ওজন কমাতে তাড়াহুড়ো কেন ক্ষতিকর জানালেন ফিটনেস বিশেষজ্ঞ

জীবনযাপন ডেস্ক 
১৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৫আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৫

দ্রুত ওজন কমানোর প্রবণতা এখন বিশ্বজুড়ে বেড়েই চলেছে। কঠোর ডায়েট, অতিরিক্ত ব্যায়াম কিংবা ওজন কমানোর ইনজেকশনের মাধ্যমে অল্প সময়ে দৃশ্যমান ফল পাওয়া গেলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো ‘স্লো-বার্ন অ্যাপ্রোচ’—অর্থাৎ ধীরে ধীরে এবং টেকসইভাবে ওজন কমানো।

স্থূলতা বর্তমানে একটি বড় জনস্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (এনএফএইচএস)-৫ অনুযায়ী, অনেক দেশেই এখন অধিকাংশ নারী-পুরুষ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় ভুগছেন। ফলে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে ভারতীয় ফিটনেস কোচ রাজ গণপত বলেন, অধিকাংশ মানুষ ওজন কমানোকে একটি স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে দেখেন। তারা মনে করেন কয়েক মাস কঠোর ডায়েট ও ব্যায়াম করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় লক্ষ্য পূরণের পর। তখন অনেকেই আবার আগের জীবনধারায় ফিরে যান এবং হারানো ওজন ফের বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য কোনও পরীক্ষার মতো নয়, বরং একটি চাকরির মতো। যতদিন নিয়ম মেনে চলবেন, ততদিন ফল পাবেন। নিয়ম ভাঙলেই ফলও হারিয়ে যেতে শুরু করবে।”

ওজন কমানো নয়, ওজন ধরে রাখাই আসল লক্ষ্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্লো-বার্ন অ্যাপ্রোচ মূলত ওজন কমানোর চেয়ে নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। এর লক্ষ্য এমন অভ্যাস গড়ে তোলা, যা কয়েক সপ্তাহ নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে বজায় রাখা যায়।

রাজ গণপত বলেন, “ওজন কমানো এই যাত্রার শুধু একটি ধাপ। আসল বিষয় হলো এমন জীবনধারা তৈরি করা, যা দীর্ঘ সময় ধরে অনুসরণ করা যায় এবং যার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখা সম্ভব।”

স্বাস্থ্যকর ওজন কমানোর হার কত

অনেকেই দ্রুত ফল চান। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি সপ্তাহে শরীরের মোট ওজনের শূণ্য দশমিক ২৫ থেকে এক শতাংশ কমানোই সবচেয়ে নিরাপদ ও টেকসই পদ্ধতি।

রাজ গণপত বলেন, “এই হার অনেকের কাছে ধীরগতির মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সফলতা আসে ধীরে ধীরে অর্জিত পরিবর্তনের মাধ্যমে। ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফলাফল কতদিন ধরে ধরে রাখা যায়।”

মেটাবলিজম ও হরমোনের ভূমিকা

ওজন কমানোর বিষয়টি সবার জন্য এক নয়। কারণ প্রত্যেক মানুষের মেটাবলিজম, হরমোন, বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও জীবনধারা ভিন্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের প্রধান লক্ষ্য হলো টিকে থাকা, ওজন কমানো নয়। তাই ক্যালোরি ঘাটতি তৈরি হলে শরীর নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

রাজ গণপত বলেন, “ধীরে ধীরে ওজন কমালে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে, শক্তির মাত্রা স্থিতিশীল থাকে এবং মানুষ সহজে ব্যায়াম ও দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু অতিরিক্ত কঠোর ডায়েট ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়, শক্তি কমিয়ে দেয় এবং অনেককে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে।”

তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি সফলতা আসে তখনই, যখন মানুষ শরীরের বিরুদ্ধে না গিয়ে শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তন আনে।

স্বাস্থ্য কি শুধু ওজনের সংখ্যায় মাপা যায়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওজন কমার হারই স্বাস্থ্যের একমাত্র সূচক নয়। অনেক সময় ওজনের মাপে বড় পরিবর্তন না এলেও শরীরের চর্বি কমে এবং পেশি বৃদ্ধি পায়।

রাজ গণপত বলেন, “অনেক মানুষ একই সঙ্গে চর্বি কমাচ্ছেন এবং পেশি বাড়াচ্ছেন। ফলে স্কেলে অগ্রগতি ধীর মনে হতে পারে। কিন্তু শরীরের ভেতরে ইতিবাচক পরিবর্তন চলতেই থাকে।”

