ফ্রিটাউনের ওয়াটার ট্যাক্সি

Send
মঈনুস সুলতান
প্রকাশিত : ০৭:০০, জানুয়ারি ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, জানুয়ারি ১১, ২০২০

ওয়াটার ট্যাক্সির জেটিতে অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। ওখান থেকে সৈকতের পরিষ্কার ভিউ পাওয়া যায়। দেখি, কয়েকজন জেলে দারুণ মেহনতে ঠেলছেন একটি রঙিন দেশি নৌকা। আমি জেটির ব্রিজ ধরে চলে আসি নোঙর করা ওয়াটার ট্যাক্সির কাছে। ঝকঝকে মোটরবোটটি তরঙ্গের ঘাত-প্রতিঘাতে নার্ভাস হওয়া হৃৎপিন্ডের মতো ধড়াস ধড়াস করে দোলে। প্ল্যাটফর্মে অলসভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াটার ট্যাক্সির পোর্টাররা। বুঝতে পারি, প্যাসিঞ্জারদের কোটা পুরা হয়নি। বোট ছাড়তে দেরি আছে প্রচুর। এখানে দাঁড়াতেই নোনা হওয়ায় শরীর জুড়িয়ে যায়। আমি লেগুনের মতো সূর্যালোক জ্বলা সবুজাভ জলের দিকে তাকাই। কিছু দূরে নোঙর ফেলে ঢেউয়ে দোল খাচ্ছে ফ্রিটাউনের বিত্তবান নাগরিকদের শৌখিন বোটগুলো।

সিয়েরা লেওনর রাজধানী ফ্রিটাউন থেকে এয়ারপোর্টে যেতে হলে এ জেটি থেকেই বোট পাকড়ে উপসাগরের মতো সুপ্রশস্ত জলধি অতিক্রম করে পৌঁছতে হয় বিমানবন্দরে। এ নগরীতে আজকে আমার শেষ দিন। বছর তিনেক আমি ফ্রিটাউনে বসবাস করেছি, কাজ করেছি মূলত ইবোলা রিকভারি প্রগামে। ইবোলা সংক্রমণের দুর্যোগপূর্ণ দিনগুলোতে আন্তর্জানিক রুটের বেশ কিছু বিমান চলাচল সাসপেন্ডের কারণে মাসের পর মাস দেশটি ছিলো বিচ্ছিন্ন। আমরা গুটিকয়েক বিদেশ থেকে আগত এইড ওয়ার্কার ও ডিপ্লোম্যাট ইবোলা সংকটে যারা এ দেশ ছেড়ে চলে যাইনি, বোধ করি বিচ্ছিন্নতার কারণে আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠেছিলো গাঢ় সামাজিক অন্তরঙ্গতা। আজ আমি চলে যাচ্ছি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। ফ্রিটাউনের বিমানবন্দরটি লুঙ্গি এয়ারপোর্ট নামে পরিচিত। এর অবস্থান উপসাগরের অন্যপাড়ে একটি উপদ্বীপে। বিমানবন্দরে পৌঁছার সহজ উপায় হচ্ছে, এ জেটিতে এসে ওয়াটার-ট্যাক্সি নামক বোটে সওয়ার হয়ে, অজস্র তরঙ্গে হমেহাল সয়লাব হয়ে থাকা দরিয়া পাড়ি দেয়া।

