X
সোমবার, ২৭ জুন ২০২২
১৩ আষাঢ় ১৪২৯

চিরায়ত বাংলার হারিয়ে যাওয়া শিল্পীরা

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২২, ০৯:২৯

বাংলাদেশ শিল্পীর দেশ, শিল্পের দেশ। এদেশের ঘরে ঘরে শিল্পীর বাস। প্রকৃতিতেও কি কম? পাখির গানের সুরে, ময়ূর-ময়ূরীর নাচেও রয়েছে শিল্পের ছোঁয়া! বাংলার বাবুই পাখির মতো বড় শিল্পী আর কে আছে? জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও প্রকৃতির পাঠশালা থেকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এ দেশের মানুষ বিচিত্র শিল্প তৈরি করেন। নিরক্ষর কিন্তু নান্দনিক চেতনায় ঋদ্ধ এই শিল্পীরা যুগের পর যুগ সৃষ্টি করে চলেছেন বিচিত্র শিল্পকর্ম। হাতের কাছের অতি সাধারণ উপকরণ এবং বিভিন্ন ধাতব পদার্থ দিয়েই তারা তৈরি করেন অসাধারণ সব শিল্প। গাছের পাতা, ফলের খোঁসা, মাটি, বাঁশ, কাঠ, বেত, শন, কাপড়, লোহা, পিতল, তামা, স্বর্ণ, রৌপ্য প্রভৃতিকে শিল্পীর নিপুণ দক্ষতায় নানা রূপ-রূপান্তর ঘটিয়ে বিভিন্ন শিল্প তৈরি করেন। নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গৃহ ও দেহের সৌন্দর্যবর্ধণেও এগুলো ব্যবহার করেন। কেবল বস্তুগত শিল্পই নয়, অবস্তুগত শিল্পকর্ম যেমন―নাচ, গান, গল্প, ছড়া, ধাঁধা, প্রবাদ-প্রবচন প্রভৃতিও সৃষ্টি হয়েছে বিস্তর। মানুষের বুদ্ধির বিকাশ এবং দক্ষতার উৎকর্ষে প্রয়োজনের তাগিদে কালে কালে নানা লোকশিল্প সৃষ্টি হলেও বিজ্ঞানের আবিষ্কার এবং প্রযুক্তির চরম উন্নতির ফলে সেগুলো অনেকটাই আজ অস্তিত্বসঙ্কটে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় লোকশিল্প যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছেন এসব শিল্পের শিল্পীরাও। পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে শিল্পীদের যে কর্মকোলাহল এবং লোকশিল্পের যে সমাহার ঘটতো, বর্তমানে তেমন একটা চোখে পড়ে না। জীবনসংগ্রামে পর্যুদস্ত শিল্পীরা পেশা বদল করায় বংশপরম্পরাগতভাবে চলে আসা ঐতিহ্য থেকে তারা অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছে। ফলে ভাঁড়ার শূন্য হতে হতে ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক লোকশিল্প।

নকশিকাঁথা বাংলার পল্লিমেয়েরা নিজেদের ব্যবহার্য পুরনো কাপড় দিয়ে সুঁই-সুতার নিপুণ কারুকার্যে তৈরি করতো নকশিকাঁথা, রুমাল, বালিশের কভার, জায়নামাজ, দস্তরখানা প্রভৃতি। একে কেন্দ্রে করে পল্লির ঘরে ঘরে রীতিমতো উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হতো। সুঁইয়ের প্রতিটি ফোঁড়ের সঙ্গে মিশে যেতো তাদের ব্যক্তিজীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা তথা বিচিত্র আবেগ-অনুভূতি। কাজের অবসরে পা মেলে বসে গল্পে-গুজবে, হাসি-ঠাট্টায় তারা তৈরি করত এক একটি নকশিকাঁথা। বর্তমানে সে চিত্র চোখে পড়ে না। পল্লির মেয়েদের বড়ো একটা অংশ পারি জমিয়েছে শহরের পোশাকশিল্পের কারখানায়। তাই এখন তারা সুঁই-সুতার ফোঁড় তোলে না, বিদ্যুৎচালিত অত্যাধুনিক মেশিনের সুইচ টেপে। কখনো কখনো মেশিনে পা রেখে শ্যেন দৃষ্টির নিশানায় হাত চালিয়ে তারা কাঁথা বোনেন বটে, তবে তাতে নেই সেই শিল্পের ছোঁয়া এবং অকৃত্রিম প্রাণের স্পন্দন। এর ফলে বিচিত্র নকশার কাঁথাশিল্প হারিয়েছে তার বৈচিত্র্য ও বৈভব। একইভাবে বলা যায়―বাঁশ, বেত, কাঠ ও মৃৎশিল্পের শিল্পীদের কথা। কারখানার ধাতব ও প্লাস্টিকের বাহারি পণ্যের দাপটে তাদের শিল্পকর্ম টিকতে না পেরে অস্তিত্বসঙ্কটে পড়ে ক্রমে বিলুপ্তির পথে ধাবিত হয়েছে।

