X
রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
৯ আশ্বিন ১৪২৯

একেকটি শব্দ হয়ে যেতে পারে একেকটি পথ : জাকির জাফরান 

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : জাহিদ সোহাগ  
০৪ আগস্ট ২০২২, ১৩:৫৮আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২২, ১৫:৫৬

জাকির জাফরানের জন্ম ১৯৭৬ সালের ৪ আগস্ট, সিলেটে। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : সমুদ্রপৃষ্ঠা, নদী এক জন্মান্ধ আয়না, অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলী, অন্ধের জানালা, নির্বাচিত কবিতা, জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়, পায়ে বাঁধা দুটি সর্বনাম। অনুবাদগ্রন্থ : পাওলো কোয়েলহোর  ‘আকরায় পাওয়া পাণ্ডুলিপি’। গানের এলবাম : পথ দেখাও বন্ধু। পুরস্কার ও সম্মাননা : ব্রাডফোর্ড সাহিত্য সম্মাননা (যুক্তরাজ্য), বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার, যুগসাগ্নিক একুশে সম্মাননা, শালুক সাহিত্য সম্মাননা, কবিতা আশ্রম পুরস্কার ইত্যাদি।


বাংলা ট্রিবিউন : সংগীত আগে না কবিতা? কিশোর বয়সেই তো শুরু? প্রথম কবিতার কথা কি মনে আছে দুচার লাইন?
জাকির জাফরান : জীবনে সংগীতই প্রথম আমাকে আক্রান্ত করেছে। আবিষ্ট করেছে। একদম কম বয়সে। বয়স ৮ কী ৯, এক সন্ধ্যায় আমার ছোট
চাচা বাড়ির উঠানে গান করছিলেন—সুজন বন্ধু রে আরে ওরে বন্ধু, তুমি কোন বা দেশে থাকো—এখনো মনে আছে, অস্থির হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে চাচার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর ভীষণ এক কষ্ট ভর করেছিল আমার উপর। কিসের এই কষ্ট তখন বুঝিনি। কিন্তু এখন বুঝি। 
প্রথম কবিতা লিখি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায়। হাই স্কুলের এক বড় ভাই কবিতা লিখতেন। তিনি একদিন ডেকে বললেন, ‘একটা ম্যাগাজিন বের করব। তুমি কি কবিতা বা ছড়া লিখতে পারো?’ বললাম, ‘কখনো লিখিনি। কীভাবে লিখতে হয় তাও জানি না।’ সেদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় অদ্ভুত এক ঘোর চেপে বসল আমার উপর। ৮/১০ লাইনের মধ্যে কবিতার মতো কিছু একটা মনে মনে বিড়বিড় করলাম। বাড়িতে এসে খাতায় লিখে নাম দিলাম ‘অপূর্ব সৃষ্টি’। লেখাটা ঐ ম্যাগাজিনে ছাপাও হয়েছিল। কিন্তু একটা পঙক্তিও এখন আর মনে নেই। 

বাংলা ট্রিবিউন : কবিতার কলরোল কীভাবে অনুভব করেন? 
জাকির জাফরান : কবিতা কীভাবে যে অনুভব করি তা বলা মুশকিল! তবে আমার মনে হয়, একটা ভালো কবিতা বা কবিতার বই পড়ার সময়ই তার প্রতিটি সম্ভাবনা ও নৈঃশব্দ্য অনুধাবন করা যায়। তখন একেকটি শব্দ হয়ে যেতে পারে একেকটি পথ। একেকটি পঙক্তি হতে পারে একেকটি ঘোরলাগা প্রান্তর। মনে পড়ে, কবিতা যেদিন আমাকে প্রথম আচ্ছন্ন করেছিল সেদিনের কথা। 
স্কুলে কোনো এক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছিলাম জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’। তখন ছুঁয়েও দেখিনি। হঠাৎ এক বিকেলে এমনিতেই বইটি হাতে নিলাম। প্রথম কবিতাটি পড়ার পর আমার অন্তরাত্মা যেন কেঁপে উঠল। কেন কী কারণে এমন হচ্ছে তা বুঝতে পারছিলাম না। একে একে সবকটি কবিতাই পড়ে ফেললাম। আর নিজের অজান্তেই চোখ দুটো ভিজে গিয়েছিল। সেদিন থেকেই আমার কবিজীবনের শুরু। সেই থেকে এখন অব্দি নিজের অস্তিত্বের ভেতরে, একাকীত্বে, প্রেমে ও বিচ্ছেদে, বিপুল নিসর্গের মাঝে, অশ্রু ও হাসির রসায়নে, ব্যক্তিজীবনের বিষাদে, এমনকি জনতার অভিমানেও আমি কবিতার কলরোল অনুভব করে চলেছি।

বাংলা ট্রিবিউন : নর-নারীর প্রেমের কবিতার দিকেই কি আপনার বেশি ঝোঁক? হলে কেন? 
জাকির জাফরান : মাঝেমধ্যে আমারও তাই মনে হয়। কবিতা লিখতে গেলে যেকোনো ছুতোয় প্রেম এসে হাজির হয়। তবে তার রূপ ও রস সব সময় এক নয়। কবিতায় আমরা যে ‘তুমি’কে খুঁজি সে কে? সে কোন তুমি? এই ‘তুমি’র রহস্যের যেমন শেষ নেই, ঠিক তেমনি কবিতায় প্রেমের উপস্থিতিরও শেষ নেই। 
আমার কাছে প্রেম এমন এক শক্তি যা সমস্ত সৃষ্টিকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে। প্রেম না থাকলে সৃষ্টি জগতই অর্থহীন। এই যে শব্দে, বাক্যে, বিষয়ে যখন-তখন উপযাজকের মতো প্রেম এসে হাজির হয়, এর সৌন্দর্য অপার, অবারিত। 

