করোনাভাইরাসের পরের পৃথিবী

Send
ইউভাল নোয়াহ হারারি, তর্জমা: ইরফানুর রহমান রাফিন
প্রকাশিত : ১৫:০৬, মার্চ ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৭, মার্চ ২২, ২০২০

জেরুজালেম হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইজরায়েলি ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়াহ হারারি’র ‘স্যাপিয়েন্স : অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ হিউম্যানকাইন্ড’ (২০১৪), ‘হোমো দেউস : অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টুমরো’ (২০১৬) এবং ‘টোয়েন্টি লেসনস ফর টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ (২০১৮) বই তিনটি শুধু বেস্টসেলারই হয়নি, বৈশ্বিক বিদ্বান-সমাজেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।


মানবজাতি এখন একটা বৈশ্বিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। এটা সম্ভবত আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট। আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশে দেশে সরকার ও জনসাধারণ যেসব সিদ্ধান্ত নেবেন, সেগুলো সম্ভবত আসন্ন বছরগুলোর জন্য দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি ঠিক করে দেবে। এগুলো যে শুধুমাত্র আমাদের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার রূপটাই নির্ধারণ করে দেবে তা নয়, নির্ধারণ করে দেবে আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির রূপটাও। যা করার, কোনো ধরণের সংশয়ের বশবর্তী না হয়ে, আমাদেরকে দ্রুত করে ফেলতে হবে। যেসব পদক্ষেপ আমরা নেবো, সেসবের দীর্ঘমেয়াদী ফল কী হতে পারে, সেটাও আমাদেরকে আমলে নিতে হবে। একাধিক বিকল্পের ভেতর থেকে একটাকে বেছে নেওয়ার সময় আমাদের, শুধু এই নিয়ে ভাবলেই চলবে না যে আশু হুমকি মোকাবেলা করার জন্য কী করার আছে আমাদের, এটাও ভাবতে হবে যে, ঝড় কেটে যাওয়ার পর কোন ধরণের পৃথিবীতে থাকতে চাই আমরা। হ্যাঁ, ঝড়টা কেটে যাবে, মানবজাতি টিকে থাকবে, আমাদের অধিকাংশই বেঁচে থাকবে—কিন্তু আমরা একটি ভিন্ন দুনিয়ায় বাস করবো।

জরুরি অবস্থার কারণে নেওয়া বহু স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপই জীবনের একটা বাস্তবতায় পরিণত হবে। এটা জরুরী অবস্থার প্রকৃতি। তারা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলোকে ত্বরান্বিত করে। স্বাভাবিক সময়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বছরের পর বছর ধরে আলোচনা করা লাগে, সেগুলো কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নেওয়া হয়ে যায়। অবিকশিত, এবং এমনকি বিপজ্জনক প্রযুক্তিও কাজে লাগানো হয়, কারণ কিছুই না-করার ঝুঁকিটা তারচেয়েও অনেক বেশি। বৃহদায়তন সামাজিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পুরো দেশটাকেই গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সবাই যখন ঘরে বসে কাজ করে আর দূরত্ব বজায় রেখে যোগাযোগ করে, তখন কী ঘটে? যখন গোটা স্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই অনলাইনে চলে যায়, তখন কী ঘটে? স্বাভাবিক সময়ে, সরকার, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, আর শিক্ষাবোর্ডগুলো এই ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে কখনোই রাজি হতো না। কিন্তু এগুলো তো স্বাভাবিক সময় নয়।

এই সংকটের সময়ে, আমাদের সামনে সুনির্দিষ্ট দুইটা বাছবিচার আছে। প্রথমটা সর্বাত্মক স্বৈরাতান্ত্রিক নজরদারি আর নাগরিক ক্ষমতায়নের মধ্যে। দ্বিতীয়টা জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা আর বৈশ্বিক সংহতির মধ্যে।

