জীবন অনেক সহজ হয় যদি আপনি আপনার নিতম্ব, হাঁটু, কনুই ও কাঁধের যত্ন নেন—বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। রিউমাটোলজিস্ট ও অর্থোপেডিক সার্জনরা ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে ব্যায়াম করবেন, কী খাবেন এবং কীভাবে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলবেন।
আমাদের শরীর অসাধারণ এক যন্ত্রের মতো, তবে সমস্যা না হওয়া পর্যন্ত আমরা এর কার্যপ্রণালিকে অনেক সময়ই গুরুত্ব দিই না। তাহলে কীভাবে আমরা সারা জীবন সুস্থ জয়েন্ট বজায় রাখতে পারি এবং সার্জারি এড়াতে পারি? এখানে রিউমাটোলজিস্ট ও অর্থোপেডিক সার্জনরা দিয়েছেন তাদের পরামর্শ…
যতটা সম্ভব বেশি নড়াচড়া করুন
যুক্তরাজ্যের চিফ মেডিকেল অফিসারদের মতে, আমাদের সবারই সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম (যেমন দ্রুত হাঁটা বা সাইক্লিং) অথবা ৭৫ মিনিট উচ্চমাত্রার ব্যায়াম (যেমন দৌড়ানো) করা উচিত।
তবে ইস্ট সাসেক্স হেলথকেয়ার এনএইচএস ট্রাস্টের কনসালট্যান্ট অর্থোপেডিক সার্জন অধ্যাপক স্কারলেট ম্যাকনালি বলেন, ইংল্যান্ডের প্রায় ২৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক সপ্তাহে ৩০ মিনিটেরও কম এমন ব্যায়াম করেন, যা করলে শ্বাসকষ্ট হয়। তিনি বলেন, “আপনি যদি সামান্যও এটি বাড়াতে পারেন, তাহলে এর বড় ধরনের স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যাবে।”
আর্থ্রাইটিস—অর্থাৎ জয়েন্টে ব্যথা ও শক্তভাব—খেলাধুলা ও ব্যায়ামে অংশগ্রহণ বাড়লে কমতে পারে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অর্থোপেডিক সার্জন অধ্যাপক অ্যালিস্টার হার্ট।
ম্যাকনালি বলেন, শরীরকে সক্রিয় রাখলে জয়েন্টগুলো শক্ত থাকে এবং নড়াচড়া বজায় রাখলে ব্যথাও কমানো সম্ভব।
প্রেস্টনের কনসালট্যান্ট রিউমাটোলজিস্ট ডা. এলিজাবেথ ম্যাকফি বলেন, “যেসব রোগীর জয়েন্ট, মাংসপেশি বা টেনডনে প্রচুর ব্যথা থাকে, তাদের ক্ষেত্রে ব্যায়াম করা ভীতিকর মনে হতে পারে। আমাদের উচিত রোগীদের সাহায্য করা যাতে তারা আর্থ্রাইটিস থাকলেও কীভাবে জয়েন্টের যত্ন নিতে হয় তা বুঝতে পারে।”
এ ধরনের শুরু করার জন্য অনলাইনে বিভিন্ন রিসোর্সও রয়েছে, যেমন Moving Medicine—যা ব্যায়াম শুরু করতে সহায়তা করতে পারে।
ব্যথা ও অস্বস্তির প্রতি খেয়াল রাখুন
সাধারণভাবে চলাফেরাই ওষুধের মতো কাজ করে বলে মনে করেন হার্ট। তিনি বলেন, “একজন অর্থোপেডিক সার্জন হিসেবে ওয়ার্ড রাউন্ডে যখন আপনি হিপ ফ্র্যাকচার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের দেখেন, তখন প্রথমেই আপনি বলেন—‘আমাদের আপনাকে উঠে চলাফেরা করাতে হবে। এটি টিস্যু নিরাময়ে সাহায্য করবে, কারণ এতে এমন কিছু রাসায়নিক নিঃসৃত হয় যা সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াকে উন্নত করে।’”
গ্লুট ব্রিজ অনুশীলন করুন
হার্ট বলেন, সবচেয়ে কার্যকর ব্যায়ামগুলোর একটি হলো গ্লুট ব্রিজ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ব্যায়ামটি করতে হলে চিত হয়ে শুয়ে হাঁটু ৯০ ডিগ্রি ভাঁজ করতে হবে এবং কোমর (পেলভিস) ওপরের দিকে তুলতে হবে। যদি হাঁটুর ওপরের অংশে একটি রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড ব্যবহার করা হয়, তাহলে গ্লুট মাংসপেশি আরও ভালোভাবে কাজ করে, যা নিতম্ব ও হাঁটু উভয়েরই উপকার করে।
…এবং স্কোয়াট
