X
সোমবার, ০৮ আগস্ট ২০২২
২৩ শ্রাবণ ১৪২৯

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে উপনিবেশায়ন

নূর-ই-নুসরাত
২৬ জুন ২০২২, ১৪:২৭আপডেট : ২৬ জুন ২০২২, ১৪:২৭

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) ছিলেন উনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙালি ঔপন্যাসিক। ঔপনিবেশিক শাসন তথা সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় যে গদ্য ও উপন্যাসের জন্ম, তার বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যয়ের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি আধুনিক বাংলা উপন্যাসের জনক। জীবিকাসূত্রে ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তা হওয়ার ফলে পাশ্চাত্যের ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতির সংস্পর্শ লাভ করেছিলেন। তিনি বাংলা ভাষার আদি সংবাদপত্র ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রতিষ্ঠা সম্পাদক ছিলেন। তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু হয় ১৮৫২ সালে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে। ‘কমলাকান্ত’ ছদ্মনামে সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি তিনি তুলে ধরেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে ‘সাহিত্য সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ললিত তথা মানস’ (১৮৫৬)। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’র (১৮৬৫) রচয়িতা তিনি। তাঁর রচিত উপন্যাসের সংখ্যা ১৫টি। কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬), মৃণালিনী (১৮৬৯), বিষবৃক্ষ (১৮৭৩), ইন্দিরা (১৮৭৩), যুগলাঙ্গুরীয় (১৮৭৪), চন্দ্রশেখর (১৮৭৫), রাধারাণী (১৮৮৬), কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮), আনন্দমঠ (১৮৮২), দেবী চৌধুরাণী (১৮৮৪) ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। লোকরহস্য (১৮৭৪), কমলাকান্তের দপ্তর (১৮৭৫), সাম্য (১৮৭৯), বিবিধ প্রবন্ধ (১৮৯২) তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থ।  

সাহিত্যের নবীনতর শাখা উপন্যাস। পূর্বে বাংলা সাহিত্য ছিলো মূলত গীতিকবিতানির্ভর। শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয়, পৃথিবীর কোনো দেশেরই প্রাচীন সাহিত্যে উপন্যাসের দর্শন মেলে না। ঔপনিবেশিক শাসন তথা সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট মননের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের জন্ম হয়। আধুনিক ধনতান্ত্রিক যুগের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। প্রাচীন ও মধ্যযুগের শেষে উনিশ শতকের শুরুতে যে গদ্যের জন্ম হয়, সেটাও ঔপনিবেশিক শক্তির হাত ধরেই। মধ্যযুগের সামাজিক শৃঙ্খল থেকে মানুষের মুক্তিলাভ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের উদ্বোধনের ফলে উপন্যাস সৃষ্টির তাগিদ জন্মে। সে কারণেই পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জটিল চিন্তা, দর্শন ও অনুভূতি থেকেই উপন্যাসের উদ্ভব। বিশেষত বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের সূচনা হয় উপনিবেশশাসিত পরাধীন ভারতবর্ষে। বাংলা উপন্যাসের মূল গ্রথিত পাশ্চাত্যে, ফলে বাংলা উপন্যাস ছিল অনেকটাই দিকভ্রান্ত।

