X
রবিবার, ১৯ মে ২০২৪
৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

রবের্তো আলিফানো : শত জল ঝরনার ধ্বনি

রাজু আলাউদ্দিন
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:১৭আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৩:২৬

হোর্হে লুইস বোর্হেসের সব ধরনের লেখার একটি সংকলন তৈরির জন্য নব্বই দশকের শুরু থেকেই আমি তৎপর হয়ে উঠেছিলাম। আর যেহেতু আমার লক্ষ্য ছিল, লেখাগুলো বহুজনকে দিয়ে অনুবাদ করিয়ে নেয়া, ফলে আমাদের নবীন থেকে প্রবীণ—সব অনুবাদকের সাথেই যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল এই কারণে। বোর্হেসের সব ধরনের লেখার পাশাপাশি তার সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও মাথায় এসেছিল, যেহেতু বোর্হেসের সাক্ষাৎকারও সাহিত্য ও পাণ্ডিত্যগুণে অসাধারণ। কিন্তু সেই সময় ঢাকায় লাতিন আমেরিকার লেখকদের বই বইয়ের দোকানগুলোতে মোটেই সহজলভ্য ছিল না। তাদের সাক্ষাৎকারের বই তো আরও দুরস্ত। সেই সময় পর্যন্ত ইংরেজিতে অনূদিত বোর্হেসের সবগুলো বই মনে হয় এককভাবেও কারো কাছে ছিল না। ফলে, বহু জনের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত লেখাগুলো আমাকে সংগ্রহ করতে হয়েছিল। বোর্হেসের সাক্ষাৎকার আমেরিকার দুএকটি পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করতে পারলেও, তখনও পর্যন্ত প্রকাশিত বহু সাক্ষাৎকার ছিল আমার আয়ত্তের বাইরে। তবে প্রবাসী বন্ধুদের সৌজন্যে তার সাক্ষাৎকারের দুএকটি বই সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু রবের্তো আলিফানোর ‘Twenty-four Conversations with Borges’ শীর্ষক বইটির নাম জেনেছি বা শুনেছি, কিন্তু চোখে দেখিনি তখনও পর্যন্ত। বন্ধু তাপস গায়েনকে বলেছিলাম তিনিও যেন বোর্হেসের একটি দুটি লেখা অনুবাদ করে এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হন। তাপস আমার কথায় রাজী হবেন—এটা ছিল অবধারিত। আর যদি হয় বোর্হেস তাহলে নিশ্চয়তা শতভাগ। হয়েওছিল তাই। সময়-বিষয়ক বোর্হেসের একটি সাক্ষাৎকার অনুবাদ করে পাঠিয়েছিলেন তিনি। আর ঘটনাক্রমে সেই সাক্ষাৎকারটি ছিল আলিফানো কর্তৃক গৃহীত। সাক্ষাৎকারটি পড়ে এতই ভালো লেগেছিল যে সেটি যে-বই থেকে অনুবাদ করা হয়েছে, সেই বইটি পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে ঢাকায় আমার চেনা গ্রন্থকুবেরদের কাছে খুঁজছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে একদিন পেয়েও গেলাম সেটি বাবু ভাইয়ের সংগ্রহে। বাবু ভাই সাধারণত বই কাউকে ধার দেন না, কিন্তু আমি বোর্হেসের একটি সংকলন বাংলা ভাষায় প্রকাশ করছি জেনে তিনি নিজস্ব নিয়মে শৈথিল্য এনে ধার দিয়েছেন বইটি ফটোকপি করার জন্য।

বোর্হেসের সঙ্গে যৌবনে বইটির সঙ্গে যারা পরিচিত তারা জানেন ভিন্ন ভিন্ন চব্বিশটি বিষয়ে বোর্হেসের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন রবের্তো আলিফানো। বোর্হেসের সাক্ষাৎকারের আমি আগে থেকেই মুগ্ধ ছিলাম। কিন্তু সাক্ষাৎকারগ্রহিতা হিসেবে আলিফানোর প্রতি আমার আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল এই তথ্য জেনে যে ১০ বছর (১৯৭৪-১৯৮৪) তিনি বোর্হেসের সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। অন্যদিকে, আমার প্রবাসজীবনের দশ বছর মেক্সিকোতে অবস্থানের সুযোগে বোর্হেসের পাশাপাশি, আলিফানোকেও ধীরে ধীরে আবিষ্কার করতে শুরু করি। আবিষ্কার করতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম, তিনি কবি, এখনও পর্যন্ত তিনি ২৪টি কাব্যগ্রন্থের জনক, তিনটি উপন্যাসের প্রণেতা, চারটি গল্পগ্রন্থের স্রষ্টা আর সাতটি প্রবন্ধের বইয়ের তিনি লেখক। কিন্তু যে-সাক্ষাতকারের মাধ্যমে তার প্রাথমিক পরিচয় আমার কাছে তৈরি হয়েছিল, সেই সাক্ষাৎকারের বই আছে পাঁচটি। এই পাঁচটির সবই মূলত বোর্হেসের সাথে তার কথোপকথনের ফল। তবে বোর্হেস নিয়ে এগুলোর বাইরেও ‘Borges, biografía verbal’ (1987) ও ‘El humor de Borges’ (1996) নামক আরও দুটি গ্রন্থ আছে। এই বই দুটোর প্রথমটি বোর্হেসের লেখার বৈশিষ্ট্য এবং বিশ্বসাহিত্যে তার প্রভাব বিষয়ে প্রায় আড়াই শত পৃষ্ঠার একটি বই। আর অন্যটি বিভিন্ন বিষয়ে বোর্হেসের উইট, হিউমারের সংগ্রহ যা নানা উপলক্ষ্যে বোর্হেস অন্যদেরকে এবং আলিফানোকে বলেছেন। বোর্হেস সম্পর্কে এ ধরনের বই এখনও পর্যন্ত একটিই। আর এই বইটির বিশেষত্ব এই যে আমরা বোর্হেস নামক সিরিয়াস যে-লেখককে চিনি, তিনি হাস্যরস, কৌতুককর ও বুদ্ধিদীপ্ত রসাত্মক মন্তব্য করতেও যে ওস্তাদ সেটা আলিফানোর এই বইটি না পড়লে বোঝা যেত না। অর্থাৎ, আলিফানো এমন এক বোর্হেসকে আমাদের সামনে তুলে ধরলেন যিনি সাহিত্যের গোটা ইতিহাসে সবচেয়ে সাহিত্যমণ্ডিত লেখকই (“Es el escritor mas literario de toda la historia de literature.” —Roberto Alifano, Asi Pasan Los Años, P 162) শুধু নন, তিনি রক্ত-মাংসের অতিসাধারণ একজন মানুষ যার রয়েছে অসাধারণ রসবোধ। আলিফানো আমাদের এই বোর্হেসের সাথে পরিচয় করিয়ে না দিলে লেখক বোর্হেসের ব্যক্তিত্বের একটি দিক আবৃত বা অনাবিষ্কৃতই থেকে যেত।