নজরদারিকে চামড়ার নিচে নিয়ে যাওয়া

মহামারিঠেকাতে গোটা জনগোষ্ঠীকেই কিছু দিক-নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। এটা অর্জন করার দুটি প্রধান তরিকা আছে। একটা হচ্ছে, সরকার জনগণকে তত্ত্বাবধানে রাখবে, এবং যারা নিয়ম ভাঙে তাদেরকে শাস্তি দেবে। আজকে মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রযুক্তি সবাইকে তত্ত্বাবধানে আনাটা সম্ভবপর করে তুলেছে। পঞ্চাশ বছর আগে ২৪ কোটি সোভিয়েত নাগরিককে ২৪ ঘণ্টা অনুসরণ করা কেজিবির পক্ষে সম্ভব ছিলো না, জড়ো করা সব তথ্যকে কার্যকরভাবে প্রক্রিয়াজাত করার আশাও রাখতে পারতো না তারা। কেজিবি নির্ভর করতো মানব এজেন্ট আর বিশ্লেষকদের ওপরে, এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের পেছনে একজন এজেন্টকে লেলিয়ে দেওয়াটা স্রেফ অসম্ভব ছিলো। কিন্তু এখন সরকারগুলো সর্বব্যাপী সেন্সর আর ক্ষমতাশালী অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করতে পারে, রক্তমাংসের টিকটিকির আর কোনো প্রয়োজন নেই।

একাধিক সরকার ইতোমধ্যেই করোনাভাইরাস মহামারীর বিরুদ্ধে তাদের সমরে নতুন নজরদারির যন্ত্রপাতি বহাল করেছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে চীন। জনসাধারণের স্মার্টফোনগুলোকে নিবিড় তত্ত্বাবধানের আওতায় এনে, লক্ষ লক্ষ চেহারা-শনাক্তকরণ ক্যামেরা ব্যবহার করে, এবং জনসাধারণকে তাদের দৈহিক তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি চেক করতে এবং এই বিষয়ক প্রতিবেদন দাখিল করতে বাধ্য করে, চীনা কর্তৃপক্ষ শুধু যে দ্রুততার সাথে সন্দেহভাজন করোনাভাইরাস বাহকদেরকে শনাক্ত করতে পেরেছে তাই নয়, তাদের গতিবিধিও ট্র্যাক করতে পেরেছে, এবং তাদের সংস্পর্শে আসা যে কাউকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। নাগরিকদেরকে সংক্রমিত রোগীদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতার ব্যাপারে একগুচ্ছ মোবাইল অ্যাপস সতর্ক করে দেয়।

এই ধরণের প্রযুক্তি স্রেফ পূর্ব-এশিয়ায় সীমিত নয়। করোনাভাইরাস রোগীদেরকে চিহ্নিত করতে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ইজরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থাকে সেইসব নজরদারি প্রযুক্তি বহাল করার অনুমতি দিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে যেগুলো সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে লড়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। যখন সম্পৃক্ত সংসদীয় উপকমিটি এই পদক্ষেপে সায় দিতে অপারগতা প্রকাশ করে, তখন নেতানিয়াহু এটাকে একটা ‘জরুরী অবস্থাকালীন ডিক্রির’ জোরে পাশ করিয়ে নেন।

আপনি বলতে পারেন এতে নতুন কী আছে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনসাধারণকে ট্র্যাক, তত্ত্বাবধান, আর নিজেদেরকে স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য সরকার আর কর্পোরেশন উভয়েই অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর নমনীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। তথাপি, আমরা যদি সাবধান না থাকি, এই মহামারীটি নজরদারির ইতিহাসে একটা সন্ধিক্ষণ হিসেবে হাজির হতে পারে। শুধুমাত্র এই কারণেই নয় যে, এখন পর্যন্ত যেসব দেশ গণ নজরদারির যন্ত্রপাতি বহাল করার প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করে আসছিলো, সেসব দেশে তা বহাল করাটা স্বাভাবিক করে তোলা হবে। বরং এই কারণেও যে, একটা নাটকীয় রূপান্তরের ভেতর দিয়ে এটা নজরদারিকে ‘চামড়ার ওপর’ থেকে ‘চামড়ার নিচে’ নিয়ে যাবে।

আজকের আগ পর্যন্ত, আপনার আঙুল যখন আপনার স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্পর্শ করেছিলো এবং একটা লিংকে ক্লিক করেছিলো, সরকার জানতে চেয়েছিলো আপনার আঙুল ঠিক কী ক্লিক করেছিলো? কিন্তু করোনাভাইরাসের সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেটের ফোকাস বদলে গেছে। এখন সরকার জানতে চায় আপনার আঙুলের তাপমাত্রা কতো এবং এর ত্বকের নিচের রক্তচাপ কতো।

