প্রসঙ্গ ‘চল্লিশ কদম’

Send
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৭:২৬, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩০, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত কাজী আনিস আহমেদের উপন্যাসিকা ‘চল্লিশ কদম’-এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এ বছর একুশে গ্রন্থমেলায়। বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। মূল্য ১৫০ টাকা। পাওয়া যাচ্ছে কাগজ প্রকাশনের ৬১৪-১৫ নম্বর স্টলে।

২০০১ সালে মিনেসোটা রিভিউ-এ কাজী আনিস আহমেদের ‘চল্লিশ কদম’ প্রথম প্রকাশিত হয়েই ব্যাপক প্রশংসা পায় এবং বিবেচিত হয় উপমহাদেশীয় গল্পকথনের এক সেরা নমুনা হিসেবে। ইন্দ্রিয়পরতা, প্রবঞ্চনা আর ছলনার এক সিরিও-কমিক কাহিনি বর্ণনা করার জন্য আহমেদ তাঁর সূক্ষ্ম শিল্পদক্ষতায় এক জাদুবাস্তবতাধর্মী আবহ সৃষ্টি করেছেন। এর পটভূমি হলো জামশেদপুর নামে একটা ছোট ঔপনিবেশিক শহর, যার নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিচয় এবং উত্থান-পতনে ভরা ইতিহাস নেই। আহমেদ শহরটার এই বৈশিষ্ট্য আলাদা করে তুলে ধরেন। বিভিন্ন সময়ে রাজধানী শহরের যেখানে স্থান অনেক বেশি সুনির্ধারিত, আর কাল অনেক বেশি সংকটপূর্ণ; তার সঙ্গে প্রতিতুলনার মাধ্যমে কাহিনির আরম্ভ আর শেষটা ধাঁধার মতো নায়ক মারা যায় এবং মারা যায় না; সেই সঙ্গে বিপরীত বয়ানের কৌশল সময়ক্রমের মধ্যে একটা রহস্যময়তা আনে, যার ফলে কাহিনির শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রেখে একই ঘটনার একাধিক সমান্তরাল ভাষ্যের আবির্ভাব ঘটানো সম্ভব হয়। জামশেদপুরের লোকদের বলা বেশিরভাগ কাহিনির মতোই যেগুলোর দুটো করে আলাদা ভাষ্য থাকে, আর তাদের সৃষ্টি হয় মুখে মুখে এবং ‘চিমনির ধোঁয়া’য় ‘চল্লিশ কদম’-এরও দুটো সমান্তরাল অথচ পৃথক প্লট আছে। একটিতে আছে মূল কাহিনিটি, যার সূচনা হয় একটা কবরস্থানে, আর তা নানা ঘটনার পর শেষ হয় সেই কবরস্থানেই; অন্যটি ধারণ করে আছে নায়ক শিকদারের স্ত্রী নূরজাহান আর তার ইংরেজ প্রেমিক ডসনের গোপন জীবনের ইতিবৃত্ত, যার শুরুটা গতানুগতিক হলেও যে কোনো বিয়োগান্ত প্রেমকাহিনির মতোই গতি উত্থান-পতনময়। কাহিনির শেষে যে আমরা দেখি শিকদার একই সঙ্গে মৃত এবং জীবিত, এই ব্যাপারটি অনিবার্যের অস্তিত্বকে ঘোষণা করায় এবং একই সঙ্গে তাকে অস্বীকার করায় কাহিনির ক্ষমতাকে তুলে ধরে। আর সন্দেহ নেই যে এই ক্ষমতা আহমেদ নিয়েছেন গল্পকথনের লোকজ ঐতিহ্য থেকে।