আলিফানোর পরিচয় কেবল বোর্হেসের এই দিকটি উন্মোচনেই সীমিত নয়, তিনি বোর্হেসের সাহিত্যসচিব, ভ্রমণসঙ্গী, শ্রুতিলিপিকার এবং সহলেখকও। রবার্ট লুইস স্টিভেন্সন-এর গল্পগুচ্ছ এবং হেরমান হেস-এর কবিতাগুচ্ছের অনুবাদের ক্ষেত্রেও ছিলেন বোর্হেসের সহ-অনুবাদক। আর বোর্হেসের সাক্ষাতকারগৃহিতা হিসেবে তার অনন্য ভূমিকার কথা তো আগেই বলেছি।

কিন্তু বোর্হেসকেন্দ্রিক পরিচয়ের বাইরেও আলিফানোর আরও কিছু পরিচয় আছে যার হদিস আমাদের কাছে এখনও পর্যন্ত অজানাই রয়ে গেছে। ১৯৪৩ সালে জন্ম নেয়া আলিফানো শৈশবেই সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন আর্হেন্তিনার সবচেয়ে আলোচিত রাষ্ট্রপতি হুয়ান দোমিঙ্গ পেরনের। আর্হেন্তিনার এল কাসাদর নামক জায়গায় পেরনের সঙ্গে ফুটবল খেলার কৈশোরিক স্মৃতিও রয়েছে আলিফানোর। বহু বছর সাংবাদিকতার সূত্রে এই পেরনের মুখোমুখি হয়েছিলেন আবারও। পেরনের সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন। আর যখন প্রচার, প্রাপাগাণ্ডা এবং সবকিছুতেই পেরন-এর প্রতিমায় দেশের চেহারা আড়াল হয়ে যাচ্ছে তখন প্রবল ক্ষমতাবান সেই পেরনকে আলিফানো কথাচ্ছলে জানিয়ে দিলেন ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু এবং অপ্রয়োজনীয়। আলিফানো এসবের মধ্যে মুসোলিনিরই অনুসরণ লক্ষ্য করেছিলেন, যে-মুসোলিনি এক হাস্যকর দেবতায় রূপান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু পেরন এর কোনো জবাব না দিয়ে মৃদু হেসেছিলেন মাত্র। ফরাসি রাষ্ট্রপতি ফ্রাঁসোয়া মিতেরা, মেহিকোর রাষ্ট্রপ্রধান মিগেল দে লা মাদ্রিদ এবং সামরিক বাহিনীর বিশ্বাসঘাতকায় ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত চিলির রাষ্ট্রপতি সালবাদর আইয়্যেন্দের মতো ব্যক্তির সাথে কেবল পরিচয়ই নয়, তার সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন আলিফানো। আইয়্যেন্দের প্রতি তার আগ্রহ এবং পাবলো নেরুদার সাথে তার মাখামাখি আলিফানোকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছিলে। চিলির সামরিক বাহিনী সদ্যনিহত আইয়্যেন্দের প্রতি পক্ষপাত ও নেরুদার অন্তেস্টিক্রিয়ায় সন্দেহজনক উপস্থিতি লক্ষ্য করে তাকে গ্রেফতার করে নির্যাতন চালিয়েছিল। পরে অবশ্য আর্হেন্তিনা ও বহির্বিশ্বের চাপে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। আইয়্যেন্দেকে হত্যার ঘটনার আগে থেকেই আলিফানো চিলিতে সাংবাদিকতার সূত্রে গিয়েছিলেন। সেখানে পাবলো নেরুদার সাথে তিনি এতটাই ঘনিষ্ঠতা হয়ে যান যে নেরুদার কেবল প্রিয়ভাজনই নন, নেরুদার বন্ধু, ব্যক্তিগত সচিব এমনকি নেরুদার কোনো কোনো রচনার সহলেখক হয়ে ওঠেন। নেরুদার ইসলা নেগ্রার বাড়িতে তিনি কাটিয়েছেন মাসের পর মাস। আর যখন আলিফানোর মাথায় কবিতার নতুন বই প্রকাশের পরিকল্পনা এলো, তখন নেরুদাকেই অনুরোধ করলেন সে বইয়ের যুৎসই নাম দেয়ার জন্য। আর নেরুদা তৎক্ষণাৎ মুহূর্তের মধ্যে ভেবে জবাব দিলেন : “শিরোনাম? তোমার নামের শেষাংশই হবে শিরোনাম। ‘আলিফানো পদাবলি’, বইয়ের নাম এটাই হওয়া উচিত।” ( Titulo? Tu apelldo es el titulo. ‘Alfano Poesias’, Asi se debe llamar el libro.) আলিফানো সত্যি সত্যিই ২০০৪ সালে নেরুদার দেয়া নামেই তার ১৬তম কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছিলেন। নেরুদা প্রথম সাক্ষাতেই আলিফানো নামের যে-বুৎপত্তি আর ইতিহাস মেলে ধরেছিলেন, সেখানে নানান বিষয়ে নেরুদার পাঠের এক বিস্তারও আমাদের চমকিত করবে। সবাই জানেন নেরুদা লিখেছেন প্রধানত কবিতাই। বোর্হেসের মতো নানান বিষয়ে মননশীল প্রবন্ধ বলতে গেলে লেখেননি। কিন্তু বহু বিষয় তার আগ্রহ আর পাঠ যে ছিল তা কেবল আলাপে ও আড্ডায় বসলেই বোঝা যেত। আলিফানো সেরকম এক অভিজ্ঞতার কথা জানালেন তার নিজের বয়ানে। আলিফানোর সাথে প্রথম পরিচয়ের দিন স্ত্রী মাতিল্দেকে নেরুদা বললেন : “এই তরুণের নাম আলিফানো, এই নামটি এসেছে সামনিউম (Samnnium )-এর রাজধানী আলিফা থেকে, আলিফা হচ্ছে রোমান যুগে ওয়াইনের বিখ্যাত এক অঞ্চল। আলিফানো আলিফা-এর ইঙ্গিত দেয়।” তিনি এরপর আমাকে বলেন, “তাছাড়া, রোমানদের দ্বারা ব্যবহৃত পানপাত্রকে তোমার নামে ডাকা হতো, এবং ভার্জিলের ‘Georgics’ বইটিতে তোমার উল্লেখ আছে, তিনি বলছেন রোমানরা আলিফানো পানপাত্র দিয়ে পান করছে, ওয়াইনের অভিধানেও তোমার উল্লেখ আছে, দাঁড়াও তোমাকে দেখাচ্ছি।” এই বিষয়ে বেশ জোর দিয়েই তিনি শেষ করলেন এভাবে : “আমার নাম যদি আলিফানো হতো, তাহলে আমি নিজের নাম পাবলো নেরুদা রাখতাম না। তোমার নামের শেষাংশটা কাব্যিক।” (Asi Pasan Los Años, P 141)

