X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

কামরুল হাসান ও তার ছবির রাজনীতি

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:২৮

কামরুল হাসান, মানে পটুয়া কামরুল হাসান। ছিলেন দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী। আজ তার জন্মের একশ বছর পূর্ণ হলো। এ ধরনের চিত্রশিল্পীদের একশবছর পূর্ণ হলেও কার কি যায় আসে জানি না। তবু এই বিদ্রোহী শিল্পীকে স্মরণ করতেই হয়। তার কাজ, তার চেতনা, তারপর শৈল্পিক দায়বদ্ধতা ছিলো একদম আলাদা। এই মহান শিল্পীর পারিবারিক নাম নাম আবু শরাফ মোহাম্মদ কামরুল হাসান। ১৯২১ সালের ২ ডিসেম্বর পিতার কর্মস্থল কলকাতায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার নারেঙ্গা গ্রামে। পিতা মোহাম্মদ হাশিম ছিলেন তিলজলা গোরস্তানের সুপারিনটেন্ডেন্ট। কামরুল হাসানের শিক্ষাজীবন কাটে কলকাতায়। ছাত্রজীবনে চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি তিনি বয়েজ-স্কাউট, শরীর চর্চা, ব্রতচারী আন্দোলন, শিশুসংগঠন মণিমেলা, মুকুল ফৌজ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। এখানে একটা কথা না বললেই নয় শিল্পচর্চায় কামরুল হাসানের হাতেখড়ি হয় মূলত গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী আন্দোলনের মাধ্যমে। ১৯৩২ সালে উৎপত্তি লাভ করা ব্রতচারী আন্দোলনের মধ্যদিয়ে ভেতরে একটা বদলের তৃষ্ণা থেকেই কামরুল হাসান যোগ দেন ব্রতচারী আন্দোলনে। সেটা খুবই কম বয়সের কথা। যত কম বয়সই হোক দেশপ্রেমে একবার উদ্বুদ্ধ হলে তাকে আর ফেরায় কে? দেশপ্রেম সৃষ্টিই ছিল ব্রতচারী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। সেই কম বয়স থেকেই ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব অফার দেশপ্রেমের একাত্মতা তার চিত্রকলাকে রাজনীতিসচেতন করেছিল। এই ব্রতচারী আন্দোলনের সাথে থেকে লোকনৃত্য ও লোকসঙ্গীত চর্চার পাশাপাশি দেশের প্রতি একধরনের টান অনুভব করতে শুরু করেন কামরুল হাসান। ধীরে ধীরে প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখাও শুরু হয় সেখান থেকেই। অর্থাৎ, বাংলার প্রগতিবাদী সংগ্রামের সঙ্গে বেশ আগে থেকেই যুক্ত ছিলেন। তার মধ্যে শিল্পকলা আর রাজনীতি দুটো এক হয়ে যায়। বিশেষত ব্রতচারী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ গুরুসদয় দত্ত একবার তার সঙ্গে ব্রতচারীর এক সম্মেলনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্পী মটরুর সঙ্গে। মটরুর সরাচিত্র তাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিল। বাংলাদেশে আসার পরে এদেশের সরাচিত্র তাকে আলোড়িত করে। ওই সরাচিত্রের রেখার মাধ্যমে তিনি হিউম্যান এনাটমির প্রচল ধারাকে ভাংতে পেরেছিলেন এটা যেমন একটা দিক আরেকটা দিক ছিলো কিউবিজমের চর্চা। তিনি পিকাসোর এত ভক্ত ছিলেন যে তিনি পিকাসোকে খুবভাবে অনুসরণ করতেন। পিকাসোর কিউবিজম চর্চার যে ডিবহিউমাইনাজেশন বা বিমানবিকীকরণকে তিনি সরাচিত্রের রেখার সঙ্গে ব্যবহার করে তার চিত্ররীতির প্রাতস্বিক ধারা নির্মাণ করেছিলেন। অন্যদিকে পিকোসোদের যে আবাজার্দ নামের পলিটিক্যাল আন্দোলন কিংবা বলা যায় পোস্টমডার্ন শিল্পীদের যে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ তাও কামরুল হাসানের তৈরি হয়েছিলো শৈশব থেকে। ফলে পিকাসোকে অনুসরণ কিউবিজমের চর্চা আর রাজনৈতিক আন্দোলন সবইড তার জীবনের অংশ ছিলো। যে কারণে আমরা দেখি ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগ হলে তিনি ঢাকা চলে আসেন। তার যে