বাংলা উপন্যাসের প্রথম খসড়া সংবাদপত্রের স্তম্ভেই রচিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের অধিকাংশ উপন্যাসই প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রিকায়। প্রথম তিনটি (দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা, মৃণালিনী) ও শেষ (সীতরাম) উপন্যাস বাদ দিয়ে বাকি দশটি উপন্যাস বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হয়। ‘সীতারাম’ প্রকাশিত হয় প্রচারে। বিদ্যাসাগরী গদ্যরীতি থেকেই বঙ্কিমচন্দ্রের যাত্রা শুরু। দুর্গেশন্দিনী, কপালকুণ্ডলা, মৃণালিনী বিদ্যাসাগরীয় রীতিতে লিখিত। বঙ্গদর্শনের যুগের আরম্ভে ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসের বঙ্কিমের নিজস্ব রীতি আত্মপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই সংবাদপত্রের সঙ্গে বাংলা উপন্যাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সংবাদ-সাময়িকপত্রগুলো প্রকাশিত হয় বাঙালি সমাজের ভিতর মতবিনিময়ের প্রয়োজনে। দিকদর্শন, সমাচার দর্পণ, তত্ত্ববোধিনী, বঙ্গদর্শন, ভারতী, ইত্যাদি পত্রিকায় তখন নাগরিক সমষ্টিমত সংগঠনের দায়ে আরেক নতুন বাকরীতির চর্চা শুরু হয়। এই ভাষা ও সাহিত্যের ধারায় বাংলা সংবাদ-সাময়িকপত্র উপনিবেশের ইতিহাসেরই অংশ। সাম্রাজীবাদী উপনিবেশের সমস্ত গ্লানি, অসম্মান ও ক্লিন্নতার ভিতর থেকে তৎকালীন সংবাদ সাময়িকপত্রে বাংলা গদ্যচর্চা চলতে থাকে। বাংলাদেশের ব্রাহ্ম আন্দোলন এই স্বীকৃতির প্রথম চিহ্ন। তাদের তত্ত্বাবধানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা চলে। কলোনির মধ্যবিত্তশ্রেণি তাদের নিজস্ব আত্মদ্বন্দ্বে, শিক্ষায়, চারিত্রিক অসঙ্গতিতে খণ্ডিত জীবনযাপন করতে বাধ্য থাকায় তার সাহিত্যও গড়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদের আদলে। তৎকালীন বঙ্গীয় সমাজের এই মধ্যবিত্তের হাতেই শিক্ষাদীক্ষার পরিবর্তন ঘটে। বিশ শতকের প্রথম দশকে মুসলমান মধ্যবিত্তের অগ্রগতি শুরু হলেও তারা সাহিত্যক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। বাংলা সাহিত্য উনিশ শতক থেকেই মূলত হিন্দু মধ্যবিত্তশ্রেণির হাতেই গড়ে ওঠে। ইংরেজ রাজশক্তি মুসলমান সামন্ত্রতন্ত্রকে ধ্বংস করে তার পরিবর্তে হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সম্প্রসারণের দিকে যে দৃষ্টি দেয়, তাতে মুসলমান সামন্ত্রতন্ত্রের কেবল আর্থিক ধ্বংসই ঘটেনি, মানবসম্পদেরও বিপর্যয় ঘটে।

১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা গদ্যের প্রচলনও শুরু হয় গভর্নর জেনারেলের প্রচারিত নির্দেশে স্বদেশ থেকে আগত সিভিলিয়ানদের এদেশের কর্মক্ষেত্রে ভাষা ও সাহিত্যে শিক্ষিত করে তোলার উদ্দেশ্যে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা গদ্য আকারগতভাবে অস্থির। উপন্যাসের মধ্যে যে জীবনবোধ, যুগসচেতনতা ও আদর্শের অনুসন্ধান দেখি তা ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’-এ (১৮৫২) পাওয়া না গেলেও ‘আলালের ঘরের দুলাল’ (১৮৫৭) উপন্যাসে কিছুটা আভাস মেলে। যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না, সেই সাম্রাজ্যের একজন গর্বিত ও অধিকারবোধ সচেতন প্রজা হিসেবে বাঙালি তখন তার অন্য এক আত্মজীবনীর সন্ধান করে। যাতে নিজেকে আবিষ্কার করা যায় বিস্তৃত ইতিহাসের পটভূমিতে। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ কিংবা ‘হুতোম পেঁচার নকশা’ (১৮৬২) সেই পটভূমি বা পরিপ্রেক্ষিতের কথা বিন্দুমাত্র বলে না। প্রস্তুতিমূলক এই সাহিত্যকর্মটিকে পুরোপুরি উপন্যাস না বলা গেলেও নকশাজাতীয় এই রচনা বাংলা কথাসাহিত্যের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তবুও এই বহুস্বরের বিপরীতে বাঙালি অপেক্ষা করে মহৎ কোনো একস্বরের। যে স্বর লেখকের এবং কেবল লেখকেরই।