নেরুদাকথিত আর্হেন্তিনার এই ‘কাব্যিক’ ব্যক্তিত্বের বন্ধুবৃত্ত শিল্প ও সাহিত্যের জগদ্বিখ্যাত বহুজনে সমৃদ্ধ। অক্তাবিও পাস, হুলিও কোর্তাসার, মারিও বার্গাস যোসা, আদোল্ফো বিয়ই কাসারেস, বিক্তোরিয়া ওকাম্পো, নিকানোর পাররা, কামিলো হোসে সেলা, হুয়ান রুলফো, গার্সিয়া মার্কেস, গ্রাহাম গ্রিন, কার্লোস ফুয়েন্তেস, লুইস বুনুয়েল, কার্লোস সাউরা, পিয়ের পাওলো পাসোলিনি, মারিয়া কাল্লাস, মার্সেল্লো মাস্ত্রোইয়ান্নি, সোফিয়া লোরেন, ভিত্তরিও দি সিকা প্রমুখ। এদের কারোর কারোর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি।

এই সব ব্যক্তিত্বদের সাথে আলিফানোর যোগাযোগ, বন্ধুত্ব ও চেনাজানার মূল কারণ ছিল একদিকে তার সাংবাদিকতার পেশা অন্যদিকে তার সাহিত্যিক নেশা। এই দুই বৃত্তি তাকে ঘনিষ্ঠতা ও নৈকট্যের দিকে নিয়ে গেছে। চিলি, পেরু ও আর্হেন্তিনার প্রধান গণমাধ্যমগুলোয় তিনি কাজ করেছেন যৌবনের শুরু থেকেই। ‘Siete dias’, ‘Clarin’, ‘La Nacion’, ‘La Tercera de la Hora’, ‘La Opinion’ শীর্ষক পত্রিকাগুলো ছাড়াও একাধিক টেলিভিশন ও রেডিওতে কাজ করেছেন আলিফানো। বোর্হেসের সাক্ষাৎকার ছাড়াও, তার নেয়া জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সাক্ষাৎকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বই হচ্ছে LA ENTREVISTA.: Un autor en busca de sus personajes: Gardel, Perón, Borges, Fellini, Neruda, Gassman, Buñuel, Troilo.  লুইজি পিরাদেল্লোর Six Characters in Search of an Author নামক গ্রন্থের শিরোনামটিকে সৃষ্টিশীল বিনির্মাণ ঘটিয়ে আলিফানো তার বইটির নাম রেখেছেন ‘সাক্ষাৎকার : নিজেরই চরিত্রদের সন্ধানে এক লেখক।’ অর্থাৎ যাদের সাথে তিনি মোলাকাত করেছেন, যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারা কীভাবে আলিফানোরই সৃষ্টি হয়ে উঠছেন, এ যেন তারই ইঙ্গিত।

২.
আশ্চর্য ও বহুবর্ণিল এই মানুষটিকে কোনোদিন স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পাবো, এ ছিল আমার কল্পনারও বাইরে। নব্বই দশকের শুরুতে যার একটি বইয়ের ফটোকপি পেলেই মনে হতো হাতে স্বর্গ পাওয়ার মতো, সেই বইয়ের লেখককে রক্ত-মাংসের সচল মূর্তিতে দেখতে পাবো আর তারই সাথে তৈরি হবে এক ‘মৈত্রিঘনিম’ সম্পর্ক—এ ছিল আমার কাছে এক বিস্ময়। বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ বন্ধু আলেহান্দ্রো বাক্কারোর সহৃদয় আমন্ত্রণে যদি বুয়েনোস আইরেসে যাওয়ার সুযোগ না হতো তাহলে আলিফানোকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিতই থাকতে হতো। আলিফানো মানে আলিফানো নয়, তিনি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বহু ব্যক্তিত্বের এক শত জল ঝরনার ধ্বনি। আর এই ধ্বনি স্বপ্নময় (De sueños y caminantes, Sueño que sueña), কোমল গান্ধার। তার কবিতাগুলো স্বপ্নের তন্তু দিয়ে জীবনকে বুনে যাওয়ার এক শিল্পরূপ। স্বপ্নাচ্ছন্ন তার দুটি বইয়ের নামের দিকে তাকালেই আমাদের কাছে তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে : একটির নাম Of dreams and walkers  আর অন্যটির নাম Dream that Dream. সন্দেহ নেই যে এই শিরোনামগুলোয় বোর্হেসের ছায়ার প্রলেপ রয়েছে, কিন্তু আলিফানোর নিজস্ব উন্মীলনও কবিতাগুলোয় স্পষ্ট। প্রভাব এবং মৌলিকতা নিয়ে বোর্হেসের যেমন কোনো উদ্বেগ ছিল না, আলিফানোরও এনিয়ে কোন উদ্বেগ নেই। সাহিত্যে এই দুয়ের উপস্থিতি যে পরস্পরের বন্ধনে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তা পরহেজগার পাঠক মাত্রেই জানেন।