আহমেদের কাহিনি এমন এক স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্রেণির অন্তর্গত যেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয় এবং বজায় রাখা হয় একেবারে শুরু থেকে শেষ অব্দি, এবং যেখানে লেখক সাধারণ এবং অদ্ভুতের সমন্বয় ঘটান সমান সহজতায়। কাহিনিও এমন এক এলাকার মধ্য দিয়ে নিজের পথ বুনে এগিয়ে চলে, যা একই সঙ্গে চেনা এবং অদ্ভুতভাবে অচেনা। এই সুনির্মিত কাহিনিটির কেন্দ্রটি ভর করে আছে একটি বাস্তবধর্মী কাঠামোকে, যদিও এর মধ্যে আছে এক শান্ত-অলস আঙিনায় জন্মানো গল্পের বৈশিষ্ট্যাবলি; গল্পটির কথক এক বৃদ্ধ গ্রামবাসী, যে গ্রামে কল্পনা আর বাস্তবতার সীমানা অবলুপ্ত। কিন্তু লোকগল্পের ক্ষেত্রে যেমনটা হয়, স্থান-কাল থেকে শুরু করে সবকিছু থেকে যায় অনির্দিষ্ট, এবং যতটা নিশ্চিত তার থেকে অনেক বেশি অনুমাননির্ভর। এবং লোকগল্পের মতোই ‘চল্লিশ কদম’ তার সম্মোহনী ক্ষমতায় দেহজ আবেদন, রোমাঞ্চ এবং অধিবাস্তব কৌতুকরস জাগিয়ে তোলে।

কাজী আনিস আহমেদ এই নতুন প্রজন্মের লেখকদের একজন, যাঁরা বাংলাদেশের ইংরেজি ভাষার সাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবার চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করলেন। একই সঙ্গে তিনি সেই গুটিকয়েক লেখকদের একজন, যাঁরা তাঁদের প্রতিভার প্রথম চিহ্ন এঁকেছেন দেশের বাইরে তাঁর ক্ষেত্রে দেশটা যুক্তরাষ্ট্র আর তারপর সন্ধান করেছেন বাংলাদেশি পাঠকের। এই শেষোক্ত কাজটা তাঁর জন্য সহজ হয়ে গিয়েছিল ‘চল্লিশ কদম’ ছাপা হবার পর তিনি যে প্রশংসা পেয়েছিলেন তার বদৌলতে।

আহমেদের আকর্ষণীয় রচনাশৈলী, কাহিনির বাস্তবধর্মী কাঠামোর মধ্যে জাদুময়তাকে জায়গা দেবার ক্ষমতা, ক্ষমতাশালী ভাষা, চরিত্র সৃষ্টি এবং তাদেরকে ইতিহাস, ভূগোল এবং সমসাময়িক রাজনীতির বিচিত্র দৃশ্যে চালনা করবার সহজ দক্ষতা, লোকগল্পের ঐতিহ্যকে নতুন করে ব্যবহার করা, কাহিনি বয়ানের সমান্তরাল কিংবা পরস্পরবিরোধী সম্ভাবনাসমূহকে পাশাপাশি রাখার প্রবণতা এ সবকিছুকে, আশ্চর্যজনকভাবে, কাহিনির শেষের দিকে এসে ভারসাম্যে স্থিত করা হয়েছে আর কাহিনিতে উত্তেজনা সৃষ্টি ও তার প্রশমন নিয়ে তাঁর ক্লান্তিহীন খেলা আহমেদকে গল্পকথক হিসেবে অনন্য করে তুলেছে। ‘চল্লিশ কদম’-এ জামশেদপুরের একটা পুরনো দিনের আবহ রয়েছে যাকে গাঢ় বাদামি রঙেই সবচেয়ে ভালোভাবে কল্পনা করা যায়। সেখানে নূরজাহান এবং ডসন সমাজের আইনকানুন না মেনে মিলিত হলেও তাদেরকে রেহাই দেয়া হয়, তবে সেটা বাকি জীবনের নীরবতার সাজা দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দেবার আগে নয়।

আহমেদের প্রতিভার বিশেষত্ব হলো, এক মহৎ গল্পকথকের সূক্ষ্ম শিল্পদক্ষতা দিয়ে তিনি দৈনন্দিনতাকে রূপ দেয়ার সামর্থ্য রাখেন। নিছক সাধারণ একটা দিনে নিতান্ত সাধারণ লোকজনই তাঁকে সূক্ষ্ম ও পরিশীলিত সাহিত্যিক আখ্যান নির্মাণের জন্য যথেষ্ট মালমশলা জোগান দিতে পারে। তাঁর চরিত্রেরা পাঠকের সহানুভূতি আদায় করে নেয়, কারণ তাদেরকে মোটেই আগন্তুক মনে হয় না তাদের কাছে এবং কাহিনিতে, এমনকি তারা যখন নিজেদের মনের দুনিয়ার অতল জটিলতার মধ্যে বাস করে, তখনও। আহমেদের অনেক বর্ণনার মধ্যে একটা নজরকাড়া দৃশ্যময়তা রয়েছে, যা দেয় একটা বর্ণময়তার অনুভূতি; মনে হয় জীবন কাটছে অনেক মানুষজন আর জিনিসপত্রের মধ্যে। আবার দৈনন্দিনতার প্রসঙ্গ, তবে এবার একটু তির্যকভাবে। এর সঙ্গে যোগ করুন তাঁর নিয়ন্ত্রিত রসবোধ আর ‘অস্তিত্বের অসহনীয় লঘুতা’কে দেখানোর পরিহাসপ্রবণ ভঙ্গি। এইসব কারণে তাঁর বয়ান হয়ে ওঠে নিবিড় এবং আনন্দময়। একই সঙ্গে আছে এক বিষাদের অনুভূতি, যেন শিকদারের কাহিনিতে তা ধূলার মতো লেগে থাকে।