ঘুমের মান উন্নত হওয়া, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ, শক্তি বৃদ্ধি, মানসিক সুস্থতা এবং শারীরিক সক্ষমতার উন্নতিও সুস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

স্লো-বার্ন ডায়েট কেমন হওয়া উচিত

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবার জন্য উপযোগী কোনও নির্দিষ্ট ডায়েট নেই। তবে কিছু মৌলিক বিষয় প্রায় সবার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখা
  • বেশি ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া
  • পর্যাপ্ত পানি পান করা
  • খাবারের পরিমাণ সম্পর্কে সচেতন থাকা

রাজ গণপত বলেন, “প্রোটিন পেশি ধরে রাখতে ও দীর্ঘ সময় তৃপ্তি দিতে সাহায্য করে। ফাইবার ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে এবং হজম ভালো রাখে। আর পর্যাপ্ত পানি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”

তার মতে, কঠোর ডায়েটের চেয়ে সুষম খাদ্যাভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।

কোন ব্যায়াম সবচেয়ে ভালো

হাঁটা, দৌড়ানো, সাইক্লিং, যোগব্যায়াম, স্ট্রেংথ ট্রেনিং কিংবা গ্রুপ ফিটনেস ক্লাস—কোনটি সবচেয়ে কার্যকর, এ প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়।

রাজ গণপতের উত্তর, “সবচেয়ে ভালো ব্যায়াম হলো সেটি, যা আপনি নিয়মিত করতে পারবেন।”

তবে তিনি স্ট্রেংথ ট্রেনিংকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। কারণ এটি পেশি বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে সহায়তা করে, যা দীর্ঘমেয়াদি ওজন নিয়ন্ত্রণ, শক্তি বৃদ্ধি এবং মেটাবলিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, স্লো-বার্ন অ্যাপ্রোচের মূল দর্শন হলো দ্রুত ফলের পেছনে না ছুটে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমানো কোনও স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জীবনধারা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। তাই টেকসই ফল পেতে হলে কঠোর নিয়ন্ত্রণের বদলে ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

সূত্র: এনডিটিভি

 

/এমএএল/ 
সম্পর্কিত
ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, শরীরের নীরব পুনর্জন্ম
‘রাশিয়ান’ ম্যানিকিউর ট্রেন্ডে মাতছেন অনেকে, বাড়ছে সংক্রমণের শঙ্কা
কখন বুঝবেন সম্পর্ক থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় এসেছে
সর্বশেষ খবর
ডাকলেই হাজির হবে রোবট টয়লেট!
ডাকলেই হাজির হবে রোবট টয়লেট!
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাখায় আপত্তি নেই ট্রাম্পের
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাখায় আপত্তি নেই ট্রাম্পের
গর্বিত বাংলাদেশি হওয়ার আরেকটি কারণ দেওয়ায় বিকেএসপিকে ধন্যবাদ জানালেন জাইমা রহমান 
গর্বিত বাংলাদেশি হওয়ার আরেকটি কারণ দেওয়ায় বিকেএসপিকে ধন্যবাদ জানালেন জাইমা রহমান 
এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার দলিল: গালিবাফ
এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার দলিল: গালিবাফ
সর্বাধিক পঠিত
‘বাক্সের কাঁকড়া’: যে কারণে নিজের পরিবারই আপনার উন্নতিতে অখুশি!
‘বাক্সের কাঁকড়া’: যে কারণে নিজের পরিবারই আপনার উন্নতিতে অখুশি!
প্রধানমন্ত্রী পৌঁছানোর আগেই ভেঙে পড়লো সভামঞ্চের প্যান্ডেল
প্রধানমন্ত্রী পৌঁছানোর আগেই ভেঙে পড়লো সভামঞ্চের প্যান্ডেল
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ৭ দাবির সঙ্গে একমত গভর্নর
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ৭ দাবির সঙ্গে একমত গভর্নর
অবশেষে মাকে নিয়ে সুখবর পেলেন ভোজিনহা
অবশেষে মাকে নিয়ে সুখবর পেলেন ভোজিনহা
সকালে সিলেটে প্রধানমন্ত্রীর বকুনি, বিকালে সংসদে এমপি
সকালে সিলেটে প্রধানমন্ত্রীর বকুনি, বিকালে সংসদে এমপি