বাংলার ঘরে ঘরে তো বটেই আগের দিনে নানা অঞ্চলে প্রসার ঘটেছিল বাঁশ, বেত, কাঠ, শন, পাটকাঠি, খড়, নারিকেলের ছোবরা-মালুই ও মাটির শিল্পের। বাঁশ ফাটিয়ে, কাঠ চেড়াই করে, বেতের সূক্ষ্ম প্যাঁচ দিয়ে, মাটি ছেনে তৈরি করা হতো গৃহস্থালির নানা উপকরণ। বাঁশের শিল্পের মধ্যে ছিল―টুকরি, ডালা, সাজি, মোড়া, দোলনা, মাথাল প্রভৃতি; কাঠের শিল্পের উপকরণগুলো ছিলো―চকি, চেয়ার, টেবিল, খাট, আলনা, আলমারি প্রভৃতি; বেতের ধামা, ডালা, কাঠা, চেয়ার প্রভৃতি; মাটির হাড়ি, পাতিল, খেলনা, পুতুল প্রভৃতি। নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ এসব উপকরণ তৈরিতে শিল্পীর ব্যাপক নৈপুণ্যের প্রকাশ ঘটত। এমনও দেখা গেছে যে, বছরজুড়ে তৈরি উপকরণ বর্ষামৌসুমে নৌকায় করে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হতো। কখনো কখনো কুমার কাঁখে বহন করে মধুর সুর তুলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করা হতো। গাঁয়ের পথে তার পসার দেখলে মন জুড়িয়ে যেত। ক্লান্ত পথিকের মতো তারাও বিশ্রাম নিত গাছের ছায়ায়। বাঁশ, বেত আর কাঠের তৈরি শিল্পের তো জুড়ি ছিলো না। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই গৃহস্থবধূ বাঁশের ডালি নিয়ে গোয়ালঘরের দিকে ছুটত। গোবর তোলা হলে ঘুটো বানিয়ে বা কাঁড়িতে ফেলেই ছুটতো রান্নার চুলার পাশে। বেতের কাঠায় চাউল মেপে হাঁড়িতে দিয়ে কাঠের পিঁড়িতে বসে পড়ত সব্জি কাটার কাজে। সন্ধ্যা নামলেই মাটির কিংবা টিন-পিতলের প্রদীপ বসিয়ে রাখা হতো কাঠের গাছার ওপর। বৃষ্টির দিনে পাটটাকুর নিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ব্যস্ত হয়ে পড়ত পাটের রশি পাকানোর কাজে। সময় সময় গ্রামের মোড়লের বাড়িতে পাড়ার সকল বয়সী মানুষ সমবেত হয়ে গল্পে-গুজবে, হাসি-ঠাট্টায় তৈরি করতো বিচিত্র শিল্প-উপকরণ। পল্লিবাংলার সেই সোনালি দিনের চিত্র বর্ণনা করে কবি জসীম উদ্দীন লিখেছেন : ‘গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায়,―/গল্পে গানে কি জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়!/কেউ বসে বসে বাখারী চাঁচিছে, কেউ পাকাইছে রসি,/কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাকা বাঁধে কসি কসি।/কেউ তুলিতেছে বাঁশের লাঠিতে সুন্দর করে ফুল/ কেউবা গড়িছে সারিন্দা এক কাঠ কেটে নির্ভুল।/মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ, করুণ ভাটীর সুরে,/আমীর সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে।’ মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা পাকাপোক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গৃহস্থ ছুটত বাঁশ ও বেতশিল্পীর বাড়িতে। বাঁশের ঝুড়ি, ডালা; বেতের ধামা, কাঠা প্রভৃতি এনে সেগুলো কনেকে দেওয়া হতো তার নিত্য প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্যে। ধামাভর্তি মুড়ি আর খইয়ের মোয়া পাঠানো হতো মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে। এখন সেসবের জায়গা দখল করে নিয়েছে কারখানায় তৈরি বিচিত্র গৃহস্থালিসামগ্রী। ফলে বাংলার বাঁশ, বেত, কাঠ ও মৃৎশিল্পীদের অধিকাংশই হারিয়ে গেছেন। কেউ কেউ টিকে থাকার সংগ্রামে তেলফুরানো প্রদীপের মতো জ্বলছেন নিভুনিভু করে।