রবের্তো আলিফানোর সঙ্গে রাজু আলাউদ্দিন বুয়েনোস আইরেস-এর বইমেলায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ যখন পেয়েছিলাম তখন আলিফানোর সাথে দেখা হওয়ার একটা সম্ভাবনা মনে মনে কল্পনা করেছিলাম ঠিকই। তবে সেটা যে নিশ্চিতই ঘটবে এমনটা জোর দিয়ে ভাবা সম্ভব ছিল না। আলিফানোর শহরে পৌঁছানোর পরেরদিন বিকেলে বন্ধু আলেহান্দ্রো  আমার হোটেলের দারগোড়ায় এসে হাজির। বললেন, চলো, তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাই। আমি আর তাকে কিছুই জিজ্ঞেস না করে গাড়িতে উঠে পড়লাম। আমাকে সে নিয়ে গেল আর্হেন্তিনিয় লেখক সমিতির অফিসে—Sociedad Argentina de Escritores(SADE)। এই সেই অফিস যেখানে আর্হেন্তিনার অনেক লেখকের সমাগম হতো এবং এখনও হচ্ছে। ১৯৫১ সালে বোর্হেস এই লেখক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। বোর্হেস যে-অফিসটিতে প্রতিদিন আসতেন, আমি এখন সেই অফিসে! এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় মনের তন্ত্রীগুলো প্রাণ পেয়ে গুনগুন করে উঠলো। কিন্তু আমার জন্য আরও এক বিস্ময় অপেক্ষা করছিল, সেটা টের পেলাম আরও কিছুক্ষণ পরে। অচেনা কয়েক ভদ্রলোকের সাথেই প্রবেশ করলেন সেই কাঙ্ক্ষিত কিন্তু অধরা ব্যক্তিত্ব রবের্তো আলিফানো। তাকে দূর থেকে দেখেই চিনেছিলাম। চেনার কারণ ইতিমধ্যে তিনি ছবির মাধ্যমে আমার কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। ইন্টারনেট আর অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশাধিকারের কারণে অনেকেই ছবির মাধ্যমে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। আলিফানোও তাই। নেটে অনুসন্ধান করলেই আলিফানোর অসংখ্য ছবি আর তথ্যভাণ্ডার এসে হুমড়ি খেয়ে পড়বে আপনার সামনে। কিন্তু রক্ত-মাংসের জীবন্ত মানুষটিই আজ আমার সামনে! তিনি আর ছবির মানুষ নন, নন কেবল গ্রন্থধৃত বাক্যপুঞ্জের সেই ঝরনাধারা। তিনি এখন আমার সামনে। সামনেই, কারণ আমি দাঁড়িয়েছিলাম আলেহান্দ্রোর পাশে, যেই আলেহান্দ্রো এখন এই লেখক সমিতির সভাপতি; আলিফানো তার সাথে সৌজন্য ও করমর্দন বিনিময়ের জন্য এগিয়ে এসেছেন। সৌজন্য বিনিময় শেষে আলেহান্দ্রো আমাকে আলিফানোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন :“রবের্তো, ইনি রাজু আলাউদ্দিন। বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ এবং বোর্হেস-অনুবাদক। বইমেলায় তিনি অতিথি হিসেবে এসেছেন।” আলিফানো বা রবের্তো, যে-নামেই ডাকি না কেন, তিনি  সৌজন্যমধুর নম্রতায় আমার দিকে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে বললেন, “আহা, বোর্হেস বেঁচে থাকলে কী যে খুশী হতেন! এত দূর দেশে বাংলাভাষায় তার লেখা অনুবাদ হচ্ছে, তাকে নিয়ে চর্চা হচ্ছে—এটা জানতে পারলে নিশ্চিতভাবেই তিনি খুশী হতেন। আর্হেন্তিনায় তোমাকে স্বাগতম!” যেই মানুষটি বোর্হেসের সাথে দশটি বছর কাটিয়েছেন, যিনি শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতির এতসব মহাজনের সংস্পর্শে এসেছেন তাকে স্পর্শ ও তার সাথে আলাপের শিহরন আমাকে যেন কল্লোলিত করে তুললো। বললাম, “রবের্তো, আপনি কি জানেন আমি আপনাকে কবে থেকে চিনি?” মনে হয় তিনি এমন প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলেন না।  মিষ্টি হাসির আপ্যায়ন নিয়ে তিনি অপেক্ষা করছেন আমি এরপর কী বলি। “কম করে হলেও তিরিশ বছর আগে।” “আই কারাম্বা! কে ইনক্রেইব্লে!” মানে—ওরে বাপরে! এ তো অবিশ্বাস্য! আমি তাকে বোর্হেস-সংকলন প্রস্তুতকালীন ঘটনার কথা বললাম, বললাম কীভাবে আলিফানোর সাক্ষাৎকারের বইটি তখন সংগ্রহ করেছিলাম। এবং তার ‘El Humor de Borges’ বইটি যে মেক্সিকো শহরের এক পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে সংগ্রহ করেছিলাম বেশ কয়েক বছর আগে, সেই ঘটনাও জানালাম। রবের্তো সবসময়ই প্রসন্ন এবং শান্তস্বভাবের। কিন্তু নির্বাক শান্ততা নয়, প্রশান্ত ভঙ্গিতে  আমার কাছে এই ঘটনাগুলোর মূল্যকে তিনি আবেগের সাথেই গ্রহণ করে বললেন, “বোর্হেসের সাথে আমার সময়গুলো ছিল জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। অন্য যে-কারোর চেয়ে বোর্হেসের প্রভাবই আমার উপর সবচেয়ে বেশি।” আমি রসিকতা করে বললাম, “আপনি বোর্হেসের দশ বছরের সঙ্গ পেয়ে প্রভাবিত, আর চিন্তা করে দেখুন আমরা যারা তাকে দেখিনি, তারাও তার দ্বারা প্রভাবিত।” তিনি মৃদু হেসে আমার কথায় সম্মতি জানিয়ে বললেন, “বোর্হেস এমনই এক লেখক যার দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে উপায় নেই।” “একদমই ঠিক কথা। আর এই কারণেই পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ সব ভাষায় তার এত অনুসারী।” ইতিমধ্যে আরও অনেকেই তার সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষায় আছেন দেখে আমি ধীরে ধীরে কথার নাটাই গুটিয়ে আনতে থাকি। কারণ বোর্হেস নিয়ে তার সাথে কথা বলা কখনোই ফুরাবে না। তার সঞ্চিত ভাণ্ডার থেকে যদি সামান্যও তুলে ধরেন সেও হয়ে উঠতে পারে সহস্র এক রজনি। সুতরাং এই এক রজনীর এক লহমায় তা মোটেই ফুরাবার নয়। আমি কথার তোড় কমিয়ে দিয়ে তাকে সুযোগ দিলাম অন্যদের দিকে তাকাবার, যাতে অন্যরা কাছে এসে সৌজন্য বিনিময় করতে কিংবা তিনি নিজেই খানিকটা সরে গিয়ে তাদের সৌজন্যের জবাব দিতে পারেন। তিনি নিজেই খানিকটা এগিয়ে অন্যদের সাথে সৌজন্য বিনিময় করলেন। যাদের সাথে কথা বলছিলেন তারা সবাই তার পূর্বপরিচিত এবং তারা সবাই বুয়েনোস আইরেসের না হলেও আর্হেন্তিনার কোনো না কোনো প্রদেশের।