জরুরি অবস্থার পুডিং

নজরদারির ব্যাপারে আমরা এখন কোন দশায় আছি, সেটা খুঁজে বের করতে গিয়ে আমরা যে-সমস্যাটার সম্মুখীন হই, সেটা হচ্ছে, আমরা কেউই জানি না ঠিক কীভাবে আমাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে, এবং আসন্ন দিনগুলোতে কেমন হবে। নজরদারি প্রযুক্তি বিপজ্জনক গতিতে বিকশিত হচ্ছে, এবং আজ থেকে মাত্র ১০ বছর আগে যেটাকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বলে মনে হতো, সেটা এখন বাসি খবর। একটা চিন্তা পরীক্ষা হিসেবে, এমন একটি কাল্পনিক সরকারের কথা ভাবুন, যে দাবি করে প্রতিটি নাগরিককে একটা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে হবে, যা দিনের ২৪ ঘণ্টাই দৈহিক তাপমাত্রা আর হৃৎস্পন্দনের হার তত্ত্বাবধান করবে। এর ফলে যে ডাটা পাওয়া যাবে, তা সরকারি অ্যালগরিদম ব্যবহার করে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হবে। আপনি যে অসুস্থ, এটা আপনি নিজে টের পাওয়ার আগেই, অ্যালগরিদম টের পেয়ে যাবে। আপনি কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, সব অ্যালগরিদমের নখদর্পণে থাকবে। সংক্রমণের শেকলটাকে ব্যাপকভাবে ছোট করে আনা যাবে, এমনকি সেটাকে একেবারে কেটেও ফেলা যাবে। তর্কসাপেক্ষে বলা চলে, এরকম একটি ব্যবস্থা মহামারীটাকে এর যাত্রাপথে কয়েকদিনের মধ্যেই থামিয়ে দিতে পারবে। চমৎকার শোনাচ্ছে, তাই না?

বিপদের দিকটা হচ্ছে, অবশ্যই, এটা একটা ভয়ানক রকমের নতুন নজরদারি ব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়ে বসতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনি যদি জানেন আমি একটা সিএনএন লিংকের বদলে একটা ফক্স নিউজের লিংকে ক্লিক করেছিলাম, এটা থেকে আপনি আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং খানিকটা আমার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও আভাস পেয়ে যাবেন। কিন্তু একটা ভিডিও ক্লিপ দেখার সময় আমাদের দৈহিক তাপমাত্রা, রক্তচাপ, ও হৃৎস্পন্দনের হার কতো থাকে, সেটাও যদি আপনি তত্ত্বাবধান করতে পারেন, তাহলে কী আমাকে হাসায়, কী আমাকে কাঁদায়, এবং কী আমাকে প্রকৃতই, ক্ষুব্ধ করে তোলে আপনি সেটাও জানতে পারবেন।

এটা মনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, সর্দি-কাশির মতো আনন্দ-বেদনা-বিরক্তিবোধ-ভালোবাসাও জৈবিক ব্যাপার। যেই প্রযুক্তি কাশি চিহ্নিত করতে পারে, সেই প্রযুক্তি হাসিও চিহ্নিত করতে পারে। যদি সরকার আর কর্পোরেশনসমূহ আমাদের বায়োমেট্রিক ডাটা গণহারে জড়ো করা শুরু করে, আমরা নিজেদেরকে যতটা জানি, তারা আমাদেরকে তারচেয়ে ঢের বেশি ভালো জানতে পারবে। তারা যে শুধু আমাদের অনুভূতিই অনুমান করবে তাই নয়, সেই অনুভূতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করবে, এবং তাদের যা মন চায় তাই বিক্রি করবে আমাদের কাছে। তা সে একটা পণ্যই হোক, আর একজন রাজনীতিবিদই হোক। বায়োমেট্রিক তত্ত্বাবধান কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার ডাটা হ্যাক করার পদ্ধতিগুলোকে প্রস্তর যুগের জিনিসে পরিণত করতে পারে। ২০৩০-এর উত্তর কোরিয়ার কথা কল্পনা করুন, যেখানে প্রতিটি নাগরিককে দিনে ২৪ ঘণ্টাই একটা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে হয়। মহান নেতার একটা ভাষণ শুনছেন, আর বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট সুস্পষ্টভাবেই আপনার রাগের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে, তো আপনি গেছেন।