বাঁশ ও বেতের গৃহস্থলির জিনিস বাংলার ধাতবশিল্পের মধ্যে রয়েছে লোহা, তামা, পিতল, কাঁসা, স্বর্ণ, রৌপ্য প্রভৃতির তৈরি শিল্পকর্ম। আগুনে গলিয়ে, হাতুড়ি পিটিয়ে সূক্ষ্ম কারুকাজে এসব শিল্প তৈরি করা হয়। লোহা দিয়ে দাঁ, বঁটি, কাঁচি, খোন্তা, কোদাল, ছুরি প্রভৃতি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করে দক্ষ কর্মকার। তামা-পিতল-কাঁসার থালা, বাটিসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা হতো। স্বর্ণ-রুপার থালা-বাটি ছাড়াও তৈরি হয় বিচিত্র গহনা। বাংলার স্বর্ণকারদের শিল্পনৈপুণ্য ও নান্দনিকতার স্পর্শে গড়া গহনায় সাজে বাংলার নর-নারী। এসব ধাতব শিল্পের শিল্পীদের জীবনও হয়ে পড়েছে সঙ্কটপূর্ণ। ফলে অনেকেকেই পৈত্রিক পেশা বদল করেছেন। এতে হারিয়ে গেছেন বহু দক্ষ শিল্পী।

বাঙালির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ঐতিহ্যের গৌরব ধরে রাখতে হলে টিকিয়ে রাখতে হবে বাংলার লোকশিল্পীদের। দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে তাদের তৈরি শিল্পকর্ম। প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভর্তুকি দিতে হবে তাদের। তা না হলে নববর্ষ আসবে কিন্তু মেলাপ্রাঙ্গণ সজ্জিত হবে না তাদের তৈরি বিচিত্র পণ্য ও শিল্পসম্ভারে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এবং নানামাত্রিক পৃষ্ঠপোষকতা দ্বারাই বাংলা লোকশিল্পীদের বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। সে কাজটি যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যাবে ততই বাঙালির ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও বাংলার শিল্পীদের মঙ্গল হবে। আর সেটা করতে পারলেই পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং বর্ষবরণ উৎসব আরও পূর্ণতা পাবে।

প্রচ্ছদ শঙ্কর তরফদারের চিত্রকর্ম অবলম্বনে এবং ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
প্রতিদিন রেলে কত যাত্রী?
সংসদে প্রশ্নোত্তরপ্রতিদিন রেলে কত যাত্রী?
বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা
বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা
শ্রীলঙ্কায় স্কুল বন্ধ, সরকারি কর্মীদের হোম অফিসের পরামর্শ
শ্রীলঙ্কায় স্কুল বন্ধ, সরকারি কর্মীদের হোম অফিসের পরামর্শ
সিরাজগঞ্জে কৃষক হত্যায় ৮ জনের যাবজ্জীবন
সিরাজগঞ্জে কৃষক হত্যায় ৮ জনের যাবজ্জীবন
এ বিভাগের সর্বশেষ
মিলিত হওয়ার আয়োজন
মিলিত হওয়ার আয়োজন
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে উপনিবেশায়ন
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে উপনিবেশায়ন
কুসতুনতুনিয়ায় কয়েকদিন
পর্ব—তিনকুসতুনতুনিয়ায় কয়েকদিন
চেতনার বাতিঘর
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীচেতনার বাতিঘর
অন্ত্যজ শ্রেণি ও কমিউনিস্ট দর্শন
নির্মলেন্দু গুণের কবিতাঅন্ত্যজ শ্রেণি ও কমিউনিস্ট দর্শন