স্কোয়াটও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যায়াম। ম্যাকনালি বলেন, “আপনি যদি পড়ে যান এবং উঠে দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে খুব দ্রুতই অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন। তাই গ্লুটস এবং উরুর পেশি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।” এই পেশিগুলো স্কোয়াটের মাধ্যমে শক্তিশালী করা যায়।
বিকল্প হিসেবে তিনি বলেন, “যদি আপনার বাসায় সিঁড়ি থাকে, তাহলে ওঠানামা করাও খুব ভালো ব্যায়াম।”
পার্করানে অংশ নিন
হার্ট বলেন, “দৌড়ানোর মতো ইমপ্যাক্ট স্পোর্টসকে অনেক সময় নেতিবাচকভাবে দেখা হয়, ধরে নেওয়া হয় এগুলো শরীরের ক্ষতি করে।” তবে বাস্তবে, “হাড়ের সঙ্গে যুক্ত পেশি ও টেনডন সুস্থ রাখতে ইমপ্যাক্ট বা চাপ প্রয়োজন।”
হার্ট ৫ কিলোমিটার দৌড়ানোকে “গোল্ডিলক্স ডোজ” হিসেবে বর্ণনা করেন, অর্থাৎ এটি না খুব বেশি, না খুব কম—একটি ভারসাম্যপূর্ণ মাত্রা। ম্যাকনালি বলেন, এতে হাঁটাহাঁটির মাধ্যমেও অংশ নেওয়া যায়।
যদি দৌড়াতে না পারেন, সাঁতার কাটুন
লন্ডনের কনসালট্যান্ট রিউমাটোলজিস্ট ও Are You Really the Doctor? বইয়ের লেখক ডা. ম্যাথিউ হাচিনসন বলেন, ‘‘কম-ইমপ্যাক্ট এরোবিক ব্যায়াম যেমন সাঁতার “নিশ্চিতভাবে জয়েন্টের কার্যক্ষমতা বাড়াতে এবং ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।”
ম্যাকফি বলেন, “যাদের জয়েন্টে ব্যথা আছে, তাদের জন্য পানিতে নেমে ব্যায়াম করা সবসময়ই সহজ।”
তিনি আরও বলেন, শুধু সাঁতার নয়, পুলে হাঁটাচলা করা বা পানির মধ্যে হালকা স্ট্রেচিং করাও শুরু করার জন্য ভালো উপায়।
ব্যায়ামের পর স্ট্রেচিং করতে ভুলবেন না
আমাদের অনেকেই ব্যায়ামের পর স্ট্রেচিং করেন না। হার্ট বলেন, “এটাকে বড় কিছু ভাবার দরকার নেই। মাত্র দুই মিনিট স্ট্রেচিং করলেও তা না করার চেয়ে অনেক ভালো।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত চাপ নেওয়া উচিত নয়। “আপনার জয়েন্টকে তার স্বাভাবিক নড়াচড়ার সীমার মধ্যেই রাখুন।”
স্ট্রেংথ ট্রেনিংয়ের জন্য সময় রাখুন
স্ট্রেংথ ট্রেনিং—অর্থাৎ ওজন ও রেজিস্ট্যান্স ব্যায়াম—হলো “আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এটি শুরু করার জন্য কখনোই খুব দেরি বা খুব তাড়াও নয়,” বলেন হার্ট।
ম্যাকনালি বলেন, “আপনি এমন কিছু খুঁজে বের করুন যা করতে পারবেন—যেমন সাইক্লিং, স্টেশনারি সাইক্লিং বা সাঁতার। পেশি শক্তিশালী রাখুন এবং সুস্থ পায়ের ওপর ভারসাম্য অনুশীলন করুন। যদি আপনি ভারসাম্য রাখতে পারেন, তাহলে টয়লেটে যাওয়া-আসা সহজ হবে এবং হাসপাতালে আটকে থাকার ঝুঁকিও কমবে।”
কন্ডিশনিংই মূল বিষয়
হার্ট বলেন, আঘাত এড়াতে স্ট্রেংথ ট্রেনিংয়ের সঙ্গে কন্ডিশনিং—অর্থাৎ কার্ডিওভাসকুলার বা এরোবিক ব্যায়াম—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “সব পেশাদার খেলোয়াড়ই এটি জানেন, কিন্তু বিষয়টি হলো এই অভ্যাস আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া, যারা একটু স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করার চেষ্টা করছি।”
হাচিনসন আরও বলেন, “জয়েন্টের চারপাশে ও জয়েন্টকে সমর্থনকারী পেশিগুলো যত শক্তিশালী হবে, জয়েন্টকে স্থিতিশীল রাখতে তত কম চাপ পড়বে।”
জয়েন্টের কথা মাথায় রেখে খাবার নির্বাচন করুন
হাচিনসন বলেন, “একটি স্বাস্থ্যকর, কম প্রক্রিয়াজাত (নন-প্রসেসড) ডায়েট অনুসরণ করার চেষ্টা করুন, যেখানে থাকবে প্রচুর হোল ফুড, তাজা ফল ও শাকসবজি।”