নৈশভোজের দাওয়াত থাকায় দীর্ঘ সময় ধরেই আমরা একসাথে লেখক সমিতির ওই অফিস ছিলাম। এটি যদিও অফিস বলছি আসলে গান গাওয়া বা বক্তৃতা দেয়ার জন্য উঁচু মঞ্চ যেমন আছে তেমনি আছে মোটামুটি ২৫/৩০ জন অতিথিকে আপ্যায়ন করার জন্য খাওয়ার টেবিল বসানো জায়গা। কক্ষের মাঝখানে খানিকটা নিচু একটা মেঝে রয়েছে। সেখানেও আরও ১০/১৫ জন টেবিল নিয়ে বসতে পারে। আমি, আলেহান্দ্রো ও রবের্তোসহ অনেকেই নিচু মেঝেতে একটি টেবিল ঘিরে বসেছি। আর্হেন্তিনিয় ওয়াইন আর খাবারের পাশাপাশি আড্ডায় মুখর এবং আনন্দময় সময় কেটেছিল। খাবারের আগে আগে ছিল সঙ্গীতের এক আয়োজন যাকে অপেরা বলা হয়। এই ধরনের সঙ্গীতের সাথে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল না। তিনজন টেনর-এর অসামান্য পারফর্মেন্স দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম।

কিন্তু আলিফানোর সাথে ওই প্রথম সাক্ষাতে মুগ্ধতার প্রথম প্রহর আমাকে এতটাই তাতিয়ে রেখেছে যে তার সাথে আরও বহু বিষয়ে কথা বলার জন্য উদগ্রীব হয়েছিলাম। আর সেই সুযোগ এলো বইমেলার অন্য আরেকটি অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার আগে। সেদিন ছিল আলোহান্দ্রোর বোর্হেস-বিষয়ক বই নিয়ে অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের আগে আগেই উপস্থিত হয়েছিলাম আমরা। যেহেতু আগেই উপস্থিত হয়েছি তাই মেলার স্টলগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। হঠাৎ করেই চোখে পড়লো SADE-এর স্টলে আলিফানো উপস্থিত। কাছে গিয়ে তাকে বললাম, আপনার বইগুলো আমি কিনতে চাই। কিন্তু জানি না কোন স্টলে গেলে পাওয়া যাবে। আপনি কি বলতে পারেন কোথায় গেলে পাবো? আলিফানো তার স্বভাবসুলভ মিষ্টতা আর স্মিতহাস্যে বললেন, “আমার পুরোনো কোনো বইয়ের সংস্করণ এখন পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।” তিনি সামান্য ঘুরে একটি বই দেখালেন যেটি তার দেয়া সাক্ষাৎকারের একটি বই, নাম ‘Asi Pasas Los Años.’ আমি সঙ্গে সঙ্গে বইটি কিনে তার স্বাক্ষর নেয়ার জন্য এগিয়ে দিলাম। কিন্তু তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো তিনি বিব্রত। তার হয়ত এরকম মনে হয়ে থাকতে পারে যে তিনি বলাতে আমি বইটি কিনতে বাধ্য হয়েছি, এটাই হয়ত তার মধ্যে অস্বস্তির জন্ম দিয়ে থাকতে পারে। তিনি বললেন, “এটা আমি আপনাকে উপহার দিতে চাই, কেনার দরকার নেই।” আমি তার বিব্রত অবস্থা কাটাবার জন্য বললাম, “আপনি যদি আপনার কোনো বই উপহার দিতে চান, পরে দেবেন। আমি এটা কিনে নিচ্ছি কারণ এটি আমি পছন্দ করেছি।” তিনি আমার নাছোড় অবস্থা দেখে মেনে নিলেন। বইটি তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, “দয়া করে আপনার স্বাক্ষর দিন।” বলা হয়নি যে আলিফানো একই সঙ্গে চিত্রশিল্পী, যদিও  এই শিল্পের গহিন যাত্রী তিনি ছিলেন না, কিন্তু অন্য শিল্পের সহযোগী হিসেবে আভা ছড়িয়ে রেখেছে। সেই আভারই এক রেখাময় রূপ ফুটে উঠলো যখন তিনি বইটিতে স্বাক্ষর এঁকে দিলেন : শুধু লেখা নয়, লেখাকে রেখায়, আর রেখাকে এক ভাষিক মন্ত্রণায় বাঙ্ময় করে তুললেন স্বাক্ষরের মাধ্যমে। আর জানি না, কী ভেবে  তিনি তার কোটের পকেট থেকে জাদুকরের মতো ছোট্ট একটি বই বের করে সেটাতে একইভাবে রেখা ও লেখার যৌথ আদর বুলিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ‘Sueño que sueña’ নামক ক্ষুদ্রাকৃতির অলংকৃত ও মুদ্রণশোভিত বইটি হাতে পেয়ে আমি ভীষণ আনন্দিত, রীতিমতো অবাক তার কাছ থেকে এই অভাবনীয় উপহার পেয়ে। বিরল এই সৌভাগ্যে বিশ্বাস করতে পরছিলাম না বলে আমি হতবিহ্বল হয়ে তার দিকে তাকিয়ে শুধু বলতে পেরেছিলাম, “এটা কি আমার জন্য?” “অবশ্যই এটা তোমার জন্য। আমার ছোট্ট উপহার।” ছোট্ট উপহার? মনে মনে নিজেকেই বললাম, আলিফানোর কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া কোনো কিছুই ছোট্ট হতে পারে না। আর যখন পাতা উল্টে দেখলাম এই বইয়ে বোর্হেসের ভূমিকা তখন তো এটা আর কোনোভাবেই ছোট নয়। বইটি হাতে পেয়ে আমি রীতিমতো বিহ্বল। কীভাবে তাকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাবো বুঝতে পারছিলাম না। প্রাপ্তি যখন বিশাল হয়ে যায় কৃতজ্ঞা জ্ঞাপনের অভিব্যক্তি তখন এতটাই সংকুচিত হয়ে আসে যে তখন স্রেফ ধন্যবাদ জানিয়ে সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আমি ওই ছোট্ট ধন্যবাদটুকুই তাকে জানিয়েছিলাম। কারণ ওই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে গেলে তা অতিবচনের প্রাচুর্যে কথার সারমর্ম আরও বেশি ক্ষুদ্র হয়ে যেত। আমি সেই অতিবচনের ঝুঁকি নিতে চাইনি।