একটা জরুরি অবস্থার সময়ে সাময়িক পদক্ষেপ হিসেবে অবশ্যই আপনি বায়োমেট্রিক নজরদারির পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন। জরুরি অবস্থা কেটে গেলেই পদক্ষেপটা বাতিল করা হবে। কিন্তু সাময়িক পদক্ষেপগুলোর একটা নোংরা অভ্যাস আছে। সেটা হলো, এগুলো সাধারণত সাময়িক থাকে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমার দেশ ইজরায়েল ১৯৪৮-এ তার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জরুরি অবস্থা জারি করেছিলো। সংবাদপত্র সেন্সরশীপ ও ভূমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে পুডিং বানানোর বিশেষ বিধিবিধান (আমি ঠাট্টা করছি না) পর্যন্ত অনেক ব্যাপারে একগুচ্ছ সাময়িক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো। স্বাধীনতা যুদ্ধে বহুদিন আগে জেতা হয়ে গেছে, কিন্তু ইজরায়েল আজও আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি অবস্থার অবসান ঘোষণা করেনি, এবং ১৯৪৮-এর অনেক ‘সাময়িক’ পদক্ষেপ বাতিল করতে ব্যর্থ হয়েছে (ঈশ্বর করুণাময়, জরুরি অবস্থাকালীন পুডিং ডিক্রিটা ২০১১’য় বাতিল করা হয়েছে)।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ যদি কমতে কমতে শূন্যেও নেমে আসে, এমনকি তখনো কিছু ডাটা-ক্ষুধার্ত সরকার দাবি করবে, বায়োমেট্রিক নজরদারি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন আছে তাদের, কারণ করোনাভাইরাসের একটা দ্বিতীয় ঢেউ উঠতে পারে, অথবা কেন্দ্রীয় আফ্রিকায় নতুন ইবোলার জীবাণু দেখা দিচ্ছে, অথবা...বোঝেনই তো। গত কয়েক বছর ধরে আমাদের গোপনীয়তাকে কেন্দ্র করে একটা বিশাল লড়াই চলছে। করোনাভাইরাস সংকট এই লড়াইটার শীর্ষবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। কারণ জনসাধারণকে যখন গোপনীয়তা আর স্বাস্থ্যের মধ্য থেকে যেকোনো একটা বেছে নিতে বলা হবে, জনসাধারণ স্বাস্থ্যকে বেছে নেবে।

সাবান পুলিশ

আসলে জনসাধারণকে গোপনীয়তা আর স্বাস্থ্যের ভেতর যে-কোনো একটিকে বেছে নিতে বলাটাই সমস্যার একেবারে গোড়ার কথা। কারণ এটা একটা ভুল বাছ-বিচার। আমরা দুটোই বেছে নিতে পারি, এবং আমাদের দুটোই উপভোগ করার অধিকার আছে। আমরা আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারি, এবং করোনাভাইরাস মহামারি ঠেকাতে পারি, সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী নজরদারি ব্যবস্থাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার মাধ্যমে নয়, বরং, নাগরিকদেরকে ক্ষমতায়িত করে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, করোনাভাইরাস মহামারিপ্রতিরোধ করার সবচেয়ে সফল কিছু প্রচেষ্টা দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ও সিঙ্গাপুরে। এই দেশগুলো ট্র্যাকিং অ্যাপ যে একেবারেই ব্যবহার করেনি তা নয়, তবে তারা অনেক বেশি জোর দিয়েছে ব্যাপকভাবে রোগ পরীক্ষণ, সততার সঙ্গে তার প্রতিবেদন দাখিল করা, এবং ওয়াকেফহাল নাগরিকদের আন্তরিক সহযোগিতার ওপরে।


