পুলিশ বৃত্তান্ত

Send
স্বকৃত নোমান
প্রকাশিত : ১৬:৫৩, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৬, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

মানুষ কি স্বভাবতই অপরাধপ্রবণ? হয়ত তাই। এই অপরাধপ্রবণতার কথা আমরা সৃষ্টির শুরুতেই পাই। সেমেটিক পুরাণে বলা হচ্ছে, প্রভু যখন মানুষ সৃষ্টির অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন তখন ফেরেশতারা বলল, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি ঘটাবে এবং রক্তপাত করবে? ফেরেশতাদের কথা মিথ্যে হয়নি। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইভ খেলেন গন্ধম এবং আদমকেও খাওয়ালেন। এটাও একটা অপরাধ। আদমপুত্র কাবিল হত্যা করল ভাই হাবিলকে। এটা আরো গুরুতর অপরাধ। সুতরাং পুরাণই প্রমাণ দিচ্ছে অপরাধপ্রবণতা সৃষ্টির শুরুতেই ছিল।

কেন মানুষের মধ্যে এই অপরাধপ্রবণতা? দার্শনিক হেগেল বলেছিলেন, সৃষ্টির সবকিছুর পেছনেই রয়েছে দ্বন্দ্ব। তার মতে এর কারণ ভাব বা চৈতন্য। এ কারণে হেগেলের দ্বন্দ্বিক তত্ত্ব ভাববাদ নামে পরিচিত। অপরদিকে মহামতি কার্ল মার্কসের মতে দ্বন্দ্বের কারণ বস্তুজগত। মার্কস দ্বন্দ্ববাদকে ভাববাদের প্রভাব থেকে মুক্ত করে বস্তুবাদী জগতের গতি, পরিবর্তন, রুপান্তর ও বিকাশের দ্বন্দ্ববাদের প্রয়োগ ঘটান। তার মতে বস্তুজগতের সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে দ্বন্দ্ব।

বিস্ময়ের সঙ্গে খেয়াল করি, হেগেল বা কার্ল মার্কসেরও আগে এই বাংলার লোকদার্শনিকরা তাদের মতো করে বলেছেন এই দ্বন্দ্ববাদের কথা। যেমন একটি গান :

“পাপ না থাকলে পুণ্যির কি মান্য হত?

যমের অধিকার উঠে যেত।

যদি দৈত্য দুশমন না থাকত

কামক্রোধ না হ’ত

মারামারি খুনখারাপি জঞ্জাল ঘুচিত

সবাই যদি সাধু হ’ত

তবে ফৌজদারি উঠে যেত ।।”

 

অন্য একটি গানে :

“দোষগুণ দুইয়েতে এক রয়

কর্মক্ষেত্রে পৃথক হয়।

পৃথক পৃথক না থাকিলে

দোষগুণ কেবা কয়।

যদি অমাবস্যা না থাকিত

পূর্ণিমা কে বলিত?”

কার্ল মার্কস ঠিকই বলেছেন, সবকিছুর পেছনেই দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্ব না থাকলে এই বস্তুজগত অচল হয়ে পড়ত। নেগেটিভ-পজেটিভ একত্রিত হলেই তো কারেন্টের বাল্ব জলে। এটাই দ্বন্দ্ব। সবকিছুর ভেতেরই দ্বন্দ্ব সক্রিয়। আমাদের লোকদার্শনিকরাও কত যৌক্তিকভাবেই না পাপ-পুণ্য তথা এই দ্বান্দ্বিকতার ব্যাখ্যা করেছেন!

সুতরাং, আলোর বিপরীতে যেমন অন্ধকার থাকে, পুণ্যের বিপরীতেও তেমন পাপ থাকে। থাকতে হয়। নইলে বস্তজগত অচল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে। এই পাপ বা অপরাধ আছে বলেই আইনের প্রয়োজন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রয়োজন, কোর্ট-কাচারির প্রয়োজন। অপরাধ না থাকলে এসবের প্রয়োজন হতো না। প্রয়োজন না হলে কী হতো? পুলিশ অচল, র‌্যাব অচল, সেনাবাহিনী অচল, কোর্ট-কাচারী অচল, উকিল-ব্যারিস্টার-পেশকার-মুহুরি অচল, কারাগার অচল, কারারক্ষীরা অচল। কারো কোনো কাজ নেই। এটা কি সম্ভব? পৃথিবীতে এর কোনো নজির কি আছে? নেই। তার মানে এটা আপাতত অসম্ভব।