ঢেউয়ে হিলহিলানো ভাসমান প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে লাউঞ্জের দিকে ফেরার পথে আমি আবার জেটির অন্যদিকের প্রান্ত ঘেঁষা রেলিংয়ে এসে দাঁড়াই। ওখান থেকে পাড়ে ওয়াটার ট্যাক্সি স্টেশনের সামনে পার্ক করা মোটরকারগুলোকে পরিষ্কার দেখা যায়। আমি গাড়িগুলোর আশপাশে হরেকরকমের পণ্য নিয়ে ঘোরাফেরা করা ফেরিওয়ালাদের দিকে তাকাই। বৃদ্ধ জোসেফ বার্জকে দেখি, একজন ফেরিওয়ালার সঙ্গে কথা বলতে বলতে তার ডালায় রকমারি পণ্য খুঁটিয়ে দেখছেন। মি. বার্জের বয়স পঁচাত্তর থেকে ঊনআশির মধ্যে। এক সময় বিলাতের বাকিংহামশায়ার শহরের মিউনিসিপালিটিতে টাউন ক্লার্ক হিসাবে কাজ করতেন। তিনি হরহামেশা স্যুট-টাই পরে ঘোরাফেরা করতে ভালোবাসেন। আজকেও তিনি বছর তিরিশেকের পুরানো ঝ্যালঝ্যালে একটি পিন স্ট্রাইপ স্যুট পরে এসেছেন। হাত নাড়িয়ে ফেরিওয়ালার সঙ্গে কথা বলছেন, তাই রোদে পুড়ে তার কবজিতে ঝলমলাচ্ছে কাফলিংকসের পাথর। তিনি মারাত্মক রকমের কোনো রোগে ভুগছেন বিধায় তার চলৎশক্তি সীমিত—কোমরে সার্জারি হয়েছে দু’বার। বিলাতে ডাক্তাররা তার হাঁটু রিপ্লেস করে দিয়েছেন। তিনি ঠিরঠিরিয়ে এক-পা দু-পা করে কার্টুন ফিল্মের রোবটের মতো হাঁটেন। আর থেকে থেকে বাঁধানো দাঁতে ঝিকমিকিয়ে হাসেন। এ ইংরেজ বৃদ্ধের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় আছে। তার স্ত্রী নিকোল বার্জও আমার প্রিয় মানুষদের একজন। নিকোল ফ্রিটাউনের একটি আন্তর্জাতিক এনজিওতে কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করছেন। তার সংস্থা গরিব গৃহহীনদের জন্য সস্তায় ঘর বানানোর প্রযুক্তি ও ফান্ডস্ সরবরাহ করে থাকে। অবসর সময়ে নিকোল সেইন্ট জর্জ এতিমখানায় সেবা প্রদান করে থাকেন। স্বামী মি. জোসেফ বার্জের সঙ্গে তার বয়সের ব্যবধান বিশ থেকে পঁচিশ বছরের মতো। তবে, তাদের সম্পর্কের তীব্রতা দেখে আমি বিস্মিত হই! ফ্রিটাউনের হিল স্টেশনে আছে ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত বেশ কতগুলো কাঠের ভিলা। আমি উইকএন্ড-এ ওগুলোর ছবি তুলতে যেতাম। আমার এ শখের কথা জানতে পেরে নিকোল তার বৃদ্ধ স্বামী জোসেফকে নিয়ে আমার সঙ্গে ছবি ওঠানোর আয়োজনে শরিক হতেন। আমি বাড়ির বাসিন্দাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সব বন্দোবস্ত করে রাখতাম। নিকোল জোসেফ সাহেবকে নিয়ে নির্দিষ্ট বাড়িটির সামনে হাজির হতেন সময়মতো। এ ডিজিটালের যুগেও মি. বার্জ আদিকালের অলিম্পিয়া ক্যামেরায় ফিল্ম পুরে ছবি তোলা পছন্দ করেন। নিকোল বৃদ্ধের হাত ধরে, ভারসাম্য রক্ষা করে তাকে পুরনো বাড়িগুলোর উঁচু সিঁড়ি দিয়ে, নানা কসরতে ঘরে ঢুকতে সাহায্য করতেন। তারপর মি. বার্জ ঠিরঠিরিয়ে হেঁটে গিয়ে তুলতেন কেবল দোতালায় ওঠার সিঁড়ির ফটোগ্রাফস। মি. বার্জ বর্তমানে নানা অ্যাঙ্গেলস থেকে তোলা হরেক রকমের কাঠের সিঁড়িতে স্কাইলাইট দিয়ে আসা আলোর প্রতিসরণকে থিম করে ফটোগ্রাফসের একটি বই কম্পোজ করছেন। গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য তিনি পাবলিশারও খুঁজে পেয়েছেন।

আমি ওয়েটিং-লাউঞ্জে ফেরার পথে দেখতে পাই সরু করিডোরের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে জোসেফ বার্জ সাহেবের স্ত্রী নিকোল। তিনি উদ্বিগ্ন চোখে আইফোনে নিউজ পড়তে পড়তে তার ঠ্যারঠেরানো স্বামীর দিকে নজর রাখছেন। দাঁড়িয়ে পড়ে আমি তার সঙ্গে একটু-আধটু কথাবার্তা বলি। আমি আজকেই ফ্রিটাউন ছেড়ে চলে যাচ্ছি শুনে তিনি চিন্তিত হয়ে বলেন, ‘জোসেফ যে তোমাকে তার অনেক বছর আগে প্রকাশিত ফটোগ্রাফসের বইটি উপহার দিতে চেয়েছিল?’ নিকোলের সঙ্গে বিবাহিত হাওয়ার অনেক আগে জোসেফ সাহেবের প্রথমা স্ত্রীর আমলেও একবার নাকি তিনি ছবি তোলায় মেতেছিলেন। তখন তরুণ মি. জোসেফ বার্জ ইতালি ও ফ্রান্সের নানা পোতাশ্রয়ে স্পিডবোট হাঁকিয়ে তুলেছিলেন শৌখিন ইয়টগুলোর হাওয়ায় ফুলে ওঠা পালের ছবি। হরেক রকমের আকৃতি ও বর্ণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নাকি সমুদ্রজলে পালের বিচিত্র সব প্রতিবিম্বের অনেক তসবির তুলেছিলেন। এসব ফটোগ্রাফস কম্পাইল করে প্রকাশিত হয়েছিল তার একটি মনোজ্ঞ ছবিওয়ালা বই। জোসেফ সাহেব এতদিন বইখানি খুঁজে পাচ্ছিলেন না, তাই আমাকে তা উপহার দেয়া হয়নি। সম্পত্তির উইল বিষয়ক দলিল খুঁজতে গিয়ে গতকাল তিনি তার পুরনো ট্রাংকের তলায় পালের ছবিওয়ালা কেতাবটি খুঁজে পেয়েছেন। নিকোল সিনসিয়ারলি জানতে চান, পুস্তকখানি আমাকে পাঠানোর উপায় কী? আমি তার নোটবুকে আমার ফরোয়ার্ডিং অ্যাড্রেস লিখে দিয়ে ওয়েটিং লাউঞ্জের দিকে অগ্রসর হই।

