ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন অনেক সময় তার কালপর্বের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী একটি সংগীতধারা রেখে যায়। বাংলা সংগীতের ইতিহাসে ব্রহ্মসংগীত তেমনই একটি দৃষ্টান্ত। ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলন আজ মূলত ইতিহাসের বিষয়, কিন্তু সেই আন্দোলনের হাত ধরে জন্ম নেওয়া গানগুলো—বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায়—আজও বাংলা সংগীতসংস্কৃতির একটি জীবন্ত ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বাংলা সংগীতের ইতিহাসে যে ধারাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে তার নাম ব্রহ্মসংগীত। এই সংগীতধারা মূলত নিরাকার, অদ্বিতীয় ব্রহ্মের আরাধনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। বাংলায় ভক্তিগীতির চর্চা বহু পুরোনো—বৈষ্ণব ও শাক্ত পদাবলির মধ্য দিয়ে তার বিকাশ ঘটেছিল, যেখানে দেবদেবীর সাকার রূপকে কেন্দ্র করে ভক্তিরসের প্রকাশ ঘটত। কিন্তু ব্রহ্মসংগীত সেই পৌত্তলিক ঐতিহ্যের বাইরে গিয়ে এক অভিনব, নিরাকার উপাসনাসংগীতের জন্ম দেয়।
এই ধারার প্রবর্তক ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। "ব্রহ্মসংগীত" নামটিও তারই দেওয়া। তবে তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে একটি ঐতিহাসিক সূক্ষ্মতা লক্ষণীয়। প্রচলিত ধারণায় তাকে সরাসরি "ব্রাহ্মধর্মের প্রতিষ্ঠাতা" বলা হলেও ১৮২৮ সালে গড়া প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল "ব্রহ্ম সভা"—"ব্রাহ্মসমাজ" নামটি তখনও প্রচলিত হয়নি, "ব্রাহ্মধর্ম" কথাটির অস্তিত্বই ছিল না। এই সভার লক্ষ্য ছিল একেশ্বরবাদী চিন্তাভাবনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, যেখানে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান নির্বিশেষে যে কেউ অংশ নিতে পারতেন। রামমোহন কোরান ও বাইবেল পাঠের মধ্য দিয়ে একেশ্বরবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং সেই একই সুর হিন্দুধর্মের উপনিষদীয় ঐতিহ্যেও খুঁজে পেয়েছিলেন—ফলে তার কাছে এটি ছিল কোনো নতুন ধর্ম নয়, একটি প্রাচীন সত্যেরই পুনরাবিষ্কার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও চরিত্রপূজা গ্রন্থের রামমোহন রায় প্রবন্ধে (সিটি কলেজে পঠিত, ৫ মাঘ ১২৯১) লিখেছেন, "তিনি গড়িয়া পিটিয়া একটা নূতন ধর্ম বানাইতে পারিতেন, তাহা না করিয়া পুরাতন ধর্ম প্রচার করিলেন," এবং আরও বলেছেন, "সকলে বলিল, তিনি হিন্দুধর্মের উপরে আঘাত করিলেন। কিন্তু তিনিই হিন্দুধর্মের জীবন রক্ষা করিলেন।" রামমোহনের জীবদ্দশাতেই ১৮৩০ সালে "ব্রহ্ম সভা" নাম বদলে "ব্রাহ্মসমাজ" হয়ে ওঠে, আর তার মৃত্যুর (১৮৩৩) প্রায় দেড় দশক পর "ব্রাহ্মধর্ম" নামে একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় তৈরি হয় দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে, তত্ত্ববোধিনী সভার এক অধিবেশনে।
১৮২৮ সালে ব্রহ্ম সভা প্রতিষ্ঠার আগেই, ১৮১৫ সালে রামমোহন আত্মীয়সভা গঠন করেছিলেন, যেখানে ধর্মালোচনার পাশাপাশি সংগীতের মাধ্যমে উপাসনার সূচনা হয়। রামমোহনের রচিত প্রথম ব্রহ্মসংগীত ছিল সিন্ধুভৈরবী রাগে বাঁধা একটি গান, যা ১৮১৬ সালে প্রথম গীত হয়। গবেষক দিলীপকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে তার রচিত গানের সংখ্যা প্রায় চল্লিশটি, যদিও এই সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তার "ভাব সেই একে, জলে স্থলে শূন্যে যে সমানভাবে থাকে" গানে ব্রহ্মের সর্বব্যাপ্তি প্রকাশ পায়। তার জীবনের শেষ ব্রহ্মসংগীতটি রচিত হয় ইংল্যান্ডে থাকাকালীন—"কি স্বদেশে কি বিদেশে যথায় তথায় থাকি"—যেখানে ব্যবহৃত "স্বদেশ" শব্দটি পরবর্তীকালের স্বদেশি আন্দোলনের চেতনায় প্রেরণা জুগিয়েছিল বলে মনে করা হয়।