আলেহোন্দ্রোর বোর্হেস বিষয়ক বই নিয়ে আলোচনার সময় ঘনিয়ে আসতেই আমরা দুজনেই সেমিনার কক্ষের সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়ে অপেক্ষা করছি কখন শুরু হবে। অনুষ্ঠান শুরু হতে এখনও কিছুটা বাকি হলেও আলিফানোর তুঙ্গস্পর্শী খ্যাতির কারণে অনেকেই তাকে ঘিরে আছে। কেউ কেউ তার সাথে ছবি তুলছেন, সৌজন্য বিনিময় করছেন। তার নিজের লেখা এবং বোর্হেস ও তার সম্পর্কবিষয়ক নানান রকম কৌতূহলের জবাব দিচ্ছেন ধৈর্যের সাথে। বোর্হেস এখন নেই, কিন্তু বোর্হেসের সঙ্গ পেয়েছেন, দশ বছর বোর্হেসের ব্যক্তিগত সচিব এখনও বেঁচে আছেন, ফলে বোর্হেস সম্পর্কে কৌতূহলীদের কাছে তিনি বোর্হেসকে ব্যক্তিগতভাবে জানার এক অফুরান উৎস। আর বোর্হেস যেহেতু আর্হেন্তিনার এক আইকনিক ব্যক্তিত্ব, ফলে রবের্তো তাদের কৌতূহল নিবারণের এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিরাজমান। ঠিক এই কারণেই যে-কোনো সাহিত্যিক সমাগমে রবের্তো  হয়ে ওঠেন মনোযোগের  এক কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব।

রবের্তো আলিফানোর স্বাক্ষর করা বই সেমিনার কক্ষ কানায় কানায় ভরে আছে। সবাই অপেক্ষায় আছেন কখন শুরু হবে অনুষ্ঠান। রবের্তোর সাথে সেমিনার কক্ষে প্রবেশ করতেই আয়োজকরা আমাদের দুজনকেই মঞ্চে আসন গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানালেন। আজকের অনুষ্ঠান আলেহান্দ্রো বাক্কারো রচিত ‘Borges, Vida y Literatura’-কে কেন্দ্র করে। আলোচক আমি, রবের্তো আর স্পেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসে লুইস রদ্রিগেস সাপাতেরো আর অনুষ্ঠানের মধ্যমণি আলেহান্দ্রো বাক্কারো। আমরা সবাই মঞ্চে যে যার আসনে উপবিষ্ট। সদ্যপ্রকাশিত আলেহান্দ্রোর বইটি আমি ইতিমধ্যে এক নজর চোখ বুলিয়ে গেছি। কিন্তু আলোচনার জন্য যতটা প্রস্তুতি নেয়া উচিত, সেরকম প্রস্তুতি আমার ছিল না। আর প্রস্তুতি থাকলেও যে খুব আস্থা নিয়ে বলতে পারবো—সেই বিশ্বাসও থাকার কথা নয়, কারণ বক্তা হিসেবে আমার দক্ষতা ও সামর্থ্য নিতান্তই গড়পড়তা। আমি ছাড়া অন্য দুজনের বোর্হেস সম্পর্কে জানাশোনা, পাঠঅভিজ্ঞতা আমার চেয়ে যে ঢের বেশি তা জানার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার হয় না। রবের্তো যে বোর্হেস সম্পর্কে খুঁটিনাটি অনেক কিছু জানবেন সে তো সহজেই অনুমেয়। আর হোসে লুইস প্রেসিডেন্ট বলে মনে হতে পারে তিনি বুঝিবা বোর্হেসের নিছকই পাঠকমাত্র, সুতরাং বোর্হেস সম্পর্কে তিনি কী আর বলবেন! কিন্তু এই অনুমান যে ভুল সেটা পাঠকদের অবগতির জন্য এই সুযোগে বলি রাখি। তিনিও একজন বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ। অন্যান্য অনেক বিষয়ের পাশাপাশি তিনি ‘No voy a traicionar a Borges’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের বই লিখেছেন। সুতরাং যে-কেউ অনুমান করতে পারেন বোর্হেস সম্পর্কে কতখানি জানা শোনা থাকলে স্প্যানিশ ভাষায় বোর্হেস বিষয়ক শত শত বইয়ের জগতে প্রবেশের সাহস রাখেন। কিন্তু আলেহান্দ্রোর কেন যে ধারণা জন্মেছে এদের পাশে আমাকেও আলোচক হিসেবে রাখার উচিত, তা আমি কখনোই বুঝে উঠতে পারিনি। সুতরাং নিজের মান আর বাংলাদেশের মুখ রক্ষার জন্য আমাকে বোর্হেসবিষয়ক জ্ঞানের এই অগ্নিপরীক্ষায় শামিল হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। অন্যদিকে, পড়বি তো পর মালির ঘাড়ে-এর মতো আলোচনার প্রথম বক্তা হিসেবে আমার নামটিই ঘোষণা করা হলো প্রথমে। আমি ভেবেছিলাম অন্য দুজন আলোচনা করলে, আমার জন্য আলোচনা করা সহজ হয়ে যাবে। ঘোষক সেই পথও রুদ্ধ করে দিলেন দেখে বোর্হেসবিষয়ক আমার পাঠের সঞ্চয়ের উপর ভরসা করেই স্প্যানিশে বক্তৃতা শুরু করতে হলো। গত তিরিশ বছরের পাঠ অভিজ্ঞতার সঞ্চয় যদিও কম নয়, সুতরাং আলেহান্দ্রোর বইটির অনন্য দিক বুঝাবার জন্য কিছু উদাহরণতো দিতেই হবে পাঠকশ্রোতাদেরকে। শুধু গালগপ্প দিয়ে গবেষণাধর্মী একটি বই সম্পর্কে কথা বলা বাতুলতামাত্র। বক্তৃতা লিখিত হবে না বলে আমি কয়েকটি তথ্য উপাত্ত একটি ছোট্ট কাগজে টুকে এনেছিলাম। সেটার উপর ভিত্তি করেই বক্তৃতা শুরু করলাম। আলেহান্দ্রোর বইটি ছিল বোর্হেস নিয়ে এ যাবত রচিত জীবনী গ্রন্থগুলোর মধ্যে সেরা। কেন সেরা তার উদাহরণ হিসেবে ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষায় রচিত জেমস উডাল-এর ‘The life of Jorge Luis Borges’, এডউইন উইলিয়ামসন-এর ‘Borges: A life’ , জেইসন উইলসন রচিত ‘Jorge Luis Borges’, এমির রদ্রিগেস মনেগাল রচিত ‘Jorge Luis Borges: A literary Biography’, আলিসিয়া হুরাদোর ‘Genio y Figura de Jorge Luis Borges’, কিংবা এস্তেলা কান্তোর ‘Broges a Contraluz’ নামক বইগুলোর বৈশিষ্ট্য ও তথ্যভাণ্ডারের তুলনা করলে আলেহান্দ্রোর বইটি তথ্যের মহিমায় কেবল সর্বসাম্প্রতিকই নয়, বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এর বুননকৌশলও অন্যদের চেয়ে আলাদা। তথ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খতায় এই বই আগের বইগুলোকে ছাড়িয়ে তো গেছেই, এমনকি এই বইয়ে এই প্রথম বোর্হেসের এমন কিছু ছবি প্রকাশিত হলো যা অন্য কোনো বইয়ে আগে দেখা যায়নি। এই বইটি জীবনীগ্রন্থ হলেও, এটি বোর্হেসের রচনার তাৎপর্য এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার অভিঘাতকে আমলে নিয়ে জীবনানুক্রমের সঙ্গে এমনভাবে বুনে দিয়েছেন যে পাঠক একই সঙ্গে ব্যক্তি আর লেখক বোর্হেসকে অভিন্ন করপুটে দেখার অভিজ্ঞতা পাবেন। গুণ ও গুরুত্বের বিচারে আলেহান্দ্রোর বইটির সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় হতে পারে এমির রদ্রিগেস মনেগালের বইটি। কিন্তু তথ্যের বিপুলতায় আলেহান্দ্রোর বইটি সবচেয়ে বেশি পরিপূর্ণ এবং নির্ভরযোগ্য। আলোচনা শেষ করেছিলাম এই বলে যে বোর্হেসকে পরিপূর্ণভাবে জানার জন্য আলেহান্দ্রোর বইটি বোর্হেসবিষয়ক এক বাইবেল হয়ে উঠেছে। আলোচনা খুব বেশি দীর্ঘ না করে বইটির জন্য আলেহান্দ্রোকে কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানিয়ে আমি এখানেই শেষ করেছিলাম। মঞ্চে উপবিষ্ট সবাই তো বটেই, দর্শকশ্রোতারাও আমার ছোট্ট আলোচনাটিকে সাদরেই গ্রহণ করলেন করতালির মাধ্যমে। এরপরই এলো হোসে লুইস সাপাতেরোর পালা। তিনি খুবই চমৎকার বলেছেন বোর্হেস এবং আলেহান্দ্রোর বইটি সম্পর্কে। রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি যে বক্তা হিসেবে ভালো হবেন সে তো এমনিতেই অনুমেয়। আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, “রাজু আলাউদ্দিনের সাথে আমি একমত যে আলেহান্দ্রোর এই বইটি বোর্হেস সম্পর্কে এক সত্যিকারের বাইবেল।” হোসে লুইস সাপাতেরোর এই বক্তব্য শুনে আমি খানিকটা নিশ্চিত হলাম যে আমার ছোট্ট আলোচনাটি তাহলে মন্দ হয়নি। আলোচকদের মধ্যে সবশেষে রবের্তো আলিফানো বইটির গুরুত্ব সম্পর্কে তার অভিমত জানালেন। এই বইয়ের আলোচনার পাশাপাশি বোর্হেস সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক অনেক কৌতূহলোদ্দীক অ্যানেকডটও শুনালেন। দর্শক-শ্রোতারা খুব উপভোগ করেছিলেন রবের্তোর আলোচনা।