তাই বলে কি আমরা অপরাধের পক্ষে সাফাই গাইব? মোটেই না। আমরা অপরাধের বিরুদ্ধেই কথা বলব। অপরাধ যাতে তার সীমা অতিক্রম করতে না পারে। পুণ্যকে যাতে গ্রাস করতে না পারে পাপ। আলোকে যাতে গ্রাস করতে না পারে অন্ধকার। দুটোই থাকুক। তবে নিজ নিজ সীমানায়। কোনোভাবেই যাতে সীমানা অতিক্রম করতে না পারে। আপরাধশূন্য পৃথিবী আমাদের স্বপ্ন। আমাদের যাত্রা সেই স্বপ্নের দিকে। মানুষ হয়ত কোনো একদিন এই স্বপ্নের কাছে পৌঁছতে পারবে।

মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা আছে বলেই প্রয়োজন পড়েছে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কে করবে? মানুষই। একদল মানুষ, যারা অন্যদের বলে-কয়ে, ভয় দেখিয়ে অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারা অপরাধের নিয়ন্তা। তাদের ভয়ে মানুষ অপরাধ থেকে দূরে থাকে, অপরাধ করতে ভয় পায়ে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে তাদেরকে ডাকা হতো প্রহরী, কোটাল, বরকন্দাজ, পাইক, পেয়াদা, লস্কর, সিপাহী ইত্যাদি নামে। আধুনিক কালে তাদেরকে ডাকা হয় পুলিশ।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় পুলিশ নামে কোনো বাহিনীর কথা জানা যায় না। সুলতানি আমলে একটি সরকারি প্রশাসনিক স্থর বিন্যাস লক্ষ্য করা যায়। শহরাঞ্চলে কোতোয়াল পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকতেন। মধ্যযুগের প্রশাসনিক ব্যবস্থা শেরশাহ শুরী দ্বারা প্রবর্তিত। সম্রাট আকবরের সময়কালে এই ব্যবস্থা আরও সংগঠিত হয়। সম্রাট তার ফৌজদারী প্রশাসনিক কাঠামো মীর আদাল (সম্রাটের প্রধান প্রতিনিধি) এবং কাজী (বিচার বিভাগ প্রধান) এবং কোতোয়াল (প্রধান বড় শহরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা) এই তিন ভাগে ভাগ করেন। এই ব্যবস্থা শহরের আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে খুব কার্যকর হিসাবে পরিগণিত হয়। কোতোয়ালী ব্যবস্থা ঢাকা শহরেও বাস্তবায়িত হয়েছিল। অনেক জেলাসদর পুলিশ স্টেশনকে এখনও কোতোয়ালী থানা বলা হয়।

মোঘল আমলে কোতোয়াল একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হয়। একজন ফৌজদার সরকারের প্রশাসনিক ইউনিট (জেলা) প্রধান পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হতেন। কিছু ফৌজদারের অধীনে কামান ও অশ্বারোহী সৈন্য বাহিনীও থাকত। মোগল ও নবাবী আমলে প্রতিটি পরগণাকে একাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এককে ও পুলিশ চৌকিতে বিভক্ত করা হয়। এগুলো মূলত বহুসংখ্যক গ্রাম-সমবায়ে গড়ে তোলা। এই জাতীয় একগুলোকে বলা হতো ‘থানা’। বিভিন্ন ঐতিহাসিকের রচনায় থানার কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। থানা ছিল মূলত পরিখা, প্রাচীর, কামান ইত্যাদি দ্বারা সুরক্ষিত দুর্গ। থানার জন্য যে কর্মকর্তা নিযুক্ত হতো তার পদবি হতো ‘থানাদার’। থানাদারকে অভিবক্ত বাংলার ‘সাব-ইন্সপেক্টর’ এবং বর্তমানের ‘ইন্সপেক্টর’ বলা যায়। থানা ছাড়াও ছিল ছোট ছোট আধা-সামরিক চৌকি। এগুলো সীমান্ত এলাকায়, দুর্গম ও নদী বা সমুন্দ্র বন্দর এলাকায় নিয়মিত থানার অতিরিক্ত বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করত। আজকের দিনে এসব চৌকিকে ‘ফাঁড়ি’ বলা হয়। থানায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে যেসব সিপাহি কাজ করত তাদেরকে বলা হতো বরকন্দাজ, পাইক, পেয়াদা।