‘চল্লিশ কদম’ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন কলকাতাবাসী খ্যাতিমান বাঙালি পণ্ডিত ও অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। লাতিন আমেরিকান লেখকদের রচনা বাংলায় পরিবেশনের মতো আরো যন্ত্রণাদায়ক কাজটিও তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন, যা বিভিন্ন সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভাষার মধ্যবর্তী স্থানে তাঁর নিজেকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করবার সামর্থ্যরে সাক্ষ্য দেয়, এবং প্রতিস্থাপন ও স্থানান্তরের মধ্যে, অর্থোদ্ধার ও ব্যাখ্যানের মধ্যে, সমার্থকতা ও রূপান্তরের মধ্যে একটা মধ্যবর্তী পথ অনুসন্ধানে তাঁর সক্ষমতা প্রমাণ করে। ‘চল্লিশ কদম’-এর পটভূমি, চরিত্রসমূহ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহ, এর সঙ্কেত ও সূত্রসমূহ, এতে ব্যবহৃত ভাষার রূপ সবকিছুই একটা দেশি প্রেক্ষাপটে সংলগ্ন, তাই এতে অনুবাদের সমস্যা তুলনামূলকভাবে কম; শুধু প্রয়োজন গল্পটা বাংলায় নতুন করে বলা। তবু দুর্বলতর অনুবাদকের হাতে এই কাহিনির আনন্দময়তা আর বিষাদ হারিয়ে যেত, সেই সঙ্গে এর সূক্ষ্ম ভাষাগত বাঁকগুলো, আর চরিত্রগুলোর কণ্ঠের কৌতুক এবং স্বরভঙ্গি। বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদকে প্রাণময়তা দিয়েছে মূল রচনার মেজাজটা ধরতে পারায় তাঁর সফলতা, গল্পের জীবন্ত কাঠামো এবং কাহিনির ছন্দ ও চলন। অনুবাদে তিনি একটা কার্যকারিতার ধারণা ধরে এগিয়েছেন, যা তাঁকে গল্পটির অনূদিত সংস্করণটির নির্মাণপ্রক্রিয়ার একজন অংশী করে তুলেছে। কখনো কখনো তিনি ভাষার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা গ্রহণ করেছেন, ব্যবহার করেছেন এমন সব শব্দ ও পরিভাষা যা সাধারণত পুরনো আমলের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মুসলমানরাই ব্যবহার করতেন; বলাবাহুল্য, এখন সেগুলো বাংলাদেশের কোনো লেখক আর ব্যবহার করেন না। এই একটি সমস্যা ছাড়া, বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদ সুপাঠ্য ও সুসংগত।

‘চল্লিশ কদম’ সুদীর্ঘ একটা গল্প, তবে এর লেখকের গল্পকথনের ক্ষমতা পাঠকের মনোযোগ শেষ অব্দি ধরে রাখে। বলা হয়ে থাকে যে, ছোটগল্প একই সঙ্গে বর্ণনা ও অভিনয়ের জিনিস। কাজী আনিস আহমেদ সন্দেহাতীতভাবে একজন অভিনেতার ভূমিকা গ্রহণ করেছেন, যে অভিনেতার বর্ণনা একই সঙ্গে মানুষ ও স্থানকে, বাস্তব ও জাদুময়তাকে এবং তুচ্ছ ও মহানকে জীবন দান করে। আমি নিশ্চিত, ‘চল্লিশ কদম’ পড়ার অভিজ্ঞতা পাঠকের সন্তুষ্টি উৎপাদন করবে। (সংক্ষেপিত)

//জেডএস//

লাইভ

টপ