বাংলা ট্রিবিউন : ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’ প্রকাশের দীর্ঘ ৭ বছর পর ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়না’ প্রকাশিত হয়; এই বিপুল বিরতি কেন?
জাকির জাফরান : ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’ প্রকাশের পর বহুদিন আমি লিখতে পারিনি। এক পর্যায়ে ভাবলাম আর লিখবই না। প্রায় ৩ বছর লেখালেখি বন্ধ থাকল। এই বিপুল বিরতির প্রকৃত কারণ আমারও অজানা। আসলে আমার মনোজগত এরকমই। দীর্ঘদিন না লিখে থাকতে পারি। আবার ইচ্ছা করলেই যখন তখন লেখায় ফিরেও আসতে পারি। 

বাংলা ট্রিবিউন : ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’ কোন আইডিয়া থেকে লিখতে শুরু করেন? এই বই হাতে নিলে পাঠকের স্মৃতিতে কি আল মাহমুদ জেগে উঠবেন?
জাকির জাফরান : ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’ প্রকাশিত হয় ২০২০ এর নভেম্বরে। এটি লেখার পরিকল্পনা করি ২০১৫ সালের দিকে। কয়েকটি কবিতা লেখাও হয়। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল যে-ভাষাকে আমি ধরতে চাই সেটি খুঁজে পাচ্ছি না। তারপর আর এগোয়নি। ২০২০ সালের মার্চ মাসে কোভিডজনিত কারণে লকডাউন শুরু হলে এক চরম অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সেই চরম হতাশাময় দিনগুলোতে আবার লিখতে বসি। এবং আশ্চর্যজনকভাবে আমি ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’-এর জন্য যে-ভাষা খুঁজছিলাম সেটিই এসে ধরা দেয় আমার হাতে। একটানা লিখতে থাকি চার মাস। তারপর তৈরি হয় পাণ্ডুলিপি। আমি আসলে এই গ্রন্থে আমাদের নিজেদের কবিতাই লিখতে চেয়েছি নিজেদের ভাষায়। লিখতে চেয়েছি এই ভূখণ্ড ও মানুষের কবিতা। এক অর্থে এ বইকে বাঙালি সংস্কৃতির ডকুমেন্টেশনও বলা যায়।
এই বই হাতে নিলে আল মাহমুদের স্মৃতি জাগা স্বাভাবিক। কারণ ‘সোনালী কাবিন’ ও ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’ একই প্রজাতির বই। কিন্তু ভাষা, টেকনিক, প্রকরণ ও বিষয়বৈচিত্রে ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’ আলাদা। দুটি বই পাশাপাশি পড়লে মৌলিক পার্থক্য ধরা পাঠকের জন্য সহজ হবে।

বাংলা ট্রিবিউন : ফোক গানের প্রতি আপনার অনুরাগ আছে, কবিতায়ও লক্ষ্য করি ভাব ও ভাষার দিক থেকে অনেকখানি লোকজ উপাদান ব্যবহার করেন, এ ব্যাপারে আপনার ভাবনাচিন্তা জানতে চাই।
জাকির জাফরান : বাউল গানের সুর আমার রক্তের মধ্যে খেলা করে। আমার ভেতরে যে সহজাত বাউলিয়ানা আছে তার প্রভাব কবিতায়ও স্পষ্ট। আমার মতে, আমাদের যে লোকসংস্কৃতি, লোকসাহিত্য ও লোকজ ঐতিহ্য রয়েছে তার ২০ ভাগও আমরা কবিতায় ব্যবহার করতে পারিনি। আমরা আমাদের ভাষায় আমাদের কবিতা লিখতে পারিনি। আমরা দীর্ঘদিন অন্য জনপদের ভাষায় কবিতা লিখেছি। আমি ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’-এ বাংলাদেশের কবিতা লিখতে চেষ্টা করেছি।
সংক্ষিপ্ত

/জেডএস/
সম্পর্কিত
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
আ.লীগ সব সময় জনগণের ভোটেই ক্ষমতায় আসে: প্রধানমন্ত্রী
আ.লীগ সব সময় জনগণের ভোটেই ক্ষমতায় আসে: প্রধানমন্ত্রী
মহরতে স্মৃতিকাতর প্রযোজক অপু বিশ্বাস (ভিডিও)
মহরতে স্মৃতিকাতর প্রযোজক অপু বিশ্বাস (ভিডিও)
আজ মহালয়া, দেবীপক্ষের শুরু
আজ মহালয়া, দেবীপক্ষের শুরু
এ বিভাগের সর্বশেষ
‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ ও আহমদ ছফা : এক ক্ষ্যাপা বাউলের প্রাণ ।। পর্ব—সাত
পথে নেমে পথ খোঁজাআহমদ ছফা : এক ক্ষ্যাপা বাউলের প্রাণ
সাড়ে তিন আনা
সাদত হাসান মান্টোর ‘শিকারি আওরত’ থেকেসাড়ে তিন আনা
আকাশটা জুম করে দেখি
আকাশটা জুম করে দেখি
প্রসঙ্গ একজন বিনয় মজুমদার
জোনাকি পোকাই প্রকৃত জ্যোতির্ময়প্রসঙ্গ একজন বিনয় মজুমদার
প্রথম মানস-সন্তানের জন্মবৃত্তান্ত ।। পর্ব—৬
পথে নেমে পথ খোঁজাপ্রথম মানস-সন্তানের জন্মবৃত্তান্ত ।। পর্ব—৬