উনিশ শতকের সূচনা থেকে কলকাতা শহর একটি পরিবর্তিত চেহারা পেতে শুরু করে, কিন্তু তখনও গ্রামীণ রূপ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়নি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মননের ফলে কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নব্য শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, আলালের ঘরের দুলাল-এ কলকাতার ইংরেজি স্কুল, পথঘাট-বাজার, আদালতের চিত্র যেমন আছে, তেমনি কলকাতার অদূরবর্তী বৈদ্যবাটি-বালির পল্লিজীবনের অনিবার্য পরিবর্তনের ছবিটিও তুলে ধরা হয়। বলা যেতে পারে বাংলা উপন্যাসের প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ এই নকশা জাতীয় রচনাটি।

উনিশ শতকের শুরু থেকেই পাশ্চাত্যে উপন্যাসের ধারা পরিণত ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। সে যুগে ওয়াল্টার স্কট (Walter Scott, ১৭৭১-১৮৩২) ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগের অন্যতম ঔপন্যাসিক। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলো অতীতভিত্তিক রোমান্টিক কল্পনার সাক্ষ্য বহন করে। পাশ্চাত্যের উপন্যাসে স্বদেশপ্রীতি, রোমান্স ও ইতিহাসপ্রীতির প্রভাব আমাদের উপন্যাসেরও বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। বিশেষত এই প্রভাব বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। ততোদিনে এদেশে ইংরেজ রাজত্বের প্রতিষ্ঠা কায়েম হয়ে গেছে। কীভাবে, কোনদিক দিয়ে সমাজ ও শিক্ষার ব্যবস্থা পরিচালনা করে নিজেদের শাসন আরো শক্তিশালী ও স্থায়ী করা যায় তা নিয়ে তখন গবেষণা চলছে। তৎকালীন কলকাতা নগর ও হিন্দু কলেজ থেকে নব্যশিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণি সাহিত্যের এই ভাবধারা গ্রহণ করে।

বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্যে এই প্রভাব লক্ষণীয়। বাংলা সাহিত্য এর ব্যতিক্রম নয়। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার সমাজ সংস্কারমূলক নানা ঘটনা ঘটে যেমন বিধবা বিবাহ প্রচলন, সতীদাহ প্রথার বিলোপ, নারী শিক্ষার প্রচলন, ব্রাহ্ম সমাজের উদ্ভব। এসব নানাবিধ সামাজিক অনুষঙ্গের সঙ্গে রাজনৈতিক নানা ঘটনাও সাহিত্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। একইসঙ্গে পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও সাহিত্য জ্ঞানের অনুপ্রবেশ ঘটে আমাদের সাহিত্যে।

দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা, আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরাণী ইত্যাদি উপন্যাস এ যুগেরই সৃষ্টি। দুর্গেশনন্দিনী লেখার সময় বঙ্কিমচন্দ্রের মনে স্কটের The Antiquary উপন্যাসের প্রভাব ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যেই প্রথম স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রেমের পরিচয় মেলে। যে সমাজে নারীরা একেবারেই পশ্চাৎপদ সেখানে কপালকুণ্ডলা, দেবী চৌধুরাণীর মতো চরিত্র সৃষ্টি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু তা বাংলা সাহিত্যে এক হঠাৎ পরিবর্তন। ফলে বঙ্কিমের মধ্যেও কাজ করে এক ধরনের স্ববিরোধিতা। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস একদিকে রোমান্স ও অন্যদিকে ইতিহাসাশ্রয়ী।

