সকালে দাঁত ব্রাশ করার পর মাউথওয়াশ দিয়ে কুলকুচি অনেকেরই দৈনন্দিন পরিচর্যার অংশ। মুখের দুর্গন্ধ দূর করা থেকে শুরু করে দাঁত ও মাড়ির বিভিন্ন সমস্যা নিয়ন্ত্রণে মাউথওয়াশ ব্যবহারের চল রয়েছে। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি উঠেছে, নিয়মিত মাউথওয়াশ ব্যবহারে মুখের উপকারী ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে, এমনকি এর প্রভাব পড়তে পারে হৃদ্যন্ত্র, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার ওপরও।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। গবেষণায় কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত মিলেছে ঠিকই, কিন্তু মাউথওয়াশ ব্যবহার করলেই গুরুতর রোগ হবে এমন প্রমাণ এখনও নেই। বরং কোন ধরনের মাউথওয়াশ, কত ঘন ঘন এবং কী কারণে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
মুখের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মুখের ভেতরে নানা ধরনের অণুজীবের একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য থাকে। এর মধ্যে কিছু ব্যাকটেরিয়া দাঁত ও মাড়ির সমস্যার জন্য দায়ী হলেও, কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া মুখের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ডেন্টিস্ট্রির পেরিওডন্টিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিবেক থুম্বিগেরে-মাথ বলেন, ভালো মুখের যত্নের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করা, পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোর ভারসাম্যও বজায় রাখা।
তার মতে, দাঁত ব্রাশ করা, ফ্লস করা এবং নিয়মিত পেশাদারভাবে দাঁত পরিষ্কার করানোই এই লক্ষ্য পূরণের মূল উপায়।
সব মাউথওয়াশ কি এক রকম?
মাউথওয়াশ মূলত দুই ধরনের থেরাপিউটিক ও কসমেটিক।
থেরাপিউটিক মাউথওয়াশে এমন সক্রিয় উপাদান থাকে, যা ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। মুখের দুর্গন্ধ, মাড়ির রোগ বা দাঁতের ক্ষয়ের মতো নির্দিষ্ট সমস্যায় এগুলো উপকারী হতে পারে।
অন্যদিকে কসমেটিক মাউথওয়াশ মূলত সাময়িকভাবে মুখের দুর্গন্ধ দূর করে এবং মুখে সতেজ অনুভূতি দেয়। এতে সাধারণত জীবাণু ধ্বংসকারী সক্রিয় উপাদান থাকে না।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ডেন্টিস্ট্রির অধ্যাপক ডা. পূর্ণিমা কুমারের মতে, সপ্তাহে একবার বা মাসে একবারের মতো মাঝে মধ্যে মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে মুখের স্বাস্থ্য বা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম।
তবে নির্দিষ্ট কিছু মাউথওয়াশ দিনে একাধিকবার করে দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে কিছু ক্ষতিকর প্রভাব দেখা দিতে পারে।
মাইক্রোবায়োমে কী প্রভাব পড়ে?
এ নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। কিছু সীমিত ও প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিসেপটিক উপাদানযুক্ত নির্দিষ্ট মাউথওয়াশ মুখের মাইক্রোবায়োমের স্বাভাবিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষ করে ক্লোরহেক্সিডিনযুক্ত মাউথওয়াশ নিয়ে এমন কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২০ সালের একটি ছোট গবেষণায় ৩৬ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ক্লোরহেক্সিডিনযুক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহারের পর তাদের লালার মাইক্রোবায়োমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। একই সঙ্গে মুখের অম্লতা বেড়ে যায় এবং স্বাস্থ্যকর রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কমে যায়।
তবে গবেষণাটি ছিল ছোট পরিসরের। তাই এর ফলাফল থেকে সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রভাব পড়বে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
হৃদ্স্বাস্থ্য ও রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্ক কী?