জনসাধারণ কার্যকর দিকনির্দেশনা মেনে চলবে, সেটা নিশ্চিত করতে, কেন্দ্রীভূত তত্ত্বাবধান আর কঠিন শাস্তি প্রদানই একমাত্র পথ নয়। যখন জনসাধারণের সামনে বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো তুলে ধরা হবে, এবং জনসাধারণ এই তথ্যাবলীর ব্যাপারে গণকর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা রাখতে সমর্থ হবে, তখন ঘাড়ের ওপর শ্বাস ফেলা কোনো বড় ভাই ছাড়াই নাগরিকরা সঠিক কাজটা করতে পারবে। স্বপ্রণোদিত ও ওয়াকেফহাল জনগোষ্ঠীগুলো সাধারণত পুলিশি নজরদারিতে থাকা অজ্ঞ জনগোষ্ঠীগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ও কার্যকর।
সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যাপারটি বিবেচনা করুন। মানুষের স্বাস্থ্যবিধির অন্যতম অসাধারণ অর্জনগুলোর একটি এটি। এই ছোট্টো কাজটি প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ জীবন বাঁচায়। আজকে আমরা এটাকে মামুলি ব্যাপার ধরে নিয়েছি, অথচ সাবান দিয়ে হাত ধোয়াটা যে গুরুত্বপূর্ণ, এটা কেবলমাত্র উনিশ শতকে এসে আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। এর আগ পর্যন্ত এমনকি চিকিৎসক আর সেবিকারা পর্যন্ত হাত না ধুয়েই, একটার পর একটা সার্জিক্যাল অপারেশন করে গেছেন। আজকে কোটি কোটি মানুষ দৈনন্দিনভাবে তাদের হাত পরিষ্কার করেন, এই কারণে না যে তারা কোনো সাবান পুলিশের ভয়ে ভীত, এই কারণে যে তারা তথ্যগুলো জানেন। আমি সাবান দিয়ে হাত ধুই কারণ আমি ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে জানি। আমি এটা বুঝি যে, এই ছোট ছোট প্রাণকণাগুলো অসুখ বাঁধাতে পারে। আর আমি এটাও জানি না, সাবান দিয়ে আমি এগুলোকে ধুয়ে দিতে পারি।
কিন্তু এই মাপের মান্যতা আর সহযোগিতা অর্জন করার জন্য আস্থার প্রয়োজন পড়বে। জনসাধারণকে বিজ্ঞানের ওপর, গণকর্তৃপক্ষের ওপর, ও গণমাধ্যমের ওপর আস্থা রাখতে হবে। বিগত কয়েক বছরে, দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিজ্ঞান, গণকর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমের ওপর জনসাধারণের আস্থা কমিয়ে আনতে ভূমিকা রেখেছে। আজকে এই একই দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা কর্তৃত্ববাদের মহাসড়কে উঠতে প্রলুব্ধ হতে পারে, এই যুক্তি নিয়ে হাজির হতে পারে যে সঠিক কাজটি করার ব্যাপারে জনসাধারণের ওপর আস্থা রাখা যাবে না।
সাধারণত, বছরের পর বছর ধরে যে আস্থা ভঙ্গ করা হয়েছে, সেটা রাতারাতি ফিরে পাওয়া যায় না। কিন্তু এটা কোনো স্বাভাবিক সময় নয়। সংকটের সময়ে, মানুষের মনও খুব দ্রুত বদলায়। বছরের পর বছর ধরে আপনার ভাইবোনদের সঙ্গে তিক্ত বিবাদের সম্পর্ক থাকতে পারে আপনার। কিন্তু জরুরি অবস্থার কালে আস্থা আর বন্ধুত্বের একটা গোপন কুয়ার সন্ধান আপনি পেয়ে যাবেন, এবং একজন আরেকজনকে সাহায্য করতে ছুটে যাবেন। একটা নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে বিজ্ঞান, গণকর্তৃপক্ষ, আর গণমাধ্যমে জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য এখনো খুব বেশি দেরী হয়ে যায়নি। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের অবশ্যই করা উচিত, কিন্তু সেটা নাগরিকদেরকে ক্ষমতায়িত করার জন্য। আমি নিশ্চয়ই আমার দৈহিক তাপমাত্রা আর রক্তচাপ তত্ত্বাবধান করার পক্ষে, কিন্তু সেটা কোনো সর্বশক্তিমান সরকার তৈরি করার জন্য নয়। বরঞ্চ, সেই ডাটার কাজ হবে ব্যক্তিগত বাছবিচারের ক্ষেত্রে আমাকে অধিকতর ওয়াকেফহাল করে তোলা, এবং সরকারকেও এর সিদ্ধান্তগুলোর জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করা।