একারণে আমরা বঙ্কিমের উপন্যাসে পাশ্চাত্যের আদলে গড়া ভারতবর্ষের ইতিহাসের নবরূপায়ণ দেখি। বঙ্কিম তাঁর আখ্যানকে নিয়ে যান ৯৯৭ বঙ্গাব্দে (দুর্গেশনন্দিনী), আকবরের শাসনামলে (কপালকুণ্ডলা), লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় (মৃণালিনী)। ফলে তাঁর উপন্যাস নব্যশিক্ষিত পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। কিন্তু বাংলা উপন্যাসের এই সূচনা হলো জনসাধারণের জীবন থেকে বহুদূর গিয়ে। সাধারণ বাঙালি জীবনের অনুষঙ্গ সেখানে উপস্থাপিত হয়নি। ইংরেজ ভদ্রসমাজের বা অভিজাত শ্রেণির অনুকরণ করতে গিয়ে এবং এদেশীয় অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টা তাই অনেকটাই বিসদৃশ হয়ে পড়ে।

বঙ্কিমের আগে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের কোনো উদাহরণ না থাকায় তাঁর সামনে ইউরোপীয় উপন্যাসের মডেলটিই ছিল একমাত্র উদাহরণ। ফলে এরকমভাবে উপন্যাস লিখলেই উপন্যাস হয়ে উঠবে এ বিষয়ে তিনি অনেকটাই স্থিতসিদ্ধান্তে পৌঁছান। তিনি বাঙালি জীবনের অন্তর্নিহিত নাটকীয় গুণকে ব্যবহার করেন। যেখানে জনসাধারণের অনুপ্রবেশ নেই বললেই চলে। তবে উপন্যাসের সূচনাপর্বে বঙ্কিমের ভিন্ন প্রয়াস বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য ভূমিকা রাখে। ১৮৬৫-র বছর দশেক আগে বিধবা বিবাহের প্রচলন হয় আর তখন বাংলা উপন্যাসের নায়িকা ঘোষণা করে, ‘এ বন্দী আমার প্রাণেশ্বর’। আরেক নারীকণ্ঠেই উচ্চারিত হয়, ‘পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ’। ফলে তা নিঃসন্দেহে বাংলা গদ্য তথা উপন্যাসের ধারায় এক ভিন্ন কণ্ঠস্বর।