ক্রমবর্ধমান কিছু গবেষণায় মুখের মাইক্রোবায়োম এবং হৃদ্স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ডা. কুমার জানান, মুখের কিছু ব্যাকটেরিয়া খাবার থেকে পাওয়া নাইট্রেটকে নাইট্রিক অক্সাইডে রূপান্তর করে। নাইট্রিক অক্সাইড রক্তনালিকে শিথিল করতে এবং রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
কিছু গবেষণায় আবার দীর্ঘদিন নিয়মিত মাউথওয়াশ ব্যবহারের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব গবেষণার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে মাউথওয়াশ ব্যবহারের কারণেই এসব রোগের ঝুঁকি বাড়ে এমন কারণ-ফল সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত হয়নি।
মাউথওয়াশে জ্বালা বা ঘা হতে পারে?
হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালকোহল বা পারঅক্সাইডযুক্ত মাউথওয়াশ মাড়ি, জিহ্বা, গালের ভেতরের অংশসহ মুখের নরম টিস্যুতে জ্বালা বা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া কিছু এসেনশিয়াল অয়েল বা ফোমিং এজেন্টের কারণে জ্বালাপোড়া, ঘা বা আলসার হতে পারে। বিরল ও গুরুতর ক্ষেত্রে মুখের ভেতরের আবরণ উঠে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
কোন মাউথওয়াশ বেছে নেবেন?
প্রয়োজন অনুযায়ী মাউথওয়াশ বেছে নেওয়াই ভালো। একসঙ্গে নানা ধরনের সমস্যা সমাধানের দাবি করে এমন একাধিক সক্রিয় উপাদানযুক্ত পণ্যের বদলে নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য উপযোগী মাউথওয়াশ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
দাঁতে ক্যাভিটি বা ক্ষয়ের ঝুঁকি বেশি হলে ফ্লোরাইডযুক্ত মাউথওয়াশ উপকারী হতে পারে। এটি ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করার চেয়ে দাঁতের এনামেল শক্তিশালী করতে বেশি ভূমিকা রাখে।
মুখ শুষ্ক থাকলে এমন মাউথওয়াশ বেছে নেওয়া যেতে পারে, যাতে লালা নিঃসরণ বাড়াতে বা লালার মতো কাজ করতে সহায়ক উপাদান রয়েছে।
আর যাদের মুখ শুষ্ক, মুখে ঘা রয়েছে কিংবা দাঁত ও মাড়ি সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে অ্যালকোহলমুক্ত মাউথওয়াশ বেছে নেওয়া ভালো। সংবেদনশীল দাঁত থাকলে ঘন ঘন দাঁত সাদা করার মাউথওয়াশ ব্যবহারও এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কিছু দাঁতের চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের পর যখন স্বাভাবিকভাবে দাঁত ব্রাশ বা ফ্লস করা সাময়িকভাবে সম্ভব হয় না, তখন চিকিৎসকের পরামর্শে থেরাপিউটিক মাউথওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে।
মাউথওয়াশ কি প্রতিদিন ব্যবহার করতেই হবে?
বেশির ভাগ মানুষের জন্য মাউথওয়াশ ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়। দাঁত ব্রাশ করা, ফ্লস করা এবং নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ ও পেশাদারভাবে দাঁত পরিষ্কার করানোর কোনও বিকল্প নেই।
ডা. কুমারের ভাষায়, মাউথওয়াশ এমন কোনো জিনিস নয়, যা সারা জীবন প্রতিদিন ব্যবহার করতেই হবে, বিশেষ করে সেটি যদি প্রেসক্রিপশনভিত্তিক হয়।
তাই মাউথওয়াশকে দৈনন্দিন মুখের পরিচর্যার অপরিহার্য অংশ না ভেবে প্রয়োজন অনুযায়ী এবং সঠিক ধরনের পণ্য বেছে নিয়ে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর কোনও নির্দিষ্ট দাঁত বা মাড়ির সমস্যা থাকলে নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন মাউথওয়াশ ব্যবহার না করে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
সূত্র: দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস









