লিট ফেস্টে নাচ এবং ফেসবুক সোসাইটি

Send
শাখাওয়াৎ নয়ন
প্রকাশিত : ২২:০৪, নভেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০৬, নভেম্বর ১২, ২০১৯

ঢাকা লিট ফেস্ট প্রথম প্রথম যে রকম অপপ্রচার কিংবা বিরোধীতার সম্মুখীন হয়েছিলো, এখন আর তা তেমন চোখে পড়ছে না। আস্তে আস্তে উবে গেছে। তবে এ বছর ফেস্টের শেষে আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘জাত গেল’ রব উঠেছে। কারণ মমতাজের ‘লোকাল বাস’ গানের সঙ্গে দেশি-বিদেশী কিছু কবি-লেখক নেচেছেন আর তাকে নাকি বাংলা সংস্কৃতির বারোটা বেজে গেছে, অপসংস্কৃতির চুড়ান্ত হয়েছে।

কোনো কোনো মহান ফেসবুকার আরো আশংকা করে বলেছেন, ‘দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। বাংলা একাডেমি না আবার ক্যাসিনো বসায়া দ্যায়। এই নাচের সাথে তো ক্যাসিনো, বোতল ভাল যায়’। কেউ কেউ তীব্র নিন্দা, ধিক্কার জানিয়েছেন। কেউ বলেছেন, ‘বাংলা সংস্কৃতিকে এক্কেবারে বলৎকার করে ছাড়লো’। কেউ বলছে ‘বাংলা একাডেমি গেল’ ‘আমাদের সংস্কৃতি-ঐতিহ্য গেল’ কেউ কেউ বলছে ‘পুরো সাহিত্যেরই বারোটা বেজে গেল’। এক কথায় ছিঃ ছিঃ পড়ে গেছে। সব কথার মোট কথা (১) বাংলা একাডেমির মর্যাদা শেষ (২) আমাদের সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

এত কলরব দেখে-শুনে মমতাজের গানের সঙ্গে সেই নাচের দৃশ্যখানি ফেইসবুক এবং ইউটিউব থেকে বেশ কয়েকবার দেখলাম। যারা মঞ্চে এবং দর্শক সারি থেকে নেচেছেন, তাদের এক্সপ্রেশনগুলো ভালো করে খেয়াল করলাম। অতঃপর নাচ বিষয়ক কতগুলো প্রশ্ন মাথায় এলো—নাচ কী কিংবা নাচ কাহাকে বলে? মানুষ নাচে কেন? কখন, কোথায় নাচে? নাচের ইতিবৃত্ত কী? কখন কোন নাচকে অশ্লীল মনে করা হয়? মানুষ ব্যতীত আর কোনো প্রানী কি নাচে?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনেকেই জানেন। তাই সবগুলোর উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে আলোচনার স্বার্থে কিছু প্রশ্নের উত্তর না দিলেই নয়। নাচ হচ্ছে এক ধরনের সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ। নাচের ভাষা বিশ্বজনীন। ভিন্ন ভাষা-ভাষী অনেক মানুষের লৈখিক কিংবা মৌখিক ভাষা আমরা বুঝতে পারি না, কিন্তু নাচের মুদ্রায় তার আনন্দ-বেদনা-ক্রোধ বুঝতে পারি। ইংরেজিতে নাচের সহজ সংজ্ঞা হচ্ছে, ‘এক্সপ্রেশন অফ সেলিব্রেশন’। মানুষ তার জীবনের সবকিছুকেই কোনো না কোনোভাবে উদযাপন করে। উদজাপন করার জন্য এক্সপ্রেশনগুলোকে যারা নিয়মসিদ্ধভাবে করতে পারে, তারা নৃত্যশিল্পী, যারা পারে না তারা নৃত্যশিল্পী নয়। তাতে কী? তবে গান না জানা মানুষও তো কোনো না কোনোভাবে গান গাওয়ার চেষ্টা করে, তেমনি নাচ না জানা মানুষের কি নাচতে ইচ্ছে করবে না?

কবি অহ নওরোজের ফেসবুক পোস্ট থেকে জানলাম এবং পরে খোঁজ নিয়ে নাচটির পুরো কারণ বুঝতে পারলাম। অহ নওরোজ বেশ গুছিয়ে লিখেছেন : ‘৯ নভেম্বর বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে বাংলা একাডেমির ভাস্কর নভেরা হলে অনুষ্ঠিত ওই সেশনের শিরোনাম ছিলো ‘Ageing: The Secret of Life’। পুরো সেশন জুড়ে কথা হয়েছে বয়স বেড়ে যাওয়াকে কীভাবে উদযাপন করা যায়। সেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন নরওয়েজিয়ান লেখক অ্যানি ওস্টবি—যার বই পনেরটির বেশি দেশে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়, ফিনিশ লেখক মিন্না লিন্ডগ্রেন—যার ট্রিলজি দ্য সানসেট গ্রোভ শুধু ফিনল্যান্ডে নয়, বিশ্বব্যাপী বেস্টসেলার হয়েছিলো, ওই ট্রিলজির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে সিনেমাও। উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ-ব্রাজিলিয়ান ঔপন্যাসিক ইয়ারা রদরিগাজ ফাউলার এবং বিখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রযোজক তেরেসা আলবর।

পুরো সেশন জুড়ে তারা বিভিন্নভাবে বয়স বেড়ে যাওয়ার এবং লেখকসত্তার ওপর তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। ৬২ বছর বয়সী তেরেসা আলবারের আকর্ষণীয় পারফরম্যান্স দিয়ে সেশন শুরু হয়। আয়োজনে তেরেসা বলেন, ‘তরুণ বয়স থেকে স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষকে বার্ধক্যে পা রাখতে হয়। বার্ধক্যে সমাজে নানা মানুষের অবহেলা, কটুকথার সম্মুখীন হতে হয় নারীদের। বার্ধক্য মানে জীবনের সব রঙ ফুরিয়ে যাওয়া নয়। বার্ধক্য হতে পারে রোমাঞ্চকর, হতে পারে উপভোগ্য।’

লেখক মিননা লিন্ডগ্রেন সম্মতি রেখেই বলেন, ‘বয়স কেবল একটি সংখ্যা, বার্ধক্য নারীকে তাদের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা থেকে বিরত রাখতে পারে না; বরং তা পূরণ করার মধ্যেই রয়েছে এ সময়ের সুখ ও শান্তি। বার্ধক্য কোনও লজ্জা নয়।’

অ্যানি ওস্টবি তার প্রকাশিত ‘হাভসং’ বই থেকে কিছু লাইন আবৃত্তি করে শোনান। তরুণ থেকে বৃদ্ধ হওয়া এই বাস্তব পর্যায়টিকে মেনে নিয়ে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। এটিকে সুন্দরভাবে মেনে নেওয়াই শ্রেয় বলে মনে করেন অ্যানি। এবং একেবারে শেষে বেড়ে যাওয়া বয়সকে আনন্দে উদযাপন করার একটি উদাহরণ স্বরূপ সবাই বাংলা 'লোকাল বাস' গানের সঙ্গে নাচেন।

অর্থাৎ সকল বিবেচনায়, নাচটি সেশনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিলো। অনেকদিন আগে বিটিভিতে রুনা লায়লার হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে গান করার প্রতিবাদে বাংলা সংস্কৃতির তখনকার তথাকথিত ধারক-বাহকরা খুব সরব হয়েছিলেন। ‘জাত গেল’ ‘জাত গেল’ বলে মাতম করেছিলেন। সেসব সমোজদাররা বেঁচে আছেন কি-না জানি না, কিন্তু তাদের আত্মা যাবে কোথায়? সেইসব মুমুর্ষ আত্মার ‘কুই’ ‘কুই’ শব্দ শোনা যাচ্ছে।   

আমাদের গ্রামে-গঞ্জেও বিয়ে-শাদী-খৎনা-গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে মা-খালা-ফুপু-নানী-দাদীদের নাচতে দেখেছি। গীত গাইতে শুনেছি। তাতে কি আমাদের আবহমান বাংলার ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ধবংস হয়ে গেছে? নাকি এটাও আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ? লিট ফেস্টের যে সেশনটির মূল বক্তব্যই ছিল, ‘জীবনটা বৃদ্ধ হলেই শেষ হয়ে যায় না’। সেখানে তো বরং যেমন খুশি তেমন করে এমন নির্মল আনন্দ উদযাপন করাই যুক্তিযুক্ত। তাই তো তারা নেচে গেয়ে উক্ত বার্তাটিই দিতে চেয়েছেন। যে সমাজ বয়সী নারীদেরকে হেয় করার জন্য ‘বিগতযৌবনা’ বলে তাচ্ছিল্য করে, অবহেলা করে। সেই সমাজের চোখ তো টাটাবেই, জ্বালা করবেই। এই নাচটি সেই সমাজের বিরুদ্ধেই একটি প্রতীকি প্রতিবাদ।

আর সবশেষে একটি কথা বলা ভালো, যারা বিদেশী লেখকদের বাংলাদেশে বাংলা একাডেমিতে আসার ব্যাপারটি কিংবা নাচের ব্যাপারটি ‘বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছেন, তারা কি বিদেশী লেখকদের লেখা বিজাতীয় বইও পড়া বর্জন করবেন?

//জেডএস//

লাইভ

টপ