সহজাত প্রবৃত্তি শিল্পকে ছড়িয়ে দেওয়া যে একটা আন্দোলন সেটা তিনি ভেতর থেকেই শুরু করেছিলেন। তাই দেশভাগের পরে বাংলাদেশে এসেও বসে থাকেননি। শিল্পান্দোলন শুরু করেছিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে মিলিত হয়ে ঢাকায় একটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৪৮ সালে। ঢাকায় চিত্রকলার চর্চা ও প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৫০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আর্ট গ্রুপ। ১৯৬০ সালে তিনি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প কর্পোরেশনের নকশাকেন্দ্রের প্রধান নকশাবিদ নিযুক্ত হন এবং ১৯৭৮ সালে উক্ত পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এই চাকরির মধ্যদিয়ে বাংলার আবহমান লোকচিত্রের সঙ্গে তার যে পরিচয় ঘটে তার প্রকাশ দেখা যায় কামরুল হাসানের চিত্রকলার বিষয়য়ের দিকে তাকালে। নর-নারী,পশুপাখি (প্রধানত গরু ও শৃগাল), সাপ ও প্রকৃতি। অর্থাৎ, একধরনের জাতীয়তাবোধ সংস্কৃতি তার রঙে-রেখায় বিধৃত হয়েছে। বাঙালী নারীদের জীবনের বহুমাত্রিক স্বভাব, পোশাকে পরিচ্ছদে যে বাঙালিয়ানার ভিন্ন গতি-প্রকৃতি সেটা তিনি তার চিত্রভাষ্যে তুলে ধরেছেন। আর এসবের মধ্যদিয়ে তিনি বাংলার আবহমান সমাজের সামগ্রিক রূপপ্রকাশ করেছেন। বাংলার নিসর্গ ও নারীকে দিয়েছেন ভিন্ন মাত্রা। কামরুলর হাসানের ছবির রাজনীতিতে আমরা যেমন দুই সখী বা অন্যান্য নারী-পুরুষকে দেখে আপ্লুত হই—এসব কাজ আমরা যেকোনো শিল্পীর ছবিতে দেখি না। বিশেষত বলা যায় অজগ্রামের মানুষ বা অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ তিনি তাদের ছবি এঁকেছেন এবং! শ্রেণিবিভক্ত সমাজের যে দ্বন্দ্ব সেটা তার ছবিতে রয়েছে। কামরুল হাসানের ছবির নিম্নবর্গের অন্ত্যজ শ্রেণির এই বস্তুগত দর্শন আমাদের ভিন্ন কথা ভাবার জায়গা করে দেয়। যেটা তার সামগ্রিক জীবনের লড়াই সংগ্রামের দর্শন। তবে হ্যাঁ, এজন্য তাকে মার্কসবাদী বলতে হবে তা নয়। তবে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পরে যে থার্ড ইন্টারন্যাশনাপল হয় ও সোস্যালিস্ট রিয়েলিজম চিত্রকলায় নতুন শিল্পধারার জন্ম দেয় বিদ্রোহী কামরুল হাসান সে ধারার হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ এসব তো বলার কিছু নয়। শিল্পী প্রকাশ করে তার রঙে রেখায়। সেদিক থেকে দেখলেও আমরা দেখি তার ছবির মানুষদের তিনি জোর করে ক্যানভাসে বসিয়ে দেননি। মানুষগুলোকে তিনিই এনেছেন। অর্থাৎ, তিনি কোনো মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তা বলার জন্য আর নতুন কিছুর দরকার হয় না। কামরুল হাসানের ছবিতে সমাজ বাস্তবতা যেমন ছিলো তেমন রোম্যান্টিকতাও ছিলো। তার নারীরা শহুরে না, গ্রামের তাদের ছবিগুলো শিল্পীত একেকটি আখ্যানের মতো। এসব আখ্যানের পেছনে গল্প আছে, চিত্রকল্পের ইতিহাস আছে সব ঘটনাই ব্রাত্য লোকায়ত জীবনের শিল্পরূপ যার অনবদ্য স্রষ্টা শুধু কামরুল হাসান। সমাজের খেটে খাওয়া ব্রাত্যজনদের নিয়ে যে একটি নতুন ধারা গড়ে বেঁচে থাকা যায় সেখানে সফল শিক্ষক কামরুল হাসান। রাজনৈতিক সচেতনতা পটুয়া কামরুল হাসানকে বিশেষত্ব দিয়েছিলো এক ব্যক্তিত্ব। যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে তার সরব উপস্থিতি ছিলো অনিবার্য। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তার একটি চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি তা স্থগিত করেছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন সক্রিয়। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও বেতার দপ্তরের শিল্প বিভাগের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন। শোনা যায় একবার তিনি সরাসরি পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে দেখেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলনের কর্মী এই শিল্পী তাকে দেখার পর থেকেই তার দানবিক চেহারাটি আঁকতে শুরু করেন। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হার্মাদবাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার শিল্পীত প্রকাশ ছিলো আয়ুব খানের রক্তপায়ী, একটি দানবিক হিংস্র মুখমণ্ডল সম্বলিত একটি পোস্টার প্রকাশ। যেটা তখন যেমন আলোড়ন তুলেছিলো আজও তার সমান জনপ্রিয়তা রয়েছে। পোস্টারটির শিরোনাম ছিলো ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে।’ বাংলাদেশের ত্রিশ লাখ শহিদ ও দুলাখ মা-বোনের সম্ভ্রম এক সাগর রক্ত আর নয় মাসের মরণপন যুদ্ধের মাধ্যমে পাওয়া মহান স্বাধীনতার অমূল্য স্মারক বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার বর্তমান যে ডিজাইন, তা কামরুল হাসানই করেছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক, বিমান বাংলাদেশের লোগোসহ প্রায় চার হাজারের মতো কাজ নিজ হাতে করেছেন তিনি। বাংলাদেশের ইতিহাস যতদিন থাকবে, ততদিনই এদেশের মানুষের স্মরণ করতে হবে পটুয়া কামরুল হাসানের মতো একজন দায়বদ্ধ শিল্পীকে। তার রেখাচিত্রের সঠিক সংখ্যা আজও পাওয়া যায়নি। তার স্বভাবজাতি কাজই ছিলো রেখাচিত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন মোটিভ তৈরি করা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার চিত্র তিনি এঁকে তা নান্দনিকভাবে তুলে ধরেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ইনস্টিটিউটের প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনে তিনি সব সময় সরব ছিলেন। দেশে এরশাদ স্বৈরশাসকের অত্যাচার, নির্যাতনের প্রতিবাদেও তিনি মাঠে নেমেছিলেন। ১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হৃদরোগে মৃত্যুর কয়েক মিনিট পূর্বে জাতীয় কবিতা উৎসবে সভাপতিত্ব করছিলেন তিনি। কবিতা উৎসবের মঞ্চে বসেই তিনি আঁকের তার জীবনের শেষ প্রতিবাদের ভাষা ‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পড়ে’। তৎকালীন সামরিক শাসক হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদকে ব্যঙ্গ করেই জনসম্মুখে এই স্কেচটি সম্পন্ন করেন। একজন শিল্পী সমাজে রূপান্তরে কত বড় মাপের এক যোদ্ধা সমাজের কাছে তার দায়বদ্ধতা কতটুকু তা কামরুল হাসানের শিল্পী চরিত্র আমাদের জানান দেয়। এই দেশপ্রেমিক দ্রোহী ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ শিল্পীকে জন্মতিথির প্রণাম।

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
৪০ এতিম কন্যার যৌতুকবিহীন বিয়ে
৪০ এতিম কন্যার যৌতুকবিহীন বিয়ে
বিবিধ চেষ্টার পরও পতন থামছে না শেয়ার বাজারে
বিবিধ চেষ্টার পরও পতন থামছে না শেয়ার বাজারে
গৃহবধূর ভিডিও ধারণ করে ধর্ষণ, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূর ভিডিও ধারণ করে ধর্ষণ, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা গ্রেফতার
৯ ব্যাটারের শূন্য রানে লজ্জার রেকর্ড বাংলাদেশের
৯ ব্যাটারের শূন্য রানে লজ্জার রেকর্ড বাংলাদেশের
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
ইন্টারন্যাশনাল বুকার পেলেন গীতাঞ্জলি
ইন্টারন্যাশনাল বুকার পেলেন গীতাঞ্জলি