রামমোহন নিজে সংগীতরসিক ছিলেন এবং প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ কালী মির্জার কাছে রাগসংগীতের তালিম নিয়েছিলেন। কালী মির্জা মূলত টপ্পাঙ্গের শিল্পী ছিলেন বলে রামমোহনের অধিকাংশ গানে টপ্পাশৈলীর প্রভাব লক্ষণীয়; ধ্রুপদাঙ্গের ব্যবহার এসেছিল পরে, কৃষ্ণপ্রসাদ ও বিষ্ণুচন্দ্র চক্রবর্তী নামে দুই গায়ক ব্রহ্মমন্দিরে যুক্ত হওয়ার পর। বিষ্ণুচন্দ্র চক্রবর্তী দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে থেকে ব্রহ্মসংগীতের সঙ্গে ধ্রুপদী ঐতিহ্যের গভীর সংযোগ ঘটান। রামমোহন তার বন্ধুদেরও ব্রহ্মসংগীত রচনায় উদ্বুদ্ধ করতেন, আর তারা প্রায়ই সংক্ষিপ্ত অক্ষরসংকেতে পরিচয় দিতেন—ফলে অনেক গান কার রচনা তা নিয়ে আজও বিভ্রান্তি থেকে গেছে।
রামমোহনের মৃত্যুর পর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ধারার হাল ধরেন। তিনি নিজে বিখ্যাত গায়ক না হলেও রাগসংগীতের একজন বড়ো পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। তার গানে কানাড়া, ছায়ানট, হাম্বির, বেহাগ, মালকৌশের মতো গম্ভীর রাগ ব্যবহৃত হতো, আর "স্মর পরম জ্ঞানে, বেদ বেদান্ত প্রতিপন্ন করে যাঁরে" গানে উপনিষদীয় জ্ঞানভাবের গভীর প্রকাশ ঘটে। কাব্যগুণের বিচারে দেবেন্দ্রনাথ ও রামমোহনের গান তুলনামূলকভাবে সরল ছিল—মূলত সংসারের অনিত্যতা ও ঈশ্বরের শরণাগতির আহ্বানই ছিল মূল বিষয়—তবু এই গানগুলিই ব্রহ্মসংগীতের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। দেবেন্দ্রনাথ আদি ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে একটি সংগীত বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে বিখ্যাত ধ্রুপদী যদুভট্ট শিক্ষকতা করতেন। তার উৎসাহেই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি রাগসংগীত চর্চার এক প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে পরিবারের নারী সদস্যরাও—যা সেকালের সমাজে বিরল ঘটনা—সংগীতে সুশিক্ষিত হয়ে ওঠেন।
দেবেন্দ্রনাথের পুত্রদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রহ্মসংগীত রচনায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ রাগসংগীতে পারদর্শী হওয়ার পাশাপাশি পাশ্চাত্য সংগীতেও দক্ষ ছিলেন এবং কলকাতায় হারমোনিয়াম বাজানোর প্রথম দিককার শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তার গান আদি ব্রাহ্মসমাজের স্বরলিপি-সংকলনে সংরক্ষিত রয়েছে, আর পরিচিত আকারমাত্রিক স্বরলিপি পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ প্রবর্তক ছিলেন তার ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৮ সালে হিন্দুমেলার দ্বিতীয় অধিবেশনে "মিলে সবে ভারত সন্তান" গানটি রচনা করেন, যা বাংলার প্রথম দিককার স্বদেশী সংগীতগুলোর অন্যতম। হিন্দি গানের সুর ভেঙে ব্রহ্মসংগীত রচনার রীতি চালু করেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরই, আর এই পদ্ধতি পরবর্তীতে তার দাদারা এবং সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ করেন।
এই তিন ভাইয়ের পথ ধরেই আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি ব্রহ্মসংগীতের সর্বোচ্চ ও উজ্জ্বলতম রূপটি প্রকাশ করেন। তিনি প্রায় সাড়ে ছয়শ ব্রহ্মসংগীত রচনা করেছিলেন—তার সামগ্রিক গীতরচনার মধ্যে এই পর্বেই সংখ্যাগত দিক থেকে সর্বাধিক। তার গানে ঈশ্বর-সম্বোধনের বিবর্তনটি লক্ষ্য করার মতো। উনিশ বছর বয়সে লেখা "তুমি কি গো পিতা আমাদের" গানে ঈশ্বর সম্বোধিত হয়েছেন পিতৃরূপে; কিন্তু একুশ বছর বয়সেই লেখা "বড়ো আশা করে এসেছি গো, কাছে ডেকে লও, ফিরায়ো না জননী" গানে ঈশ্বর প্রথমবার সম্বোধিত হন জননীরূপে—যা দেখায় কীভাবে তার গানে ঈশ্বর-সম্বোধনের রীতি পিতৃকল্পনা থেকে ধীরে ধীরে মাতৃকল্পনার দিকে বিবর্তিত হয়েছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ভাঙা গানের সংগ্রহ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশ কিছু গান রচনা করেছিলেন বলে জানা যায়, যা তিনি পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করেন। ধ্রুপদাঙ্গের পাশাপাশি খেয়াল, টপ্পা, লোকসুর—এমনকি লোকসুর ও রাগসুরের