মোঘল আমল পর্যন্ত একটি সুশৃঙ্খল পেশাদারী পুলিশ সিস্টেম প্রবর্তিত হয়নি। তবুও সাধারণভাবে উপরোক্ত নিয়ম প্রতিষ্ঠিত ছিল বাংলা-ভারতে মুসলিম শাসকদের রাজত্বের সময়ে। আইন-শৃঙ্খলা এবং অপরাধ প্রতিরোধমূলক প্রশাসন অত্যন্ত কার্যকর ছিল। প্রাচীন ও মধ্যযুগের জমিদারদেরও ছিল পাইক, পেয়াদা ও চৌকিদার। এরা রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কর্মচারি ছিল না। তাই সরকারের কাছ থেকে কোনো বেতন পেত না। তাদের ভরণ-পোষণ বাবদ জমিদার বা ইজারাদারদের কাছ থেকে লাখেরাজ বা ভূমিরাজস্বমুক্ত ভূমি পেত।

শিল্প বিপ্লবের কারণে ইংল্যান্ডের সামাজিক ব্যবস্থায় অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে স্যার রবার্ট পিল একটি নিয়মতান্ত্রিক পুলিশ বাহিনীর অভাব অনুভব করেন। ১৮২৯ সালে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে পুলিশ গঠনের বিল আনেন। এর প্রেক্ষিতে গঠিত হয় লন্ডন মেট্রো পুলিশ। অপরাধ দমনে বা প্রতিরোধে এর সাফল্য শুধু ইউরোপ নয়, সাড়া ফেলে আমেরিকায়ও। ১৮৩৩ সালে লন্ডন মেট্রো পুলিশের অনুকরণে গঠিত হয় নিয়ইয়র্ক সিটি নগর পুলিশ কর্তৃপক্ষ।

১৭৫৭ সালে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে যুদ্ধে পরাজিত করে ক্ষমতা দখল করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৮৫৬ সালে ভারত শাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে বৃটিশ সরকার গ্রহণ করে। পিলস অ্যাক্ট ১৮২৯ এর অধীনে গঠিত লন্ডন পুলিশের সাফল্য ভারতে স্বতন্ত্র পুলিশ ফোর্স গঠনে বৃটিশ সরকারকে অনুপ্রাণিত করে। ১৮৬১ সালে The commission of the Police Act (Act V of 1961) বৃটিশ পার্লামেন্টে পাস হয়। এ আইনের অধীনে ভারতের প্রতিটি প্রদেশে একটি করে পুলিশ বাহিনী গঠিত হয়। প্রদেশ পুলিশ প্রধান হিসাবে একজন ‘ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ’ এবং জেলা পুলিশ প্রধান হিসাবে ‘সুপারিটেনটেন্ড অব পুলিশ’ পদ সৃষ্টি করা হয়।

১৯৪৭ সালে ভারতভাগের পর বাংলাদেশের পুলিশের নাম প্রথমে ‘ইস্ট বেঙ্গল পুলিশ’ রাখা হয়। পরবর্তীকালে এটি পরিবর্তিত হয়ে ‘ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ’ নাম ধারণ করে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত এই নামে পুলিশের কার্যক্রম অব্যহত থাকে। মুক্তিযুদ্ধের পর ‘বাংলাদেশ পুলিশ’ নামে সংগঠিত হয়।

বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল সময় ১৯৭১ সাল। মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন ডিপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল, বেশ কয়েকজন এসপিসহ প্রায় সব পর্যায়ের পুলিশ সদস্য বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে জীবনদান করেন। ’৭১ সালের মার্চ মাস থেকেই প্রদেশের পুলিশ বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব হারিয়েছিল পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার। পুলিশের বীর সদস্যরা প্রকাশ্যেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তারা ’৭১-এর ২৫ মার্চ ঢাকার রাজারবাগের পুলিশ লাইনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত বাতিল .৩০৩ রাইফেল দিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা। এই সশস্ত্র প্রতিরোধটিই বাঙালিদের কাছে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরুর বার্তা পৌছে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে পুলিশের এই সদস্যরা দীর্ঘ নয় মাস জুড়ে দেশব্যাপী গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১২৬২ জন শহীদ পুলিশ সদস্যের তালিকা স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত, ঝিনাইদহের তৎকালীন সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার মাহবুবউদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম, ’৭১-এর ১৭ এপ্রিল মুজিব নগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানশেষে ঐতিহাসিক ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করেন।

দুই.

যতদিন রাষ্ট্র থাকবে ততদিন পুলিশও থাকবে। রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃংখলা ও জনগণের জানমাল রক্ষার জন্য পুলিশ বাহিনী অপরিহার্য। সেকারণে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে নিবিড় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকে। জনগণের সমস্যা-সংকটে পুলিশ জীবনবাজি রেখে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে হলেও এগিয়ে আসে। জনগণের কল্যাণে পুলিশ সদা সতর্ক। সে কারণে বলা হয় পুলিশের দায়িত্ব চব্বিশ ঘণ্টা। যে-কোনো সময় তাদের ডাক পড়তে পারে। রাত বারোটার সময় ঘুমিয়ে পড়েছে, এমন সময় কোনো নাগরিক বিপদে পড়েছে। তাকে উদ্ধার করতে হবে। ডাক পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম শিকেয় তুলে রেখে পুলিশকে দৌড় দিতে হয়। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বেতন-ভাতা পায়। তাই জনসেবাই তাদের প্রধান ও পবিত্র দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অপারগতার কোনো সুযোগ নেই। নৈতিক কর্তব্য পালন থেকে যেমন ছুটি নেই, তেমনি কর্তব্য পালনে কোনো কিছু বাধা হতে পারে না। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে হলেও একজন পুলিশকে দায়িত্ব পালনে সদা নিয়োজিত থাকতে হয়। তারা মানুষের সমস্যা-সংকট মোকাবেলা এবং মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট থাকে। এ কারণেই পুলিশকে বলা হয় জনগণের বন্ধু। জনসাধারণের মতিগতি পুলিশ যতটা বোঝে, রাষ্ট্রের অন্য কোনো বাহিনি ততটা বোঝে না।

পুলিশের ইতিবাচক কাজের কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির ১ তারিখের ঘটনা। সারাদেশে শুরু হয়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। প্রথম দিনে বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সদর থানার অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে যান এক পরীক্ষার্থী। কিন্তু পরীক্ষা শুরু হওয়ার মাত্র বিশ মিনিট আগে জানতে পারেন, তিনি ভুল পরীক্ষাকেন্দ্রে এসেছেন। কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বিষয়টি প্রথমে খেয়াল করেন ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ফরিদা নাজনীন। ছাত্রীটির প্রবেশপত্র দেখে তার সঠিক পরীক্ষা কেন্দ্রের নাম জানান তিনি। এরপর ছাত্রীটিকে নিয়ে বিদ্যালয়ের বাইরে আসেন। শরণাপন্ন হন রাস্তায় যানজট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তার। ঘটনা শুনে পুলিশের সেই উপ সহকারী পরিদর্শক মো. শরিফুল ইসলাম নিজেই তার মোটর সাইকেলে করে ওই শিক্ষার্থীকে পৌঁছে দেন সঠিক পরীক্ষা কেন্দ্রে। শুধু কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি, নিশ্চিত করেছেন শিক্ষার্থীর সঠিক পরীক্ষা কক্ষও।