ওখানে চাকাওয়ালা ভারী সব স্যুটকেস ও নানা আকৃতির ব্যাগ নিয়ে প্যাসিঞ্জাররা জড়ো হচ্ছেন। টিকিট কাউন্টারের সামনে ছোটোখাটো জটলা, কী যেন একটা কোন্দল বেঁধেছে, জনা তিনেক স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ হাত ছুড়ে, গলার স্বর চড়িয়ে তর্কাতর্কি করছেন। একজন পোর্টার আমরা স্যুটকেস ইত্যাদি পাহারা দিচ্ছেন, আমি তাকে হ্যালো বলে বসে পড়ি একটি চেয়ারে। তখনই জোসেফ সাহেবের উইলের প্রসঙ্গটি ফিরে আসে মনে। আমার সাথে ঔপনিবেশিক আমলের কোনো ভিলাতে সিঁড়ির ছবি তোলার সময় বার কয়েক তিনি উইলের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তার জীবনের মেয়াদ যে বেশিদিন নেই-এ ব্যাপারে মি. জোসেফ বার্জ খুবই সচেতন। তিনি উকিল খুঁজছিলেন, উইলটি বাদলানোর জন্য। কারণ, অনেক দিন আগে করা উইলে উত্তরাধিকারী হচ্ছেন তাঁর প্রথমা স্ত্রী-যিনি বহু বছর হলো বিগত হয়েছেন। সুতরাং নাম পরিবর্তন করে উইলে বর্তমান পত্নী নিকোলের নাম ঢোকানো প্রয়োজন। আন্দাজ করি, মি. বার্জ যখন উইলটি খুঁজে পেয়েছেন, আশা করি ব্রিটিশ হাইকমিশনের হিল্লা ধরে ল-ইয়ার জোগাড় করা তার জন্য কঠিন কিছু হবে না। একটি অশুভ ভাবনাও আমার মনে উঁকি দেয়। আগামী দু এক বছরের মধ্যে তার মৃত্যু হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। মি. বার্জ তার অন্তিম সময়ের কথা ভেবে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। ছবি ওঠাতে গিয়ে নিকোলের অবর্তমানে আমার সঙ্গে এ বিষয়টি তিনি আলাপও করেছেন। অন্ত্যোষ্টিয়ার খরচাদি নির্বাহের জন্য তার যে ইন্স্যুরেন্স আছে, তা মরদেহ বিলাতে পাঠানোর ব্যয় বহন করবে না। তিনি ‘রিহেবিলিটেশন অব রিমেইনস্’ নামে ভিন্ন ধরনের আরেকটি ইন্স্যুরেন্স-যা বিমানযোগে তার স্বদেশে লাশ পাঠানোর ব্যয় বহন করে থাকে, তার পদ্ধতি ও প্রিমিয়াম নিয়ে আমার সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। তূলনামূলকভাবে কম বয়স্ক নিকোল কেন তাকে স্বামী হিসেবে নির্বাচন করেছে বিষয়টা আমার কাছে রহস্যময়। তবে যতটা জানি, নিকোল তার ওপর ইমোশনালি দারুণভাবে নির্ভরশীল। তিনিও ওপেনলি তার ভালোবাসার প্রকাশ করেন কায়মনোবাক্যে। তাদের দাম্পত্য নিয়ে একটি ভাবনা আমাকে কৌতূহলী করে তোলে—নিকোল কি জোসেফ সাহেবের মৃত্যুর পরপরই ভিন্ন কোনো অল্পবয়সি পুরুষকে বিবাহের উদ্যোগ নেবে?

হইচই করে ওয়েটিং লাউঞ্জে এসে ঢুকে নানা রকমের ড্রাম, মারিমবা ও গিটার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র হাতে রঙিন জামাকাপড় পরা, পিঠে মুখোশ ঝোলানো তরুণদের কালচারেল ডেলিগেশন। তাদের সঙ্গে আছেন মিসেস কিটি ওয়াং। এই চৈনিক নারী ফ্রিটাউনের বালানটা মিউজিক একাডেমির ডিরেক্টর। দক্ষ পিয়ানো বাজিয়ে এই প্রৌঢ়া ব্রিটিশ এক অ্যাকাউটেন্ট মি. ক্লাইভকে বিয়ে করে নব্বই দশকের শেষ দিকে ফ্রিটাউনে এসে সেটেল্ড হন। তারপর আর ফিরে যাননি তার স্বদেশে। আমার সাথে চোখাচোখি হতেই কিটি ওয়াং কাউন্টার থেকে পুরা কালচারেল ডেলিগেশনের জন্য ওয়াটার ট্যাক্সির টিকিট কিনতে কিনতে হাত নেড়ে যেন বলতে চান, একটু অপেক্ষা করো সুলতান, ঝামেলাটা মিটুক, তারপর এসে তোমার সঙ্গে বাতচিত করব। আমি আগ্রহ নিয়ে ডেলিগেশনের বিশাল বিশাল শঙ্খ ও বন্যপশুর শিংয়ে ছিদ্র করে তৈরি বাঁশরি হাতে তরুণ-তরুণীদের দেখি। এদের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে সকলকে নানা রকমের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন মি. মাসাক্যুই। বছর আষ্টেক আগে ইনি ছিলেন সিয়েরা লেওনের তথ্যমন্ত্রী। বর্তমানে একটি মিডিয়া হাউসের মালিক হিসেবে পত্রিকা, রেডিও ও টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। ঘানার আক্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সত্তর দশকে নাটকে ডক্টরেট করা মি. ম্যাসাক্যুইকে ফ্রিটাউনের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রধান চাঁই হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। আকার-আকৃতিতে দশাসই এ পুরুষ দৈহিক উচ্চাতায় অন্যান্য কলাকারদের চেয়ে কমসে-কম ফুট খানেক লম্বা। ওয়েটিং লাউঞ্জে জড়ো হওয়া কালচারেল ডেলিগেশনের ধুন্দুমারের ভেতর ছড়ি হাতে মি. ম্যাসক্যুইকে দেখায় যানবাহনের ভিড়ে ট্র্যাফিক-আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে জ্যাম সামলানো পুলিশের মতো। তিনি এক হাত তুলে আমাকে ফৌজি কায়দায় স্যালুটের ভঙ্গিতে যেন বোঝাতে চান, যাক, অবশেষে তোমাকে ধরা গেল সুলতান। আমি কুর্নিশি কায়দায় মাথা ঝুঁকিয়ে তার সম্ভাষণের জবাব দিই।

তখনই হুড়মুড় করে লাউঞ্জে এসে ঢুকে কালচারেল ডেলিগেশনের আরেক অংশ-সালোন ড্যান্স ট্রুপ। এ গ্রুপের মেয়েগুলোর মুখে ফোঁটা ফোঁটা রঙ দিয়ে আল্পনা আঁকা। দলে বেশ কতেক বাচ্চা মেয়েও আছে। মি. ম্যাসাক্যুই হাঁকডাক করে সকলকে একপাশে সারিয়ে দিয়ে পুরো ড্যান্স-ট্রুপকে দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে আইপ্যাডে ফটাফট ফটো তুলেন। পোজ দেয়া ড্যান্সারদের বেজায় কিউট দেখায়। কালচারেল ডেলিগেশনের তাবৎ কলাকাররা কে কী করছে, কার হাতে কী ধরনের বাদ্যযন্ত্র, এসব খুঁটিয়ে দেখার সময় সালোন জ্যাজের জবরদস্ত গায়িকা লায়লাতু তুরেকে শনাক্ত করি। চেহারা-সুরতে চনমনে সেক্স অ্যাপিলওয়ালি মেয়েটি হালফিল তরুণদের হৃদয়ে হার্টথ্রবের মর্যাদা পাচ্ছে। নাইটক্লাব মাতানো পারফরমেন্সের জন্য ট্যাবলয়েডে লায়লাতু তুরেকে সন্ধ্যারাতের ললিপপও বলা হচ্ছে। সপ্তদশী এ গায়িকাকে আমি পয়লা চাক্ষুষ করি বালানটা মিউজিক একাডেমির বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে। সে নিজের লেখা লিরিক ‘রিয়েল ম্যান ডোন্ট স্লিপ উইথ আ স্কুলগার্ল’ ব্লুজের কায়দায় গেয়েছিল। অনুষ্ঠানের মাস দেড়েক আগে সিয়েরা লেওন কেবল ইবোলামুক্ত ঘোষিত হয়েছে। মারাত্মক এ রোগের দুর্বিষহ দিনে সংক্রমণের ভয়ে দেশের তামাম স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এতে বালকদের মধ্যে ছড়ায় সস্তা ড্রাগসে আসক্তি এবং প্রচুর স্কুলছাত্রী হয়ে পড়ে অনভিপ্রেতভাবে অন্তঃসত্ত্বা। পরবর্তীতে ইবোলাহীন নরমাল পরিবেশে স্কুল খুললে কর্তৃপক্ষ প্রেগনেন্ট মেয়েদের বিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সালোন স্যোসাইটি বলে পরিচিত সিয়েরা লেওনের রক্ষণশীল সমাজ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন দেয়। সারা দেশে কোথাও এ নিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ওঠে না বটে, তবে লায়লাতু তার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া বান্ধবীদের সহানুভূতিতে রচনা করে বিতর্কিত এ লিরিক এবং তা বিশাল একটি অনুষ্ঠানে সাহসীভাবে গেয়ে তোড়জোড় তোলে। প্রতিবাদী এ কণ্ঠস্বরকে অ্যাপ্রিশিয়েট করে অনুষ্ঠানের গোটাকয়েক শ্রোতা, মঞ্চে গাইতে গাইতে ড্যান্সরতা লায়লাতুর দিকে লকেল কারেন্সি লিয়োন্স ছুড়ে দিলে আমিও জোশাক্রান্ত হয়ে ছুড়েছিলাম টাকার ছোটোখাটো একটি তোড়া।

ওই অনুষ্ঠানে বাদ্যবাজনার তামাদি হলে পর বালানটা মিউজিক একাডেমির ডিরেক্টর মিসেস কিটি ওয়াং এর সঙ্গে সহবতের উদ্দেশ্যে গ্রিনরুমের চৌকাঠে উঠলে স্ক্রিন ঠেলে বেরিয়ে এসেছিল লায়লাতু। আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে একটি ছোট্ট কার্ডে লিরিকটির পয়লা চরণ ‘রিয়েল ম্যান ডোন্ট স্লিপ উইথ আ স্কুল গার্ল’ লিখে অটোগ্রাফও দিয়েছিল। গানটিতে প্রচারিত হচ্ছে সময়ানুগ বার্তা। তাই তা সিডি আকারে প্রকাশ করার সম্ভাবনা যাচাই করেছিলাম। সদালাপী লায়লাতুর সাথে কথাবার্তা বলতে বলতে আগ্রহের সাথে নজর করেছিলাম, তার ব্যতিক্রমী ফ্যাশন সেন্স। সুতির শার্টটপের সঙ্গে সে পরে ছিল লাল-সবুজের মিশেলে ঝলমলে একটি পুরুষালি টাই। তার দুটি পায়েও ছিল এক পাটি লাল ও এক পাটি সবুজ রঙের স্পোর্টস-সু।

আজ লায়লাতুকে ওয়েটিং লাউঞ্জে বেজায় প্রভোকেটিভ আউটফিটে দেখতে পেয়ে কৌতূকবোধ করি। উচ্চতায় ছোটোখাটো রনপায়ের মতো সাদায় সোনালি গ্লেইস দেয়া হাইহিল পরে কোমরের দুদোল্যমানতায় পুরুষদের হৃদয়ে সেনসেশন ছড়িয়ে সে হাঁটে। তার কাঁচুলির মতো পুঁতির বিড বসানো টপটি নিন্মনাভির প্রায় চার ইঞ্চি উপরে জরির আভায় ঝলমলে হয়ে দুলছে। তার এক হাতের বাস্কেটে বেনি-কেক নামে পরিচিত মধুমাখানো সেসমি সিডের বরফি। অন্য হাতে সে এক পুরুষ প্যাসিঞ্জারের কাঁধ মৃদুভাবে সংবাহন করে দিতে দিতে অদুরে ভঙ্গিতে অনুযোগ করে বলে, কালচারেল ডেলিগেশন ঘানার আক্রাতে যাচ্ছে সালোন সংস্কৃতির ডিসপ্লে করতে। সরকার তাদের টিকিটের বন্দোবস্ত করে দিলেও কলাকার ছেলেমেয়েদের হাতে কোনো পকেটমানি ধরিয়ে দেয়নি। তো, তারা আক্রাতে দিনযাপন করবে কীভাবে? প্যাসিঞ্জার ভদ্রসন্তানের মুখে সে মারাত্মক রকমের সুইট একটি বানি-কেক গুঁজে দিতে চাইলে তিনি লায়লতুর কোমরে কড়ির বেল্টে বাঁধা পার্সে ঢুকিয়ে দেন লিয়োন্সের বান্ডিল বাঁধা কিছু নোট। পুরো ব্যাপারটি নিরিখ করে দেখতে গিয়ে লায়লাতুর সঙ্গে আমার আই কন্ট্রাক্ট হয়। সে তৎক্ষণাৎ লোহিত ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে প্যাসিঞ্জার ভিকটিমটিকে ত্যাগ করে আমার দিকে পুরোপুরি নজর দেয়। বলে, ‘ওহ ম্যান, হিয়ার ইউ আর, হাইডিং বিহাইন্ড অ্যাভরি বডি, নট গেটিং দ্যা অ্যাটেনশন ইউ ডিজারভড, তোমার দিকে এবার বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হয় যে।’ আমি রিঅ্যাক্ট করার আগেই সে হাইহিলে হেলেদুলে চলে আসে আমার সামনে। ন্যাপকিনে প্যাঁচিয়ে সেসমি সিডের দুখানা বরফি আমার হাতে তুলে দিয়ে জানতে চায়, ‘হ্যান্ডসাম গাই, তুমি কি ইউরোতে কনট্রিবিউট করতে চাও? নাকি তোমার পছন্দ ডলারে পেমেন্ট করা।’ আমি মুখে কিছু না বলে বাতাসে তর্জনি দিয়ে ডলারের চিহ্ন আঁকি। উৎসাহিত হয়ে আমার কাঁধে হাত রেখে সে বলে, ‘হাউ অ্যাবাউট আ টোয়েনটি ডলার বিল।’ আমি তার দিকে তাকিয়ে বিভাজিকার কাছে টপে পিন দিয়ে আটকানো একটি বোতাম দেখি। তাতে মার্কার দিয়ে লেখা ‘লায়লাতু এনজয়স্ কোয়ালিটি টাইম উইথ আ রিয়েল ম্যান’ বাক্যটি। পড়ে আমার চোখেমুখে আমোদ ফুটে ওঠে। তো সে বাঁ-চোখ কুঁচকে খুব ফেমিনিনভাবে উইন্ক করে বলে, ‘ম্যান, ওহ ম্যান, পকেট থেকে ওয়ালেট বের করতে এত দেরি হচ্ছে কেন তোমার? ইজ টেন ডলার আ বেটার কনট্রিবিউশন ফর ইউ ইনস্টেড।’ আমার মেজাজ ফ্লার্টি হয়ে ওঠে, তাই কণ্ঠস্বরে হালকা চটুলভাব এনে বলি, ‘আজকে আমি ফ্রিটাউন ছেড়ে যাচ্ছি, আমি চাই আজ একটু জেনারাস হতে।’ লায়লাতু চোখমুখে বিভ্রান্তি ফুটিয়ে জানতে চায়, ‘হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দিস?’ আমি ওয়ালেট বের করতে করতে প্রস্তাব করি,‘ হাউ অ্যাবাউট থার্টি ডলার? এর সাথে এয়ারপোর্টে তুমি চিলড দুটি বিয়ার কিনে খাবে, এ জন্য আমি যদি আরও পাঁচ ডলার যোগ করি, তুমি খুশি হবে না লায়লাতু?’ কিছু না বলে পঁয়ত্রিশ ডলার কোমরে ঝোলা পার্সে ঢুকিয়ে ফিক করে হেসে, মুখ বাড়িয়ে দিয়ে সে বলে, ‘হাউ অ্যাবাউট অ্যা সফট সুইট কিস?’ আমি আঁতকে উঠে ‘ওহ্ হেল নো,’ বলে ঘাড় বাঁকিয়ে সরে যাই। সাদা ধুপদুরস্ত ম্যানিলা শার্ট পরে আছি। এতে লিপস্টিকের দগদগে লোহিত বর্ণের ছোঁয়া নিয়ে পরপর একাধিক বিমানবন্দর অতিক্রম করতে চাই না। মৃদু মুখ ভ্যাংচিয়ে লায়লাতু অন্য এক প্যাসিঞ্জারের দিকে যেতে যেতে বলে, ‘ম্যান, ইউ আর গোনা রিগ্রেট দিস।’ আমি এ মন্তব্যের পাল্টি না দিয়ে চুপচাপ অন্য দিকে তাকাই।

মিসেস কিটি ওয়াং ও মি. মাসাক্যুই এসে চেয়ার টেনে আমার কাছাকাছি বসেন। বসেই মি. ম্যাসাক্যুই আইপ্যাডে ইমেইলের জবাব দিতে শুরু করেন। তার মৃত কোনো পশুর চামড়ায় তৈরি কোটির পকেট থেকে উঁকি দিচ্ছে সেলোফোনে মোড়া সিগার। কিটি তার ডায়েরিতে কিছু খোঁজাখুঁজি করতে করতে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসেন। তিনি ডাসাকি ওয়াক্স প্রিন্ট বাটিকের একটি কালারফুল ড্রেস পরে আছেন। পোশাকটির নেকলাইন সম্পূর্ণ স্লিভলেস হওয়ার ফলে তার গ্রীবার কাছে তৈরি হয়েছে ক্রিসেন্ট মুনের সিগ্ধ আকৃতি। কিটি রঙিন কালিতে ক্যালিওগ্রাফ করে লেখা একটি দাওয়াতি চিঠি আমার হাতে ধরিয়ে দেন। এতে সপ্তাহ দেড়েক আগে ঘানার আক্রা শহরে কালচারেল ডেলিগেশনের যাত্রা উপলক্ষ্যে ফান্ড রাইজিং অনুষ্ঠানে যাওয়ার তারিখ, সময়, ও ভোজ বাবদ পঞ্চাশ ডলারের তথ্য লিপিবদ্ধ আছে। আমি অনুষ্ঠানে শরিক হতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলি, ‘স্যরি, সিয়েরা লেওন ছেড়ে যাওয়ার আগে আমি যে-ইবোলা রিকভারি প্রোগ্রামে কাজ করতাম, তার গোটা বিশেক প্রজেক্ট ক্লোজ আউট করতে হলো। এ নিয়ে বড্ড ব্যস্ত ছিলাম, অনেকগুলো গ্রামে যেতে হচ্ছিল কিটি।’ আমার অজুহাতকে আমলে না এনে মাথা দুলিয়ে কিটি বলেন, ‘নো প্রবলেম সুলতান, ইনভাইটেশনের কার্ড আমি তোমার জন্য হাতে লিখেছিলাম, নেবে না তুমি এটা?’ আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বলি, ‘আপনি এত সুন্দরভাবে ক্যালিওগ্র্যাফ করে হাতে কার্ডটি তৈরি করেছেন, আমি এটা স্যুভিনির হিসেবে নিতে চাচ্ছি।’ হাসিটিকে আরো মিষ্টি করে তিনি পার্স থেকে একটি বই বের করে বলেন, ‘তোমাকে কিন্তু স্যুভিনির হিসেবে সামান্য ভারী আরেকটি জিনিস ক্যারি করতে হবে।’ কিটি সিয়েরা লেওনের জ্যাজ সংগীতের প্রেক্ষাপট নিয়ে তার লেখা গবেষণামূলক বইটিতে চায়নিজ ইন্কওয়ালা একটি কলম দিয়ে ক্যালিওগ্রাফ করে আমার নাম লেখেন। লিখে চলা হাতের দিকে তাকিয়ে আমি জানতে চাই, তার স্বামীর খবরাদি। কী রকম আছেন মি. ক্লাইভ? কিটি লেখা থেকে চোখ না তুলেই বলেন, ‘হয়তো শুনেছ, তার চিকিৎসার জন্য আমরা বিলাতে মাস দুয়েক কাটিয়ে এসেছি, ক্লাইভ ইজ ডুয়িং অলরাইট, জানোইতো এসব সমস্যার কোনো নিরাময় নেই।’ কিটি মাথা নিচু করে তার বইয়ের সাদা পৃষ্ঠায় চায়নিজ ইন্ক দিয়ে সিয়েরা লেওনের একটি জনপ্রিয় জ্যাজ লিরিকের কয়েকটি চরণ লিখছেন। এ সংগীতের কথা ও সুরের রচয়িতা কিটি স্বয়ং। এর প্রথম দুটি লাইন ‘স্পেনডিং টু মাচ টাইম এলোন/হর্সেস গ্যালাপ টু হার থ্রোন,’ আমি এ দেশের অনেক তরুণ-তরুণীকে এ গানটি গুনগুন করে গাইতে শুনেছি। কিটির অঙ্কনরত সুগোল বাহুর দিকে তাকিয়ে এ লিরিকটির রেশ আমার করোটিতে বেজে ওঠে। তার আবেশে আমি উদ্দীপ্ত হতে হতে ক্লাইভ সাহেবকে নিয়েও একটু ভাবি। ক্লাইভের জন্ম ফ্রিটাউনে। তার বাবা এ শহরের ঔপনিবেশিক প্রশাসনে কাজ করতেন। বালক বয়সে এখানকার একটি স্কুলে তিনি ক্রিকেট ক্লাব গড়ে তুলেছিলেন। সিয়েরা লেওন স্বাধীন হলে পর ক্লাইভ মা-বাবার সাথে ফিরে যান বিলাতে। বেড়ে ওঠেন ব্রিস্টল শহরে। তারপর একটি ব্রিটিশ সওদাগরি কোম্পানিতে চাকুরি পেয়ে চলে যান হংকংয়ে। ওখানে পরিচয় থেকে প্রণয় অবধি গড়ায় কিটি ওয়াংয়ের সঙ্গে। তাকে বিয়ে করে ক্লাইভ সাহেব কিছু দিন হংকংয়ে কাটিয়ে চীনা কনেকে নিয়ে অতঃপর ফিরে আসেন ফ্রিটাউনে। দেশটি তাদের এতই ভালো লাগে যে, তারা এদেশে হালফিল রীতিমতো সেটেল্ড হয়ে আছেন। বিলাতে বা হংকংয়ে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই।

কিটি এখন মাথা নিচু করে বইতে লেখা লিরিকের চরণগুলোর চারপাশে ফুল-পাতা ও পাখির মোটিফ এঁকে যাচ্ছেন। তাকে অন্যমনস্ক দেখায়। ক্লাইভ সাহেবের ভাবনা আমি মাথা থেকে সরাতে পারি না। বছর দেড়েক আগে তিনি অ্যাকাউটেন্টের চাকুরি থেকে কেন জানি আর্লি রিটায়ারমেন্ট নিয়েছেন। ফ্রিটাউনের বাইরে দরিয়ার তীরে তাদের কটেজ। যার পেছনের আঙিনা থেকে হেঁটে চলে যাওয়া যায় সমুদ্রসৈকতে। মাঝে মাঝে কিটি ও ক্লাইভ বিচ-পার্টির আয়োজন করে থাকেন। তাতে বালানটা মিউজিক একাডেমির ছাত্রছাত্রীরা এসে পরিবেশন করে লাইভ মিউজিক। এ ধরনের একটি বিচ-পার্টিতে ক্লাইভের আউলাঝাউলা আচরণ আমার নজরে আসে। পানীয়ের পাত্র হাতে আমার সাথে গল্পগুজব করতে করতে বলেন, ঠিক মনে করতে পারছেন না, কোন স্ট্রিটে ছোটোবেলা তিনি তার মা-বাবার সঙ্গে বাস করতেন। এ তথ্য আমার তো জানা থাকার কথা নয়। ওই পার্টিতে তিনি স্যুট-টাই পরা মি. জোসেফ বার্জকে ব্রিটিশ হাইকমিশনার ভেবে ‘ইয়োর এক্সলেন্সি’ ইত্যাদি সম্বোধন করলে মুখ টিপে হাসাহাসির খোরাক হন।

এ ঘটনার মাস খানেক পর ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বাসভবনে নিউ ইয়ার্স ডে’র গার্ডেন পার্টিতে আবার মিসেস কিটি ও ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়। ক্লাইভ এক বাটি আইসক্রিমে চামচ চুবিয়ে চুকচুক করে তা চুষতে চুষতে আমাকে বলেন, ‘গতকাল সূর্যগ্রহণের সময় তুমি কোথায় ছিলে, সুলতান? আমরা সৈকতে পার্টি করলাম। ইট ওয়াজ ট্রুলি অ্যান অ্যামেজিং সাইট।’ গতকাল সূর্যগ্রহণের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না, আমি এদেশে আসা অবধি কখনো চন্দ্র কিংবা সূর্যগ্রহণ কিছুই হয়নি। কী আজগুবি আবজাব বলছেন মি. ক্লাইভ, বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করি, ‘হোয়াট দ্যা হেল আর ইউ টকিং অ্যাবাউট?’ তিনি ইলাবরেট করে বলেন, ‘ইট ওয়াজ অ্যান আনপ্যারালাল সাইট। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে ছিলাম সৈকতে, আর আসমান-জমিন তাবৎ কিছু ঠিক দুপুরবেলা অন্ধকার হয়ে আসল। মুদে গেল বনগোলাপের পাপড়ি, কাঁটাঝোপে ঝিঁঝিপোকারা তারস্বরে ডাকছে, আর জলতলে বিভ্রান্ত হয়ে সমুদ্রের সারফেসে লাফিয়ে উঠছে ডলফিন।’

সূর্যগ্রহণের বর্ণনা শুনে আমি  নির্বাক হয়ে যাই। ক্লাইভ সাহেব ন্যাপকিনে ঠোঁটমুখ মুছে, পাইপ ধরিয়ে, পাশে বসা ফ্রিটাউন ইন্টান্যাশনেল স্কুলের শিক্ষার্থী আইরিনকে পুতুল নাচের দারুণ পারফরম্যান্সের গল্প বলতে শুরু করেন। ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা পাপেটিয়ারদের ট্রুপ নাকি ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেলের ম্যানসনে গেল সপ্তাহের উইকএন্ডে পুতুলনাচের প্রদর্শনী করেছে। শুনতে শুনতে মহাবিভ্রান্তির মাঝে পড়ি। সিয়েরা লেওন তো স্বাধীন হয়েছে অনেক বছর। এখানে ব্রিটিশ গভর্নরের সাবেক ম্যানশনটি নাম বদলে হয়েছে প্রেসিডেন্টসিয়াল লজ। বর্তমানে তাতে বহাল তবিয়তে বসবাস করছেন দেশের রাষ্ট্রপতি ড. বাই করোমা। ফ্রিটাউন তেমন একটা বড়ো মেট্রোপলিটান শহর নয়। ইন্দোনেশিয়া থেকে পুতুলনাচের ট্রুপ আসলে তা পত্রিকায় নিউজ হতো। আমরাও জানতে পারতাম। দূতাবাসগুলোর চ্যানেলে ইনভাইটেশনের কার্ড পেতাম। মি. ক্লাইভ পুতুলনাচের নানা রকমের ডিটেলস উৎসাহের সাথে বর্ণনা দিয়ে চলছেন। আশপাশে চেয়ারে বসা জানাশোনা অভ্যাগতরা পরস্পরের দিকে চোখ ঠারছেন। আমি কী করব বুঝতে না পেরে উঠে পড়লে, কিটি আমাকে বাগানের এক কোণায় ডেকে নিয়ে বলেন, ‘স্যরি, ক্লাইভ ইজ ক্রিয়েটিং কনফিউশন। সে গত কয়েকদিন ধরে ফ্রিটাউনে পিতা-মাতার সঙ্গে তার বালক বয়সে বসবাসের সময় লেখা একটি ডায়েরি বারবার পড়ছে। ডায়েরিতে বছর তিরিশেক আগে ফ্রিটাউনে ঘটা সূর্যগ্রহণ ও পুতুলনাচের বিস্তারিত বিবরণ আছে।’ আমি তাকে বলি, ‘ইটস্ অলরাইট কিটি, বিষয়টা আমি বুঝতে পারছি, ডোন্ট ওয়ারি।’

