একসময় ধারণা ছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমিয়ে দিচ্ছে। ছোট ছোট ভিডিয়ো, দ্রুত স্ক্রল ও ক্রমহ্রাসমান মনোযোগের কারণে তরুণ প্রজন্ম বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—এমন অভিযোগও ছিল দীর্ঘদিন। তবে এখন সেই ডিজিটাল দুনিয়াতেই জন্ম নিয়েছে নতুন এক প্রবণতা, যার নাম বুকস্ট্রিমিং। অনেকের বিশ্বাস, বই পড়ার আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে নতুন এই ট্রেন্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বুকস্ট্রিমিং বলতে বোঝায়, কেউ লাইভে বসে বই পড়ছেন, বই নিয়ে আলোচনা করছেন কিংবা গল্পের নানা মুহূর্তে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। দর্শকেরাও একই সময়ে মন্তব্য করছেন, প্রশ্ন করছেন এবং আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। ফলে একা বই পড়ার অভিজ্ঞতা বদলে যাচ্ছে সম্মিলিত পাঠের অভিজ্ঞতায়।
এই ধারা মূলত টুইচ, ইউটিউব লাইভ ও অন্যান্য লাইভস্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয় হয়েছে। আগে এসব প্ল্যাটফর্মে গেমিং বা আড্ডাধর্মী কনটেন্ট বেশি দেখা গেলেও এখন বইও সেখানে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে।
বুকস্ট্রিমিংয়ের সমর্থকদের মতে, আজকের তরুণদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে দূরে সরিয়ে বই পড়াতে বলা বাস্তবসম্মত নয়। তারা যেখানে সময় কাটায়, বইকেও সেখানে নিয়ে যাওয়াই বেশি কার্যকর হতে পারে।
এই প্রবণতা অনেকটা বুকটকের পরবর্তী ধাপ বলেও মনে করছেন অনেকে। টিকটকের বুকটক যেমন বহু অচেনা বইকে বেস্টসেলার বানিয়েছে, তেমনি বুকস্ট্রিমিং বই নিয়ে দীর্ঘ সময়ের আলাপ ও পাঠের পরিবেশ তৈরি করছে। এতে দর্শক শুধু বইয়ের নামই জানছেন না, বরং পড়ার আনন্দও ভাগ করে নিচ্ছেন।
বই পড়ার অভ্যাস যে সামাজিকভাবেও তৈরি হয়, সেটিও নতুন করে সামনে আনছে বুকস্ট্রিমিং। পরিচিত বা প্রিয় কোনো কনটেন্ট নির্মাতাকে বই পড়তে দেখলে দর্শকদের মধ্যেও সেই বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। ফলে বইকে ঘিরে নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক আলোচনার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলের বাধ্যতামূলক পড়াশোনার বাইরে তরুণদের কাছে বইকে আনন্দের বিষয় হিসেবে তুলে ধরতে পারছে বুকস্ট্রিমিং। এখানে কঠিন সাহিত্য বিশ্লেষণের চাপ নেই, আছে সহজ আলাপ এবং পাঠের আনন্দ।
সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ অবশ্য জনপ্রিয় স্ট্রিমার কাই সেনাট। গেমিংয়ের বাইরে এসে তিনি লাইভে বিভিন্ন বই পড়া শুরু করেন। কঠিন শব্দের অর্থ খুঁজে দেখা কিংবা বই পড়তে গিয়ে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার মতো মুহূর্তগুলো দর্শকদের কাছে তাকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। তার দেখাদেখি আরও অনেক স্ট্রিমার বই নিয়ে লাইভ করা শুরু করেছেন।
তবে সমালোচকেরা মনে করেন, কাউকে বই পড়তে দেখা আর নিজে বই পড়া এক বিষয় নয়। বুকস্ট্রিমিং একা সংকটের সমাধান করতে পারবে না। কিন্তু সমর্থকদের যুক্তি, এটি অন্তত বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে পারে। সেই আগ্রহই মানুষকে বই হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করবে।
একসময় অডিওবুক নিয়েও সংশয় ছিল। এখন তা-ও পড়ার একটি স্বীকৃত মাধ্যম। অনেকের ধারণা, বুকস্ট্রিমিংও তেমনই বইয়ের জগতে নতুন পাঠক আনার একটি কার্যকর পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।