যদি আমি দিনের ২৪ ঘণ্টাই আমার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ট্র্যাক করতে পারি, তাহলে আমি অন্য মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছি কিনা শুধু সেটাই যে জানতে পারবো তাই নয়, কোন অভ্যাসগুলো আমার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো সেটাও জানতে পারবো। আর করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানে যদি আমার প্রবেশাধিকার থাকে, এবং যদি আমি সেগুলো বিশ্লেষণ করতে পারি, তাহলে সরকার এ-ব্যাপারে আমাকে সত্য বলছে কিনা এবং মহামারিপ্রতিরোধে সঠিক নীতি অনুসরণ করছে কিনা সেটা আমি যাচাই করতে পারবো। যখন লোকে নজরদারির কথা বলে, মনে রাখবেন প্রযুক্তি শুধু যে সরকারই নাগরিকদেরকে তত্ত্বাবধানে রাখতে ব্যবহার করতে পারে তাই নয়—নাগরিকরা সেই একই প্রযুক্তি সরকারকে তত্ত্বাবধানে রাখতেও ব্যবহার করতে পারে।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবটা তাই নাগরিকত্বের একটি প্রধান পরীক্ষা। সামনের দিনগুলোতে, আমাদের প্রত্যেককে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের ওপর আস্থা রাখতে হবে, ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক আর স্বার্থপর রাজনীতিবিদদের ওপর নয়। আমরা যদি সঠিকটা বেছে নিতে ব্যর্থ হই, তবে দেখা যাবে নিজেদের সবচেয়ে মূল্যবান স্বাধীনতাগুলোই ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি আমরা, আর ভাবছি এটাই স্বাস্থ্য রক্ষার একমাত্র উপায়।
আমাদের একটা বৈশ্বিক পরিকল্পনা দরকার
আমরা দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বাছ-বিচারের সম্মুখীন, সেটা জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা আর বৈশ্বিক সংহতির মধ্যে। খোদ মহামারিটা, এবং এর ফলে দেখা দিতে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকটটা, দুটোই বৈশ্বিক সমস্যা। কেবলমাত্র বৈশ্বিক সহযোগিতার ভেতর দিয়েই কার্যকররূপে এগুলোর সমাধা করা সম্ভব।
সবার আগে ভাইরাসটাকে হারিয়ে দেয়ার জন্য, আমাদেরকে বৈশ্বিকভাবে তথ্য আদান-প্রদান করতে হবে। ভাইরাসের ওপর মানুষের একটা বড় সুবিধার জায়গা এটা। চীনে থাকা একটা করোনাভাইরাস আর আমেরিকায় থাকা একটা করোনাভাইরাস কীভাবে মানুষকে সংক্রমিত করতে হবে সেই বিষয়ে তথ্য বিনিময় করতে পারে না। কিন্তু কীভাবে করোনাভাইরাসের মোকাবেলা করতে হবে, সে-ব্যাপারে চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক মূল্যবান শিক্ষা প্রদান করতে পারে। ভোরবেলা একজন ইতালিয়ান চিকিৎসক মিলানে যা আবিষ্কার করেন তা বিকেল নাগাদ তেহরানে অসংখ্য জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে। কয়েকটি নীতির মধ্য থেকে কোনটা অনুসরণ করা হবে, সে-ব্যাপারে যুক্তরাজ্য সরকার যখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে, তখন দেশটি কয়েকমাস আগে একই ধরণের সংকটের সম্মুখীন হয়েছে যে কোরিয়ানরা, তাদের পরামর্শ নিতে পারে। কিন্তু এটা যাতে সম্ভবপর হয়ে ওঠে, সে-জন্য আমাদের একটা বৈশ্বিক সহযোগিতা ও আস্থার প্রয়োজন পড়বে।