রবের্তোর সাথে আমার শেষ দেখা বুয়েনোস আইরেস ত্যাগ করার আগেরদিন। সেদিন হোসে লুইস সাপাতেরোর বই ‘No voy a traicionar a Borges’ নিয়ে আলোচনার অনুষ্ঠান ছিল মেলার এক সেমিনার কক্ষে। আলোচক ছিলেন আলেহান্দ্রো আর রবের্তো। আমি সেদিন কৌতূহল নিয়ে হোসে লুইস সাপাতেরোর বইটি নিয়ে আলোচনা শোনার জন্য গিয়েছিলাম। তবে গিয়েছিলাম ঘণ্টাখানেক আগেই। আগে যাওয়ার একটা মুখ্য কারণ ছিল রবের্তোর সাথে একটু সময় নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার নেয়া। SADE-এর বইয়ের স্টলে তার সাথে দেখা হবে—এমনটা আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম। দেখলাম তিনি সময়মতো সেখানে উপস্থিত। ওখান থেকে তাকে নিয়ে প্রবেশ করলাম মেলার উত্তরপ্রান্তে দোতলায় একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁয়। দোতলায় যাওয়ার কারণ ওখানে ক্রেতাদের কোলাহল কম। যেহেতু তার সাক্ষাৎকার রেকর্ড করবো, তাই খানিকটা জনবিরল জায়গা দরকার ছিল। রবের্তোকে যেহেতু হোসে লুইস-এর বইয়ের আলোচনায় থাকতে হবে তাই সময় নষ্ট না করে তার সাথে বোর্হেসবিষয়ক কথাবার্তা তার অনুমতি নিয়ে রেকর্ড করতে শুরু করে দেই। সম্ভবত ৩০/৪০ মিনিট তিনি কথা বলেছিলেন। অনুষ্ঠান শুরুর তখন মাত্র ৫/৬ মিনিট বাকি আছে, তাই আলাপ শেষ করে সেমিনার কক্ষের দিকে আমরা এগিয়ে গেলাম। রবের্তোকে ছেড়ে দিয়ে আমি শ্রোতাদর্শকদের মধ্যে একটি আসনে বসে রইলাম তাদের আলোচনা শোনার জন্য।

অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিয়ে লেখাটিকে দীর্ঘ না করে রবের্তোর সাথে সবশেষ আড্ডার কথা দিয়ে শেষ করব। অনুষ্ঠান শেষে আলেহান্দ্রোর বাসায় আলোচকসহ আমার নৈশভোজের দাওয়াত ছিল। কিন্তু এই দাওয়াতের কথা আমাকে আগে জানানো হয়নি। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগে আগে আলেহান্দ্রোর ব্যক্তিগত সচিব পাত্রিসিয়া আমাকে এসে বলল, তুমি কিন্তু হোটেলে চলে যেও না, আলেহান্দ্রো তোমাকে দাওয়াত করেছে নৈশভোজের। ভাবলাম, বেশ তো, আমার যেহেতু অন্য কিছু করার নেই, ফলে তিন মোগলের সাথে খানা খেতে আপত্তি থাকা উচিত নয়। তাছাড়া, আপত্তির কথাই বা উঠবে কেন! আলেহান্দ্রো আমাকে এই বইমেলায় নিমন্ত্রণকারী, তাছাড়া, হোসে লুইস ও রবের্তোর সাথে অন্নগ্রহণ ও আড্ডার লোভ—কোনোটাই উপেক্ষণীয় নয়। 