মিশ্রণেও তিনি গান রচনা করেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলনের সামাজিক জনপ্রিয়তা কমে গেলেও রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসংগীত ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে সর্বজনীন সংগীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার প্রায় চার দশকের মাথায় ব্রাহ্মসমাজে প্রথম বিভক্তি দেখা দেয়। ১৮৬৬ সালে দেবেন্দ্রনাথের রক্ষণশীল ধারা ও কেশবচন্দ্র সেনের প্রগতিশীল ধারার মতপার্থক্যের জেরে ব্রাহ্মসমাজ ভাগ হয়—দেবেন্দ্রনাথের অংশ আদি ব্রাহ্মসমাজ, কেশবচন্দ্রের অনুসারীরা ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ। ১৮৭৮ সালে কেশবচন্দ্র নিজের কন্যার সঙ্গে কোচবিহারের মহারাজার বিবাহ ব্রাহ্ম বিবাহ-আইন লঙ্ঘন করে সম্পন্ন করালে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়, আর সেই বিতর্কের জেরে শিবনাথ শাস্ত্রী ও আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে একদল সদস্য বেরিয়ে গঠন করেন সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ। দুই বছর পর, ১৮৮০ সালে, কেশবচন্দ্র নিজের অবশিষ্ট সংগঠনের নাম দেন নববিধান। এভাবে মূল ব্রাহ্মসমাজ তিনটি ধারায় ভাগ হয়—আদি, সাধারণ ও নববিধান। এই বিভাজনের সঙ্গে সংগীতরীতিতেও পার্থক্য দেখা দেয়—আদি ব্রাহ্মসমাজে ধ্রুপদাশ্রয়ী রীতি অব্যাহত থাকলেও সাধারণ ও নববিধানে কীর্তনাঙ্গের প্রভাব প্রবল হয়ে ওঠে, যার প্রসার ঘটে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর হাত ধরে।
ব্রহ্মসংগীতের বিস্তার ছিল বিস্ময়করভাবে ব্যাপক। ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলন মূলত শহুরে শিক্ষিত সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ব্রহ্মসংগীত ব্রাহ্ম-অব্রাহ্ম নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে সমাদৃত হয়েছিল, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি রামপ্রসাদ সেন বা কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মতো শাক্তপদাবলি রচয়িতাদের গানও, ভক্তিভাবের সর্বজনীনতার কারণে, ব্রহ্মসংগীত সংকলনে স্থান পেয়েছিল—যদিও তারা ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী ছিলেন না।
সুরের বিচারে ব্রহ্মসংগীত ক্রমে এক বিশাল মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়। শুরুতে হিন্দুস্থানি রাগ-রাগিণী ও ধ্রুপদের প্রাধান্য থাকলেও পরবর্তীতে তাতে যুক্ত হয় বাংলার লোকসংগীত, বাউল-সারিগানের সুর, কীর্তনের ঢং, এমনকি বিভিন্ন প্রাদেশিক ও বিদেশি সুরও। এভাবে একটি শতাব্দীকাল ধরে ব্রহ্মসংগীত বহু সংগীতধারার মিলনস্থলে পরিণত হয়ে বাংলা কাব্যসংগীতের ভবিষ্যৎ বিকাশের পথ প্রশস্ত করে।
সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, ব্রহ্মসংগীতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব মূলত তিনটি দিক থেকে বিবেচনা করা যায়। প্রথমত, এই সংগীতধারার মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক, নিরাকার ঈশ্বরবন্দনার একটি পূর্ণাঙ্গ সংগীতরূপ প্রতিষ্ঠা পায়, যা তৎকালীন পৌত্তলিক ভক্তিগীতির ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দিশা দেখায়। দ্বিতীয়ত, ব্রহ্মসংগীতে ধীরে ধীরে স্বদেশচেতনার এক গভীর উপাদান প্রবেশ করে, যা পরবর্তীকালে বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের গানেও প্রভাব ফেলেছিল। তৃতীয়ত, এই সংগীতধারাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক অভূতপূর্ব সাংগীতিক মহামিলন—যেখানে শাস্ত্রীয় রাগসংগীত, লোকসুর, কীর্তন ও বিদেশি সংগীতরীতি একসূত্রে গাঁথা হয়ে যায়। রাজা রামমোহন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত বিস্তৃত এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় বাংলা গানের বিবর্তনের এক অনন্য অধ্যায় রচিত হয়েছে, যার প্রভাব আজও বাংলা সংগীত-সংস্কৃতিতে গভীরভাবে বিদ্যমান।