২০১৬ সালের ঘটনা- রাস্তায় ৫৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার দুটি পে-অর্ডার পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ফেরত দেন পুলিশ কনস্টেবল লিটন সুতার। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া বিভাগে কর্মরত ছিলেন তখন। সেদিন দুপুরে অফিসের কাজে মোটর সাইকেল নিয়ে পল্টনে যাচ্ছিলেন। শেরাটন মোড়ের কাছে যেতেই সামনের একটি মোটর সাইকেল থেকে একটি ব্যাগ রাস্তায় পড়ে যায়। তিনি তাৎক্ষণিক ব্যাগটি কুড়িয়ে মোটর সাইকেলটির পেছনে ছুটে যান। কিন্তু পল্টন পর্যন্ত যাওয়ার পরও সামনের মোটরসাইকেল আরোহীকে ধরতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যাগটি খুলে ভেতরে ৫৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার দুটি পে-অর্ডার দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগটি নিয়ে ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকারের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে এডিসি ব্যাগ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর খুঁজে পান। তাকে ফোন করা হলে তিনি দ্রুত মিডিয়া সেন্টারে উপস্থিত হন। পরে জানা যায়, ওই ব্যাগটি সাইফুল্লাহ নামক এক ব্যক্তির। তিনি সামিট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামিট কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক (অর্থ) হিসেবে কাজ করেন। ওই পে-অর্ডার দুটি সামিট গ্রুপের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি অথরিটি (বিটিআরসি) বরাবর পাঠানোর কথা ছিল। ব্যাগে পে-অর্ডার ছাড়াও প্রয়োজনীয় অফিসিয়াল কাগজপত্রও ছিল।

২০১৭ সালের জুলাই মাসের ঘটনা- শুক্রবার ছিল সেদিন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দাউদকান্দির গৌরীপুরে সকাল ১১টার দিকে অর্ধশত যাত্রী নিয়ে একটি বাস খাদে পড়ে যায়। কুমিল্লার দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার কনস্টেবল পারভেজ মিয়া তখন মহাসড়কে ট্রাফিক জ্যাম সামলাতে ব্যস্ত ছিলেন। বাসটি খাদে পড়ে যাওয়ার ঘটনা দেখেই তিনি ইউনিফর্মসহ লাফ দিয়ে ডোবায় পড়েন এবং দুর্ঘটনায় পড়া যাত্রীদেরকে গাড়ির ভেতর থেকে বের করে আনার উদ্দেশ্যে নিজের জীবনবাজি রেখে একটির পর একটি করে গাড়ির জানালার গ্লাস ভেঙে দিতে থাকেন। গাড়ির গ্লাসগুলো ভেঙে তিনি নিজে পানির নিচে গাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়েন এবং সাত মাসের এক শিশু ও পাঁচ নারীসহ ১০/১২জন যাত্রীকে টেনে গাড়ির ভিতর থেকে বের করে আনেন। তখন স্থানীয় জনগণও তাকে উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করেন।

এরকম অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। একইসঙ্গে দেওয়া যাবে পুলিশের নেতিবাচক অনেক কর্মকাণ্ডের উদাহরণও। কিছু দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যের কারণে পুলিশ সম্পর্কে জনগণের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, দাবিকৃত টাকা না পেয়ে হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, শ্লীলতাহানির মতো গুরুতর অভিযোগও আছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পুলিশের ওপর আইন রক্ষার যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, অনেক সময় তারা যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়। সরকারদলীয় স্বার্থে অনেক সময় তাদেরকে ব্যবহার করা হয়। যার ফলে তাদের নৈতিক অবস্থানটা দুর্বল হয়ে যায় এবং তারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়।

তবে আশার কথা, পুলিশের পারফরম্যান্স আগের তুলনায় এখন অনেক উন্নত হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনে এসেছে অনেক পরিবর্তন। পুলিশের নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শুধু দেশেই নয়, গত প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে নিজেদের কর্মদক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় প্রদান করে বহির্বিশ্বে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। এই প্রশংসা পুলিশ দেশেও অর্জন করুক। জনগণের মন জয় করে নিক। জনগণের আরো কাছাকাছি পৌঁছাক। পুলিশ হয়ে উঠুক জনগণের প্রকৃত বন্ধু।

তথ্যঋণ

১। অবিভক্ত বাংলার পুলিশের ইতিহাস : কাবেদুল ইসলাম

২। বাঙ্গলার ইতিহাস, নবাবী আমল : কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়

৩। Police.Gov.Bd

৪। দৈনিক ইত্তেফাক

//জেডএস//

লাইভ

টপ