ভিটামিন ডি এবং কে সাপ্লিমেন্ট হিসেবে গ্রহণ করা উপকারী বলে মনে করেন হার্ট।
ম্যাকফি বলেন, সাধারণ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা ঠিক আছে, তবে শীতকালে ভিটামিন ডি৩ (কোলেক্যালসিফেরল) ৪০০ আইইউ মাত্রায় নেওয়াই সবচেয়ে ভালো বিকল্প।
তিনি আরও বলেন, কড লিভার অয়েলও জয়েন্টের জন্য উপকারী। এতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা কিছুটা প্রদাহনাশক (anti-inflammatory) প্রভাব রাখতে পারে।
প্রয়োজনে ওজন কমান
হাচিনসন বলেন, যদি কারও অতিরিক্ত ওজন থাকে, তাহলে ওজন কমালে জয়েন্টের ওপর চাপ কমে যায়। তিনি আরও বলেন, “এছাড়াও কিছু প্রমাণ রয়েছে যে অতিরিক্ত শরীরের চর্বি প্রদাহ (ইনফ্ল্যামেশন) বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই GLP-1 ওষুধের দ্বৈত ভূমিকা নিয়ে অনেক আগ্রহ রয়েছে।”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমি বলছি না যে জয়েন্টের জন্য সবাইকে GLP-1 নিতে হবে, তবে ওজন কমলে জয়েন্টের ওপর চাপ কমে এবং মেটাবলিক সমস্যাজনিত প্রদাহও কমতে পারে—এটাই এর সম্ভাব্য উপকার।”
আপনার ব্যথা সঠিকভাবে বর্ণনা করতে শিখুন
রিউমাটোলজিস্টরা অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অজানা বা ব্যাখ্যাতীত ব্যথার সঙ্গে কাজ করেন। হাচিনসন বলেন, “ব্যথা বর্ণনা করা খুবই কঠিন।” তাই কীভাবে এটি ডাক্তারকে সঠিকভাবে বোঝানো যায়?
তিনি পরামর্শ দেন, “একটি ডায়েরি রাখার চেষ্টা করুন—ব্যথা কখন শুরু হয়, দিনের কোন সময়ে হয়, কতক্ষণ থাকে। ব্যথা কি নির্দিষ্ট জয়েন্টে হয়? কোন কিছু কি এটি বাড়ায় বা কমায়?”
তার মতে, এভাবে তথ্য রাখলে রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে একই ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হয়, যা সঠিক চিকিৎসা নির্ধারণে সাহায্য করে।
ধূমপান ত্যাগ করুন
হাচিনসন বলেন, “আমি যে প্রায় সব ধরনের রোগের কথা ভাবতে পারি, বিশেষ করে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে—ধূমপান করবেন না,” কারণ এটি রোগের অবস্থা আরও খারাপ করে।
তিনি আরও বলেন, “রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ধূমপানের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং এটি রোগের তীব্রতা বাড়ায়।”
পায়ে কী পরছেন সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন
কার্বন-প্লেটেড জুতা দৌড়ানোর সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। হার্ট বলেন, “এগুলো মূলত বায়োমেকানিক্স পরিবর্তন করে সুবিধা তৈরি করে।”
তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও আছে। তিনি বলেন, “এটি শরীরের ওপর পড়া চাপের ধরন বদলে দেয়, এবং যদি সেই অনুযায়ী পেশি শক্তিশালী না করা থাকে, তাহলে অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।” এতে স্ট্রেস ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “তথ্য-উপাত্ত এখনো খুব সীমিত, তবে পরিবর্তন আছে—এবং সেই পরিবর্তন গতি বাড়ায়, কিন্তু আঘাতের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। বারফুট (নগ্নপা) জুতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি থাকে। কোনো জুতাই সবসময় পরার জন্য আদর্শ নয়।”
ম্যাকনালি বলেন, “সক্রিয় জীবন শুরু করার জন্য মানুষের দামী সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই। যেকোনো আরামদায়ক এবং সাশ্রয়ী জুতা হলেই চলবে।”