দুর্গেশনন্দিনী বঙ্কিমচন্দ্রের সর্বপ্রথম উপন্যাস। উপন্যাসটিতে অপরিণতির অনেক চিহ্ন থাকলেও বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে অনবদ্য ভূমিকা রাখে। উপন্যাসটিতে মোগল পাঠানের যুদ্ধবৃত্তান্ত অঙ্কিত হয়েছে। ঐতিহাসিক পুরুষ চরিত্রের মধ্যে মানসিংহ, কতলু খাঁ চরিত্র থাকলেও তা বিশেষ গভীরভাবে ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সাথে চিত্রিত হয়নি। ঐতিহাসিক পরিবেশনা বঙ্কিমের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো না। বর্ণিত যুগের বিশেষত্ব ফুটিয়ে তোলাতেও তাঁর বিশেষ আগ্রহ দেখা যায় না। তবে ঐতিহাসিক বিপ্লব একজন সাধারণ দূর্গস্বামীর ভাগ্যের ওপর কেমন অতর্কিত বজ্রপাতের মতো এসে পড়ে তার চিত্র আমরা উপন্যাসটিতে পাই। বাংলা সাহিত্য যেখানে ছিল বর্ণনাধর্মী ও ধর্মনির্ভর সেখানে বঙ্কিম ইতিহাস ও রোমান্সকে আশ্রয় করেন। বঙ্কিমের চরিত্রেরা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। সাধারণ জীবন থেকে চরিত্রগুলো গ্রহণ করা হয়নি। তিনি সাধারণত নগরজীবনকে তাঁর বিষয় করেননি। নগর জীবনাপেক্ষা শান্ত প্রকৃতি, উদ্বেল করোজ্জ্বল নদীবক্ষ, ফুল, গাছ, পাখি তাঁর কল্পনায় প্রভাব ফেলে। প্রার্থনা ও প্রাপ্তি মধ্যে বাসনা এবং চরিতার্থতার মধ্যে যে ব্যবধান, তা তাঁর কল্পনাকে বারবার স্পর্শ করে। প্রতিটি উপন্যাসের চরিত্রের বেদনা ও যন্ত্রণার উৎসে এই কল্পনা বিদ্যমান। প্রতাপের মুত্যু, গোবিন্দলালের সন্যাস, নবকুমারের আত্মবিসর্জন, সীতারামের সমাপ্তি এই সকল কিছুর মূলেই সেই সত্য ক্রিয়াশীল। তাঁর উপন্যাসের সকল চরিত্রের মূলে বিদ্যমান এক অনুশোচনাবোধ। নৈতিকতা, ধর্মবোধকে আঁকড়ে ধরে রোমান্স ও ইতিহাসকে আশ্রয় করেই তাঁর উপন্যাস গঠিত। তাঁর উপন্যাসের কোনো চরিত্রই ভাবাতিরেক দুষ্ট নয়। সেকারণে বঙ্কিমের উপন্যাস মানুষের কর্মময় দৈনিকের চিত্রাকঙ্কনে পরান্মুখ। পারিবারিক ও সামাজিক উপন্যাসে তিনি ব্যক্তির আটপৌরে জীবনযাত্রাকে ভাষায় চিত্রিত করেননি। উনিশ শতকের অফিস, আদালত বা কর্মক্ষেত্র কিংবা একান্নবর্তী পরিবারের বিভিন্ন সম্পর্ক ও তার ঘাত-প্রতিঘাতকে তিনি এড়িয়ে যান। দুর্গেশনন্দিনীতে ঘটনাবৈচিত্র্য ও গল্পাংশের আকর্ষণই প্রধান। কপালকুণ্ডলায় তিনি ইতিহাস ও প্রেমকে যতদূর সম্ভব দূরে রেখে অনেকটাই জীবনের দিকে অগ্রসর হন। তাঁর উপন্যাস কল্পনার আধার ছিলো বৃহত্তর। তিনি বাঙালির আত্মপরিচয় খোঁজেন। তবে মুক্তিপিপাসার আর্তি মূলসুর হয়ে ওঠে। ফলে তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস হয়ে ওঠে নরনারীর সম্পর্কের চেয়ে আরো অনেক বড় সম্পর্কের আধার। সেখানে রাষ্ট্রব্যবস্থা আর ব্যক্তি মুখোমুখি। গভীরতর নৈতিক প্রশ্ন কপালকুণ্ডলা ও ভ্রমর চরিত্রে ছাড়া আর কোথাও উচ্চারিত হয়নি।

সূচনালগ্নে উপন্যাসের বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে আঙ্গিকগত গঠনগত দিকটিও বিবেচনায় দেখা যায়, তাঁর উপন্যাস ঘটনা সংস্থান রীতিতে শৃঙ্খলাবদ্ধ। পূর্ব পরিচ্ছেদে আলোচিত বিষয়ের মধ্যে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের লক্ষ্যবীজ নিহিত। চার্লস ডিকেন্সের (Charles Dickens, ১৮১২-১৮৭০) এই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বঙ্কিমের উপন্যাস তুলনীয়। তাঁর উপন্যাসে নাট্যরস বিদ্যমান এবং তা মাঝে মাঝে অতিনাটকীয়তায় পর্যবসিত হয়। সুসমতা বঙ্কিমের উপন্যাসের প্রধান গুণ। উপন্যাসের যুক্তিসিদ্ধ গঠন-রীতি থেকে এই সুসমতার জন্ম। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসে ঘটনাবৈচিত্র্যে ও গল্পাংশের আকর্ষণই প্রধান। বাস্তব বর্ণনার মধ্যে অতিপ্রাকৃতের ছায়াপাতও দেখা যায়। ‘দুর্গেশনন্দিনী’তে যে রোমান্স ঐতিহাসিক যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সাহিত্যসুলভ প্রেমের আশ্রয়ে ধীরে ধীরে দানা বাঁধে তা অনেকটাই কপালকুণ্ডলায় এসে পরিণতি পায়। উপন্যাসের গঠনকৌশল সম্পর্কে বলা যায় এটি গ্রিক ট্রাজেডির মতো সরল রেখায় অবশ্যম্ভাবী বিষাদময় পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়। আনন্দমঠ সম্পর্কে প্রধান অভিযোগ এর আখ্যানবস্তুর সঙ্গে বঙ্গের প্রকৃত জীবনের বাস্তব যোগ নেই। এটি উপন্যাস অপেক্ষা মহাকাব্যের লক্ষণান্বিত। বঙ্কিম এখানে কেবল উপন্যাসের বাহ্য আকৃতি ব্যবহার করেন। উপন্যাসের ছাঁচে তাঁর দেশভক্তি, রাজনৈতিক পরিকল্পনাকে সাজান। চরিত্রগুলো বাস্তব ও রোমান্স এই উভয় উপাদানের সংমিশ্রণে গঠিত। অর্থাৎ বলা যায় বঙ্কিমের উপন্যাসের বিশিষ্ট লক্ষণগুলো হলো :