নির্বাচিত বোর্হেস আলেহান্দ্রোর বাসায় না গেলে যে এক বিরাট অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতাম, সেটা কেবল তাদের সাথে আড্ডার দুর্লভ ও সম্মানজনক অভিজ্ঞতার জন্যই নয়, আলেহান্দ্রোর বিস্ময়কর বোর্হেস সংগ্রহের জন্যও। সেই সংগ্রহের কথা বিস্তারিত বলতে গেলে আলাদা এক প্রবন্ধ হয়ে উঠবে। সেটা আলাদা করে লিখতে হবে। আপাতত তাদের সাথে আড্ডার কথাতেই সীমিত থাকতে চাই। আমার সঙ্গে আমার সম্পাদনায় কাগজ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বাংলায় ‘নির্বাচিত বোর্হেস’ বইটির একটি কপি সঙ্গে থাকায় সেটি রবের্তোকে উপহার হিসেবে হাতে তুলে দিয়ে বললাম, “এটি আপনার প্রাপ্য। আমি জানি আপনি বাংলা পড়তে পারবেন না। কিন্তু এই সংকলনে আপনার নেয়া বোর্হেসের সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সুতরাং একটি কপি আপনার প্রাপ্য।”  বইটি পেয়ে তিনি যে খুশী হয়েছেন সেটা তার মুখের অভিব্যক্তি দেখেই বুঝা গেল। বইটি নেড়েচেড়ে দেখলেন। কিন্তু তিনি যেহেতু বাংলা জানেন না, ফলে তার পক্ষে খুঁজে বের করা মুশকিল তার লেখাটির অনুবাদ ঠিক কোন জায়গাটিতে আছে। আমি সেই পৃষ্ঠাগুলো তাকে বের করে দেখালাম। সাক্ষাৎকারের শুরুতেই বোর্হেসের সাথে তার ছবি দেখে নিশ্চিত হলেন যে এটি তারই সাক্ষাৎকার। ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আহা , কত আগেকার ছবি! রাজু , তুমি আমাকে নস্টালজিক করে দিলে এই ছবিটা দেখিয়ে।” এরপর বোর্হেস সম্পর্কে অনেক মজার মজার কৌতুকর অ্যানেকডট বললেন। এই আড্ডায় হোসে লুইস খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বললেন রবের্তো সম্পর্কে। এই কথাটা বলার আগে হোসে লুইস তার অনুষ্ঠানে বোর্হেস সম্পর্কে যে-কথাটি বলেছিলেন, সেটাও এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে বোর্হেস ও রবের্তোর পারম্পর্য বুঝে ওঠার জন্য। তিনি বলেছিলেনম, “বোর্হেসের সাহিত্যের প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা ও মুগ্ধতা আমার মধ্যে আর্হেন্তিনার প্রতি ভালোবাসার জন্ম দিয়েছে। যেই দেশ এমন প্রতিভার জন্ম দিতে পারে সেই দেশটি সাংস্কৃতিকভাবে যে অসাধারণ হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।” আর আজকের এই ঘরোয়া আড্ডায় বোর্হেসের প্রতি গভীর প্রীতিকেই তিনি ব্যক্ত করলেন রবের্তো সম্পর্কে এই কথাগুলো বলে : “আমরা যারা বোর্হেসকে দেখিনি, তারা রবের্তোর মাধ্যমে বোর্হেসকে দেখতে পাই, রবের্তোকে স্পর্শ করলে বোর্হেসকে স্পর্শের শিহরন অনুভব করি। রবের্তো আমাদেরকে বোর্হেসকে স্পর্শের সুযোগ দিচ্ছেন—এ জন্য আমরা তার কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।”

গত একুশ সেপ্টেম্বর ছিল রবের্তো আলিফানোর ৮০তম জন্মদিন। বহুবর্ণিল এই ব্যক্তিত্বকে তার আশিতম জন্মদিনে আমার শুভেচ্ছা ও আলিঙ্গন। আপনি দীর্ঘজীবী হোন প্রিয় আলিফানো।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
হামজার পর দিয়াবাতেকে বাংলাদেশ দলে খেলানোর প্রক্রিয়া শুরু
হামজার পর দিয়াবাতেকে বাংলাদেশ দলে খেলানোর প্রক্রিয়া শুরু
লালগালিচা থেকে নেমে ফের বিড়ম্বনায় উর্বশি!
কান উৎসব ২০২৪লালগালিচা থেকে নেমে ফের বিড়ম্বনায় উর্বশি!
যে কারণে তালা দেওয়া হয়েছিল মেট্রোরেলের গেটে
যে কারণে তালা দেওয়া হয়েছিল মেট্রোরেলের গেটে
সোনার ভ‌রি ১ লাখ ১৯ হাজার ৫৪৪ টাকা
সোনার ভ‌রি ১ লাখ ১৯ হাজার ৫৪৪ টাকা
সর্বাধিক পঠিত
‘নীরব’ থাকবেন মামুনুল, শাপলা চত্বরের ঘটনা বিশ্লেষণের সিদ্ধান্ত
‘নীরব’ থাকবেন মামুনুল, শাপলা চত্বরের ঘটনা বিশ্লেষণের সিদ্ধান্ত
ভারতীয় পেঁয়াজে রফতানি মূল্য নির্ধারণ, বিপাকে আমদানিকারকরা
ভারতীয় পেঁয়াজে রফতানি মূল্য নির্ধারণ, বিপাকে আমদানিকারকরা
হিমায়িত মাংস আমদানিতে নীতিমালা হচ্ছে
হিমায়িত মাংস আমদানিতে নীতিমালা হচ্ছে
এনবিআর চেয়ারম্যানকে আদালত অবমাননার নোটিশ
এনবিআর চেয়ারম্যানকে আদালত অবমাননার নোটিশ
মোবাইল আনতে ডিবি কার্যালয়ে মামুনুল হক
মোবাইল আনতে ডিবি কার্যালয়ে মামুনুল হক