইন পাসের আগে ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে স্বচ্ছ ও পর্যাপ্ত পরামর্শের দাবি জানানো হয়।
‘ওয়াইডস্প্রেড অর সিসটেমেটিক’ প্রকৃতির গুমের ক্ষেত্রে তদন্তের শুরু থেকেই এখতিয়ার নির্ধারণের সুস্পষ্ট আইনগত পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া আইনে স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পাশাপাশি কোনো সাধারণ ব্যক্তি, অপরাধী চক্র বা নন-স্টেট অ্যাকটরের মাধ্যমে সংঘটিত গুম ও আটকও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ২০০৯–২০২৪ সময়ে অপব্যবহৃত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো পুনঃপর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখার দাবি জানানো হয়েছে।