আইপ্যাডের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে মি. মাসাক্যুই বলেন, ‘আই অ্যাম স্যরি দ্যাট ইয়োর টাইম হ্যাজ কাম টু এন অ্যান্ড ইন ফ্রিটাউন। আমরা তোমার কটেজে ককটেলে যাওয়ার সুযোগ হারাব। টু ব্যাড, তোমার দেয়া সিডিগুলোও আর পাব না। দ্যাট ইজ গোয়িং টু বি আ লস ফর মি।’ আমি হাত বাড়িয়ে ,‘আই উইল ট্রুলি মিস ইউ মি. মাসক্যুই,’ বলে করমর্দন করে তার কাছ থেকে বিদায় নেই।

ওয়াটার ট্যাক্সিতে উঠে পড়ার অ্যানাউন্স হতেই স্যুটকেস, বাক্স, পোটরা প্রভৃতি টেনেটুনে সি-অফ করতে আসা আত্মীয়স্বজনদের শেষবার আলিঙ্গন করে প্যাসিঞ্জাররা জেটির দিকে হুড়মুড় করে রওনা হয়।

ওয়াটার ট্যাক্সির বোটখানি মিহি বালুকায় বাদামি হয়ে থাকা সৈকতের পাড় ঘেঁষে লুঙ্গি এয়ারপোর্টের দিকে এগোয়। বেলাভূমিতে অকেজো হয়ে পড়ে থাকা হলুদরঙের বিচিত্র একটি বিশাল মোটরবোটের দিকে নির্দেশ করে একজন চেনা প্যাসেঞ্জার বলে ওঠেন, ‘দিস ইজ আওয়ার ব্রোকেন ডাউন হোভারক্রাফ্ট।’ এক সময় ফ্রিটাউন থেকে এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্য কোনো ওয়াটার ট্যাক্সির ব্যবস্থা ছিল না। এ হোভারক্রাফ্টে জলের সামান্য ওপর দিয়ে উড়ে প্যাসিঞ্জারদের যেতে হতো এয়ারপোর্টে।

ওয়াটার ট্যাক্সির বোটখানি চলে আসে লুঙ্গি পেনিনসুলার বালুচরের কাছাকাছি। গতি কমে আসলে কাছ থেকে দেখি, সুদীর্ঘ কাঠের একটি নৌকা চলছে একই গন্তব্যে প্রায় সমান্তরালভাবে। নাওখানির নীল-হলুদে ডোরাকাটা বডিতে ইংরেজিতে লেখা, ‘আল্লাহ ইজ ওয়ান।’ তাতে বেজায় ভিড় করে আছে বসে আছেন অজস্র স্থানীয় মানুষজন। লুঙ্গি বিমানবন্দরে পৌঁছার জন্য একসময় এদিকে চালু ছিল হেলিকপ্টার ও হোভারক্রাফ্ট। এ মুহূর্তে আমি যে মোটরবোটে চড়ছি, তা তুলনামূলকভাবে বিলাসবহুল, দামের দিক থেকেও খুবই এক্সপেনসিভ। ফ্রিটাউনের বিত্তবানরা এবং বিদেশের নাগরিকরা মূলত ব্যবহার করে থাকেন ওয়াটার ট্যাক্সির সার্ভিস। স্থানীয়রা এখনও তাদের দেশি নৌকায় পাড়ি দেন তরঙ্গ সংকুল দরিয়া। সম্পদের তারতম্য এভাবে প্রতিভাত হয় যানবাহনে ও সমাজের সর্বত্র। এ ব্যবধান আমার জীবদ্দশায় ঘুচবে বলে মনে হয় না।

মোটরবোটটি লুঙ্গি পেনিনসুলার জেটিতে এসে ঠেকে। ঢেউয়ে হিলহিলানো বোট থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে আমি ক্যারি-অন ব্যাগটি সামলানোর চেষ্টা করি। একজন পোর্টার এসে তা তুলে নেন তার হাতে। আমি জেটির রেলিংয়ের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকাই।  দরিয়ার ওপর দিয়ে ওড়ছে মেঘছোঁয়া কুয়াশার মতো ঘন মিস্ট। দূরে ফ্রিটাউনের নগররেখাকে আবছা দেখায়। মনে হয়, এভাবে প্যাসিঞ্জাররা হয় ওয়াটার ট্যাক্সি বা দেশি নৌকা পাকড়ে খেয়া পারাপার করবে অনাগত দিনে। সমুদ্রের সবুজাভ তরঙ্গরাজিতে তৈরি শুভ্র ফেনায় হাওয়ার তোড় লেগে তছনছ হবে হামেশা। কিন্তু এসব দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকার ফুরসত নিয়ে আমিই শুধু এদেশে থাকব না।

//জেডএস//

লাইভ

টপ