১.        বিষয়বস্তুর গুরুত্বের বা অসাধারণত্বের ওপর প্রাধান্য আরোপের প্রবণতা।
২.       উপন্যাসের কাঠামো নির্মাণে নৈয়ায়িক শৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা।
৩.       মননশীলতাজনিত সুসমতার প্রয়াস।

পাশ্চাত্য উপন্যাসের সুগঠিত কাঠামো ব্যবহার করে বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাস রচনার যে প্রয়াস করেন তা উপনিবেশ শাসিত ভারবতর্ষীয় সাহিত্যের এক নবরূপের জন্ম দেয়। বঙ্কিমের হাতে উপন্যাসের এই যুগকে বলা যেতে পারে উপন্যাসের আত্মানুসন্ধানের যুগ। বঙ্কিমের সামাজিক উপন্যাসগুলোতে রাষ্ট্র অনুপস্থিত অন্যদিকে ইংরেজদের রাজশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের বর্ণহিন্দু সমাজে তখন ব্যক্তিজীবনের আধার বলে মনে করা হয়। এই সমাজের সংকট, ব্যক্তির দ্বন্দ্বও তাই বঙ্কিম থেকে শুরু করে পরবর্তী উপন্যাসের প্রধান বিষয় বা পটভূমি হয়ে ওঠে। এই ধারা পরবর্তীতে অনেক বছর যাবত বাংলা উপন্যাসের পথ প্রদর্শন করে।

 

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কিউবার তেল মজুতে ভয়াবহ আগুন, সহায়তায় মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা
কিউবার তেল মজুতে ভয়াবহ আগুন, সহায়তায় মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা
স্পিনারদের অনন্য কীর্তিতে জিতলো ভারত
স্পিনারদের অনন্য কীর্তিতে জিতলো ভারত
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯২তম জন্মবার্ষিকী আজ
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯২তম জন্মবার্ষিকী আজ
ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স কি তাহলে ‘ফ্লুক’?
ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স কি তাহলে ‘ফ্লুক’?
এ বিভাগের সর্বশেষ
সুরের বিকৃতি এবং মৌলবাদ
রবীন্দ্রসংগীতসুরের বিকৃতি এবং মৌলবাদ
লেখক হওয়ার জন্য জন্ম যার ।। পর্ব—১
পথে নেমে পথ খোঁজালেখক হওয়ার জন্য জন্ম যার ।। পর্ব—১
একেকটি শব্দ হয়ে যেতে পারে একেকটি পথ : জাকির জাফরান 
একেকটি শব্দ হয়ে যেতে পারে একেকটি পথ : জাকির জাফরান 
আবুল হাসানের মানবপ্রেম
আবুল হাসানের মানবপ্রেম
তর্জমায় শেষ বলে কিছু নেই : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
তর্জমায় শেষ বলে কিছু নেই : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়