দেশগুলোর উচিত হবে নিজেদের মধ্যে মুক্তভাবে তথ্য আদান-প্রদান করা এবং বিনয়ের সঙ্গে পরস্পরের পরামর্শ চাওয়া। যে ডাটা আর ইনসাইট তারা পাচ্ছে সেটার ওপর আস্থা রাখতেও সমর্থ হতে হবে তাদেরকে। মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো টেস্টিং কিট আর শ্বাসপ্রশ্বাসের যন্ত্র, উৎপাদন ও বিতরণের জন্য আমাদের একটি বৈশ্বিক প্রয়াসের প্রয়োজন পড়বে। প্রতিটা দেশ স্থানীয়ভাবে এটা করার চেষ্টা চালাচ্ছে, এবং হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাই মজুদ করছে, এরকম করার চেয়ে একটি সমন্বিত বৈশ্বিক প্রয়াসই বরং উৎপাদনকে ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করতে পারবে এবং জীবন-বাঁচানো যন্ত্রপাতি ন্যায্যভাবে বণ্টিত হচ্ছে কিনা সেটাও নিশ্চিত করতে পারবে। যুদ্ধের সময় দেশগুলো যেভাবে প্রধান প্রধান শিল্পখাতগুলোকে জাতীয়করণ করে, তেমনি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন লাইনগুলোকে ‘মানবিকীকৃত’ করার প্রয়োজন হতে পারে। করোনাভাইরাসের স্বল্পসংখ্যক কেস ধরা পড়েছে এমন ধনী দেশগুলোর অনেক বেশি কেস ধরা পড়েছে এমন গরিব দেশগুলোতে তারা মূল্যবান যন্ত্রপাতি পাঠাতে সম্মত থাকা উচিত। তাদেরকে এই ব্যাপারে আস্থা রাখতে হবে, পরবর্তী যদি ও যখন তাদের নিজেদের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে, অন্য দেশগুলো সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে।
মেডিক্যাল পার্সোনেলের ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরণের বৈশ্বিক প্রয়াস বিবেচনায় আনতে পারি। যেসব দেশ এখনো ততোটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সবচেয়ে খারাপ দশায় থাকা অঞ্চলগুলোতে সেসব দেশ তার মেডিক্যাল স্টাফ পাঠাতে পারে। বিপদে পাশে দাঁড়ানোও হলো, আবার মূল্যবান অভিজ্ঞতাও অর্জন করা হলো। পরবর্তীতে মহামারির ফোকাসটা যদি ঘুরে যায়, সাহায্য বিপরীত দিকেও বইতে পারে।
অর্থনৈতিক ফ্রন্টেও বৈশ্বিক সহায়তাটাও ব্যাপকভাবেই জরুরি। অর্থনীতি ও সরবরাহ শেকলের বৈশ্বিক চরিত্রটার কারণে, প্রতিটি সরকার যদি অন্য সবার কথা ভুলে গিয়ে শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ফলটা দাঁড়াবে বিশৃঙ্খলা আর সংকটের গভীরতর হওয়া। আমাদের একটা বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা দরকার, তাড়াতাড়ি দরকার।
আরেকটা প্রয়োজনীয়তা : ভ্রমণের ব্যাপারে একটা বৈশ্বিক বন্দোবস্তে পৌঁছানো। মাসের পর মাস ধরে সর্বপ্রকার আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বন্ধ রাখা ব্যাপক ভোগান্তির জন্ম দেবে, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অন্তত কিছু মানুষের জন্য ভ্রমণ করাটা জরুরি, যাদেরকে সীমান্ত পেরোনোর ব্যাপারে দেশগুলোকে পরস্পরের সাথে সহযোগিতা করতে হবে। এদের মধ্যে আছেন : বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ও ব্যবসায়ীগণ। ভ্রমণকারীদেরকে তাদের স্ব-স্ব দেশ আগেভাগেই স্ক্রিনিং করবে, এ-ব্যাপারে একটি বৈশ্বিক বোঝাপড়ায় সম্মত হতে পারলে কাজটা করা সম্ভব হবে। আপনি যদি জানেন শুধু সতর্কভাবে স্ক্যান করা যাত্রীদেরকেই একটা উড়োজাহাজে চড়ে বসতে দেয়া হয়েছে, নিজের দেশে তাদেরকে গ্রহণ করার ব্যাপারে আপনি অধিকতর সম্মত থাকবেন।
দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমানে দেশগুলো এসব থোড়াই কেয়ার করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর একটি সামষ্টিক পক্ষাঘাত চেপে বসেছে। মনে হচ্ছে ঘরে কোনো মুরুব্বি নাই। এই প্রত্যাশা করাটা কারো জন্য অস্বাভাবিক ছিলো না যে, হপ্তাখানেক আগেই বিশ্ব নেতারা একটি সাধারণত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে জরুরি সভায় বসেছেন। অথচ জি৭-ভুক্ত দেশগুলোর নেতারা মোটে এই সপ্তাহে একটা ভিডিও সংবাদ-সম্মেলন করতে পেরেছেন, এবং তাতে এমন কোনো কর্মপরিকল্পনা উঠে আসেনি।
পূর্ববর্তী বৈশ্বিক সংকটগুলোতে—যেমন ২০০৮’র আর্থিক সংকট বা ২০১৪’র এবোলা মহামারী— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বনেতার ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন সেই নেতৃত্বমূলক অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তারা তাদের অবস্থান পুরোপুরি পরিষ্কার করেছে : মানবজাতির ভবিষ্যতের চেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহত্ত্ব নিয়ে তাদের মাথাব্যথা অনেক বেশি।
এই প্রশাসন এমনকি তার নিকটতম মিত্রদেরকেও পরিত্যাগ করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে আমেরিকায় সব ভ্রমণ নিষিদ্ধ করার সময়, এটা ইইউকে একটা অগ্রিম নোটিশ দেয়ার গরজটা পর্যন্ত বোধ করেনি—এই মারাত্মক পদক্ষেপটা নিয়ে ইইউ-এর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা তো দূরের কথা। একটা নতুন কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের একচেটিয়া সত্ব কিনে নিতে একটি জার্মান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে ১ বিলিয়ন ডলার অফার করার মাধ্যমে এটি জার্মানিকে একটা কলঙ্কজনক দশায় ফেলেছে। বর্তমান প্রশাসন যদি হাওয়া বুঝে ঘোড়া বদলও করে, এবং একটা বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়েও আসে, এমনকি তখনও খুব কম লোকই এমন একজন নেতাকে অনুসরণ করবে, যিনি কোনোদিন দায়িত্ব নেন না, ভুল স্বীকার করেন না, এবং সব দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজে শুধু বাহবা কুড়ানোর তালে থাকেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেলে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করতে অন্য দেশগুলো যদি এগিয়ে না আসে, তাহলে বর্তমান মহামারিঠেকানোটাই যে কেবল কঠিন হয়ে উঠে তাই নয়, আগামী বছরগুলোতে এর উত্তরাধিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলাটা অব্যাহত রাখবে। তবু সব সংকটই একইসঙ্গে একটা সম্ভাবনাও বটে। আমরা আশা করতে পারি, বৈশ্বিক অনৈক্য যে তীব্র বিপদ ঘনিয়ে আনে, সেই উপলব্ধি করতে বর্তমান মহামারিটা মানবজাতিকে সহায়তা করবে।
মানবজাতির সামনে একটা বাছবিচার করার সময় এসেছে। আমরা কি অনৈক্যের পথ ধরে নিচের দিকে নেমে যাবো, নাকি বেছে নেবো বৈশ্বিক সংহতির পথ? যদি আমরা অনৈক্যকে বেছে নেই, এটা যে শুধু সংকটটাকেই ঘনীভূত করবে তাই নয়, ভবিষ্যতে এরচেয়েও মারাত্মক সব ধবংসযজ্ঞের পথ খুলে দেবে। আর আমরা যদি বৈশ্বিক সংহতিকে বেছে নেই, শুধু করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধেই নয়, ভবিষ্যৎ সব মহামারিআর একুশ শতকে মানবজাতি অন্য যেসব সংকটের সম্মুখীন হতে পারে তার বিরুদ্ধেও এটা একটা বিজয় হয়ে থাকবে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